উপ-সম্পাদকীয়
নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের ভিডিও ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বারবার ধর্ষণ এবং অন্যদের দিয়ে ধর্ষণ করানোর অভিযোগে পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলায় বিএনপির সাবেক এক নেতাসহ তার পরিবারের সদস্যদের নামও রয়েছে। মামলার পর একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে মামলার প্রধান আসামি রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া ওরফে বকুল মিয়াকে পরবর্তীতে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
মামলার এজাহার ও পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, ভুক্তভোগী বর্তমানে দশম শ্রেণির ছাত্রী। ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে একটি বাড়িতে নেওয়া হয়। সেখানে ধর্ষণ ও ভিডিও ধারণ করা হয় বলে অভিযোগ। পরে ওই ভিডিও প্রকাশের ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন সময়ে তাকে ধর্ষণ এবং অন্যদের দিয়েও ধর্ষণ করানোর অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের মার্চ থেকে এপ্রিলের মধ্যে এক নারী সহযোগী ওই ছাত্রীকে একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে যান। সেখানে অন্য ব্যক্তিদের দিয়ে ধর্ষণ করানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন সময়েও তাকে বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে ধর্ষণ করানোর অভিযোগ করা হয়েছে।
পরিবারের দাবি, ঘটনা প্রকাশ না করার জন্য ওই ছাত্রীকে দীর্ঘদিন ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হতো। গত ১ আগস্ট চট্টগ্রামে বড় ভাইয়ের কাছে যাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও পরিবারের সদস্যদের নজরে আসে। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে ঘটনার বিস্তারিত জানায় বলে পরিবারের ভাষ্য।
পরিবারের আরও দাবি, ১৮ আগস্ট চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা পরীক্ষা করালে ওই ছাত্রীকে ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা বলে জানানো হয়। ২৫ আগস্ট সে বাড়িতে ফিরে আসে। এরপর ২৬ আগস্ট রাতে পরিবারের পক্ষ থেকে কেন্দুয়া থানায় মামলা করা হয়।
মামলায় রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া ওরফে বকুল মিয়া (৫৫), তার স্ত্রী জাহানারা বেগম (৪৮), মেয়ে লিমা (২১), আবু মিয়া (৫০) এবং গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মোছা. স্মৃতিকে আসামি করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আরও ৩-৪ জনকেও আসামি করা হয়েছে। মামলার পর আবু মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এদিকে মামলার পর বকুল মিয়ার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয় কেন্দুয়া পৌর বিএনপি। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে দলীয় সব পদ থেকে বহিষ্কারের কথা জানানো হয়। পরে মামলার বিষয়ে তাকে অব্যাহতি দেওয়ার তথ্যও প্রকাশ্যে এসেছে।
কেন্দুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ তরিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, মামলার একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্য আসামিদের বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়েও পুলিশ সতর্ক রয়েছে।
তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি কেবল একটি মামলা, একটি দল কিংবা কয়েকজন ব্যক্তিকে ঘিরে নয়।
প্রশ্ন হলো—আমরা কি সত্যিই শিক্ষার্থীদের সম্মান করি, নাকি শুধু তাদের সাফল্যকে নিজেদের প্রচারের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করি?
মঞ্চে শিক্ষার্থীর গলায় পদক পরানো সহজ। ফুল হাতে ছবি তোলা সহজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে ‘ভবিষ্যতের বাংলাদেশ’ বলা আরও সহজ। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ রাখা—সেটিই আসল পরীক্ষা।
একজন শিক্ষার্থী ভালো ফল করলে তাকে নিয়ে রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোর মধ্যে কৃতিত্ব নেওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। অথচ একই শিক্ষার্থী যখন হয়রানি, নির্যাতন, ভয়ভীতি কিংবা যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে, তখন সেই নিরাপত্তার দায়িত্বটি কার?
শিক্ষার্থীকে পদক দেওয়া আর শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—দুটো এক জিনিস নয়।
কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয়ধারী হোক, প্রভাবশালী হোক কিংবা সমাজে সম্মানিত হোক—তার বিরুদ্ধে কোনো শিক্ষার্থীকে প্রলোভন, ভয়ভীতি, হয়রানি বা যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে চাপা দেওয়া যাবে না। আবার অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করাও যাবে না। তদন্ত হোক, সত্য উদঘাটিত হোক এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হোক।
কারণ ন্যায়বিচার শুধু অপরাধীর শাস্তি নয়; ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ রক্ষার নামও ন্যায়বিচার।
আজ যে শিক্ষার্থীর হাতে আমরা পদক তুলে দিয়ে বাহ্বাসহ ছবি তুলছি, আগামীকাল সেই শিক্ষার্থী যেন ভয়ের কারণে স্কুলে যেতে না চায়—এমন সমাজ আমরা চাই না।
প্রিয় গণসাধারণ, লোকদেখানো বন্দনা বন্ধ করুন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন।
মিডিয়ার ক্যামেরার সামনে শিক্ষার্থীর সঙ্গে দাঁড়ানোর আগে নিজেদের বিবেকের আয়নায় একবার দাঁড়ানো প্রয়োজন।
একটি পদক একজন শিক্ষার্থীর গলায় শোভা পেতে পারে; কিন্তু কোনো শিক্ষার্থীর সম্ভ্রমহানি, নির্যাতন কিংবা কান্নাকে কোনো পদক, কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য, কোনো প্রচারণা দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না।
কৃতির বন্দনা হোক—অবশ্যই হোক।
কিন্তু তারও আগে নিশ্চিত হোক শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা।
কারণ একজন নিরাপদ শিক্ষার্থীই আগামী দিনের সত্যিকারের কৃতি নাগরিক।

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ আগস্ট ২০২৬
নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের ভিডিও ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বারবার ধর্ষণ এবং অন্যদের দিয়ে ধর্ষণ করানোর অভিযোগে পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলায় বিএনপির সাবেক এক নেতাসহ তার পরিবারের সদস্যদের নামও রয়েছে। মামলার পর একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে মামলার প্রধান আসামি রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া ওরফে বকুল মিয়াকে পরবর্তীতে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
মামলার এজাহার ও পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, ভুক্তভোগী বর্তমানে দশম শ্রেণির ছাত্রী। ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে একটি বাড়িতে নেওয়া হয়। সেখানে ধর্ষণ ও ভিডিও ধারণ করা হয় বলে অভিযোগ। পরে ওই ভিডিও প্রকাশের ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন সময়ে তাকে ধর্ষণ এবং অন্যদের দিয়েও ধর্ষণ করানোর অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের মার্চ থেকে এপ্রিলের মধ্যে এক নারী সহযোগী ওই ছাত্রীকে একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে যান। সেখানে অন্য ব্যক্তিদের দিয়ে ধর্ষণ করানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন সময়েও তাকে বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে ধর্ষণ করানোর অভিযোগ করা হয়েছে।
পরিবারের দাবি, ঘটনা প্রকাশ না করার জন্য ওই ছাত্রীকে দীর্ঘদিন ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হতো। গত ১ আগস্ট চট্টগ্রামে বড় ভাইয়ের কাছে যাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও পরিবারের সদস্যদের নজরে আসে। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে ঘটনার বিস্তারিত জানায় বলে পরিবারের ভাষ্য।
পরিবারের আরও দাবি, ১৮ আগস্ট চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা পরীক্ষা করালে ওই ছাত্রীকে ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা বলে জানানো হয়। ২৫ আগস্ট সে বাড়িতে ফিরে আসে। এরপর ২৬ আগস্ট রাতে পরিবারের পক্ষ থেকে কেন্দুয়া থানায় মামলা করা হয়।
মামলায় রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া ওরফে বকুল মিয়া (৫৫), তার স্ত্রী জাহানারা বেগম (৪৮), মেয়ে লিমা (২১), আবু মিয়া (৫০) এবং গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মোছা. স্মৃতিকে আসামি করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আরও ৩-৪ জনকেও আসামি করা হয়েছে। মামলার পর আবু মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এদিকে মামলার পর বকুল মিয়ার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয় কেন্দুয়া পৌর বিএনপি। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে দলীয় সব পদ থেকে বহিষ্কারের কথা জানানো হয়। পরে মামলার বিষয়ে তাকে অব্যাহতি দেওয়ার তথ্যও প্রকাশ্যে এসেছে।
কেন্দুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ তরিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, মামলার একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্য আসামিদের বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়েও পুলিশ সতর্ক রয়েছে।
তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি কেবল একটি মামলা, একটি দল কিংবা কয়েকজন ব্যক্তিকে ঘিরে নয়।
প্রশ্ন হলো—আমরা কি সত্যিই শিক্ষার্থীদের সম্মান করি, নাকি শুধু তাদের সাফল্যকে নিজেদের প্রচারের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করি?
মঞ্চে শিক্ষার্থীর গলায় পদক পরানো সহজ। ফুল হাতে ছবি তোলা সহজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে ‘ভবিষ্যতের বাংলাদেশ’ বলা আরও সহজ। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ রাখা—সেটিই আসল পরীক্ষা।
একজন শিক্ষার্থী ভালো ফল করলে তাকে নিয়ে রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোর মধ্যে কৃতিত্ব নেওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। অথচ একই শিক্ষার্থী যখন হয়রানি, নির্যাতন, ভয়ভীতি কিংবা যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে, তখন সেই নিরাপত্তার দায়িত্বটি কার?
শিক্ষার্থীকে পদক দেওয়া আর শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—দুটো এক জিনিস নয়।
কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয়ধারী হোক, প্রভাবশালী হোক কিংবা সমাজে সম্মানিত হোক—তার বিরুদ্ধে কোনো শিক্ষার্থীকে প্রলোভন, ভয়ভীতি, হয়রানি বা যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে চাপা দেওয়া যাবে না। আবার অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করাও যাবে না। তদন্ত হোক, সত্য উদঘাটিত হোক এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হোক।
কারণ ন্যায়বিচার শুধু অপরাধীর শাস্তি নয়; ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ রক্ষার নামও ন্যায়বিচার।
আজ যে শিক্ষার্থীর হাতে আমরা পদক তুলে দিয়ে বাহ্বাসহ ছবি তুলছি, আগামীকাল সেই শিক্ষার্থী যেন ভয়ের কারণে স্কুলে যেতে না চায়—এমন সমাজ আমরা চাই না।
প্রিয় গণসাধারণ, লোকদেখানো বন্দনা বন্ধ করুন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন।
মিডিয়ার ক্যামেরার সামনে শিক্ষার্থীর সঙ্গে দাঁড়ানোর আগে নিজেদের বিবেকের আয়নায় একবার দাঁড়ানো প্রয়োজন।
একটি পদক একজন শিক্ষার্থীর গলায় শোভা পেতে পারে; কিন্তু কোনো শিক্ষার্থীর সম্ভ্রমহানি, নির্যাতন কিংবা কান্নাকে কোনো পদক, কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য, কোনো প্রচারণা দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না।
কৃতির বন্দনা হোক—অবশ্যই হোক।
কিন্তু তারও আগে নিশ্চিত হোক শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা।
কারণ একজন নিরাপদ শিক্ষার্থীই আগামী দিনের সত্যিকারের কৃতি নাগরিক।
