আর্কাইভ
উপকূলীয় ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে সঞ্চিত ‘ব্লু কার্বন’ বা নীল কার্বন পরিমাপ ও এর যথাযথ সংরক্ষণের মাধ্যমে জলবায়ু অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে বাংলাদেশের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, উন্নত প্রযুক্তি ও টেকসই উপকূলীয় ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) কক্সবাজারে বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিওআরআই) আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে এসব তথ্য জানানো হয়। এ জন্য বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক গবেষণা, উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ফলে এসব বন ও জলাভূমি রক্ষা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে।
‘বাংলাদেশের ব্লু কার্বন সম্ভাবনা: কার্বন মজুত, জলবায়ু সহনশীলতা এবং টেকসই উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের জন্য উন্নত পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক এই আয়োজনটি বিওআরআই-এর এনভায়রনমেন্টাল ওশানোগ্রাফি অ্যান্ড ক্লাইমেট ডিভিশন কর্তৃক পরিচালিত হয়। বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্টের (বিসিসিটি) অর্থায়নে চলমান গবেষণা প্রকল্পের অংশ হিসেবে আয়োজিত সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বিওআরআই মহাপরিচালক কমোডর শেখ শহীদ আহমেদ। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন বিসিসিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রওনাকুল ইসলাম এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. জসিম উদ্দিন।
প্রকল্পের অগ্রগতি তুলে ধরে বিওআরআইয়ের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালক মীর কাশেম জানান, সুন্দরবনের কার্বন মজুত নিরূপণে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও মাঠপর্যায়ের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সমন্বয় ঘটানো হচ্ছে। এ কাজে আরটিকে-সুবিধাযুক্ত মাল্টিস্পেকট্রাল ড্রোন বা ইউএভি ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সেন্টিমিটার-স্তরের নির্ভুল ভূ-স্থানিক তথ্য দিতে সক্ষম। এর মাধ্যমে বনের গাছপালার ত্রিমাত্রিক মডেল এবং ক্লোরোফিলের ডিজিটাল মানচিত্র তৈরির কাজ চলছে। পাশাপাশি কাদামাটি ও জোয়ার-ভাটার প্রতিকূলতা পেরিয়ে মাটির তিন মিটার গভীর পর্যন্ত নমুনা সংগ্রহ করে তা গবেষণাগারে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
গবেষণার তথ্যমতে, বাংলাদেশের উপকূলীয় ব্লু কার্বন বাস্তুতন্ত্রের প্রায় ৭৯ দশমিক ৮ শতাংশই হলো ম্যানগ্রোভ বন, যার আয়তন ৪ লাখ ৪১ হাজার ৪৫৫ হেক্টর। অবশিষ্ট ২০ দশমিক ২ শতাংশ এলাকা হলো জোয়ার-ভাটা নির্ভর সল্টমার্শ বা লবণাক্ত জলাভূমি, যার আয়তন ১ লাখ ১১ হাজার ৫৮৫ হেক্টর। গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ স্থলবনের তুলনায় উপকূলীয় ম্যানগ্রোভের মাটি প্রতি হেক্টরে তিন থেকে পাঁচ গুণ বেশি কার্বন দীর্ঘ সময় ধরে ধরে রাখতে পারে।
প্রধান অতিথি কাজী রওনাকুল ইসলাম ব্লু কার্বনকে কেবল গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ না রেখে জাতীয় জলবায়ু নীতি, গ্রিনহাউস গ্যাসের হিসাব এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু কূটনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ করার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, এটি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানের একজন শক্তিশালী অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। একই সঙ্গে বিসিসিটি কর্তৃক এই ধরনের গবেষণায় সহায়তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আশ্বাস দেন তিনি।
অধ্যাপক ড. মো. জসিম উদ্দিন ব্লু কার্বন সম্ভাবনাকে বৃহত্তর ব্লু ইকোনমি বা নীল অর্থনীতির সঙ্গে সমন্বিতভাবে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষার সাথে মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য, পর্যটন এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা সরাসরি জড়িত। তাই কার্যকর নীতিনির্ধারণের জন্য সামুদ্রিক স্থানিক পরিকল্পনা ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় জরুরি।
সমাপনী বক্তব্যে কমোডর শেখ শহীদ আহমেদ বলেন, উপকূল সুরক্ষা মানে কেবল গাছ লাগানো নয়, বরং এর সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা ও অর্থনীতি জড়িত। সেমিনারের মুক্ত আলোচনায় অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা জানান, ২০২৫ সালের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) হালনাগাদে উপকূলীয় জলবায়ু পদক্ষেপের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত মহাসাগর ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রে কার্বন ডাই অক্সাইড জৈব পদার্থ ও পলি আকারে সঞ্চিত হয়, যা দীর্ঘমেয়াদী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচিত।
সূত্র: রাইজিংবিডি

বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ অক্টোবর ২০২৬
উপকূলীয় ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে সঞ্চিত ‘ব্লু কার্বন’ বা নীল কার্বন পরিমাপ ও এর যথাযথ সংরক্ষণের মাধ্যমে জলবায়ু অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে বাংলাদেশের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, উন্নত প্রযুক্তি ও টেকসই উপকূলীয় ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) কক্সবাজারে বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিওআরআই) আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে এসব তথ্য জানানো হয়। এ জন্য বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক গবেষণা, উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ফলে এসব বন ও জলাভূমি রক্ষা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে।
‘বাংলাদেশের ব্লু কার্বন সম্ভাবনা: কার্বন মজুত, জলবায়ু সহনশীলতা এবং টেকসই উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের জন্য উন্নত পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক এই আয়োজনটি বিওআরআই-এর এনভায়রনমেন্টাল ওশানোগ্রাফি অ্যান্ড ক্লাইমেট ডিভিশন কর্তৃক পরিচালিত হয়। বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্টের (বিসিসিটি) অর্থায়নে চলমান গবেষণা প্রকল্পের অংশ হিসেবে আয়োজিত সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বিওআরআই মহাপরিচালক কমোডর শেখ শহীদ আহমেদ। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন বিসিসিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রওনাকুল ইসলাম এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. জসিম উদ্দিন।
প্রকল্পের অগ্রগতি তুলে ধরে বিওআরআইয়ের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালক মীর কাশেম জানান, সুন্দরবনের কার্বন মজুত নিরূপণে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও মাঠপর্যায়ের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সমন্বয় ঘটানো হচ্ছে। এ কাজে আরটিকে-সুবিধাযুক্ত মাল্টিস্পেকট্রাল ড্রোন বা ইউএভি ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সেন্টিমিটার-স্তরের নির্ভুল ভূ-স্থানিক তথ্য দিতে সক্ষম। এর মাধ্যমে বনের গাছপালার ত্রিমাত্রিক মডেল এবং ক্লোরোফিলের ডিজিটাল মানচিত্র তৈরির কাজ চলছে। পাশাপাশি কাদামাটি ও জোয়ার-ভাটার প্রতিকূলতা পেরিয়ে মাটির তিন মিটার গভীর পর্যন্ত নমুনা সংগ্রহ করে তা গবেষণাগারে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
গবেষণার তথ্যমতে, বাংলাদেশের উপকূলীয় ব্লু কার্বন বাস্তুতন্ত্রের প্রায় ৭৯ দশমিক ৮ শতাংশই হলো ম্যানগ্রোভ বন, যার আয়তন ৪ লাখ ৪১ হাজার ৪৫৫ হেক্টর। অবশিষ্ট ২০ দশমিক ২ শতাংশ এলাকা হলো জোয়ার-ভাটা নির্ভর সল্টমার্শ বা লবণাক্ত জলাভূমি, যার আয়তন ১ লাখ ১১ হাজার ৫৮৫ হেক্টর। গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ স্থলবনের তুলনায় উপকূলীয় ম্যানগ্রোভের মাটি প্রতি হেক্টরে তিন থেকে পাঁচ গুণ বেশি কার্বন দীর্ঘ সময় ধরে ধরে রাখতে পারে।
প্রধান অতিথি কাজী রওনাকুল ইসলাম ব্লু কার্বনকে কেবল গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ না রেখে জাতীয় জলবায়ু নীতি, গ্রিনহাউস গ্যাসের হিসাব এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু কূটনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ করার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, এটি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানের একজন শক্তিশালী অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। একই সঙ্গে বিসিসিটি কর্তৃক এই ধরনের গবেষণায় সহায়তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আশ্বাস দেন তিনি।
অধ্যাপক ড. মো. জসিম উদ্দিন ব্লু কার্বন সম্ভাবনাকে বৃহত্তর ব্লু ইকোনমি বা নীল অর্থনীতির সঙ্গে সমন্বিতভাবে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষার সাথে মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য, পর্যটন এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা সরাসরি জড়িত। তাই কার্যকর নীতিনির্ধারণের জন্য সামুদ্রিক স্থানিক পরিকল্পনা ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় জরুরি।
সমাপনী বক্তব্যে কমোডর শেখ শহীদ আহমেদ বলেন, উপকূল সুরক্ষা মানে কেবল গাছ লাগানো নয়, বরং এর সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা ও অর্থনীতি জড়িত। সেমিনারের মুক্ত আলোচনায় অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা জানান, ২০২৫ সালের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) হালনাগাদে উপকূলীয় জলবায়ু পদক্ষেপের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত মহাসাগর ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রে কার্বন ডাই অক্সাইড জৈব পদার্থ ও পলি আকারে সঞ্চিত হয়, যা দীর্ঘমেয়াদী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচিত।
সূত্র: রাইজিংবিডি
