সাহিত্য
---এস এম আজাদ হোসেন
শ্রাবণ শেষ হয়ে গেছে-
ক্যালেন্ডারের পাতায়
বর্ষার নামটাও যেন মুছে ফেলেছে সময়,
তবু বারান্দার কার্নিশে
এক ফোঁটা বৃষ্টি ঝুলে আছে-
যেন বিদায় নিতে গিয়েও
ফিরে তাকিয়েছে বর্ষা।
বর্ষা কি কখনো
শুধু আকাশ থেকে নামে?
বর্ষা নামে
কৃষকের কপালের চিন্তা মুছে দিতে,
শুকিয়ে যাওয়া জমির বুক ভিজিয়ে দিতে,
ধানের চারায় সবুজ স্বপ্ন বসাতে,
পুকুরের জলে হারিয়ে যাওয়া
আকাশটাকে আবার ফিরিয়ে দিতে।
বর্ষা নামে নদীর কাছে-
নদী তখন আর নদী থাকে না,
সে হয়ে ওঠে
দিগন্তজোড়া এক অস্থির জীবন।
ঘাটের শেষ সিঁড়িটা ডুবে যায়,
জেলে নৌকা নিয়ে দূরে যায়,
কোনো মা দরজায় দাঁড়িয়ে
ছেলের ফেরার পথ দেখে,
আর কোনো শিশু
জানালার কাচে আঙুল দিয়ে
বৃষ্টির রেখার মধ্যে
নিজের অজানা পৃথিবী আঁকে।
কিন্তু এই শহরের বর্ষা
একটু অন্যরকম।
এখানে বৃষ্টি নামলেই
আকাশের সৌন্দর্যের আগে
মানুষ খোঁজে রাস্তার অবস্থা।
একটু পরেই
পথের বুক জলে ভরে ওঠে,
রিকশার চাকা ডুবে যায়,
জুতোর ভেতর পানি ঢোকে,
বাসের জানালায় কাদা ছিটকে পড়ে,
অফিসফেরত মানুষ
ছাতা মাথায় নিয়ে
হাঁটুসমান পানির সঙ্গে
প্রতিদিনের যুদ্ধ করে।
একজন শ্রমিক
বৃষ্টির মধ্যেও কাজে যায়-
তার কাছে বর্ষা
কবিতা নয়,
দিন শেষে এক মুঠো ভাতের হিসাব।
একজন রিকশাচালক
ভেজা জামা গায়ে
প্যাডেলে চাপ দেয়-
কারণ বৃষ্টি
তার সংসারের খরচ কমায় না।
একজন ফুটপাতবাসী
পলিথিন টেনে
ঘুমানোর জায়গাটা বাঁচায়-
তার কাছে মেঘের গর্জন
রোমান্টিক কোনো সংগীত নয়।
তবু আশ্চর্য এই বর্ষা!
এত কষ্টের মাঝেও
মানুষ বৃষ্টিকে ভালোবাসে।
কারণ বৃষ্টি নামলে
মাটির গন্ধে
শৈশব ফিরে আসে।
ভেজা রাস্তায়
পুরোনো কারও কথা মনে পড়ে।
জানালার পাশে বসে
এক কাপ চায়ের ধোঁয়ায়
কেউ খুঁজে নেয়
বহুদিনের হারানো বিকেল।
কোনো তরুণী
ভেজা চুল জানালার পাশে শুকায়,
কেউ দূরের শহরে থাকা প্রিয়জনকে
মুঠোফোনে বলে-
‘এখানে খুব বৃষ্টি হচ্ছে।’
অন্য প্রান্ত থেকে উত্তর আসে-
‘এখানেও।’
দুটি শহর,
দুটি জানালা,
দুটি মানুষ-
মাঝখানে শুধু
অসংখ্য বৃষ্টির রেখা।
বর্ষা আসলে
দূরত্বও মাপতে জানে।
কোনো ছাতা
দুজন মানুষকে কাছে আনে,
কোনো বৃষ্টি
দুজন মানুষকে আরও দূরে সরিয়ে দেয়।
কেউ বৃষ্টিতে প্রেম খোঁজে,
কেউ আশ্রয়।
কেউ কবিতা লেখে,
কেউ ভেজা চাল বাঁচায়।
কেউ মেঘ দেখে ছবি তোলে,
কেউ মেঘ দেখে ভাবে-
আজ কাজ বন্ধ হলে
চুলায় আগুন জ্বলবে তো?
বর্ষা তাই
সবার কাছে এক নয়।
কারও কাছে
কদমফুলের গন্ধ,
কারও কাছে
জলমগ্ন ঘরের আতঙ্ক।
কারও কাছে
প্রেমের ঋতু,
কারও কাছে
জীবন বাঁচানোর লড়াই।
তবু বর্ষা
সবাইকে এক মুহূর্তের জন্য
এক আকাশের নিচে দাঁড় করায়।
ধনী মানুষের বারান্দায়ও বৃষ্টি,
গরিবের টিনের চালেও বৃষ্টি।
অট্টালিকার কাচে বৃষ্টি,
কুঁড়েঘরের টিনে বৃষ্টি।
পাকা রাস্তার ওপর বৃষ্টি,
কাদামাটির পথেও বৃষ্টি।
আকাশ কাউকে
কম জল দেয় না।
মানুষই শুধু
জলের ভাগ আলাদা করে নেয়।
কোথাও নদী ভাঙে,
কোথাও নদী গড়ে।
কোথাও ঘর ভেসে যায়,
কোথাও নতুন ফসলের আশা জন্ম নেয়।
বর্ষা
এক হাতে নেয়,
অন্য হাতে দেয়।
তাই বৃষ্টি থামলে
মাটি শুধু ভেজা থাকে না-
তার ভেতরে
পরের দিনের জন্মের শব্দ শোনা যায়।
কৃষকের মুখে তখন
একটু হাসি।
সবুজ ধানের পাতায়
জলের বিন্দু কাঁপে।
দূরের বাঁশবাগানে
বাতাস ঢুকে
অদৃশ্য কোনো বাঁশির সুর তোলে।
পুকুরের জলে
বৃত্ত তৈরি হয়-
একটির পর একটি।
মনে হয়,
প্রকৃতি নিজেই
অদৃশ্য হাতে লিখছে-
‘সব শেষ হয়ে যায়নি।’
শ্রাবণ চলে গেছে,
কিন্তু বর্ষা কি চলে যায়?
কোনো ভেজা মাটির গন্ধে
সে থেকে যায়।
কোনো কৃষকের আশায়
সে থেকে যায়।
কোনো শিশুর কাগজের নৌকায়
সে থেকে যায়।
কোনো মায়ের অপেক্ষায়
সে থেকে যায়।
কোনো পুরোনো গানে,
কোনো জানালার কাচে,
কোনো অসমাপ্ত প্রেমে,
কোনো নদীর ঢেউয়ে
সে থেকে যায়।
আর আমরা-
ব্যস্ত শহরের মানুষ-
ছাতা হাতে
জল মাড়িয়ে
নিজ নিজ গন্তব্যে ছুটতে ছুটতে
হয়তো ভুলেই যাই,
আমাদের মাথার ওপর
যে আকাশটি আজও বৃষ্টি ঝরায়,
সেই আকাশই একদিন
আমাদের শুষ্ক পৃথিবীকে
বাঁচিয়ে রাখবে।
তাই শ্রাবণ শেষ হোক,
বর্ষা শেষ না হোক।
আর যদি বৃষ্টি থেমেও যায়,
তবু যেন
আমাদের হৃদয়ের মাটি
শুকিয়ে না যায়।
কারণ-
পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখে শুধু বৃষ্টি নয়,
বৃষ্টির মতো
একটু মমতাও।
আর মানুষকে মানুষ করে রাখে শুধু
ভেজা মাটি নয়-
ভেতরে জমে থাকা
একটু সবুজও।

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ আগস্ট ২০২৬
---এস এম আজাদ হোসেন
শ্রাবণ শেষ হয়ে গেছে-
ক্যালেন্ডারের পাতায়
বর্ষার নামটাও যেন মুছে ফেলেছে সময়,
তবু বারান্দার কার্নিশে
এক ফোঁটা বৃষ্টি ঝুলে আছে-
যেন বিদায় নিতে গিয়েও
ফিরে তাকিয়েছে বর্ষা।
বর্ষা কি কখনো
শুধু আকাশ থেকে নামে?
বর্ষা নামে
কৃষকের কপালের চিন্তা মুছে দিতে,
শুকিয়ে যাওয়া জমির বুক ভিজিয়ে দিতে,
ধানের চারায় সবুজ স্বপ্ন বসাতে,
পুকুরের জলে হারিয়ে যাওয়া
আকাশটাকে আবার ফিরিয়ে দিতে।
বর্ষা নামে নদীর কাছে-
নদী তখন আর নদী থাকে না,
সে হয়ে ওঠে
দিগন্তজোড়া এক অস্থির জীবন।
ঘাটের শেষ সিঁড়িটা ডুবে যায়,
জেলে নৌকা নিয়ে দূরে যায়,
কোনো মা দরজায় দাঁড়িয়ে
ছেলের ফেরার পথ দেখে,
আর কোনো শিশু
জানালার কাচে আঙুল দিয়ে
বৃষ্টির রেখার মধ্যে
নিজের অজানা পৃথিবী আঁকে।
কিন্তু এই শহরের বর্ষা
একটু অন্যরকম।
এখানে বৃষ্টি নামলেই
আকাশের সৌন্দর্যের আগে
মানুষ খোঁজে রাস্তার অবস্থা।
একটু পরেই
পথের বুক জলে ভরে ওঠে,
রিকশার চাকা ডুবে যায়,
জুতোর ভেতর পানি ঢোকে,
বাসের জানালায় কাদা ছিটকে পড়ে,
অফিসফেরত মানুষ
ছাতা মাথায় নিয়ে
হাঁটুসমান পানির সঙ্গে
প্রতিদিনের যুদ্ধ করে।
একজন শ্রমিক
বৃষ্টির মধ্যেও কাজে যায়-
তার কাছে বর্ষা
কবিতা নয়,
দিন শেষে এক মুঠো ভাতের হিসাব।
একজন রিকশাচালক
ভেজা জামা গায়ে
প্যাডেলে চাপ দেয়-
কারণ বৃষ্টি
তার সংসারের খরচ কমায় না।
একজন ফুটপাতবাসী
পলিথিন টেনে
ঘুমানোর জায়গাটা বাঁচায়-
তার কাছে মেঘের গর্জন
রোমান্টিক কোনো সংগীত নয়।
তবু আশ্চর্য এই বর্ষা!
এত কষ্টের মাঝেও
মানুষ বৃষ্টিকে ভালোবাসে।
কারণ বৃষ্টি নামলে
মাটির গন্ধে
শৈশব ফিরে আসে।
ভেজা রাস্তায়
পুরোনো কারও কথা মনে পড়ে।
জানালার পাশে বসে
এক কাপ চায়ের ধোঁয়ায়
কেউ খুঁজে নেয়
বহুদিনের হারানো বিকেল।
কোনো তরুণী
ভেজা চুল জানালার পাশে শুকায়,
কেউ দূরের শহরে থাকা প্রিয়জনকে
মুঠোফোনে বলে-
‘এখানে খুব বৃষ্টি হচ্ছে।’
অন্য প্রান্ত থেকে উত্তর আসে-
‘এখানেও।’
দুটি শহর,
দুটি জানালা,
দুটি মানুষ-
মাঝখানে শুধু
অসংখ্য বৃষ্টির রেখা।
বর্ষা আসলে
দূরত্বও মাপতে জানে।
কোনো ছাতা
দুজন মানুষকে কাছে আনে,
কোনো বৃষ্টি
দুজন মানুষকে আরও দূরে সরিয়ে দেয়।
কেউ বৃষ্টিতে প্রেম খোঁজে,
কেউ আশ্রয়।
কেউ কবিতা লেখে,
কেউ ভেজা চাল বাঁচায়।
কেউ মেঘ দেখে ছবি তোলে,
কেউ মেঘ দেখে ভাবে-
আজ কাজ বন্ধ হলে
চুলায় আগুন জ্বলবে তো?
বর্ষা তাই
সবার কাছে এক নয়।
কারও কাছে
কদমফুলের গন্ধ,
কারও কাছে
জলমগ্ন ঘরের আতঙ্ক।
কারও কাছে
প্রেমের ঋতু,
কারও কাছে
জীবন বাঁচানোর লড়াই।
তবু বর্ষা
সবাইকে এক মুহূর্তের জন্য
এক আকাশের নিচে দাঁড় করায়।
ধনী মানুষের বারান্দায়ও বৃষ্টি,
গরিবের টিনের চালেও বৃষ্টি।
অট্টালিকার কাচে বৃষ্টি,
কুঁড়েঘরের টিনে বৃষ্টি।
পাকা রাস্তার ওপর বৃষ্টি,
কাদামাটির পথেও বৃষ্টি।
আকাশ কাউকে
কম জল দেয় না।
মানুষই শুধু
জলের ভাগ আলাদা করে নেয়।
কোথাও নদী ভাঙে,
কোথাও নদী গড়ে।
কোথাও ঘর ভেসে যায়,
কোথাও নতুন ফসলের আশা জন্ম নেয়।
বর্ষা
এক হাতে নেয়,
অন্য হাতে দেয়।
তাই বৃষ্টি থামলে
মাটি শুধু ভেজা থাকে না-
তার ভেতরে
পরের দিনের জন্মের শব্দ শোনা যায়।
কৃষকের মুখে তখন
একটু হাসি।
সবুজ ধানের পাতায়
জলের বিন্দু কাঁপে।
দূরের বাঁশবাগানে
বাতাস ঢুকে
অদৃশ্য কোনো বাঁশির সুর তোলে।
পুকুরের জলে
বৃত্ত তৈরি হয়-
একটির পর একটি।
মনে হয়,
প্রকৃতি নিজেই
অদৃশ্য হাতে লিখছে-
‘সব শেষ হয়ে যায়নি।’
শ্রাবণ চলে গেছে,
কিন্তু বর্ষা কি চলে যায়?
কোনো ভেজা মাটির গন্ধে
সে থেকে যায়।
কোনো কৃষকের আশায়
সে থেকে যায়।
কোনো শিশুর কাগজের নৌকায়
সে থেকে যায়।
কোনো মায়ের অপেক্ষায়
সে থেকে যায়।
কোনো পুরোনো গানে,
কোনো জানালার কাচে,
কোনো অসমাপ্ত প্রেমে,
কোনো নদীর ঢেউয়ে
সে থেকে যায়।
আর আমরা-
ব্যস্ত শহরের মানুষ-
ছাতা হাতে
জল মাড়িয়ে
নিজ নিজ গন্তব্যে ছুটতে ছুটতে
হয়তো ভুলেই যাই,
আমাদের মাথার ওপর
যে আকাশটি আজও বৃষ্টি ঝরায়,
সেই আকাশই একদিন
আমাদের শুষ্ক পৃথিবীকে
বাঁচিয়ে রাখবে।
তাই শ্রাবণ শেষ হোক,
বর্ষা শেষ না হোক।
আর যদি বৃষ্টি থেমেও যায়,
তবু যেন
আমাদের হৃদয়ের মাটি
শুকিয়ে না যায়।
কারণ-
পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখে শুধু বৃষ্টি নয়,
বৃষ্টির মতো
একটু মমতাও।
আর মানুষকে মানুষ করে রাখে শুধু
ভেজা মাটি নয়-
ভেতরে জমে থাকা
একটু সবুজও।
