উপ-সম্পাদকীয়উপ-সম্পাদকীয়

কয়েকজনের জন্য শিক্ষা নয়—শিক্ষার অধিকার সবার

শেয়ার করুন
অ+ অ-
কয়েকজনের জন্য শিক্ষা নয়—শিক্ষার অধিকার সবার
প্রতীকী ছবি

আকাশ থেকে পড়া নয়—এ যেন বাস্তবতার নির্মম চপেটাঘাত!

কিছুদিন যাবৎ এমন কিছু সংবাদ ও বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছি, যা সত্যিই হতভম্ব করে দেওয়ার মতো। মনে হচ্ছে, আমরা একই দেশের দুই ভিন্ন বাস্তবতায় বসবাস করছি—একদিকে শিক্ষার আলো ছড়ানোর নানা আয়োজন, অন্যদিকে সেই আলোর নিচেই অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য দরিদ্র শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ।

সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে দেখলাম, দেশের জনপ্রতিনিধিগণ কেহ কেহ তাঁর নির্বাচনী এলাকার শিক্ষার্থীদের ইংরেজিতে দক্ষ করে তুলতে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছেন। নিঃসন্দেহে এটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। একজন জনপ্রতিনিধি যদি তাঁর এলাকার শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তুলতে এগিয়ে আসেন, সেটি অবশ্যই ইতিবাচক।

কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়।

ইংরেজি শেখার অধিকার কি শুধু বাছাই করা কয়েকজন শিক্ষার্থীর?

জনপ্রতিনিধির নির্বাচনী এলাকায় যারা ভোট দিয়েছে, তাদের সন্তানদের মধ্যে মেধাবী, অপেক্ষাকৃত সচ্ছল কিংবা সুবিধাপ্রাপ্তদের বেছে নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা সহজ। কিন্তু প্রকৃত জনপ্রতিনিধিত্বের পরীক্ষা তো সেখানে নয়। পরীক্ষা হলো—যে সন্তানটির বাবা দিনমজুর, যে ঘরের চাল ফুটো, যে পরিবারের সন্তান দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তার জন্য স্কুল/কলেজ/মাদ্রাসা ফাঁকি দিয়ে কাজে যায়—তার হাতেও শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দেওয়া।

নইলে এটি শিক্ষা কার্যক্রম হতে পারে, কিন্তু শিক্ষার সামাজিক দায়বদ্ধতা পূরণ হয় না।

অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে কয়েকটি পরিবারের বাড়িতে গিয়েছিলাম। একজন অভিভাবককে জিজ্ঞেস করলাম— “আপনার সন্তান ক্লাসে অনুপস্থিত থাকে কেন?” উত্তরটি ছিল আরও বেশি নির্মম—

“গরিবের পড়ালেখা করে কী হবে? না হবে চাকরি, না পারবে তখন কিছু করে খাইতে। তাই এখন থেকেই কাজে দিয়েছি। যেহেতু শেষ পর্যন্ত কাজ করেই খেতে হবে, তাহলে অহেতুক অলস বানিয়ে লাভ কী?”

কথাটি শুনে তর্ক করার ভাষা হারিয়ে ফেললাম। কারণ, কথার ভেতরে যতটা হতাশা ছিল, তার চেয়েও বেশি ছিল রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা।

এরপর চোখে দেখলাম সেই বাস্তবতার প্রমাণ—ভাঙাচোরা ঘর, ছাউনির নিচে বসবাস, অস্বাস্থ্যকর স্যানিটারি ব্যবস্থা, অনিশ্চিত আয় এবং অভাবের সঙ্গে প্রতিদিনের যুদ্ধ। যাদের সন্তানদের আমরা “ক্লাশ ফাঁকি দেওয়া” বলে দোষারোপ করি, তাদের অনেকের ঘরেই হয়তো পরদিনের খাবারের নিশ্চয়তা নেই।

তখন মনে হলো— শিক্ষার্থী ক্লাশে আসছে না, নাকি দারিদ্র্য তাকে ক্লাশ থেকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে? প্রশ্নটি আমাদের করতেই হবে।

আমরা প্রায়ই বলি, “শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড।” কিন্তু সেই মেরুদণ্ড যদি শুধু সামর্থ্যবান পরিবারের সন্তানদের জন্য শক্তিশালী করা হয়, আর দরিদ্রের সন্তানকে অল্প বয়সেই শ্রমবাজারে ঠেলে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি কেমন মেরুদণ্ড?

এখানে সরকারের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গড়ে ওঠা, টিকে থাকা এবং মানুষের শিক্ষার চাহিদা পূরণ করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেখে-শুনে নয়, প্রয়োজন ও বাস্তবতার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে সরকারি ব্যবস্থার আওতায় আনা জরুরি। কারণ দরিদ্র পরিবারের সন্তানের কাছে শিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়—এটি তার ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

আর জনপ্রতিনিধিদের প্রতিও একটি বিনীত কিন্তু কঠিন প্রশ্ন—

আপনি যদি সত্যিই আপনার এলাকার শিক্ষার্থীদের ইংরেজিতে দক্ষ করতে চান, তাহলে বাছাই করে কেন?

আপনার এলাকার প্রতিটি শিক্ষার্থীই তো আপনার প্রতিনিধিত্বের অংশ। যারা আপনার উদ্যোগে জায়গা পেল, তারা যেমন আপনার এলাকার সন্তান; যারা বাদ পড়ল, তারাও তেমনি আপনার এলাকার সন্তান।

যোগ্যতার নামে সুযোগের দরজা খুলুন, কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে দরজা বন্ধ করবেন না।

আর যদি সত্যিই ভোটের বিনিময়ে জনগণের সেবা করার রাজনীতি হয়, তাহলে নির্বাচনের পর মানুষের সন্তানদের মধ্যে “ভোটার” ও “বাদপড়া ভোটার”—এমন কোনো শ্রেণিবিভাগ থাকা উচিত নয়।

কারণ ভোটের সময় যদি প্রত্যেকের ভোটের মূল্য সমান হয়,
তাহলে শিক্ষার ক্ষেত্রেও প্রত্যেক শিশুর ভবিষ্যতের মূল্য সমান হওয়া উচিত।

আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হবে তখনই, যখন আমরা কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ইংরেজিতে দক্ষ করে ছবি তুলব, সংবাদ করব, সাফল্যের গল্প লিখব—আর ঠিক সেই সময় পাশের গ্রামের কোনো দরিদ্র বাবা তার সন্তানকে স্কুল থেকে তুলে নিয়ে বলবে—

“পড়ালেখা করে কী হবে?”

এই একটি বাক্যই আসলে আমাদের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি নির্মম আয়না।

সেই আয়নায় আমরা কী দেখতে চাই?

কয়েকজন নির্বাচিত শিক্ষার্থীর সাফল্য, নাকি কোটি মানুষের সন্তানের সমান সুযোগের বাংলাদেশ?

শিক্ষা যদি অধিকার হয়, তাহলে বাছাই করে অধিকার দেওয়া যায় না।

আর জনপ্রতিনিধিত্ব যদি জনগণের জন্য হয়, তাহলে জনগণের সন্তানদের মধ্যেও বাছাই করে ভালোবাসা দেখানো যায় না।

দরিদ্রের সন্তানকে কাজে পাঠিয়ে দিয়ে উন্নয়নের গল্প বলা সহজ; তাকে শ্রেণিকক্ষে বসিয়ে ভবিষ্যৎ তৈরি করা—সেটিই আসল চ্যালেঞ্জ।

আর রাষ্ট্র যদি সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ না করে, তাহলে একদিন হয়তো শিক্ষার আলো থাকবে— কিন্তু সেই আলোয় দাঁড়ানোর মতো মানুষ থাকবে না।

Public Voice

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬


কয়েকজনের জন্য শিক্ষা নয়—শিক্ষার অধিকার সবার

প্রকাশের তারিখ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

আকাশ থেকে পড়া নয়—এ যেন বাস্তবতার নির্মম চপেটাঘাত!

কিছুদিন যাবৎ এমন কিছু সংবাদ ও বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছি, যা সত্যিই হতভম্ব করে দেওয়ার মতো। মনে হচ্ছে, আমরা একই দেশের দুই ভিন্ন বাস্তবতায় বসবাস করছি—একদিকে শিক্ষার আলো ছড়ানোর নানা আয়োজন, অন্যদিকে সেই আলোর নিচেই অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য দরিদ্র শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ।

সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে দেখলাম, দেশের জনপ্রতিনিধিগণ কেহ কেহ তাঁর নির্বাচনী এলাকার শিক্ষার্থীদের ইংরেজিতে দক্ষ করে তুলতে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছেন। নিঃসন্দেহে এটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। একজন জনপ্রতিনিধি যদি তাঁর এলাকার শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তুলতে এগিয়ে আসেন, সেটি অবশ্যই ইতিবাচক।

কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়।

ইংরেজি শেখার অধিকার কি শুধু বাছাই করা কয়েকজন শিক্ষার্থীর?

জনপ্রতিনিধির নির্বাচনী এলাকায় যারা ভোট দিয়েছে, তাদের সন্তানদের মধ্যে মেধাবী, অপেক্ষাকৃত সচ্ছল কিংবা সুবিধাপ্রাপ্তদের বেছে নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা সহজ। কিন্তু প্রকৃত জনপ্রতিনিধিত্বের পরীক্ষা তো সেখানে নয়। পরীক্ষা হলো—যে সন্তানটির বাবা দিনমজুর, যে ঘরের চাল ফুটো, যে পরিবারের সন্তান দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তার জন্য স্কুল/কলেজ/মাদ্রাসা ফাঁকি দিয়ে কাজে যায়—তার হাতেও শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দেওয়া।

নইলে এটি শিক্ষা কার্যক্রম হতে পারে, কিন্তু শিক্ষার সামাজিক দায়বদ্ধতা পূরণ হয় না।

অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে কয়েকটি পরিবারের বাড়িতে গিয়েছিলাম। একজন অভিভাবককে জিজ্ঞেস করলাম— “আপনার সন্তান ক্লাসে অনুপস্থিত থাকে কেন?” উত্তরটি ছিল আরও বেশি নির্মম—

“গরিবের পড়ালেখা করে কী হবে? না হবে চাকরি, না পারবে তখন কিছু করে খাইতে। তাই এখন থেকেই কাজে দিয়েছি। যেহেতু শেষ পর্যন্ত কাজ করেই খেতে হবে, তাহলে অহেতুক অলস বানিয়ে লাভ কী?”

কথাটি শুনে তর্ক করার ভাষা হারিয়ে ফেললাম। কারণ, কথার ভেতরে যতটা হতাশা ছিল, তার চেয়েও বেশি ছিল রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা।

এরপর চোখে দেখলাম সেই বাস্তবতার প্রমাণ—ভাঙাচোরা ঘর, ছাউনির নিচে বসবাস, অস্বাস্থ্যকর স্যানিটারি ব্যবস্থা, অনিশ্চিত আয় এবং অভাবের সঙ্গে প্রতিদিনের যুদ্ধ। যাদের সন্তানদের আমরা “ক্লাশ ফাঁকি দেওয়া” বলে দোষারোপ করি, তাদের অনেকের ঘরেই হয়তো পরদিনের খাবারের নিশ্চয়তা নেই।

তখন মনে হলো— শিক্ষার্থী ক্লাশে আসছে না, নাকি দারিদ্র্য তাকে ক্লাশ থেকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে? প্রশ্নটি আমাদের করতেই হবে।

আমরা প্রায়ই বলি, “শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড।” কিন্তু সেই মেরুদণ্ড যদি শুধু সামর্থ্যবান পরিবারের সন্তানদের জন্য শক্তিশালী করা হয়, আর দরিদ্রের সন্তানকে অল্প বয়সেই শ্রমবাজারে ঠেলে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি কেমন মেরুদণ্ড?

এখানে সরকারের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গড়ে ওঠা, টিকে থাকা এবং মানুষের শিক্ষার চাহিদা পূরণ করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেখে-শুনে নয়, প্রয়োজন ও বাস্তবতার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে সরকারি ব্যবস্থার আওতায় আনা জরুরি। কারণ দরিদ্র পরিবারের সন্তানের কাছে শিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়—এটি তার ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

আর জনপ্রতিনিধিদের প্রতিও একটি বিনীত কিন্তু কঠিন প্রশ্ন—

আপনি যদি সত্যিই আপনার এলাকার শিক্ষার্থীদের ইংরেজিতে দক্ষ করতে চান, তাহলে বাছাই করে কেন?

আপনার এলাকার প্রতিটি শিক্ষার্থীই তো আপনার প্রতিনিধিত্বের অংশ। যারা আপনার উদ্যোগে জায়গা পেল, তারা যেমন আপনার এলাকার সন্তান; যারা বাদ পড়ল, তারাও তেমনি আপনার এলাকার সন্তান।

যোগ্যতার নামে সুযোগের দরজা খুলুন, কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে দরজা বন্ধ করবেন না।

আর যদি সত্যিই ভোটের বিনিময়ে জনগণের সেবা করার রাজনীতি হয়, তাহলে নির্বাচনের পর মানুষের সন্তানদের মধ্যে “ভোটার” ও “বাদপড়া ভোটার”—এমন কোনো শ্রেণিবিভাগ থাকা উচিত নয়।

কারণ ভোটের সময় যদি প্রত্যেকের ভোটের মূল্য সমান হয়,
তাহলে শিক্ষার ক্ষেত্রেও প্রত্যেক শিশুর ভবিষ্যতের মূল্য সমান হওয়া উচিত।

আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হবে তখনই, যখন আমরা কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ইংরেজিতে দক্ষ করে ছবি তুলব, সংবাদ করব, সাফল্যের গল্প লিখব—আর ঠিক সেই সময় পাশের গ্রামের কোনো দরিদ্র বাবা তার সন্তানকে স্কুল থেকে তুলে নিয়ে বলবে—

“পড়ালেখা করে কী হবে?”

এই একটি বাক্যই আসলে আমাদের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি নির্মম আয়না।

সেই আয়নায় আমরা কী দেখতে চাই?

কয়েকজন নির্বাচিত শিক্ষার্থীর সাফল্য, নাকি কোটি মানুষের সন্তানের সমান সুযোগের বাংলাদেশ?

শিক্ষা যদি অধিকার হয়, তাহলে বাছাই করে অধিকার দেওয়া যায় না।

আর জনপ্রতিনিধিত্ব যদি জনগণের জন্য হয়, তাহলে জনগণের সন্তানদের মধ্যেও বাছাই করে ভালোবাসা দেখানো যায় না।

দরিদ্রের সন্তানকে কাজে পাঠিয়ে দিয়ে উন্নয়নের গল্প বলা সহজ; তাকে শ্রেণিকক্ষে বসিয়ে ভবিষ্যৎ তৈরি করা—সেটিই আসল চ্যালেঞ্জ।

আর রাষ্ট্র যদি সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ না করে, তাহলে একদিন হয়তো শিক্ষার আলো থাকবে— কিন্তু সেই আলোয় দাঁড়ানোর মতো মানুষ থাকবে না।


Public Voice

সম্পাদক: মোঃ বাদশাহ আলমগীর
প্রকাশক: অনন্যা অনসূয়া দিবা

কপিরাইট © ২০২৬ Public Voice । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত