দোকান, বসতবাড়ি, মসজিদ, খামার— কিছুই বাদ নেই চোরচক্রের নজর থেকে; পুলিশের প্রতি আস্থা হারাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা।বগুড়ার ধুনট উপজেলায় একের পর এক চুরির ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। গত দুই মাসে উপজেলায় অন্তত ২০টি চুরির ঘটনা ঘটেছে। কয়েকটি ঘটনায় থানায় অভিযোগ ও মামলা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চোরেরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। দোকান, বসতবাড়ি, মসজিদ, গরুর খামার থেকে শুরু করে যানবাহন— কোনো কিছুই যেন নিরাপদ নয় সংঘবদ্ধ এই চোরচক্রের হাত থেকে।দিবালোকে মার্কেটে চুরি, গ্রেপ্তার ৮।সর্বশেষ গত বুধবার সকাল ৮টায় প্রকাশ্য দিবালোকে ধুনট বাজারের ইছামতি মার্কেটে ঘটে বড় ধরনের চুরির ঘটনা। মার্কেটের নাইট গার্ড সকাল ৮টার দিকে গেট খুলে নাশতা করতে যাওয়ার সুযোগে মাসুদ টেলিকম থেকে প্রায় ৯৪টি মোবাইল ফোন চুরি করে নিয়ে যায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এ ঘটনায় তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে যমুনা সেতু পশ্চিম থানা পুলিশ আন্তজেলা চোরচক্রের ৮ জনকে গ্রেপ্তার করলেও উপজেলার বাকি চুরির ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি নেই।আজ শনিবারও (১ নভেম্বর) ধুনটের হাসপাতাল রোডে মিলন স্টোরে চুরি হয়েছে। পার্শ্ববর্তী একটি সেলুনের টিন কেটে উপর দিয়ে উঠে নগদ টাকাসহ বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে যায় চোর।এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গরু, অটোভ্যানের ব্যাটারি, টিউবওয়েল, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন জিনিস নিয়মিতই চুরি হচ্ছে। ছাড় পাচ্ছে না মসজিদ-মাদ্রাসার সম্পদও।একের পর এক গরু চুরি, নিরাপত্তাহীনতায় খামারিরা।গত ৩০ আগস্ট উপজেলার মথুরাপুর ইউনিয়নের কাশিয়াহাটা গ্রামে দরজায় তালা দিয়ে অস্ত্র প্রদর্শন করে চারটি গরু চুরি করে একটি দল। ভুক্তভোগী মোহাম্মদ আলামিন বলেন, তাঁর তিনটি গরুর আনুমানিক মূল্য প্রায় তিন লাখ টাকা। এ ঘটনায় তাঁর প্রতিবেশী মালা বক্সের একমাত্র সম্বল একটি গরুও চুরি হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৮০ হাজার টাকা। একই গ্রামের বৃদ্ধ আলেয়ারের গরু নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হলেও এলাকাবাসী বুঝতে পারায় গরু রেখে পালিয়ে যায় চোরেরা।গত ২ আগস্ট গোপালপুর খাদুলী চারমাথা বাজার এলাকা থেকে গোলাম মোস্তফার প্রায় ২ লাখ টাকা দামের সাত মাসের গাভিন গরু চুরি হয়ে যায়।মথুরাপুর ইউনিয়নের খাদরে গ্রামের মো. রজিবুল ইসলাম মোহাব্বত দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিনকে বলেন, শুধু আমাদের নয়, বাড়ির পাশের অনেক বাড়িতেই চুরি হয়েছে। আমার এক লাখ আশি হাজার টাকা মূল্যের গাভিটি চুরি করে নিয়ে গেছে। তবে বাছুরটি নিতে না পারায় রেখে যায় তারা।একই গ্রামের সিংহের পাড়া এলাকার মো. একরামুল হোসেনের তিনটি গরু চুরি হয় গত ২১ সেপ্টেম্বর। তিনি বলেন, "রাত দুটার সময় গরু দেখে এসে ঘুমিয়ে পড়ি। স্ত্রী সকালে উঠে দেখেন গোয়ালে কোনো গরু নেই। আমার দুটি বকনা গরুর একটি সাত মাসের গাভিন ছিল, অন্যটির দাম প্রায় লাখ টাকা। থানায় জিডি করলেও পরবর্তীতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। পুলিশের প্রতি আমাদের তেমন কোনো আস্থা নেই।"চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের তোফিজ উদ্দিন সরকারের চারটি গরু একই রাতে চুরি হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় তিন লাখ টাকা। তাঁর নাতি ইয়াসিন আরাফাত বলেন, থানায় অভিযোগ করার পরেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের নাম বললেও তদন্তে কোনো অগ্রগতি দেখিনি।এলাকার ক্ষুদ্র খামারি মো. আবুল কালাম বলেন, আমরা দুই-তিনটা করে গরু পালন করে সংসার চালাই। চোরের উপদ্রবে রাতে না ঘুমিয়ে গরু পাহারা দিতে হয়। গরু চুরি হয়ে গেলে আমাদের চলার মতো আর কিছু থাকবে না।চুরির হাত থেকে রক্ষা পায়নি মসজিদও।গত ১০ আগস্ট চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের ফড়িংহাটা পূর্বপাড়া জামে মসজিদের জানালার গ্লাস ভেঙে গ্রিল কেটে মাইক, মাইক্রোফোন, তারসহ প্রায় ৬০ হাজার টাকার মালামাল চুরি করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এ সময় মসজিদের সৌর ব্যাটারিও নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু মানুষের উপস্থিতিতে পালিয়ে যায় তারা।দোকানে দোকানে হানা।গত ২০ আগস্ট নিমগাছি ইউনিয়নের ধামাচামা গ্রামের উত্তরপাড়ায় খোকা পরামানিকের ছেলে রাজিবুল হক রিজুর বাড়িতে সিঁধ কেটে স্বর্ণালংকার, মোবাইল ফোনসহ প্রায় ২ লাখ টাকার সামগ্রী চুরি করে নিয়ে যায় চোরেরা। তিনি বলেন, বর্তমানে যে হারে চোরের উপদ্রব বেড়েছে, তাতে নিজের বাড়িতেও আমরা অনিরাপদ।গত ১১ আগস্ট ধুনট পাইলট স্কুল মার্কেটের একটি দোকানের তালা কাটার চেষ্টা করা হলেও মানুষের উপস্থিতি বুঝে চোরেরা সেখান থেকে পালিয়ে যায়। এই দৃশ্য সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ে।গত ৯ আগস্ট গোবিন্দপুর বাজারে রাত ১০টায় দোকান বন্ধ করে খাবার খেতে বাড়িতে যান ইউসুফ স্টোরের মালিক। এর মধ্যেই রাত ১১টার মধ্যে দোকানের টিনের বেড়া কেটে প্রায় সাত হাজার টাকা নগদ ও দেড় লাখ টাকার মালামাল চুরি করা হয়। দোকানমালিক আব্দুল হামিদ বলেন, বর্তমানে এলাকায় চোরের উপদ্রব এত বেড়েছে যে স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করা কঠিন হয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে হয়তো আমাদের ব্যবসা করাই কঠিন হয়ে যাবে।" তিনি জানান, গত মাসে তাঁর পার্শ্ববর্তী শাহ আলমের দোকানেও এক লাখ টাকা নগদসহ বিভিন্ন মালামাল চুরি হয়। থানায় অভিযোগ দিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, "থানায় অভিযোগ দিলেও তেমন কোনো অগ্রগতি হয় না, চোর গ্রেপ্তার হয় না। তাই আমরা অভিযোগ দিতে ইচ্ছুক নই।গত ১৬ আগস্ট উজান সিং গ্রামের মধ্যপাড়ায় একটি দোকানের টিনের চাল কেটে ২ লাখ টাকা নগদসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।অটোরিকশা চুরি ও ছিনতাই।গত ১৯ সেপ্টেম্বর মথুরাপুর বাজার থেকে অটোভ্যান চুরি করে পালানোর সময় সিএনজির সঙ্গে দুর্ঘটনার কবলে পড়েন শেরপুরের বটতলার শেখ সাদী। স্থানীয় জনতা তাঁকে আটক করে।প্রায় ১৫ দিন আগে উত্তর অফিসারপাড়া এলাকার রাসেল বাবুর অটোরিকশা থেকে ব্যাটারি খুলে নিয়ে যায় চোরচক্র।গত ২১ সেপ্টেম্বর থানা থেকে মাত্র ৩০০ গজ দূরে বাঁশহাটা গ্রামের অটোচালক জয়ের অটো অস্ত্রের মুখে ছিনতাই করে নেওয়া হয়। পরে ২২ সেপ্টেম্বর রজিবুল ইসলাম নামে একজনকে ছিনতাই করা অটোসহ গ্রেপ্তার করা হয়।গত ১১ আগস্ট ফড়িংহাটা গ্রামে ছাগল চুরির সময় সুদীপ সরকার নামে একজনকে হাতেনাতে ধরে পুলিশে দেয় এলাকাবাসী।আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন বাসিন্দারা।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী বলেন, "ষচুরির ঘটনায় আমরা থানায় অভিযোগ করেছি। পুলিশ এসে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গেছে, কিন্তু এখনো কাউকে আটক করতে পারেনি। একই ঘটনা বারবার ঘটছে, কিন্তু কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। আমার মনে হয়, একটি চক্রই এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে।"ষচৌকিবাড়ী ইউনিয়নের পাঁচথুপী গ্রামের আবু তালেব বলেন, "ষবাড়িতে বউ-বাচ্চাকে একা রাখতেও ভয় লাগছে। দ্রুত এসব ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, চোরচক্র ধারাবাহিকভাবে দোকান ও খামারিদের লক্ষ্য করেই চুরি করছে, যাতে বাজারের সাধারণ ব্যবসায়ী ও খামারিরা পড়েছেন ব্যাপক দুশ্চিন্তায়।স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, যে সব বাড়িতে পুরুষ সদস্য কম, যেগুলো জনবসতি থেকে দূরে, এবং যে সব বাজারে নাইট গার্ড নেই বা দোকান ফাঁকা জায়গায়— সেসব স্থানেই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেশি। সচেতন মহলের দাবি, অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা না হলে এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটতে পারে।উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় চুরি, ছিনতাই ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।এ বিষয়ে ধুনট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুল ইসলাম বলেন, আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি এবং ইতিমধ্যে কিছু গ্রেফতার করেছি। এ বিষয়ে ধুনট থানা পুলিশ সতর্ক অবস্থানে আছে।