ধর্মধর্ম

ধুনটে ৭৯৭ মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের নেই নির্ধারিত বেতন কাঠামো

ধুনটে ৭৯৭ মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের নেই নির্ধারিত বেতন কাঠামো
উপজেলার মসজিদ ও ইমামদের বেতন কাঠামো।

জারে যাওয়ার আগে দুবার ভাবতে হয় তাদের। চালের দাম বেড়েছে, বেড়েছে সবজি তেলের দামও।কিন্তু বাড়েনি একটি জিনিস, তাদের মাস শেষের বেতন। বগুড়ার ধুনট উপজেলার মসজিদগুলোর ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জীবন এখন এই একমুখী কঠিন সমীকরণের মধ্যে বন্দী। একদিকে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী বাজার, অন্যদিকে বছরের পর বছর একই জায়গায় আটকে থাকা সামান্য সম্মানী,এই দুইয়ের মাঝে পিষ্ট হয়ে চলছে তাঁদের সংসার।

আর্থিক ও মানসিক অসহায়ত্বের কারণে ধর্মীয় এ দায়িত্ব পালনে পূর্ণ একাগ্রতা হারিয়ে ফেলছেন অনেক মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনরা। সময়ের পরিক্রমায় সবকিছু পরিবর্তন হলেও বদলাচ্ছে না তাদের ভাগ্য। চাহিদা বিবেচনায় সরকারি-বেসরকারি কর্মচারী ও শ্রমিকদের বেতন-ভাতায় সামঞ্জস্যতা-ভারসাম্যতা রক্ষা করা হলেও কেবল মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনরা অবহেলায় থাকছেন যুগ যুগ ধরে।

পরিবার-পরিজন নিয়ে অভাব অনটনে দিনাতিপাত করছেন বেশিরভাগ মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন।

চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের ফড়িংহাটা গ্রামের মসজিদের ইমাম মো. আব্দুর রহমানের কথাতেই স্পষ্ট এই বাস্তবতা। গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি থেকে চাঁদা তুলে মাস শেষে তাকে দেওয়া হয় মাত্র পাঁচ হাজার টাকা, অনেক সময় সেটাও হাতে আসে দুই মাস পার হওয়ার পর। তিনি বলেন, ‘সংসারে স্ত্রী, দুই মেয়ে আর এক ছেলে। মাস শেষে পাঁচ হাজার টাকা বেতনে সংসার চলে না। প্রতি মাসেই ধারদেনা বাড়ছে।’

পৌরসভার খাদ্য গুদাম সংলগ্ন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মসজিদের মুয়াজ্জিনের সংসারেও একই ছবি। তিনি বলেন, ‘মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকা বেতনে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বেশিরভাগ সময়ই সবজি বা ডাল খেয়ে কোনোমতে দিন পার করছি। সবজি কেনাও এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, ধারদেনার চাপ বাড়ছে।’ অথচ এই পেশায় ছুটি বলে কিছু নেই,ঝড়বৃষ্টি কিংবা কনকনে শীত, কোনো অজুহাতই চলে না। সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গেই পালন করতে হয় দায়িত্ব। যাঁরা প্রতিদিন ভোরে মানুষকে জাগিয়ে তোলেন আজানের সুরে, দিনের শেষে তাঁদেরই ঘরে জ্বলে থাকে অভাবের প্রদীপ।

এই ছবি শুধু দুটি মসজিদের নয়।পুরো ধুনট উপজেলার প্রায় প্রতিটি মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিব ও খাদেমের গল্পও একই সুরে বাঁধা। উপজেলা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ধুনটে মোট মসজিদের সংখ্যা ৭৯৭টি। এসব মসজিদে ইমাম আছেন প্রায় ৭৯৭ জন, মুয়াজ্জিন ৭৭১ জন, খতিব ৪৭০ জন এবং খাদেম ৪৯০ জন,সব মিলিয়ে এই পেশায় যুক্ত প্রায় ২ হাজার ৫২৭ জন মানুষ। অথচ তাঁদের জন্য সরকারিভাবে নির্ধারিত কোনো বেতন কাঠামো নেই, নেই কোনো নিয়মনীতিও। মসজিদ কমিটির দায়িত্বে থাকা সমাজের বিত্তবান মানুষেরাই ঠিক করে দেন তাঁদের বেতন বা সম্মানী,যা নির্ভর করে অনেকটাই কমিটির সদিচ্ছার ওপর।

অন্তত ৩০ জন ইমাম-মুয়াজ্জিনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাস শেষে মসজিদ কমিটি থেকে একজন ইমাম পান চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা, মুয়াজ্জিন পান দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। শহরের মসজিদে ইমামদের বেতন কিছুটা বেশি, সাত থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত—কিন্তু পৌর এলাকার তুলনায় গ্রামাঞ্চলের চিত্র আরও করুণ, সেখানে অনেক জায়গায় ইমাম আর মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব একই মানুষকে সামলাতে হয় একার কাঁধে।

তবে অন্ধকারেও কিছুটা আলোর রেখা আছে যদিও তা সামগ্রিক বিবেচনায় খুবই সামান্য । ইমামতির পাশাপাশি মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত প্রায় ৮০ জন ইমাম মাসে বাড়তি পাঁচ হাজার টাকা করে পান, বেতনের পাশাপাশি তাদের এতে মোটামুটি সংসার চালানো যাচ্ছে বলে জানান। আর উপজেলার একমাত্র কেন্দ্রীয় মডেল মসজিদের বেতন কাঠামো তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক। ইমাম পান সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা, মুয়াজ্জিন সাড়ে সাত হাজার আর খাদেম সাত হাজার টাকা। এই মসজিদের সভাপতি স্বয়ং ইউএনও, তাই বেতন কাঠামোতেও আছে কিছুটা স্থিতিশীলতা আছে,যা উপজেলার আর কোনো মসজিদে নেই।

তবু সেই মডেল মসজিদের ইমাম আব্দুল বাসেতকেও চালিয়ে নিতে হয় দুটি দায়িত্ব,ইমামতির পাশাপাশি করেন শিক্ষকতা। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মসজিদের মুয়াজ্জিন কাম খাদেম মো. ইসমাইলের কথাতেও একই দুশ্চিন্তার সুর। স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে সংসার তার, সাত হাজার টাকার বেতনে যা কুলোয় না। মুয়াজ্জিনের পেশার বাইরে আয়ের অন্য কোনো পথ নেই, পুরোপুরি নির্ভর করতে হয় মসজিদ কমিটির দেওয়া বেতনের ওপর। মাস শেষে হিসাব মেলে না, সামনের দিনগুলো নিয়েও দুশ্চিন্তায় কাটে তার রাত।

চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের পাঁচথুপী গ্রামের মধ্যপাড়া জামে মসজিদের ইমাম মো. মিজানুর রহমানের দিনযাপনেই ফুটে ওঠে এই লড়াইয়ের ছবি। ভোরের আঁধার কাটতে না কাটতেই মসজিদে গিয়ে আজান দেন তিনি, ফজরের নামাজ শেষে বাড়ি ফিরে খেজুরের গুড় আর আটার রুটি মুখে দিয়েই বেরিয়ে পড়েন অটোভ্যান নিয়ে,আর্থিক টানাপোড়েনে ঋণ করে কেনা সেই ভ্যানই এখন তাঁর বাড়তি রোজগারের ভরসা। জোহরের নামাজের আগে বাড়ি ফিরে সামান্য বিশ্রাম, গোসল, খাওয়া সেরে আবার ছুটে যান মসজিদে। ইমামতি আর জীবিকার এই দ্বৈত লড়াইয়ে কেটে যায় তাঁর প্রতিটি দিন।

এলাঙ্গী ইউনিয়নের শৈলমারী জামে মসজিদের ইমাম মুফতি শাহাদাতের কণ্ঠেও একই হতাশা। এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে আমরা অনেক কষ্টে আছি। দিন দিন যেভাবে সবকিছুর দাম বাড়ছে, জানি না কীভাবে জীবনযাপন করব। সব কিছুর দাম বাড়লেও আমাদের বেতন তো আর বাড়ছে না।’

ধুনটে ইমাম মোয়াজ্জিন ও মাদ্রাসা নিয়ে কাজ করা সংগঠন আল খিদমাহ কওমী ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি মুফতি আশেকে এলাহী শিবলী বলেন, ইমামরা সব সময় মানুষের পাশে থাকেন, ইসলামের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ রোকন আদায় করতে সহযোগিতা করেন, কিন্তু দিন শেষে তারাই সবথেকে বেশি অবহেলার শিকার হন। আমরা ধুনটে ইমাম মুয়াজ্জিনদের বেতন কাঠামো, স্বাস্থ্য তাদের সার্বিক বিষয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। 

আমরা আশা রাখি মসজিদ কর্তৃপক্ষকে সচেতন করলে এ বিষয়গুলো আরো সহজ হবে এবং ইমাম মোয়াজ্জিনদের বেতনের উন্নতি হবে।

সংসার সামলাতে অনেকেই বাড়তি আয়ের পথ খোঁজেন,কেউ শিক্ষকতা করেন, কেউ টিউশনি, কেউ ছোটখাটো ব্যবসা, কৃষিকাজ কিংবা দিনমজুরির কাজেও যুক্ত হন। কিন্তু দায়িত্ব পালনের ফাঁকে সময় বের করা যেমন কঠিন, তেমনি গ্রামাঞ্চলে বাড়তি আয়ের সুযোগও সীমিত।

এ নিয়ে ধুনট ইমাম সমিতির সভাপতি মোঃ আবু সুফিয়ান বলেন, ‘আমরা ইমাম, সবার নেতা অথচ এই নেতার খোঁজ কেউ রাখে না। বিভিন্ন সময় সরকার অনুদান দেয়, কিন্তু আমাদের ইমামদের কেউ সাহায্য করে না। এলাকার চেয়ারম্যান-মেম্বাররা যারা মসজিদে নামাজ আদায় করেন, তারা চাইলে একজন ইমাম বা মুয়াজ্জিনকে একটি চালের কার্ডের ব্যবস্থাও করে দিতে পারেন,এটা তাদের অধিকার।’

 উপজেলা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ফিল্ড সুপারভাইজার মীর আরিফুল ইসলাম জানান, ইমামতির পাশাপাশি মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় প্রায় ৮০ থেকে ১০০ জন প্রতি মাসে বাড়তি পাঁচ হাজার টাকা পাচ্ছেন, আর বাকি ইমামদেরও সরকারের মাসিক ভাতা কার্যক্রমের আওতায় আনার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। ইতিমধ্যে উপজেলার ১৬০টি মসজিদ ভাতার আওতায় এসেছে, ধাপে ধাপে বাকি মসজিদগুলোও যুক্ত হবে বলে জানান তিনি।

ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে না তোলা গেলে এই সংকট দিন দিন আরও প্রকট হবে।

M

Public Voice

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ধুনটে ৭৯৭ মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের নেই নির্ধারিত বেতন কাঠামো

প্রকাশের তারিখ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

জারে যাওয়ার আগে দুবার ভাবতে হয় তাদের। চালের দাম বেড়েছে, বেড়েছে সবজি তেলের দামও।কিন্তু বাড়েনি একটি জিনিস, তাদের মাস শেষের বেতন। বগুড়ার ধুনট উপজেলার মসজিদগুলোর ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জীবন এখন এই একমুখী কঠিন সমীকরণের মধ্যে বন্দী। একদিকে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী বাজার, অন্যদিকে বছরের পর বছর একই জায়গায় আটকে থাকা সামান্য সম্মানী,এই দুইয়ের মাঝে পিষ্ট হয়ে চলছে তাঁদের সংসার।

আর্থিক ও মানসিক অসহায়ত্বের কারণে ধর্মীয় এ দায়িত্ব পালনে পূর্ণ একাগ্রতা হারিয়ে ফেলছেন অনেক মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনরা। সময়ের পরিক্রমায় সবকিছু পরিবর্তন হলেও বদলাচ্ছে না তাদের ভাগ্য। চাহিদা বিবেচনায় সরকারি-বেসরকারি কর্মচারী ও শ্রমিকদের বেতন-ভাতায় সামঞ্জস্যতা-ভারসাম্যতা রক্ষা করা হলেও কেবল মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনরা অবহেলায় থাকছেন যুগ যুগ ধরে।

পরিবার-পরিজন নিয়ে অভাব অনটনে দিনাতিপাত করছেন বেশিরভাগ মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন।


চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের ফড়িংহাটা গ্রামের মসজিদের ইমাম মো. আব্দুর রহমানের কথাতেই স্পষ্ট এই বাস্তবতা। গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি থেকে চাঁদা তুলে মাস শেষে তাকে দেওয়া হয় মাত্র পাঁচ হাজার টাকা, অনেক সময় সেটাও হাতে আসে দুই মাস পার হওয়ার পর। তিনি বলেন, ‘সংসারে স্ত্রী, দুই মেয়ে আর এক ছেলে। মাস শেষে পাঁচ হাজার টাকা বেতনে সংসার চলে না। প্রতি মাসেই ধারদেনা বাড়ছে।’


পৌরসভার খাদ্য গুদাম সংলগ্ন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মসজিদের মুয়াজ্জিনের সংসারেও একই ছবি। তিনি বলেন, ‘মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকা বেতনে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বেশিরভাগ সময়ই সবজি বা ডাল খেয়ে কোনোমতে দিন পার করছি। সবজি কেনাও এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, ধারদেনার চাপ বাড়ছে।’ অথচ এই পেশায় ছুটি বলে কিছু নেই,ঝড়বৃষ্টি কিংবা কনকনে শীত, কোনো অজুহাতই চলে না। সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গেই পালন করতে হয় দায়িত্ব। যাঁরা প্রতিদিন ভোরে মানুষকে জাগিয়ে তোলেন আজানের সুরে, দিনের শেষে তাঁদেরই ঘরে জ্বলে থাকে অভাবের প্রদীপ।


এই ছবি শুধু দুটি মসজিদের নয়।পুরো ধুনট উপজেলার প্রায় প্রতিটি মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিব ও খাদেমের গল্পও একই সুরে বাঁধা। উপজেলা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ধুনটে মোট মসজিদের সংখ্যা ৭৯৭টি। এসব মসজিদে ইমাম আছেন প্রায় ৭৯৭ জন, মুয়াজ্জিন ৭৭১ জন, খতিব ৪৭০ জন এবং খাদেম ৪৯০ জন,সব মিলিয়ে এই পেশায় যুক্ত প্রায় ২ হাজার ৫২৭ জন মানুষ। অথচ তাঁদের জন্য সরকারিভাবে নির্ধারিত কোনো বেতন কাঠামো নেই, নেই কোনো নিয়মনীতিও। মসজিদ কমিটির দায়িত্বে থাকা সমাজের বিত্তবান মানুষেরাই ঠিক করে দেন তাঁদের বেতন বা সম্মানী,যা নির্ভর করে অনেকটাই কমিটির সদিচ্ছার ওপর।


অন্তত ৩০ জন ইমাম-মুয়াজ্জিনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাস শেষে মসজিদ কমিটি থেকে একজন ইমাম পান চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা, মুয়াজ্জিন পান দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। শহরের মসজিদে ইমামদের বেতন কিছুটা বেশি, সাত থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত—কিন্তু পৌর এলাকার তুলনায় গ্রামাঞ্চলের চিত্র আরও করুণ, সেখানে অনেক জায়গায় ইমাম আর মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব একই মানুষকে সামলাতে হয় একার কাঁধে।


তবে অন্ধকারেও কিছুটা আলোর রেখা আছে যদিও তা সামগ্রিক বিবেচনায় খুবই সামান্য । ইমামতির পাশাপাশি মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত প্রায় ৮০ জন ইমাম মাসে বাড়তি পাঁচ হাজার টাকা করে পান, বেতনের পাশাপাশি তাদের এতে মোটামুটি সংসার চালানো যাচ্ছে বলে জানান। আর উপজেলার একমাত্র কেন্দ্রীয় মডেল মসজিদের বেতন কাঠামো তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক। ইমাম পান সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা, মুয়াজ্জিন সাড়ে সাত হাজার আর খাদেম সাত হাজার টাকা। এই মসজিদের সভাপতি স্বয়ং ইউএনও, তাই বেতন কাঠামোতেও আছে কিছুটা স্থিতিশীলতা আছে,যা উপজেলার আর কোনো মসজিদে নেই।


তবু সেই মডেল মসজিদের ইমাম আব্দুল বাসেতকেও চালিয়ে নিতে হয় দুটি দায়িত্ব,ইমামতির পাশাপাশি করেন শিক্ষকতা। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মসজিদের মুয়াজ্জিন কাম খাদেম মো. ইসমাইলের কথাতেও একই দুশ্চিন্তার সুর। স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে সংসার তার, সাত হাজার টাকার বেতনে যা কুলোয় না। মুয়াজ্জিনের পেশার বাইরে আয়ের অন্য কোনো পথ নেই, পুরোপুরি নির্ভর করতে হয় মসজিদ কমিটির দেওয়া বেতনের ওপর। মাস শেষে হিসাব মেলে না, সামনের দিনগুলো নিয়েও দুশ্চিন্তায় কাটে তার রাত।


চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের পাঁচথুপী গ্রামের মধ্যপাড়া জামে মসজিদের ইমাম মো. মিজানুর রহমানের দিনযাপনেই ফুটে ওঠে এই লড়াইয়ের ছবি। ভোরের আঁধার কাটতে না কাটতেই মসজিদে গিয়ে আজান দেন তিনি, ফজরের নামাজ শেষে বাড়ি ফিরে খেজুরের গুড় আর আটার রুটি মুখে দিয়েই বেরিয়ে পড়েন অটোভ্যান নিয়ে,আর্থিক টানাপোড়েনে ঋণ করে কেনা সেই ভ্যানই এখন তাঁর বাড়তি রোজগারের ভরসা। জোহরের নামাজের আগে বাড়ি ফিরে সামান্য বিশ্রাম, গোসল, খাওয়া সেরে আবার ছুটে যান মসজিদে। ইমামতি আর জীবিকার এই দ্বৈত লড়াইয়ে কেটে যায় তাঁর প্রতিটি দিন।


এলাঙ্গী ইউনিয়নের শৈলমারী জামে মসজিদের ইমাম মুফতি শাহাদাতের কণ্ঠেও একই হতাশা। এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে আমরা অনেক কষ্টে আছি। দিন দিন যেভাবে সবকিছুর দাম বাড়ছে, জানি না কীভাবে জীবনযাপন করব। সব কিছুর দাম বাড়লেও আমাদের বেতন তো আর বাড়ছে না।’

ধুনটে ইমাম মোয়াজ্জিন ও মাদ্রাসা নিয়ে কাজ করা সংগঠন আল খিদমাহ কওমী ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি মুফতি আশেকে এলাহী শিবলী বলেন, ইমামরা সব সময় মানুষের পাশে থাকেন, ইসলামের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ রোকন আদায় করতে সহযোগিতা করেন, কিন্তু দিন শেষে তারাই সবথেকে বেশি অবহেলার শিকার হন। আমরা ধুনটে ইমাম মুয়াজ্জিনদের বেতন কাঠামো, স্বাস্থ্য তাদের সার্বিক বিষয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। 

আমরা আশা রাখি মসজিদ কর্তৃপক্ষকে সচেতন করলে এ বিষয়গুলো আরো সহজ হবে এবং ইমাম মোয়াজ্জিনদের বেতনের উন্নতি হবে।

সংসার সামলাতে অনেকেই বাড়তি আয়ের পথ খোঁজেন,কেউ শিক্ষকতা করেন, কেউ টিউশনি, কেউ ছোটখাটো ব্যবসা, কৃষিকাজ কিংবা দিনমজুরির কাজেও যুক্ত হন। কিন্তু দায়িত্ব পালনের ফাঁকে সময় বের করা যেমন কঠিন, তেমনি গ্রামাঞ্চলে বাড়তি আয়ের সুযোগও সীমিত।


এ নিয়ে ধুনট ইমাম সমিতির সভাপতি মোঃ আবু সুফিয়ান বলেন, ‘আমরা ইমাম, সবার নেতা অথচ এই নেতার খোঁজ কেউ রাখে না। বিভিন্ন সময় সরকার অনুদান দেয়, কিন্তু আমাদের ইমামদের কেউ সাহায্য করে না। এলাকার চেয়ারম্যান-মেম্বাররা যারা মসজিদে নামাজ আদায় করেন, তারা চাইলে একজন ইমাম বা মুয়াজ্জিনকে একটি চালের কার্ডের ব্যবস্থাও করে দিতে পারেন,এটা তাদের অধিকার।’


 উপজেলা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ফিল্ড সুপারভাইজার মীর আরিফুল ইসলাম জানান, ইমামতির পাশাপাশি মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় প্রায় ৮০ থেকে ১০০ জন প্রতি মাসে বাড়তি পাঁচ হাজার টাকা পাচ্ছেন, আর বাকি ইমামদেরও সরকারের মাসিক ভাতা কার্যক্রমের আওতায় আনার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। ইতিমধ্যে উপজেলার ১৬০টি মসজিদ ভাতার আওতায় এসেছে, ধাপে ধাপে বাকি মসজিদগুলোও যুক্ত হবে বলে জানান তিনি।

ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে না তোলা গেলে এই সংকট দিন দিন আরও প্রকট হবে।

M


Public Voice

সম্পাদক: মোঃ বাদশাহ আলমগীর
প্রকাশক: অনন্যা অনসূয়া দিবা

কপিরাইট © ২০২৬ Public Voice । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত