উপ-সম্পাদকীয়উপ-সম্পাদকীয়

শ্রেণিকক্ষে ফাঁকা বেঞ্চের নীরব প্রশ্ন!

শেয়ার করুন
অ+ অ-
শ্রেণিকক্ষে ফাঁকা বেঞ্চের নীরব প্রশ্ন!
ইন্টারনেট থেকে নেয়া। প্রতীকী ছবি

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে, শ্রেণিকক্ষ আছে, শিক্ষক আছেন—কিন্তু অনেক সময় নেই শুধু শিক্ষার্থী। শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চগুলো দিনের পর দিন ফাঁকা পড়ে থাকে, অথচ পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি হঠাৎ বেড়ে যায়। এই বাস্তবতা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য, জবাবদিহি এবং সনদনির্ভর মানসিকতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করছে।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশেষ করে মফস্বলাঞ্চলে শিক্ষার বিভিন্ন ধারা রয়েছে। এর সবগুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একই কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয় না। কওমি শিক্ষাব্যবস্থার মতো স্বতন্ত্র ধারাও এর বাইরে রয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়মিত ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ নিয়ে যে প্রশ্ন রয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

বাস্তবে কোথাও কোথাও নিয়মিত ক্লাসে অংশ নেওয়ার চেয়ে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে একটি সনদ অর্জনই যেন শিক্ষার্থীদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠছে। ফলে ‘শিক্ষিত’ মানুষের সংখ্যা বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত জ্ঞান, দক্ষতা ও বাস্তব সক্ষমতা অর্জনের প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে।

শিক্ষার্থীর নিয়মিত অনুপস্থিতির একটি বড় ক্ষতি হলো শেখার ধারাবাহিকতা ভেঙে যাওয়া। একটি বিষয় না বুঝে পরবর্তী অধ্যায়ে গেলে জ্ঞানের ঘাটতি ক্রমেই বাড়তে থাকে। শেষ মুহূর্তে গাইড, নোট, কোচিং কিংবা মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে পরীক্ষায় কোনোভাবে সাফল্য এলেও শেখার মূল উদ্দেশ্য অনেকাংশেই ব্যাহত হয়।

এখানে শুধু শিক্ষার্থীকে দায়ী করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। অভিভাবকের নজরদারি, নিয়মিত পাঠদান, প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক তদারকি এবং শিক্ষার্থীর নিজস্ব দায়িত্ব—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) প্রতিবছর শিক্ষা-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করে। বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান-২০২৪-ও এর অংশ। অর্থাৎ শিক্ষার্থী, প্রতিষ্ঠান, উপস্থিতি, ঝরে পড়াসহ শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে সরকারি পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও পর্যালোচনার ব্যবস্থা রয়েছে।

সমস্যাটির ব্যাপ্তি বোঝাতে একটি তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। ব্যানবেইসের ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার ছিল ২১ দশমিক ৫১ শতাংশ। অর্থাৎ মাধ্যমিক পেরিয়ে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষা-ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি।

ইউনেসকোর সাম্প্রতিক তথ্যেও বাংলাদেশের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জের বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০২৪ সালে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার হার আনুমানিক ৩৮ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের শিক্ষা-ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

তাই শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি নিশ্চিত করা শুধু উপস্থিতির খাতা পূরণের বিষয় নয়; এটি শিক্ষার্থীকে শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে ধরে রাখার একটি মৌলিক শর্ত।

পরীক্ষার আগে তৎপরতা, সারা বছর অনুপস্থিতি

আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো—নিয়মিত ক্লাসে না আসা বা একাডেমিকভাবে প্রস্তুত না থাকা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার আগে নানা চাপ, তদবির কিংবা প্রভাবের মাধ্যমে পরীক্ষার ফরম পূরণের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ।

যদি কোনো শিক্ষার্থী নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ না নিয়েও শেষ মুহূর্তে বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পায়, তাহলে তার স্বল্পমেয়াদি লাভ হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিটা শিক্ষার্থী, প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ—তিন পক্ষেরই।

পরীক্ষার ফল খারাপ হলে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার কোনোভাবে উত্তীর্ণ হলেও যদি প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জিত না হয়, তাহলে সনদ হাতে নিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পর বাস্তব দক্ষতার ঘাটতি প্রকাশ পেতে পারে।

তখন তৈরি হয় এক ধরনের বৈপরীত্য—সনদ আছে, কিন্তু দক্ষতা নেই।

‘ওপেন বক্স’ হতে পারে জবাবদিহির একটি মাধ্যম

এই পরিস্থিতিতে প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে একটি ‘ওপেন বক্স’ বা মতামত/অভিযোগ বাক্স স্থাপনের প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এটি যেন শিক্ষার্থীদের শাস্তি দেওয়ার বাক্স না হয়ে ওঠে; বরং শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকের জন্য নিরাপদ মতামত জানানোর একটি কার্যকর মাধ্যম হয়।

বাক্সে শিক্ষার্থীরা জানাতে পারে—

  • কোনো শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন কি না;
  • কোন বিষয়ে পাঠ বুঝতে সমস্যা হচ্ছে;
  • কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর আচরণে সমস্যা আছে কি না;
  • ক্লাসে অনুপস্থিতির পেছনে কী কারণ রয়েছে;
  • প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে;
  • পরীক্ষার আগে কোনো অনিয়ম বা অযাচিত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে কি না।

অভিভাবকরাও জানাতে পারেন, তাদের সন্তান কেন নিয়মিত প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে না এবং এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা কীভাবে প্রয়োজন।

তবে ‘ওপেন বক্স’ কার্যকর করতে হলে অভিযোগ যাচাইয়ের একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়াও থাকতে হবে। বেনামি অভিযোগকে সরাসরি সত্য ধরে শাস্তি দেওয়া যেমন ঠিক হবে না, তেমনি অভিযোগ বাক্স স্থাপন করে সেটি বছরের পর বছর না খোলাও অর্থহীন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এবং পরবর্তী পর্যবেক্ষণ—এই তিনটি ধাপ নিশ্চিত করতে হবে।

শাস্তির আগে কারণ খুঁজতে হবে

প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি শ্রেণির মাসিক উপস্থিতির হার অভ্যন্তরীণভাবে পর্যালোচনা করা যেতে পারে। কোনো শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকলে প্রথমে তার সঙ্গে যোগাযোগ, পরে অভিভাবকের সঙ্গে আলোচনা এবং প্রয়োজন হলে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অর্থাৎ শাস্তির আগে কারণ খুঁজতে হবে।

কারণ কোনো শিক্ষার্থী অর্থনৈতিক সংকট, কর্মসংস্থান, পারিবারিক সমস্যা, যাতায়াতের অসুবিধা, মানসিক চাপ বা অন্য কোনো বাস্তব সমস্যার কারণে অনুপস্থিত হতে পারে। আবার কারও ক্ষেত্রে নিছক অবহেলা কিংবা পড়াশোনার প্রতি অনাগ্রহও কারণ হতে পারে। দুই পরিস্থিতির সমাধান এক হতে পারে না।

শুধু প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করেও সমস্যার সমাধান হবে না। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, নিয়মিত ক্লাস করছে কি না, পড়াশোনার অগ্রগতি কেমন—এসব বিষয়ে অভিভাবকেরও নিয়মিত খোঁজ থাকা দরকার।

‘ভর্তি করেছি, এখন প্রতিষ্ঠানই সব দেখবে’—এই ধারণা শিক্ষার ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থীর বয়স ও স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ববোধও তৈরি করতে হয়।

অভিভাবক যদি সন্তানের নিয়মিত অনুপস্থিতিকে প্রশ্রয় দেন এবং পরীক্ষার সময় ফল ভালো করার জন্য প্রতিষ্ঠান বা প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে তদবির করেন, তাহলে শিক্ষার্থীর মধ্যে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

প্রতিষ্ঠানকেও নিজেদের দিকে তাকাতে হবে

তবে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার দাবি করার আগে প্রতিষ্ঠানকেও নিজেদের দিকে তাকাতে হবে।

ক্লাস সময়মতো হচ্ছে কি না, শিক্ষক নির্ধারিত পাঠ শেষ করছেন কি না, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান আকর্ষণীয় ও কার্যকর হচ্ছে কি না, উপস্থিতির হিসাব বাস্তবসম্মত কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরও জরুরি।

শুধু উপস্থিতির খাতায় স্বাক্ষর নেওয়া দিয়ে শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন—

উপস্থিতি + পাঠদান + মূল্যায়ন + জবাবদিহি

এই চারটির সমন্বিত ব্যবস্থা।

শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস নেবেন, শিক্ষার্থী নিয়মিত অংশ নেবে, অভিভাবক সন্তানের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ রাখবেন এবং প্রতিষ্ঠান পুরো প্রক্রিয়াটি তদারক করবে—এমন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা ছাড়া শুধু উপস্থিতির হার বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।

সনদ নয়, দক্ষতাই হোক শিক্ষার লক্ষ্য

শিক্ষার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় পাস করা নয়। শিক্ষা একজন মানুষকে জ্ঞান, চিন্তাশক্তি, যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধান এবং কর্মক্ষেত্রের উপযোগী দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করবে—এটাই প্রত্যাশা।

যদি বছরের পর বছর শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত না থেকেও কোনো শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষার সময় সক্রিয় হয়, তাহলে তার হাতে একটি সনদ হয়তো আসতে পারে। কিন্তু সনদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় দক্ষতা না এলে কর্মজীবনে তার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যেতে পারে।

এভাবেই তৈরি হতে পারে অদক্ষ কিন্তু সনদধারী বেকারের একটি বড় জনগোষ্ঠী—যার দায় শেষ পর্যন্ত শুধু শিক্ষার্থীর নয়, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার।

এখন প্রয়োজন ‘ফাঁকা শ্রেণিকক্ষ’ নিয়ে আলোচনা

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুনাম শুধু ভালো ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না। একটি প্রতিষ্ঠানের আসল সাফল্য হলো—তার শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাস করছে কি না, শেখার পরিবেশ কেমন, শিক্ষকরা দায়িত্বশীল কি না এবং শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনের জন্য কতটা প্রস্তুত হচ্ছে।

তাই উচ্চমাধ্যমিক, ডিগ্রি, ফাজিল ও অনার্স পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ, অভিভাবক-প্রতিষ্ঠান যোগাযোগ, শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিং, অভিযোগ ও মতামত বাক্স, শিক্ষক মূল্যায়ন এবং পরীক্ষার আগে জবাবদিহিমূলক একাডেমিক পর্যালোচনা চালু করা যেতে পারে।

‘ওপেন বক্স’ তার একটি ছোট কিন্তু কার্যকর অংশ হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সরল—শ্রেণিকক্ষ যদি শিক্ষার্থীর জন্য না হয়, তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কাদের জন্য?

পরীক্ষার দিন কয়েকটি ঘণ্টা উপস্থিত থাকার চেয়ে শিক্ষাবর্ষজুড়ে নিয়মিত শেখার পরিবেশ তৈরি করাই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। ফাঁকা শ্রেণিকক্ষ পূরণ করতে হলে শুধু শিক্ষার্থীকে নয়—শিক্ষক, অভিভাবক, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং পরীক্ষাব্যবস্থাকেও একই সঙ্গে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ শুধু কতজন সনদ পেল, তার ওপর নির্ভর করে না; কতজন সত্যিকার অর্থে শিখল, দক্ষ হলো এবং সেই দক্ষতা দিয়ে সমাজে অবদান রাখতে পারল—সেটিই বড় প্রশ্ন।


লেখক- শিক্ষানুরাগী, সমাজ সচেতন ও বিএড-এমএড ডিগ্রিধারী 

Public Voice

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬


শ্রেণিকক্ষে ফাঁকা বেঞ্চের নীরব প্রশ্ন!

প্রকাশের তারিখ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে, শ্রেণিকক্ষ আছে, শিক্ষক আছেন—কিন্তু অনেক সময় নেই শুধু শিক্ষার্থী। শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চগুলো দিনের পর দিন ফাঁকা পড়ে থাকে, অথচ পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি হঠাৎ বেড়ে যায়। এই বাস্তবতা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য, জবাবদিহি এবং সনদনির্ভর মানসিকতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করছে।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশেষ করে মফস্বলাঞ্চলে শিক্ষার বিভিন্ন ধারা রয়েছে। এর সবগুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একই কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয় না। কওমি শিক্ষাব্যবস্থার মতো স্বতন্ত্র ধারাও এর বাইরে রয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়মিত ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ নিয়ে যে প্রশ্ন রয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

বাস্তবে কোথাও কোথাও নিয়মিত ক্লাসে অংশ নেওয়ার চেয়ে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে একটি সনদ অর্জনই যেন শিক্ষার্থীদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠছে। ফলে ‘শিক্ষিত’ মানুষের সংখ্যা বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত জ্ঞান, দক্ষতা ও বাস্তব সক্ষমতা অর্জনের প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে।

শিক্ষার্থীর নিয়মিত অনুপস্থিতির একটি বড় ক্ষতি হলো শেখার ধারাবাহিকতা ভেঙে যাওয়া। একটি বিষয় না বুঝে পরবর্তী অধ্যায়ে গেলে জ্ঞানের ঘাটতি ক্রমেই বাড়তে থাকে। শেষ মুহূর্তে গাইড, নোট, কোচিং কিংবা মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে পরীক্ষায় কোনোভাবে সাফল্য এলেও শেখার মূল উদ্দেশ্য অনেকাংশেই ব্যাহত হয়।

এখানে শুধু শিক্ষার্থীকে দায়ী করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। অভিভাবকের নজরদারি, নিয়মিত পাঠদান, প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক তদারকি এবং শিক্ষার্থীর নিজস্ব দায়িত্ব—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) প্রতিবছর শিক্ষা-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করে। বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান-২০২৪-ও এর অংশ। অর্থাৎ শিক্ষার্থী, প্রতিষ্ঠান, উপস্থিতি, ঝরে পড়াসহ শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে সরকারি পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও পর্যালোচনার ব্যবস্থা রয়েছে।

সমস্যাটির ব্যাপ্তি বোঝাতে একটি তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। ব্যানবেইসের ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার ছিল ২১ দশমিক ৫১ শতাংশ। অর্থাৎ মাধ্যমিক পেরিয়ে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষা-ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি।

ইউনেসকোর সাম্প্রতিক তথ্যেও বাংলাদেশের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জের বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০২৪ সালে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার হার আনুমানিক ৩৮ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের শিক্ষা-ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

তাই শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি নিশ্চিত করা শুধু উপস্থিতির খাতা পূরণের বিষয় নয়; এটি শিক্ষার্থীকে শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে ধরে রাখার একটি মৌলিক শর্ত।

পরীক্ষার আগে তৎপরতা, সারা বছর অনুপস্থিতি

আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো—নিয়মিত ক্লাসে না আসা বা একাডেমিকভাবে প্রস্তুত না থাকা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার আগে নানা চাপ, তদবির কিংবা প্রভাবের মাধ্যমে পরীক্ষার ফরম পূরণের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ।

যদি কোনো শিক্ষার্থী নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ না নিয়েও শেষ মুহূর্তে বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পায়, তাহলে তার স্বল্পমেয়াদি লাভ হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিটা শিক্ষার্থী, প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ—তিন পক্ষেরই।

পরীক্ষার ফল খারাপ হলে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার কোনোভাবে উত্তীর্ণ হলেও যদি প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জিত না হয়, তাহলে সনদ হাতে নিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পর বাস্তব দক্ষতার ঘাটতি প্রকাশ পেতে পারে।

তখন তৈরি হয় এক ধরনের বৈপরীত্য—সনদ আছে, কিন্তু দক্ষতা নেই।

‘ওপেন বক্স’ হতে পারে জবাবদিহির একটি মাধ্যম

এই পরিস্থিতিতে প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে একটি ‘ওপেন বক্স’ বা মতামত/অভিযোগ বাক্স স্থাপনের প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এটি যেন শিক্ষার্থীদের শাস্তি দেওয়ার বাক্স না হয়ে ওঠে; বরং শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকের জন্য নিরাপদ মতামত জানানোর একটি কার্যকর মাধ্যম হয়।

বাক্সে শিক্ষার্থীরা জানাতে পারে—

  • কোনো শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন কি না;
  • কোন বিষয়ে পাঠ বুঝতে সমস্যা হচ্ছে;
  • কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর আচরণে সমস্যা আছে কি না;
  • ক্লাসে অনুপস্থিতির পেছনে কী কারণ রয়েছে;
  • প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে;
  • পরীক্ষার আগে কোনো অনিয়ম বা অযাচিত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে কি না।

অভিভাবকরাও জানাতে পারেন, তাদের সন্তান কেন নিয়মিত প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে না এবং এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা কীভাবে প্রয়োজন।

তবে ‘ওপেন বক্স’ কার্যকর করতে হলে অভিযোগ যাচাইয়ের একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়াও থাকতে হবে। বেনামি অভিযোগকে সরাসরি সত্য ধরে শাস্তি দেওয়া যেমন ঠিক হবে না, তেমনি অভিযোগ বাক্স স্থাপন করে সেটি বছরের পর বছর না খোলাও অর্থহীন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এবং পরবর্তী পর্যবেক্ষণ—এই তিনটি ধাপ নিশ্চিত করতে হবে।

শাস্তির আগে কারণ খুঁজতে হবে

প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি শ্রেণির মাসিক উপস্থিতির হার অভ্যন্তরীণভাবে পর্যালোচনা করা যেতে পারে। কোনো শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকলে প্রথমে তার সঙ্গে যোগাযোগ, পরে অভিভাবকের সঙ্গে আলোচনা এবং প্রয়োজন হলে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অর্থাৎ শাস্তির আগে কারণ খুঁজতে হবে।

কারণ কোনো শিক্ষার্থী অর্থনৈতিক সংকট, কর্মসংস্থান, পারিবারিক সমস্যা, যাতায়াতের অসুবিধা, মানসিক চাপ বা অন্য কোনো বাস্তব সমস্যার কারণে অনুপস্থিত হতে পারে। আবার কারও ক্ষেত্রে নিছক অবহেলা কিংবা পড়াশোনার প্রতি অনাগ্রহও কারণ হতে পারে। দুই পরিস্থিতির সমাধান এক হতে পারে না।

শুধু প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করেও সমস্যার সমাধান হবে না। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, নিয়মিত ক্লাস করছে কি না, পড়াশোনার অগ্রগতি কেমন—এসব বিষয়ে অভিভাবকেরও নিয়মিত খোঁজ থাকা দরকার।

‘ভর্তি করেছি, এখন প্রতিষ্ঠানই সব দেখবে’—এই ধারণা শিক্ষার ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থীর বয়স ও স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ববোধও তৈরি করতে হয়।

অভিভাবক যদি সন্তানের নিয়মিত অনুপস্থিতিকে প্রশ্রয় দেন এবং পরীক্ষার সময় ফল ভালো করার জন্য প্রতিষ্ঠান বা প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে তদবির করেন, তাহলে শিক্ষার্থীর মধ্যে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

প্রতিষ্ঠানকেও নিজেদের দিকে তাকাতে হবে

তবে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার দাবি করার আগে প্রতিষ্ঠানকেও নিজেদের দিকে তাকাতে হবে।

ক্লাস সময়মতো হচ্ছে কি না, শিক্ষক নির্ধারিত পাঠ শেষ করছেন কি না, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান আকর্ষণীয় ও কার্যকর হচ্ছে কি না, উপস্থিতির হিসাব বাস্তবসম্মত কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরও জরুরি।

শুধু উপস্থিতির খাতায় স্বাক্ষর নেওয়া দিয়ে শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন—

উপস্থিতি + পাঠদান + মূল্যায়ন + জবাবদিহি

এই চারটির সমন্বিত ব্যবস্থা।

শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস নেবেন, শিক্ষার্থী নিয়মিত অংশ নেবে, অভিভাবক সন্তানের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ রাখবেন এবং প্রতিষ্ঠান পুরো প্রক্রিয়াটি তদারক করবে—এমন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা ছাড়া শুধু উপস্থিতির হার বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।

সনদ নয়, দক্ষতাই হোক শিক্ষার লক্ষ্য

শিক্ষার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় পাস করা নয়। শিক্ষা একজন মানুষকে জ্ঞান, চিন্তাশক্তি, যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধান এবং কর্মক্ষেত্রের উপযোগী দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করবে—এটাই প্রত্যাশা।

যদি বছরের পর বছর শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত না থেকেও কোনো শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষার সময় সক্রিয় হয়, তাহলে তার হাতে একটি সনদ হয়তো আসতে পারে। কিন্তু সনদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় দক্ষতা না এলে কর্মজীবনে তার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যেতে পারে।

এভাবেই তৈরি হতে পারে অদক্ষ কিন্তু সনদধারী বেকারের একটি বড় জনগোষ্ঠী—যার দায় শেষ পর্যন্ত শুধু শিক্ষার্থীর নয়, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার।

এখন প্রয়োজন ‘ফাঁকা শ্রেণিকক্ষ’ নিয়ে আলোচনা

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুনাম শুধু ভালো ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না। একটি প্রতিষ্ঠানের আসল সাফল্য হলো—তার শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাস করছে কি না, শেখার পরিবেশ কেমন, শিক্ষকরা দায়িত্বশীল কি না এবং শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনের জন্য কতটা প্রস্তুত হচ্ছে।

তাই উচ্চমাধ্যমিক, ডিগ্রি, ফাজিল ও অনার্স পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ, অভিভাবক-প্রতিষ্ঠান যোগাযোগ, শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিং, অভিযোগ ও মতামত বাক্স, শিক্ষক মূল্যায়ন এবং পরীক্ষার আগে জবাবদিহিমূলক একাডেমিক পর্যালোচনা চালু করা যেতে পারে।

‘ওপেন বক্স’ তার একটি ছোট কিন্তু কার্যকর অংশ হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সরল—শ্রেণিকক্ষ যদি শিক্ষার্থীর জন্য না হয়, তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কাদের জন্য?

পরীক্ষার দিন কয়েকটি ঘণ্টা উপস্থিত থাকার চেয়ে শিক্ষাবর্ষজুড়ে নিয়মিত শেখার পরিবেশ তৈরি করাই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। ফাঁকা শ্রেণিকক্ষ পূরণ করতে হলে শুধু শিক্ষার্থীকে নয়—শিক্ষক, অভিভাবক, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং পরীক্ষাব্যবস্থাকেও একই সঙ্গে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ শুধু কতজন সনদ পেল, তার ওপর নির্ভর করে না; কতজন সত্যিকার অর্থে শিখল, দক্ষ হলো এবং সেই দক্ষতা দিয়ে সমাজে অবদান রাখতে পারল—সেটিই বড় প্রশ্ন।


লেখক- শিক্ষানুরাগী, সমাজ সচেতন ও বিএড-এমএড ডিগ্রিধারী 


Public Voice

সম্পাদক: মোঃ বাদশাহ আলমগীর
প্রকাশক: অনন্যা অনসূয়া দিবা

কপিরাইট © ২০২৬ Public Voice । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত