জাতীয়জাতীয়

পুরোনো ভারতীয় স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষের আঘাত থেকে রক্ষা পেল বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১

গত ৯ আগস্ট বিএস-১–এর দিকে ছুটে আসছিল ভারতের পুরোনো ইনস্যাট-১এ স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ। চার দিনের উদ্বেগ শেষে সামান্য কক্ষপথ পরিবর্তন করে সংঘর্ষের ঝুঁকি এড়ান বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা।

নিজস্ব প্রতিনিধি
নিজস্ব প্রতিনিধি
|
শেয়ার করুন
অ+ অ-
পুরোনো ভারতীয় স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষের আঘাত থেকে রক্ষা পেল বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১
ছবিঃ সংগৃহীত

মহাকাশে বড় ধরনের সংঘর্ষের ঝুঁকিতে পড়েছিল বাংলাদেশের যোগাযোগ স্যাটেলাইট বিএস-১। গত ৯ আগস্ট সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ নজরদারি ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থার সতর্কবার্তায় জানানো হয়, একটি পুরোনো ভারতীয় স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ দ্রুত বিএস-১–এর দিকে এগিয়ে আসছে।

ঝুঁকি এড়াতে পরবর্তী চার দিন গাজীপুরের গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশনে সতর্ক অবস্থানে ছিলেন বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) প্রকৌশলীরা। শেষ পর্যন্ত ১৩ আগস্ট বিএস-১–এর কক্ষপথ সামান্য পরিবর্তন করে ধ্বংসাবশেষটি পার হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। পরে স্যাটেলাইটটিকে আবার আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

বিএসসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান বুধবার সকালে ঢাকার বাংলামোটরে সংস্থাটির  বলেন, ওই কয়েক দিন তাঁদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের ছিল। সময় ছিল কম, আবার বিএস-১–কে সরানোর সুযোগও ছিল সীমিত। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো ক্ষতি ছাড়াই স্যাটেলাইটটি নিরাপদ রাখা সম্ভব হয়েছে।

মহাকাশে কোনো বস্তু স্যাটেলাইটের খুব কাছে চলে এলে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়। এমন সংঘর্ষে স্যাটেলাইটের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যেতে পারে, এমনকি পুরো স্যাটেলাইট ধ্বংসও হতে পারে। ২০০৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার অকেজো কসমস-২২৫১ ও যুক্তরাষ্ট্রের সচল ইরিডিয়াম-৩৩ স্যাটেলাইটের সংঘর্ষে দুটি স্যাটেলাইটই ধ্বংস হয়েছিল।

ছুটে আসছিল ইনস্যাট-১এ–এর ধ্বংসাবশেষ

পৃথিবীর কক্ষপথে এখন হাজার হাজার সচল ও অকেজো বস্তু ঘুরছে। পুরোনো স্যাটেলাইট, রকেটের অংশ কিংবা মহাকাশযানের বিচ্ছিন্ন টুকরোগুলোকে সাধারণভাবে স্পেস ডেব্রিস বা মহাকাশের বর্জ্য বলা হয়। সচল স্যাটেলাইটের জন্য এসব বর্জ্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বিএসসিএলের তথ্য অনুযায়ী, মহাকাশে স্যাটেলাইটগুলোর গতিপথ পর্যবেক্ষণ করে বিভিন্ন সংস্থা। কোনো বস্তু ও স্যাটেলাইটের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়।

৯ আগস্ট পাওয়া সতর্কবার্তা থেকে বিএসসিএল জানতে পারে, বিএস-১–এর কাছাকাছি চলে আসতে থাকা বস্তুটি ভারতের ইনস্যাট-১এ স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ।

ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর তথ্য অনুযায়ী, ইনস্যাট-১এ ১৯৮২ সালের ১০ এপ্রিল উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। উৎক্ষেপণের কয়েক মাস পরই এতে সমস্যা দেখা দেয়। একই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর স্যাটেলাইটটি নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়। এত বছর পরও এর কোনো অংশ পৃথিবীর কক্ষপথে থেকে গিয়ে অন্য স্যাটেলাইটের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

আগেও ঝুঁকিতে পড়েছিল বিএস-১

বিএস-১ মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয় ২০১৮ সালের ১২ মে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণের সময় এর নাম ছিল বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। পরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নাম পরিবর্তন করে বিএস-১ রাখা হয়।

প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বাংলাদেশ নিজস্ব যোগাযোগ ও সম্প্রচার সক্ষমতা তৈরি করে। উৎক্ষেপণের পর বাংলাদেশ নিজস্ব স্যাটেলাইটের মালিক দেশগুলোর তালিকায় যুক্ত হয়।

তবে মহাকাশে বিএস-১–এর সামনে ঝুঁকি তৈরির ঘটনা এবারই প্রথম নয়। বিএসসিএলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ ও ২০২৫ সালেও স্যাটেলাইটটিকে সম্ভাব্য সংঘর্ষের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছিল।

২০২১ সালে ঝুঁকির উৎস ছিল রাশিয়ার একটি স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ। আর ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্যাটেলাইট বিএস-১–এর খুব কাছ দিয়ে চলে যায়।

চার দিন ধরে চলেছে হিসাব-নিকাশ

ফ্রান্সের থালেস অ্যালেনিয়া স্পেস ২০১৮ সালে বিএস-১ তৈরি করে। শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি ও দক্ষিণ কোরিয়ায় থাকা তিনটি গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে স্যাটেলাইটটির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করত প্রতিষ্ঠানটি।

বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২০২১ সাল থেকে বিএস-১ পরিচালনার দায়িত্ব নেয় বিএসসিএল। গাজীপুরের জয়দেবপুরে থাকা গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন এখন স্যাটেলাইটটির নিয়ন্ত্রণের প্রধান কেন্দ্র।

বিএসসিএলের হিসাবে, সেখানে ৫০ জনের বেশি প্রকৌশলী কাজ করেন। স্যাটেলাইটটির কার্যক্রম ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং প্রকৌশলীরা পালা করে দায়িত্ব পালন করেন।

৯ আগস্ট সতর্কবার্তা পাওয়ার পর কর্মীদের সতর্ক করা হয় এবং ছুটি বাতিল করা হয় বলে জানান এমডি ইমাদুর রহমান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর টেলিযোগাযোগ উপদেষ্টাও পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলেন। মহাকাশের বস্তুটির অবস্থান ও গতিপথ সম্পর্কে স্পেস ট্র্যাকার থেকেও নিয়মিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল।

তখন মূল প্রশ্ন ছিল, বিএস-১–এর কক্ষপথ পরিবর্তন করা হবে কি না। পরিবর্তন করলে কোন দিকে এবং কতটা সরানো নিরাপদ হবে, সেটিও নির্ধারণ করতে হচ্ছিল। কারণ স্যাটেলাইটকে এক জায়গা থেকে সরিয়ে অন্য কক্ষপথে নেওয়ার পর নতুন কোনো ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও হিসাবের মধ্যে রাখতে হয়।

ইমাদুর রহমান বলেন, সব তথ্য বিশ্লেষণের পর ১৩ আগস্ট বিএস-১–কে সামান্য বাঁ দিকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ধ্বংসাবশেষটি নিরাপদ দূরত্বে চলে যাওয়া পর্যন্ত স্যাটেলাইটটিকে ওই অবস্থানে রাখা হয়। ঝুঁকি কেটে গেলে আবার বিএস-১–কে আগের কক্ষপথে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

বিএসসিএলের তথ্য অনুযায়ী, ধ্বংসাবশেষটি শেষ পর্যন্ত বিএস-১–এর প্রায় ৮৫২ মিটারের মধ্যে চলে এসেছিল।

মহাকাশে সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়ানোর এই প্রক্রিয়ায় বড় কোনো ক্ষতি হয়নি বলে জানান ইমাদুর রহমান। তাঁর মতে, বিএসসিএলের প্রকৌশলীদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা।

মহাকাশ পরিচালনায় দক্ষতার পরীক্ষা

বাংলাদেশের স্যাটেলাইটে মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার রয়েছে। এর ২০টি বাংলাদেশের ব্যবহারের জন্য এবং বাকি ২০টি বিদেশে ইজারা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও বিএস-১–এর সেবা ব্যবহার করে।

মহাকাশে কোনো স্যাটেলাইটকে সম্ভাব্য সংঘর্ষ থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কাজটি প্রযুক্তিগতভাবে জটিল। এর সঙ্গে কক্ষপথের হিসাব, সংঘর্ষের সম্ভাবনা, স্যাটেলাইটের জ্বালানি এবং নতুন কক্ষপথের ঝুঁকি—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওকলাহোমার স্কুল অব কম্পিউটার সায়েন্সের অধ্যাপক মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে দ্রুত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং নিরাপদ কক্ষপথ পরিবর্তনের হিসাব করতে হয়। তাঁর মতে, বিএস-১–এর ক্ষেত্রে বাংলাদেশি প্রকৌশলীরা অল্প সময়ের মধ্যে ঝুঁকি বিশ্লেষণ, যাচাই ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছেন।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. খলিলুর রহমানও বিষয়টিকে প্রকৌশলীদের সক্ষমতার পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কোনো বস্তু স্যাটেলাইটের খুব কাছে চলে এলে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দুর্ঘটনা এড়ানো দক্ষতার বিষয়। বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা এতে সফল হলে তা প্রশংসনীয়।

Public Voice

শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬


পুরোনো ভারতীয় স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষের আঘাত থেকে রক্ষা পেল বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১

প্রকাশের তারিখ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

মহাকাশে বড় ধরনের সংঘর্ষের ঝুঁকিতে পড়েছিল বাংলাদেশের যোগাযোগ স্যাটেলাইট বিএস-১। গত ৯ আগস্ট সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ নজরদারি ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থার সতর্কবার্তায় জানানো হয়, একটি পুরোনো ভারতীয় স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ দ্রুত বিএস-১–এর দিকে এগিয়ে আসছে।

ঝুঁকি এড়াতে পরবর্তী চার দিন গাজীপুরের গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশনে সতর্ক অবস্থানে ছিলেন বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) প্রকৌশলীরা। শেষ পর্যন্ত ১৩ আগস্ট বিএস-১–এর কক্ষপথ সামান্য পরিবর্তন করে ধ্বংসাবশেষটি পার হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। পরে স্যাটেলাইটটিকে আবার আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

বিএসসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান বুধবার সকালে ঢাকার বাংলামোটরে সংস্থাটির  বলেন, ওই কয়েক দিন তাঁদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের ছিল। সময় ছিল কম, আবার বিএস-১–কে সরানোর সুযোগও ছিল সীমিত। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো ক্ষতি ছাড়াই স্যাটেলাইটটি নিরাপদ রাখা সম্ভব হয়েছে।

মহাকাশে কোনো বস্তু স্যাটেলাইটের খুব কাছে চলে এলে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়। এমন সংঘর্ষে স্যাটেলাইটের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যেতে পারে, এমনকি পুরো স্যাটেলাইট ধ্বংসও হতে পারে। ২০০৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার অকেজো কসমস-২২৫১ ও যুক্তরাষ্ট্রের সচল ইরিডিয়াম-৩৩ স্যাটেলাইটের সংঘর্ষে দুটি স্যাটেলাইটই ধ্বংস হয়েছিল।

ছুটে আসছিল ইনস্যাট-১এ–এর ধ্বংসাবশেষ

পৃথিবীর কক্ষপথে এখন হাজার হাজার সচল ও অকেজো বস্তু ঘুরছে। পুরোনো স্যাটেলাইট, রকেটের অংশ কিংবা মহাকাশযানের বিচ্ছিন্ন টুকরোগুলোকে সাধারণভাবে স্পেস ডেব্রিস বা মহাকাশের বর্জ্য বলা হয়। সচল স্যাটেলাইটের জন্য এসব বর্জ্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বিএসসিএলের তথ্য অনুযায়ী, মহাকাশে স্যাটেলাইটগুলোর গতিপথ পর্যবেক্ষণ করে বিভিন্ন সংস্থা। কোনো বস্তু ও স্যাটেলাইটের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়।

৯ আগস্ট পাওয়া সতর্কবার্তা থেকে বিএসসিএল জানতে পারে, বিএস-১–এর কাছাকাছি চলে আসতে থাকা বস্তুটি ভারতের ইনস্যাট-১এ স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ।

ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর তথ্য অনুযায়ী, ইনস্যাট-১এ ১৯৮২ সালের ১০ এপ্রিল উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। উৎক্ষেপণের কয়েক মাস পরই এতে সমস্যা দেখা দেয়। একই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর স্যাটেলাইটটি নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়। এত বছর পরও এর কোনো অংশ পৃথিবীর কক্ষপথে থেকে গিয়ে অন্য স্যাটেলাইটের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

আগেও ঝুঁকিতে পড়েছিল বিএস-১

বিএস-১ মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয় ২০১৮ সালের ১২ মে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণের সময় এর নাম ছিল বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। পরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নাম পরিবর্তন করে বিএস-১ রাখা হয়।

প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বাংলাদেশ নিজস্ব যোগাযোগ ও সম্প্রচার সক্ষমতা তৈরি করে। উৎক্ষেপণের পর বাংলাদেশ নিজস্ব স্যাটেলাইটের মালিক দেশগুলোর তালিকায় যুক্ত হয়।

তবে মহাকাশে বিএস-১–এর সামনে ঝুঁকি তৈরির ঘটনা এবারই প্রথম নয়। বিএসসিএলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ ও ২০২৫ সালেও স্যাটেলাইটটিকে সম্ভাব্য সংঘর্ষের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছিল।

২০২১ সালে ঝুঁকির উৎস ছিল রাশিয়ার একটি স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ। আর ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্যাটেলাইট বিএস-১–এর খুব কাছ দিয়ে চলে যায়।

চার দিন ধরে চলেছে হিসাব-নিকাশ

ফ্রান্সের থালেস অ্যালেনিয়া স্পেস ২০১৮ সালে বিএস-১ তৈরি করে। শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি ও দক্ষিণ কোরিয়ায় থাকা তিনটি গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে স্যাটেলাইটটির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করত প্রতিষ্ঠানটি।

বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২০২১ সাল থেকে বিএস-১ পরিচালনার দায়িত্ব নেয় বিএসসিএল। গাজীপুরের জয়দেবপুরে থাকা গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন এখন স্যাটেলাইটটির নিয়ন্ত্রণের প্রধান কেন্দ্র।

বিএসসিএলের হিসাবে, সেখানে ৫০ জনের বেশি প্রকৌশলী কাজ করেন। স্যাটেলাইটটির কার্যক্রম ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং প্রকৌশলীরা পালা করে দায়িত্ব পালন করেন।

৯ আগস্ট সতর্কবার্তা পাওয়ার পর কর্মীদের সতর্ক করা হয় এবং ছুটি বাতিল করা হয় বলে জানান এমডি ইমাদুর রহমান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর টেলিযোগাযোগ উপদেষ্টাও পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলেন। মহাকাশের বস্তুটির অবস্থান ও গতিপথ সম্পর্কে স্পেস ট্র্যাকার থেকেও নিয়মিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল।

তখন মূল প্রশ্ন ছিল, বিএস-১–এর কক্ষপথ পরিবর্তন করা হবে কি না। পরিবর্তন করলে কোন দিকে এবং কতটা সরানো নিরাপদ হবে, সেটিও নির্ধারণ করতে হচ্ছিল। কারণ স্যাটেলাইটকে এক জায়গা থেকে সরিয়ে অন্য কক্ষপথে নেওয়ার পর নতুন কোনো ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও হিসাবের মধ্যে রাখতে হয়।

ইমাদুর রহমান বলেন, সব তথ্য বিশ্লেষণের পর ১৩ আগস্ট বিএস-১–কে সামান্য বাঁ দিকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ধ্বংসাবশেষটি নিরাপদ দূরত্বে চলে যাওয়া পর্যন্ত স্যাটেলাইটটিকে ওই অবস্থানে রাখা হয়। ঝুঁকি কেটে গেলে আবার বিএস-১–কে আগের কক্ষপথে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

বিএসসিএলের তথ্য অনুযায়ী, ধ্বংসাবশেষটি শেষ পর্যন্ত বিএস-১–এর প্রায় ৮৫২ মিটারের মধ্যে চলে এসেছিল।

মহাকাশে সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়ানোর এই প্রক্রিয়ায় বড় কোনো ক্ষতি হয়নি বলে জানান ইমাদুর রহমান। তাঁর মতে, বিএসসিএলের প্রকৌশলীদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা।

মহাকাশ পরিচালনায় দক্ষতার পরীক্ষা

বাংলাদেশের স্যাটেলাইটে মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার রয়েছে। এর ২০টি বাংলাদেশের ব্যবহারের জন্য এবং বাকি ২০টি বিদেশে ইজারা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও বিএস-১–এর সেবা ব্যবহার করে।

মহাকাশে কোনো স্যাটেলাইটকে সম্ভাব্য সংঘর্ষ থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কাজটি প্রযুক্তিগতভাবে জটিল। এর সঙ্গে কক্ষপথের হিসাব, সংঘর্ষের সম্ভাবনা, স্যাটেলাইটের জ্বালানি এবং নতুন কক্ষপথের ঝুঁকি—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওকলাহোমার স্কুল অব কম্পিউটার সায়েন্সের অধ্যাপক মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে দ্রুত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং নিরাপদ কক্ষপথ পরিবর্তনের হিসাব করতে হয়। তাঁর মতে, বিএস-১–এর ক্ষেত্রে বাংলাদেশি প্রকৌশলীরা অল্প সময়ের মধ্যে ঝুঁকি বিশ্লেষণ, যাচাই ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছেন।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. খলিলুর রহমানও বিষয়টিকে প্রকৌশলীদের সক্ষমতার পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কোনো বস্তু স্যাটেলাইটের খুব কাছে চলে এলে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দুর্ঘটনা এড়ানো দক্ষতার বিষয়। বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা এতে সফল হলে তা প্রশংসনীয়।


Public Voice

সম্পাদক: মোঃ বাদশাহ আলমগীর
প্রকাশক: অনন্যা অনসূয়া দিবা

কপিরাইট © ২০২৬ Public Voice । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত