সোশ্যাল মিডিয়াসোশ্যাল মিডিয়া

বহুমুখী চাপের মুখে পুলিশ

পাবলিকভয়েস ডেক্স
পাবলিকভয়েস ডেক্স
|
শেয়ার করুন
অ+ অ-

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে বহুমুখী চাপের মুখে পড়েছে পুলিশ। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, সাধারণ অপরাধ দমন, সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, লুট হওয়া অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদক নিয়ন্ত্রণ, খুন, ছিনতাই, ডাকাতি ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের নিরাপত্তা প্রস্তুতি- সবকিছু সামলাতে হচ্ছে একই বাহিনীকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুলিশের অভ্যন্তরে বদলি, বাধ্যতামূলক অবসর ও আগের কর্মকাণ্ড নিয়ে জবাবদিহির চাপ। জুলাই অভ্যুত্থানের মামলা তদন্ত ও আসামি গ্রেপ্তার এবং পুলিশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা নিয়েও চাপে আছে মাঠপুলিশ। এর বাইরে রয়েছে সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা, জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদ ও আন্তঃদেশীয় অপরাধের মতো নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা।

সাম্প্রতিক সময়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলকে কেন্দ্র করে মাঠপুলিশের ওপর দায়বদ্ধতার চাপ আরও বেড়েছে। কোনো এলাকায় মিছিল হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার ওসি এবং তদারকি কর্মকর্তাকে দায় নিতে হবে- এমন বার্তাও পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে দেওয়া হয়েছে।

১১ সেপ্টেম্বর গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একটি ঝটিকা মিছিলকে কেন্দ্র করে এখনও তোলপাড় চলছে পুলিশে। এ ঘটনার পর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আগস্ট মাসের মাসিক অপরাধ সভায় কঠোর বার্তা দেওয়া হয় ডিসি ওসিদের। কোনো এলাকায় আওয়ামী লীগের ঝটিকা

মিছিল বের হলে ওই এলাকার ডিসি-ওসিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে সাবধান করা হয়। পরবর্তীকালে গুলশানে আওয়ামী লীগের মিছিলের ঘটনায় ব্যর্থতা দায় হিসেবে ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান জোনের ডিসি ও ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগের মিছিল নিয়ন্ত্রণ বা ঠেকানো নিয়ে প্রচণ্ড চাপের মুখে আছে ঢাকার ৫০ থানার ওসি ও জোনাল ডিসি-এডিসি, এসিরা। ডিএমপির একাধিক থানার ওসি এই চাপের বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

শুধু ঢাকা মহানগরই নয়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল নিয়ন্ত্রণ বা ঠেকানো নিয়ে সারাদেশেই মাঠ পুলিশ চাপের মুখে পড়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে সব রেঞ্জ ডিআইজি, জেলা পুলিশ সুপার এবং মহানগর পুলিশ কমিশনারকে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে।

সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা আমাদের সময়কে বলেন, যেকোনো ধরনের চাপ নিয়ে কাজ করতে পুলিশ অভ্যস্ত। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব চাপ সামলে পুলিশ কতটা পেশাদার, নিরপেক্ষ ও কার্যকরভাবে মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারছে, সেদিকে সিনিয়র কর্মকর্তাদের নিবিড় নজরদারি বাড়াতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধ দমনের প্রতিটি ধাপে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, একই সঙ্গে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে হবে। বড় কোনো ঘটনা ঘটার পরই প্রায়ই গোয়েন্দা ব্যর্থতার বিষয়টি সামনে আসে। গুলশানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এলাকায় ঝটিকা মিছিল বের হওয়ার ঘটনাও গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি ও পুলিশের গাফিলতির বিষয়টি সামনে এনেছে।

আশরাফুল হুদা বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও পুলিশের ভেতরে দীর্ঘ ১৭ বছরে তৈরি হওয়া ‘জঞ্জাল’ এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। তবে এই প্রক্রিয়ায় যেন কোনো নিরীহ কর্মকর্তা বা সদস্য ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেটিও সতর্কতার সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে কিনা, সেদিকেও নজর দিতে হবে। কারণ বাহিনীর সদস্যরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়লে তার প্রভাব মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় পড়তে পারে।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক আমাদের সময়কে বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অপরাধের সঙ্গে রাজনীতির যে সংযোগ রয়েছে, তা মোকাবিলা করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নানা ধরনের চাপের মধ্য দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। এর মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল ও রাজনৈতিক উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ও রয়েছে। তিনি বলেন, পুলিশ এখনও পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি, তাদের মনোবলও পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হয়েছে- এমনটা বলার সুযোগ নেই। অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রয়োগের দায়িত্ব পুলিশকেই পালন করতে হবে। তবে অপরাধের সঙ্গে রাজনীতির সংযোগ বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চাপ সরাসরি পুলিশের ওপর চাপিয়ে দিলে তাদের মনোবল আরও দুর্বল এবং বাহিনীর মধ্যে নতুন করে মেরুকরণ ও চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। তাই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে রাজনৈতিক ও আইনগত বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।

আইনশৃঙ্খলা ও অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রচণ্ড চাপের মুখে রয়েছে মাঠ পুলিশ। নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বস্তিকর পর্যায়ে পৌঁছেনি। কমানো যায়নি অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে গুলির ঘটনা বেড়েছে। খুনোখুনি, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও বেড়েছে। ছিনতাই, ডাকাতি ও একের পর এক লাশ উদ্ধারের ঘটনায় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা থেকে ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছিল। গত ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মধ্যে ৪ হাজার ৪৫৭টি উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও সন্ধান পাওয়া যায়নি ১ হাজার ৩০৬টি অস্ত্রের। অর্থাৎ লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের প্রায় ২৩ শতাংশ এখনও উদ্ধার হয়নি। এই অস্ত্র উদ্ধারে চাপে রয়েছে মাঠপুলিশ। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে এসব অস্ত্র নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে খোদ পুলিশে। কারণ লুণ্ঠিত অস্ত্র স্থানীয় নির্বাচনে ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় ওইসব অস্ত্র উদ্ধারে নতুন করে বিশেষ অভিযানও শুরু হয়েছে। স্থানীয় নির্বাচনের জন্য তিন ধরনের নিরাপত্তা প্রস্তুতি সম্পন্ন করাও পুলিশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা মাঠপুলিশের জন্য আলাদা চাপ তৈরি করছে। কারণ শুধু আসামি গ্রেপ্তার করাই নয়, গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে নিরাপদে থানায় নেওয়া, অভিযান পরিচালনা এবং অভিযানের সময় জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বও পুলিশকেই পালন করতে হচ্ছে। পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও বেড়েছে। বিএনপি সরকারের ৬ মাসে ৩১৭টি পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা ঘটে। এর আগের ৬ মাসে এ ধরনের ২৭৫টি ঘটনা ঘটে।

পুলিশের ওপর চাপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি। বদলি, পদোন্নতি ও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনা নিয়ে পুুলিশের একটি বড় অংশের মধ্যেই হতাশা ও অনিশ্চয়তা রয়েছে। গত দুই বছরে ইতোমধ্যে ১৯৭ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। আরও পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর কথা শোনা যাচ্ছে। এ নিয়ে অনেক কর্মকর্তা এখনও অবসর আতঙ্কে রয়েছেন। এতে মানসিক চাপে তারা স্বাভাবিক কাজে মনোযোগ দিতে পারছেন না বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা আমাদের সময়কে জানিয়েছেন।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করতেও চাপে রয়েছেন পুলিশের কর্মকর্তারা। এই মামলার পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করতেও তাগিদ রয়েছে তাদের ওপর। সাইবার অপরাধ, অনলাইন জুয়া ও প্রতারণার ঘটনা আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে। এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতেও মাঠ পুলিশের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

Public Voice

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬


বহুমুখী চাপের মুখে পুলিশ

প্রকাশের তারিখ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে বহুমুখী চাপের মুখে পড়েছে পুলিশ। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, সাধারণ অপরাধ দমন, সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, লুট হওয়া অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদক নিয়ন্ত্রণ, খুন, ছিনতাই, ডাকাতি ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের নিরাপত্তা প্রস্তুতি- সবকিছু সামলাতে হচ্ছে একই বাহিনীকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুলিশের অভ্যন্তরে বদলি, বাধ্যতামূলক অবসর ও আগের কর্মকাণ্ড নিয়ে জবাবদিহির চাপ। জুলাই অভ্যুত্থানের মামলা তদন্ত ও আসামি গ্রেপ্তার এবং পুলিশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা নিয়েও চাপে আছে মাঠপুলিশ। এর বাইরে রয়েছে সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা, জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদ ও আন্তঃদেশীয় অপরাধের মতো নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা।

সাম্প্রতিক সময়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলকে কেন্দ্র করে মাঠপুলিশের ওপর দায়বদ্ধতার চাপ আরও বেড়েছে। কোনো এলাকায় মিছিল হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার ওসি এবং তদারকি কর্মকর্তাকে দায় নিতে হবে- এমন বার্তাও পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে দেওয়া হয়েছে।

১১ সেপ্টেম্বর গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একটি ঝটিকা মিছিলকে কেন্দ্র করে এখনও তোলপাড় চলছে পুলিশে। এ ঘটনার পর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আগস্ট মাসের মাসিক অপরাধ সভায় কঠোর বার্তা দেওয়া হয় ডিসি ওসিদের। কোনো এলাকায় আওয়ামী লীগের ঝটিকা

মিছিল বের হলে ওই এলাকার ডিসি-ওসিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে সাবধান করা হয়। পরবর্তীকালে গুলশানে আওয়ামী লীগের মিছিলের ঘটনায় ব্যর্থতা দায় হিসেবে ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান জোনের ডিসি ও ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগের মিছিল নিয়ন্ত্রণ বা ঠেকানো নিয়ে প্রচণ্ড চাপের মুখে আছে ঢাকার ৫০ থানার ওসি ও জোনাল ডিসি-এডিসি, এসিরা। ডিএমপির একাধিক থানার ওসি এই চাপের বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

শুধু ঢাকা মহানগরই নয়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল নিয়ন্ত্রণ বা ঠেকানো নিয়ে সারাদেশেই মাঠ পুলিশ চাপের মুখে পড়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে সব রেঞ্জ ডিআইজি, জেলা পুলিশ সুপার এবং মহানগর পুলিশ কমিশনারকে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে।

সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা আমাদের সময়কে বলেন, যেকোনো ধরনের চাপ নিয়ে কাজ করতে পুলিশ অভ্যস্ত। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব চাপ সামলে পুলিশ কতটা পেশাদার, নিরপেক্ষ ও কার্যকরভাবে মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারছে, সেদিকে সিনিয়র কর্মকর্তাদের নিবিড় নজরদারি বাড়াতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধ দমনের প্রতিটি ধাপে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, একই সঙ্গে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে হবে। বড় কোনো ঘটনা ঘটার পরই প্রায়ই গোয়েন্দা ব্যর্থতার বিষয়টি সামনে আসে। গুলশানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এলাকায় ঝটিকা মিছিল বের হওয়ার ঘটনাও গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি ও পুলিশের গাফিলতির বিষয়টি সামনে এনেছে।

আশরাফুল হুদা বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও পুলিশের ভেতরে দীর্ঘ ১৭ বছরে তৈরি হওয়া ‘জঞ্জাল’ এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। তবে এই প্রক্রিয়ায় যেন কোনো নিরীহ কর্মকর্তা বা সদস্য ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেটিও সতর্কতার সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে কিনা, সেদিকেও নজর দিতে হবে। কারণ বাহিনীর সদস্যরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়লে তার প্রভাব মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় পড়তে পারে।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক আমাদের সময়কে বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অপরাধের সঙ্গে রাজনীতির যে সংযোগ রয়েছে, তা মোকাবিলা করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নানা ধরনের চাপের মধ্য দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। এর মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল ও রাজনৈতিক উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ও রয়েছে। তিনি বলেন, পুলিশ এখনও পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি, তাদের মনোবলও পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হয়েছে- এমনটা বলার সুযোগ নেই। অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রয়োগের দায়িত্ব পুলিশকেই পালন করতে হবে। তবে অপরাধের সঙ্গে রাজনীতির সংযোগ বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চাপ সরাসরি পুলিশের ওপর চাপিয়ে দিলে তাদের মনোবল আরও দুর্বল এবং বাহিনীর মধ্যে নতুন করে মেরুকরণ ও চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। তাই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে রাজনৈতিক ও আইনগত বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।

আইনশৃঙ্খলা ও অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রচণ্ড চাপের মুখে রয়েছে মাঠ পুলিশ। নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বস্তিকর পর্যায়ে পৌঁছেনি। কমানো যায়নি অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে গুলির ঘটনা বেড়েছে। খুনোখুনি, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও বেড়েছে। ছিনতাই, ডাকাতি ও একের পর এক লাশ উদ্ধারের ঘটনায় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা থেকে ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছিল। গত ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মধ্যে ৪ হাজার ৪৫৭টি উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও সন্ধান পাওয়া যায়নি ১ হাজার ৩০৬টি অস্ত্রের। অর্থাৎ লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের প্রায় ২৩ শতাংশ এখনও উদ্ধার হয়নি। এই অস্ত্র উদ্ধারে চাপে রয়েছে মাঠপুলিশ। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে এসব অস্ত্র নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে খোদ পুলিশে। কারণ লুণ্ঠিত অস্ত্র স্থানীয় নির্বাচনে ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় ওইসব অস্ত্র উদ্ধারে নতুন করে বিশেষ অভিযানও শুরু হয়েছে। স্থানীয় নির্বাচনের জন্য তিন ধরনের নিরাপত্তা প্রস্তুতি সম্পন্ন করাও পুলিশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা মাঠপুলিশের জন্য আলাদা চাপ তৈরি করছে। কারণ শুধু আসামি গ্রেপ্তার করাই নয়, গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে নিরাপদে থানায় নেওয়া, অভিযান পরিচালনা এবং অভিযানের সময় জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বও পুলিশকেই পালন করতে হচ্ছে। পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও বেড়েছে। বিএনপি সরকারের ৬ মাসে ৩১৭টি পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা ঘটে। এর আগের ৬ মাসে এ ধরনের ২৭৫টি ঘটনা ঘটে।

পুলিশের ওপর চাপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি। বদলি, পদোন্নতি ও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনা নিয়ে পুুলিশের একটি বড় অংশের মধ্যেই হতাশা ও অনিশ্চয়তা রয়েছে। গত দুই বছরে ইতোমধ্যে ১৯৭ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। আরও পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর কথা শোনা যাচ্ছে। এ নিয়ে অনেক কর্মকর্তা এখনও অবসর আতঙ্কে রয়েছেন। এতে মানসিক চাপে তারা স্বাভাবিক কাজে মনোযোগ দিতে পারছেন না বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা আমাদের সময়কে জানিয়েছেন।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করতেও চাপে রয়েছেন পুলিশের কর্মকর্তারা। এই মামলার পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করতেও তাগিদ রয়েছে তাদের ওপর। সাইবার অপরাধ, অনলাইন জুয়া ও প্রতারণার ঘটনা আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে। এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতেও মাঠ পুলিশের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।


Public Voice

সম্পাদক: মোঃ বাদশাহ আলমগীর
প্রকাশক: অনন্যা অনসূয়া দিবা

কপিরাইট © ২০২৬ Public Voice । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত