ছোট গল্পছোট গল্প

অসম প্রণয় (গৌড়িকা)

সৈমোহোরা
সৈমোহোরা
|
শেয়ার করুন
অ+ অ-

একজন শিক্ষকের বেদনা তুমি কি বুঝবে? সে শিক্ষক যখন তার আত্মমর্যাদা হারায়, তখন তার কাছে জীবনের সকল অর্জন অর্থহীন মনে হয়। একটি অদ্ভুত দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজ স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কথাগগুলো বলতে থাকে অনুস্বর বাবু।

না, বুঝি না! তাই সারাজীবন এইভাবে ভৎসনা করতে থাকবে? মাথার চুল অর্ধেক গঙ্গায় গেছে আর অর্ধেক কাশফুলের চেয়ে সাদা হয়ে গেছে। স্মৃতিশক্তি নাকি একদম বিলীন হয়ে গেছে, তবুও সেই চল্লিশ বছর আগের স্মৃতি এখনো ঠিকই মাথায় রয়ে গেছে।

তা ঠিক বলেছ। কত কিছু ভুলে গেছি শুধু গুরু হিসাবে শিষ্যের কাছে চরম অপমান ভুলে থাকতে পারিনা। তার মূল্য আমাকে মনে মনে নিঃস্ব করে দেয়।

যাক ঢের হয়েছে, এখন খেয়ে দেয়ে স্কুলের দিকে রওনা দাও। ক্লাসের সময় হয়ে গেছে।

অতপর, সকল প্রস্তুতি সম্পূর্ণ করে স্কুলের দিকে রওনা হয় অনুস্বর বাবু। বাসার পাশেই স্কুল। হেটে গেলে পাঁচ -সাত মিনিট সময় লাগে। এইতো, গতবছরই যোগদান করেছে এই স্কুলে। সরকারি চাকরি, বছর বছর বদলি এই শেষ বয়সে এসে আর ভালো লাগেনা। দু বছর পরে রিটায়ার্ড। কোনমতে এই দুইটা বছর সসম্মানে পার হলেই যথেষ্ট। তারপর স্বামী-স্ত্রী বৃদ্ধ যুগল নিজ গ্রামে ফিরে গিয়ে নাতি নাতনিদের সাথে বাকি জীবন কাটানোর ইচ্ছা।

স্কুলে তিনি আইসিটি শিক্ষক। পেশা জীবনের শুরুতে এই বিষয়ের নাম ছিলো কম্পিউটার শিক্ষা। তাও আবার অনৈচ্ছিক বিষয়। সবাই পড়ত না। বিজ্ঞান বিভাগের কিছু শিক্ষার্থী ৪র্থ বিষয় হিসাবে পড়ত।

অনুস্বর বাবু যখন ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ডিগ্রিতে ভর্তি হয়েছে, তারাকান্দা গার্লসে তখন বিষয়টি চালু হয়। প্যাটার্ণ শিক্ষক না থাকায় তাকে ডেপুটেশন হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অল্প উপার্জনের চাকরি। তবে সপ্তাহে তিনদিন, শুধুমাত্র নবম আর দশম শ্রেণিতে ক্লাস। তাই না করেনি। মাস শেষে পনেরশ, ভালোই হাত খরচ চলে যাবে। এই ভেবে শুরু হয়েছিল, তারপর আর শেষ হয়নি। এভাবেই চলছে।

শিক্ষকের সার্থকতা শিক্ষার্থীদের সাথে মিশে থাকতে পারলে সর্বোত্তম। অনুস্বর মহাশয় এই কাজে পটু বটে। বন্ধুর মত ছাত্রছাত্রীদের সাথে জীবনটা কাটিয়ে গেল। যেমন ছাত্রদের সময়ে অসময়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তেমনি তাদের পাশেও পেয়েছেন।

মাধ্যমিকে একটা বিষয় খুবই কমন। উঠতি বয়সে এমন সব বিষয়ে তারা জানতে আগ্রহী, যা সমীচীন নয়। এ বিষয়গুলে অনুস্বর বাবু মহাশয় খুব ভালোভাবেই সামলাতে পারেন। কিন্তু গতকাল বিষয়টা আরো জটিল হয়ে উঠেছিল। তারা অনুস্বর মহাশয়ের জীবন থেকে এমন একটা ঘটনা জানতে চাইলো, যা হতে হবে অত্যান্ত নেক্কারজনক। এমন একটা ঘটনা যা তার বাস্তব জীবনে ঘটেছিলো অথচ সে সবসময় তা ভুলে থাকতে চাই, কিন্তু কখনোই পারেনা।

প্রথম প্রথম এমন কোনো ঘটনা তিনি খুজেই পেলেন না। পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে স্মৃতির অনেক পিছন থেকে একটি অদ্ভুত ঘটনা সনাক্ত করতে পারলেন।

তখন আমি সদ্য ডিগ্রিতে ভর্তি হয়েছি। তারাকান্দা গার্লসে কম্পিউটার পড়ানোর একটা অফার আসে। আমিও লুফে নিই। নবম ও দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের মেয়েদের অপশনাল সাবজেক্ট। চাপ কম, তাই না করিনি। সাথে পড়াশোনাও চলবে। গিয়ে দেখি, যা ভেবেছিলাম অবস্থা তার চেয়ে খারাপ। নামেই কম্পিউটার শিক্ষা। স্কুলে কোনো কম্পিউটার নেই। একটা মাত্র বোর্ড বই। কারো কোনো গাইড বইও নেই। নবম বা দশম শ্রেণিতে এ বিষয় কেউ নেইনি। শুধুমাত্র এসএসসি পরীক্ষার্থীরা বিষয়টা পড়ে। ফোন আর ইন্টারনেট বিহীন যুগে এমন বিষয়ে পাঠদান অত্যান্ত কষ্টদায়ক। শিক্ষার্থীতো দূরের কথা শিক্ষকরাও জানেনা কিভাবে পড়াতে হবে। আমি এসএসসি পরীক্ষার পর কয়েকদিন বরিশাল গেয়ে একটা কোর্স করেছিলাম। তাও শুধু কাগজে কলমে। সেই জ্ঞানের পন্ডিত। ক্লাসে মাত্র পাঁচটি মেয়ে। একজন কখনোই স্কুলে আসেনা, একজনের বিয়ে হয়ে গেছে, আর একজন কখনোই আমার সাথে কথা বলেনা। কেন বলেনা তাও জানিনা। হয়তো কোনো কারণ আছে, অন্যরা জানে, কিন্তু আমাকে বলেনা। নিজেরা কানাঘুষা করতে থাকে।

তিন জনের ক্লাস। দুইটা হাই বেঞ্চ পাশাপাশি দিয়ে একটা টেবিল বানিয়েছি। দুপাশে দুটো সিট বেঞ্চ। একটাতে আমি, আর অন্যটাতে তিন জন ছাত্রী যার দুইজন প্রেয়সী আর একজন পাথর। সব সময় দূরে দূরে বসে। প্রশ্ন করলে উত্তর দেয়না। কিছু বুঝলেও কথা নেই, না বুঝলেও কথা নেই। আমিও তেমন পাত্তা দিতাম না। যে দুজন সামনে আছে তাদের যন্ত্রণাই বাঁচি না, তাই নতুন করে আার একজনকে যুক্ত করতে চাইছি না।

হেডস্যার রিটায়ার্ড হয়েছেন। সহকারী হেড দায়িত্বে আছেন। কয়েকদিন তাকে বলেছি, স্যার মাঝখানে আর একটা হাইবেঞ্চ হলে টেবিলটা আরেকটু বড় হতো, পড়াতে সুবিধা হতো। তার সোজা উত্তর, কি দরকার বাপু বড় টেবিলের। এমনিতেই হেডস্যার রিটায়ার্ড, আমি চাইলেই তো ব্যয় করতে পারিনা। তাছাড়া সব ক্লাসেই বেঞ্চ শর্ট আছে। কোথা থেকে আনব।

স্যারকে বোঝাতে পারলাম না যে, উঠতি বয়সের মেয়েরা। সামনা সামনি বসি। সবসময় হাতে পায়ে ঠুসঠাস লাগতে থাকে। কিন্তু সাহস পেলাম না, শেষে আমারই বদনাম হয়ে যাবে। দুইটা বেঞ্চই যথেষ্ট। তিন ছাত্রীর ক্লাস। না! আসলে ক্লাস ঠিক না। স্টোর রুম। একপাশে পুরাতন বইয়ের পাহাড়, আর অন্যপাশে খাতাকাগজের টিলা। একমাত্র জানলার সামনে হাড়ি পাতিল, কাঠ-লাকড়ি আর আউল ফাউল তৈজসপত্রে ঠাঁসা। তার মধ্যেই চলে আমার রোমাঞ্চকর ক্লাস। 

অল্প বয়সী শিক্ষক, তার উপর অবিবাহিত। উপর ওয়ালার কৃপায় চেহারা, শরীর, ব্যবহার কোনটায় ত্রুটিবাচক নয়। নতুন স্যারের সুখ্যাতি কয়েকদিনের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ল। যারা স্কুলে আসতনা তারা নিয়মিত হয়ে গেল। আর যারা কম্পিউটার নেইনি তারা আফসোস করতে লাগলো। কেউ কেউ তো হুট করে ক্লাসে ঢুকে পড়তে লাগলো আর বলতে লাগলো, আমিও কম্পিউটার নিতে চাই। একজন বিবাহিত ছাত্রী ছিল, এখন সেও নিয়মিত হয়ে গেল। সামনের বেঞ্চে তিন জনের স্থান, পাঁচজনতো আর ধরে না। স্যার বলেছেন, আপাতত দুইজন আপনার বেঞ্চেই বসুক। এবছর বাজেটে আর একজোড়া বেঞ্চ বাড়িয়ে দিব।

তাহলে আমার পশে কে বসবে। এটা নিয়ে বিরোধ আর কাটাকাটি মেয়েদের মধ্যে লেগেই থাকে। প্রথমে বাংলা ক্লাস, শেষ হলে মাঠ পার হয়ে কম্পিউটার ক্লাস। ছুটাছুটি লেগেই থাকত। কে আগে এসে আমার পাশের সিটের দখল নিবে।

এভাবেই কয়েক মাস পার হয়ে গেল। এসএসসি পরীক্ষার্থীদের শেষ ক্লাসের দিন। যুথি সেদিনই প্রথম আমার সাথে কথা বলে। আমার মনটাও সেদিন খুব উৎফুল্ল ছিল। পাঁচজন ছাত্রীর তিন জনের আকার ইঙ্গিত, আচার আচরণে বুঝতাম তারা আমাকে ফিল করত। আমিও সেই বয়সে কাউকে না কাউকে খুজছিলাম। ক্লাস শুরু হওয়ার আগে দুজন আবেগ ধরে রাখতে না পরে গোপনে তাদের বাসনার কথা জানিয়ে দিয়েছে। একজন বিবাহিত, তার নজর থেকেও বাঁচতে পারিনি। স্যার আপনার আচার আচরণে আমি মুগ্ধ। আপনার মত পুরুষ জীবন সঙ্গী হিসাবে পাওয়া ভাগ্যের ব্যপার। আমি যদি বিবাহিত না হতাম, অবশ্যই আপনাকেই পছন্দ করতাম। আমার বান্ধবীরা সবাই আপনাকে পছন্দ করে। কয়েকজনের মা বাবও রাজি। আপনি বললে তারা আপনার সাথে এ ব্যপারে কথা বলবে।

আসলে তোমারা যা ভাবছ তেমনটা না। আমি তোমাদেরকে শুধু ছাত্রী হিসাবে দেখিনি। নিজের বন্ধুর মত চিন্তা করেছি। জাস্ট এতটুকুই।

কিন্তু শেষ ক্লাসে যুথির কথায় আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম। তার কথাগুলো যদিও আমি তৎক্ষনাৎ ধরতে পারলাম না। কিন্তু তার রাগান্বিত মুখমন্ডল আর ফুপিয়ে ফুপিয়ে কথা বলার ধরণ আমাকে অবাক করেছিল।

স্যার, একটা প্রশ্ন করি?

হ্যা কর।

স্যার মনে করেন, কেউ আপনাকে ভর বাজারে বিনা অপরাধে চরমভাবে অপমান করল। তখন আপনি কি করবেন?

আমাকে কোনো উত্তর দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে নিজেই আবার বলতে শুরু করল।

আমারতো মনে চাইছিল চুতা দিয়ে পিটাতে পিটাতে তাকে দোকান থেকে বের করে রাস্তায় নিয়ে ফেলি।জুতার বাড়ি তার প্রাপ্য, হয়তো সেদিন, না হয় আজ, না হয় অন্য কোনো দিন।

কথাগুলো বলতে বলতে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল মেয়েটা। রাগে ফুলতে ফুলতে উঠে দাড়লো। বইখাতা ছুড়ে ফেলে দিল পুরাতন বইয়ের গাদার উপর। তারপর কাঁদতে কাঁদতে বের হয়ে গেল।

আমি কোনো কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না। সবাই চলে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম। হয়তো কয়েক ঘন্টা। এক পর্যায়ে খেয়াল করলাম জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ওরা ফিসফিস করছে।

এটা তোর বলা ঠিক হয়নি। সে আমাদের শিক্ষক, গুরু। এইভাবে তাকে অপমান করাটা ঠিক হয়নি।

স্যারের কাছে ক্ষমা চেয়ে নে।

অবশ্যই ঠিক হয়েছে। তারও জানা উচিত, ভর বাজারে বিনা অপরাধে একটা মেয়েকে অপমান করলে তার অবস্থাটা কেমন হয়। আমি কেন তার কাছে ক্ষমা চাইব। বরং তারই উচিত আমার কাছে ক্ষমা চাওয়া।

দূর থেকে অস্পষ্ট হলেও সবকিছুই আমি বুঝতে পেরেছিলাম। কথাগুলো যে সে আমাকে বলেছে, তা আর আমার বুঝতে বাকি থাকেনা। শুধু কেন বলেছে তাই বুঝতে পারলাম না।

+চলমান)

Public Voice

শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬


অসম প্রণয় (গৌড়িকা)

প্রকাশের তারিখ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

একজন শিক্ষকের বেদনা তুমি কি বুঝবে? সে শিক্ষক যখন তার আত্মমর্যাদা হারায়, তখন তার কাছে জীবনের সকল অর্জন অর্থহীন মনে হয়। একটি অদ্ভুত দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজ স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কথাগগুলো বলতে থাকে অনুস্বর বাবু।


না, বুঝি না! তাই সারাজীবন এইভাবে ভৎসনা করতে থাকবে? মাথার চুল অর্ধেক গঙ্গায় গেছে আর অর্ধেক কাশফুলের চেয়ে সাদা হয়ে গেছে। স্মৃতিশক্তি নাকি একদম বিলীন হয়ে গেছে, তবুও সেই চল্লিশ বছর আগের স্মৃতি এখনো ঠিকই মাথায় রয়ে গেছে।


তা ঠিক বলেছ। কত কিছু ভুলে গেছি শুধু গুরু হিসাবে শিষ্যের কাছে চরম অপমান ভুলে থাকতে পারিনা। তার মূল্য আমাকে মনে মনে নিঃস্ব করে দেয়।


যাক ঢের হয়েছে, এখন খেয়ে দেয়ে স্কুলের দিকে রওনা দাও। ক্লাসের সময় হয়ে গেছে।


অতপর, সকল প্রস্তুতি সম্পূর্ণ করে স্কুলের দিকে রওনা হয় অনুস্বর বাবু। বাসার পাশেই স্কুল। হেটে গেলে পাঁচ -সাত মিনিট সময় লাগে। এইতো, গতবছরই যোগদান করেছে এই স্কুলে। সরকারি চাকরি, বছর বছর বদলি এই শেষ বয়সে এসে আর ভালো লাগেনা। দু বছর পরে রিটায়ার্ড। কোনমতে এই দুইটা বছর সসম্মানে পার হলেই যথেষ্ট। তারপর স্বামী-স্ত্রী বৃদ্ধ যুগল নিজ গ্রামে ফিরে গিয়ে নাতি নাতনিদের সাথে বাকি জীবন কাটানোর ইচ্ছা।


স্কুলে তিনি আইসিটি শিক্ষক। পেশা জীবনের শুরুতে এই বিষয়ের নাম ছিলো কম্পিউটার শিক্ষা। তাও আবার অনৈচ্ছিক বিষয়। সবাই পড়ত না। বিজ্ঞান বিভাগের কিছু শিক্ষার্থী ৪র্থ বিষয় হিসাবে পড়ত।


অনুস্বর বাবু যখন ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ডিগ্রিতে ভর্তি হয়েছে, তারাকান্দা গার্লসে তখন বিষয়টি চালু হয়। প্যাটার্ণ শিক্ষক না থাকায় তাকে ডেপুটেশন হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অল্প উপার্জনের চাকরি। তবে সপ্তাহে তিনদিন, শুধুমাত্র নবম আর দশম শ্রেণিতে ক্লাস। তাই না করেনি। মাস শেষে পনেরশ, ভালোই হাত খরচ চলে যাবে। এই ভেবে শুরু হয়েছিল, তারপর আর শেষ হয়নি। এভাবেই চলছে।


শিক্ষকের সার্থকতা শিক্ষার্থীদের সাথে মিশে থাকতে পারলে সর্বোত্তম। অনুস্বর মহাশয় এই কাজে পটু বটে। বন্ধুর মত ছাত্রছাত্রীদের সাথে জীবনটা কাটিয়ে গেল। যেমন ছাত্রদের সময়ে অসময়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তেমনি তাদের পাশেও পেয়েছেন।


মাধ্যমিকে একটা বিষয় খুবই কমন। উঠতি বয়সে এমন সব বিষয়ে তারা জানতে আগ্রহী, যা সমীচীন নয়। এ বিষয়গুলে অনুস্বর বাবু মহাশয় খুব ভালোভাবেই সামলাতে পারেন। কিন্তু গতকাল বিষয়টা আরো জটিল হয়ে উঠেছিল। তারা অনুস্বর মহাশয়ের জীবন থেকে এমন একটা ঘটনা জানতে চাইলো, যা হতে হবে অত্যান্ত নেক্কারজনক। এমন একটা ঘটনা যা তার বাস্তব জীবনে ঘটেছিলো অথচ সে সবসময় তা ভুলে থাকতে চাই, কিন্তু কখনোই পারেনা।


প্রথম প্রথম এমন কোনো ঘটনা তিনি খুজেই পেলেন না। পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে স্মৃতির অনেক পিছন থেকে একটি অদ্ভুত ঘটনা সনাক্ত করতে পারলেন।


তখন আমি সদ্য ডিগ্রিতে ভর্তি হয়েছি। তারাকান্দা গার্লসে কম্পিউটার পড়ানোর একটা অফার আসে। আমিও লুফে নিই। নবম ও দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের মেয়েদের অপশনাল সাবজেক্ট। চাপ কম, তাই না করিনি। সাথে পড়াশোনাও চলবে। গিয়ে দেখি, যা ভেবেছিলাম অবস্থা তার চেয়ে খারাপ। নামেই কম্পিউটার শিক্ষা। স্কুলে কোনো কম্পিউটার নেই। একটা মাত্র বোর্ড বই। কারো কোনো গাইড বইও নেই। নবম বা দশম শ্রেণিতে এ বিষয় কেউ নেইনি। শুধুমাত্র এসএসসি পরীক্ষার্থীরা বিষয়টা পড়ে। ফোন আর ইন্টারনেট বিহীন যুগে এমন বিষয়ে পাঠদান অত্যান্ত কষ্টদায়ক। শিক্ষার্থীতো দূরের কথা শিক্ষকরাও জানেনা কিভাবে পড়াতে হবে। আমি এসএসসি পরীক্ষার পর কয়েকদিন বরিশাল গেয়ে একটা কোর্স করেছিলাম। তাও শুধু কাগজে কলমে। সেই জ্ঞানের পন্ডিত। ক্লাসে মাত্র পাঁচটি মেয়ে। একজন কখনোই স্কুলে আসেনা, একজনের বিয়ে হয়ে গেছে, আর একজন কখনোই আমার সাথে কথা বলেনা। কেন বলেনা তাও জানিনা। হয়তো কোনো কারণ আছে, অন্যরা জানে, কিন্তু আমাকে বলেনা। নিজেরা কানাঘুষা করতে থাকে।


তিন জনের ক্লাস। দুইটা হাই বেঞ্চ পাশাপাশি দিয়ে একটা টেবিল বানিয়েছি। দুপাশে দুটো সিট বেঞ্চ। একটাতে আমি, আর অন্যটাতে তিন জন ছাত্রী যার দুইজন প্রেয়সী আর একজন পাথর। সব সময় দূরে দূরে বসে। প্রশ্ন করলে উত্তর দেয়না। কিছু বুঝলেও কথা নেই, না বুঝলেও কথা নেই। আমিও তেমন পাত্তা দিতাম না। যে দুজন সামনে আছে তাদের যন্ত্রণাই বাঁচি না, তাই নতুন করে আার একজনকে যুক্ত করতে চাইছি না।


হেডস্যার রিটায়ার্ড হয়েছেন। সহকারী হেড দায়িত্বে আছেন। কয়েকদিন তাকে বলেছি, স্যার মাঝখানে আর একটা হাইবেঞ্চ হলে টেবিলটা আরেকটু বড় হতো, পড়াতে সুবিধা হতো। তার সোজা উত্তর, কি দরকার বাপু বড় টেবিলের। এমনিতেই হেডস্যার রিটায়ার্ড, আমি চাইলেই তো ব্যয় করতে পারিনা। তাছাড়া সব ক্লাসেই বেঞ্চ শর্ট আছে। কোথা থেকে আনব।


স্যারকে বোঝাতে পারলাম না যে, উঠতি বয়সের মেয়েরা। সামনা সামনি বসি। সবসময় হাতে পায়ে ঠুসঠাস লাগতে থাকে। কিন্তু সাহস পেলাম না, শেষে আমারই বদনাম হয়ে যাবে। দুইটা বেঞ্চই যথেষ্ট। তিন ছাত্রীর ক্লাস। না! আসলে ক্লাস ঠিক না। স্টোর রুম। একপাশে পুরাতন বইয়ের পাহাড়, আর অন্যপাশে খাতাকাগজের টিলা। একমাত্র জানলার সামনে হাড়ি পাতিল, কাঠ-লাকড়ি আর আউল ফাউল তৈজসপত্রে ঠাঁসা। তার মধ্যেই চলে আমার রোমাঞ্চকর ক্লাস। 


অল্প বয়সী শিক্ষক, তার উপর অবিবাহিত। উপর ওয়ালার কৃপায় চেহারা, শরীর, ব্যবহার কোনটায় ত্রুটিবাচক নয়। নতুন স্যারের সুখ্যাতি কয়েকদিনের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ল। যারা স্কুলে আসতনা তারা নিয়মিত হয়ে গেল। আর যারা কম্পিউটার নেইনি তারা আফসোস করতে লাগলো। কেউ কেউ তো হুট করে ক্লাসে ঢুকে পড়তে লাগলো আর বলতে লাগলো, আমিও কম্পিউটার নিতে চাই। একজন বিবাহিত ছাত্রী ছিল, এখন সেও নিয়মিত হয়ে গেল। সামনের বেঞ্চে তিন জনের স্থান, পাঁচজনতো আর ধরে না। স্যার বলেছেন, আপাতত দুইজন আপনার বেঞ্চেই বসুক। এবছর বাজেটে আর একজোড়া বেঞ্চ বাড়িয়ে দিব।


তাহলে আমার পশে কে বসবে। এটা নিয়ে বিরোধ আর কাটাকাটি মেয়েদের মধ্যে লেগেই থাকে। প্রথমে বাংলা ক্লাস, শেষ হলে মাঠ পার হয়ে কম্পিউটার ক্লাস। ছুটাছুটি লেগেই থাকত। কে আগে এসে আমার পাশের সিটের দখল নিবে।


এভাবেই কয়েক মাস পার হয়ে গেল। এসএসসি পরীক্ষার্থীদের শেষ ক্লাসের দিন। যুথি সেদিনই প্রথম আমার সাথে কথা বলে। আমার মনটাও সেদিন খুব উৎফুল্ল ছিল। পাঁচজন ছাত্রীর তিন জনের আকার ইঙ্গিত, আচার আচরণে বুঝতাম তারা আমাকে ফিল করত। আমিও সেই বয়সে কাউকে না কাউকে খুজছিলাম। ক্লাস শুরু হওয়ার আগে দুজন আবেগ ধরে রাখতে না পরে গোপনে তাদের বাসনার কথা জানিয়ে দিয়েছে। একজন বিবাহিত, তার নজর থেকেও বাঁচতে পারিনি। স্যার আপনার আচার আচরণে আমি মুগ্ধ। আপনার মত পুরুষ জীবন সঙ্গী হিসাবে পাওয়া ভাগ্যের ব্যপার। আমি যদি বিবাহিত না হতাম, অবশ্যই আপনাকেই পছন্দ করতাম। আমার বান্ধবীরা সবাই আপনাকে পছন্দ করে। কয়েকজনের মা বাবও রাজি। আপনি বললে তারা আপনার সাথে এ ব্যপারে কথা বলবে।


আসলে তোমারা যা ভাবছ তেমনটা না। আমি তোমাদেরকে শুধু ছাত্রী হিসাবে দেখিনি। নিজের বন্ধুর মত চিন্তা করেছি। জাস্ট এতটুকুই।


কিন্তু শেষ ক্লাসে যুথির কথায় আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম। তার কথাগুলো যদিও আমি তৎক্ষনাৎ ধরতে পারলাম না। কিন্তু তার রাগান্বিত মুখমন্ডল আর ফুপিয়ে ফুপিয়ে কথা বলার ধরণ আমাকে অবাক করেছিল।


স্যার, একটা প্রশ্ন করি?

হ্যা কর।

স্যার মনে করেন, কেউ আপনাকে ভর বাজারে বিনা অপরাধে চরমভাবে অপমান করল। তখন আপনি কি করবেন?

আমাকে কোনো উত্তর দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে নিজেই আবার বলতে শুরু করল।

আমারতো মনে চাইছিল চুতা দিয়ে পিটাতে পিটাতে তাকে দোকান থেকে বের করে রাস্তায় নিয়ে ফেলি।জুতার বাড়ি তার প্রাপ্য, হয়তো সেদিন, না হয় আজ, না হয় অন্য কোনো দিন।


কথাগুলো বলতে বলতে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল মেয়েটা। রাগে ফুলতে ফুলতে উঠে দাড়লো। বইখাতা ছুড়ে ফেলে দিল পুরাতন বইয়ের গাদার উপর। তারপর কাঁদতে কাঁদতে বের হয়ে গেল।


আমি কোনো কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না। সবাই চলে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম। হয়তো কয়েক ঘন্টা। এক পর্যায়ে খেয়াল করলাম জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ওরা ফিসফিস করছে।


এটা তোর বলা ঠিক হয়নি। সে আমাদের শিক্ষক, গুরু। এইভাবে তাকে অপমান করাটা ঠিক হয়নি।

স্যারের কাছে ক্ষমা চেয়ে নে।


অবশ্যই ঠিক হয়েছে। তারও জানা উচিত, ভর বাজারে বিনা অপরাধে একটা মেয়েকে অপমান করলে তার অবস্থাটা কেমন হয়। আমি কেন তার কাছে ক্ষমা চাইব। বরং তারই উচিত আমার কাছে ক্ষমা চাওয়া।


দূর থেকে অস্পষ্ট হলেও সবকিছুই আমি বুঝতে পেরেছিলাম। কথাগুলো যে সে আমাকে বলেছে, তা আর আমার বুঝতে বাকি থাকেনা। শুধু কেন বলেছে তাই বুঝতে পারলাম না।

+চলমান)


Public Voice

সম্পাদক: মোঃ বাদশাহ আলমগীর
প্রকাশক: অনন্যা অনসূয়া দিবা

কপিরাইট © ২০২৬ Public Voice । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত