সাহিত্যসাহিত্য

অতীতের স্মৃতি, আগামীর প্রেরণা- কেন্দুয়ায় লোকজ সাহিত্য আসর

গ্রামীণ জীবনের সেকাল-একাল, লোকজ ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক স্মৃতি (cultural memory), নস্টালজিয়া (nostalgia) এবং পরিবর্তিত জীবনযাত্রার নানা অনুষঙ্গ নিয়ে প্রাণবন্ত এক লোকজ সাহিত্যিক আসর অনুষ্ঠিত হয়েছে নেত্রকোনার কেন্দুয়ায়। স্মৃতিচারণ, লোককথা ও অভিজ্ঞতার বয়ানে ফিরে আসে হারিয়ে যেতে বসা এক গ্রামীণ সময়—যেখানে প্রকৃতি, মানুষ, পারস্পরিক সম্প্রীতি ও লোকজ সংস্কৃতি মিলেমিশে তৈরি করেছিল এক স্বতন্ত্র গ্রামীণ জীবনচিত্র (rural life)

শুক্রবার বিকেলে কেন্দুয়া প্রেসক্লাব মিলনায়তনে লোকজ সাহিত্য আসরের ধারাবাহিক সাপ্তাহিক আয়োজনের অংশ হিসেবে ব্যতিক্রমী এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় সভাপতিত্ব করেন কেন্দুয়া প্রেসক্লাবের সিনিয়র সহসভাপতি রফিকুল ইসলাম। প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক মো. হারেছ উদ্দিন ফকির। আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন কেন্দুয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত আলী চৌধুরী কাজল এবং কবি-সাংবাদিক ও কেন্দুয়া উপজেলা মিডিয়া ক্লাবের সভাপতি সমরেন্দ্র বিশ্বশ শর্মা।

পালানাট্যকার ও সাংবাদিক রাখাল বিশ্বাসের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন কেন্দুয়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও গীতিকবি আব্দুল হাই সেলিম, বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল হক ভূইয়া, কেন্দুয়া উপজেলা জাসাসের আহ্বায়ক গোলাম মোস্তাফা ভূইয়া হাবুল, বাংলা একাডেমির সংগ্রাহক ও বেতারশিল্পী আবুল বাসার তালুকদার, বেতারশিল্পী ওল্লীউল্লাহ্, বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত গীতিকার এম আকবর, শিক্ষক ও কবি শাহাবুল করিব ভূইয়া, কবি-সাংবাদিক কুহিনূর আলম, সাংবাদিক হুমায়ুন কবির রিটন, সাংবাদিক রোকন উদ্দিন, কবি-সাংবাদিক মহিউদ্দীনসহ অনেকে।

বক্তারা বলেন, একসময় গ্রামের জীবন ছিল প্রকৃতিনির্ভর, সম্প্রীতিময় ও সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ। পাড়ায় পাড়ায় আড্ডা, উঠানে গল্প, যাত্রাপালা, পালাগান, কবিগান, বাউলগানসহ নানা লোকজ পরিবেশনা (folk performance) ছিল মানুষের বিনোদন, জ্ঞানবিনিময় ও সামাজিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এসব আয়োজন কেবল বিনোদন ছিল না; এগুলো ছিল প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মৌখিক ঐতিহ্য (oral tradition) ও জীবনবোধ সঞ্চারের মাধ্যম।

বক্তাদের স্মৃতিচারণে উঠে আসে শৈশব-কৈশোরের সেই নস্টালজিক গ্রামীণ দৃশ্যপট—মেঠোপথ, খেলার মাঠ, পুকুরঘাট, বর্ষার দিন, শীতের পিঠাপুলি, রাতের গল্প-আড্ডা এবং হারিয়ে যাওয়া নানা লোকজ আয়োজন। ব্যক্তিগত স্মৃতির এসব খণ্ডচিত্র একসময় মিলিত হয়ে তৈরি করে collective memory বা সমষ্টিগত স্মৃতির এক আবেগঘন বয়ান।

তারা বলেন, সময়ের প্রবাহে গ্রামীণ জীবনেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। প্রযুক্তির বিস্তার, নগরায়ণ ও আধুনিক জীবনযাত্রার প্রভাবে অনেক লোকজ ঐতিহ্য, সামাজিক রীতি ও পারস্পরিক যোগাযোগের পুরোনো ধরন বিলুপ্তির পথে। ফলে সেকালের গ্রামীণ জীবন আজ অনেকাংশেই পরিণত হয়েছে সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও নস্টালজিয়ার উপাদানে

আলোচনায় বক্তারা শৈশব-কৈশোরের নানা স্মৃতির পাশাপাশি হারিয়ে যাওয়া লোকজ সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন অনুষঙ্গ তুলে ধরেন। তাদের কথায় কখনো ফুটে ওঠে pastoral imagery—মেঠোপথ, মাঠ, পুকুর ও প্রকৃতির চিত্র; কখনো oral narrative—দাদু-নানুর মুখে শোনা গল্প, লোককথা ও আড্ডার স্মৃতি। ফলে পুরো আয়োজনটি হয়ে ওঠে এক ধরনের living archive—জীবন্ত সাংস্কৃতিক স্মৃতিভাণ্ডার

বক্তারা আরও বলেন, গ্রামীণ জীবনের ঐতিহ্য কেবল অতীতের রোমান্টিক স্মৃতি নয়; এটি আমাদের শিকড়, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও collective heritage-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। লোকজ সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা মানে শুধু পুরোনো দিনের স্মৃতি সংরক্ষণ নয়, বরং নতুন প্রজন্মের সঙ্গে অতীতের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের একটি intergenerational dialogue বা প্রজন্মান্তরের সংলাপ তৈরি করা।

তাই হারিয়ে যেতে বসা লোকজ সাহিত্য, সংস্কৃতি, লোককথা, লোকসংগীত ও গ্রামীণ ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে নিয়মিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।

আলোচনা শেষে লোকজ সাহিত্য আসরের নিয়মিত আয়োজন অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীরা। তাদের প্রত্যাশা—লোকজ সাহিত্য ও সংস্কৃতির এই ধারাবাহিক চর্চা অতীতের cultural memory-কে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরবে বাংলার গ্রামীণ জীবনের বহমান লোকঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার

Public Voice

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬


অতীতের স্মৃতি, আগামীর প্রেরণা- কেন্দুয়ায় লোকজ সাহিত্য আসর

প্রকাশের তারিখ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

গ্রামীণ জীবনের সেকাল-একাল, লোকজ ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক স্মৃতি (cultural memory), নস্টালজিয়া (nostalgia) এবং পরিবর্তিত জীবনযাত্রার নানা অনুষঙ্গ নিয়ে প্রাণবন্ত এক লোকজ সাহিত্যিক আসর অনুষ্ঠিত হয়েছে নেত্রকোনার কেন্দুয়ায়। স্মৃতিচারণ, লোককথা ও অভিজ্ঞতার বয়ানে ফিরে আসে হারিয়ে যেতে বসা এক গ্রামীণ সময়—যেখানে প্রকৃতি, মানুষ, পারস্পরিক সম্প্রীতি ও লোকজ সংস্কৃতি মিলেমিশে তৈরি করেছিল এক স্বতন্ত্র গ্রামীণ জীবনচিত্র (rural life)

শুক্রবার বিকেলে কেন্দুয়া প্রেসক্লাব মিলনায়তনে লোকজ সাহিত্য আসরের ধারাবাহিক সাপ্তাহিক আয়োজনের অংশ হিসেবে ব্যতিক্রমী এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় সভাপতিত্ব করেন কেন্দুয়া প্রেসক্লাবের সিনিয়র সহসভাপতি রফিকুল ইসলাম। প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক মো. হারেছ উদ্দিন ফকির। আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন কেন্দুয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত আলী চৌধুরী কাজল এবং কবি-সাংবাদিক ও কেন্দুয়া উপজেলা মিডিয়া ক্লাবের সভাপতি সমরেন্দ্র বিশ্বশ শর্মা।

পালানাট্যকার ও সাংবাদিক রাখাল বিশ্বাসের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন কেন্দুয়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও গীতিকবি আব্দুল হাই সেলিম, বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল হক ভূইয়া, কেন্দুয়া উপজেলা জাসাসের আহ্বায়ক গোলাম মোস্তাফা ভূইয়া হাবুল, বাংলা একাডেমির সংগ্রাহক ও বেতারশিল্পী আবুল বাসার তালুকদার, বেতারশিল্পী ওল্লীউল্লাহ্, বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত গীতিকার এম আকবর, শিক্ষক ও কবি শাহাবুল করিব ভূইয়া, কবি-সাংবাদিক কুহিনূর আলম, সাংবাদিক হুমায়ুন কবির রিটন, সাংবাদিক রোকন উদ্দিন, কবি-সাংবাদিক মহিউদ্দীনসহ অনেকে।

বক্তারা বলেন, একসময় গ্রামের জীবন ছিল প্রকৃতিনির্ভর, সম্প্রীতিময় ও সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ। পাড়ায় পাড়ায় আড্ডা, উঠানে গল্প, যাত্রাপালা, পালাগান, কবিগান, বাউলগানসহ নানা লোকজ পরিবেশনা (folk performance) ছিল মানুষের বিনোদন, জ্ঞানবিনিময় ও সামাজিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এসব আয়োজন কেবল বিনোদন ছিল না; এগুলো ছিল প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মৌখিক ঐতিহ্য (oral tradition) ও জীবনবোধ সঞ্চারের মাধ্যম।

বক্তাদের স্মৃতিচারণে উঠে আসে শৈশব-কৈশোরের সেই নস্টালজিক গ্রামীণ দৃশ্যপট—মেঠোপথ, খেলার মাঠ, পুকুরঘাট, বর্ষার দিন, শীতের পিঠাপুলি, রাতের গল্প-আড্ডা এবং হারিয়ে যাওয়া নানা লোকজ আয়োজন। ব্যক্তিগত স্মৃতির এসব খণ্ডচিত্র একসময় মিলিত হয়ে তৈরি করে collective memory বা সমষ্টিগত স্মৃতির এক আবেগঘন বয়ান।

তারা বলেন, সময়ের প্রবাহে গ্রামীণ জীবনেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। প্রযুক্তির বিস্তার, নগরায়ণ ও আধুনিক জীবনযাত্রার প্রভাবে অনেক লোকজ ঐতিহ্য, সামাজিক রীতি ও পারস্পরিক যোগাযোগের পুরোনো ধরন বিলুপ্তির পথে। ফলে সেকালের গ্রামীণ জীবন আজ অনেকাংশেই পরিণত হয়েছে সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও নস্টালজিয়ার উপাদানে

আলোচনায় বক্তারা শৈশব-কৈশোরের নানা স্মৃতির পাশাপাশি হারিয়ে যাওয়া লোকজ সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন অনুষঙ্গ তুলে ধরেন। তাদের কথায় কখনো ফুটে ওঠে pastoral imagery—মেঠোপথ, মাঠ, পুকুর ও প্রকৃতির চিত্র; কখনো oral narrative—দাদু-নানুর মুখে শোনা গল্প, লোককথা ও আড্ডার স্মৃতি। ফলে পুরো আয়োজনটি হয়ে ওঠে এক ধরনের living archive—জীবন্ত সাংস্কৃতিক স্মৃতিভাণ্ডার

বক্তারা আরও বলেন, গ্রামীণ জীবনের ঐতিহ্য কেবল অতীতের রোমান্টিক স্মৃতি নয়; এটি আমাদের শিকড়, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও collective heritage-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। লোকজ সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা মানে শুধু পুরোনো দিনের স্মৃতি সংরক্ষণ নয়, বরং নতুন প্রজন্মের সঙ্গে অতীতের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের একটি intergenerational dialogue বা প্রজন্মান্তরের সংলাপ তৈরি করা।

তাই হারিয়ে যেতে বসা লোকজ সাহিত্য, সংস্কৃতি, লোককথা, লোকসংগীত ও গ্রামীণ ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে নিয়মিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।

আলোচনা শেষে লোকজ সাহিত্য আসরের নিয়মিত আয়োজন অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীরা। তাদের প্রত্যাশা—লোকজ সাহিত্য ও সংস্কৃতির এই ধারাবাহিক চর্চা অতীতের cultural memory-কে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরবে বাংলার গ্রামীণ জীবনের বহমান লোকঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার


Public Voice

সম্পাদক: মোঃ বাদশাহ আলমগীর
প্রকাশক: অনন্যা অনসূয়া দিবা

কপিরাইট © ২০২৬ Public Voice । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত