শিরোনাম
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের পাশে এমপি, ঈশ্বরগঞ্জ থানায় পিকআপ বেরোবিতে শুরু হলো ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ এক্সিলেন্সের যাত্রা সুন্দরগঞ্জে জামাই শশুর বাড়িতে এসে অবরুদ্ধ: রফাদফায় বিএনপি নেতাদের পকেটে ঢুকলো পঞ্চাশ হাজার টাকা বিজ্ঞানচর্চায় শিক্ষার্থীদের আরও মনোযোগী হওয়ার আহ্বান নোবিপ্রবি উপাচার্যের লালমনিরহাট ব্যাটালিয়ন ১৫ বিজিবি’র বিশেষ অভিযানে পিস্তল গুলি এবং ক্রিস্টাল মেথ আইস উদ্ধার নেপিয়ার ঘাস চাষে বদলে যাচ্ছে ধুনটের কৃষি অর্থনীতি ময়মনসিংহে একই পরিবারের চারজনসহ মোট সাতজন সিএনজি বাস মুখোমুখিতে নিহত হাসিনাকে ফেরাতে ৭ বেরোবি শিক্ষকের তৎপরতা, ২ মাসেও নেই তদন্তের অগ্রগতি জাতীয়করণকৃত কলেজে অধ্যক্ষের যোগদান নিয়ে প্রশ্ন, পূর্বধলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা নোবিপ্রবির টিএইচএম বিভাগের নতুন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান রিনু ফাতেমা
ছোট গল্প

রগজিবা অন্যপাঠ

হারিয়া গিয়াও যে বিজয় লাভ করিয়া লয় তাহাকে বাজিগর বলিয়া সম্মোধন করা হইয়া থাকে। তবে বিজয় লাভ করিয়াও যে পরাজিত হইয়া যায়, তাহাকে কি বলিয়া সম্মোধন করিতে হয় থাকে তাহা আমার আবগত নহে। জীবন সংগ্রামের বন্ধুর সংকীর্ণ পথ পাড়ি দিইতে গিয়া এহেন কিয়ৎ ঘটনার সাক্ষী হইয়াছি, যেস্থানে ধারণা হইয়াছে বাস্তবিক বিজয় লাভ করিয়াও চরমভাবে পরাজিত হইয়া  গিয়াছি। অতঃপর যখন হৃদয়ের গভীর হইতে তাহার স্মৃতিচারণ করিয়া অনুতপ্ত হইয়াছি, তখন স্বীয় কৃতকর্মের কারণে নিজের বিচারিক দরবারে নিজেকে সময়ের সর্বাধিক ব্যার্থ, পরাজিত, নির্বোধ আর চরম শাস্তিযোগ্য অপরাধী ছাড়া কিছুই মান্য করিতে পারি নাই। ক্ষণে ক্ষণে মনে হইয়াছে নিজেই নিজের সফলতার স্তম্ভকে ভাঙ্গিয়া ব্যার্থতার বীজ বপন করিয়াছি। এহেন পরিস্থিতিতে জয়ফল হারের অধিক নিকৃষ্টতা অর্জন করিয়াছে। বিধায় বাজিগরকে শেষ হইতে পূনরায়  সজ্জিত করিয়া, জয়লাভ করিয়াও পরাজিত হইবার এই গল্পের নাম দিয়াছি রগজিবা।

পান্ডিত্যের গুরুদায়িত্ব আপন মস্তিষ্কভার করিয়া বহুকালে বহুবিধ স্থানে অবস্থান করিবার দৈবত কারণে নানাবিধ অভিজ্ঞতার সঞ্চার করিত হইয়াছে। তাহার কিয়দংশ কর্মব্যস্ত জীবনের অতিভারে স্মৃতির তলানীতে গিয়া পৌছায়াছে। আর কিয়দংশ কস্মিনকালেও স্মরণে রাখিবার প্রয়োজনীয়তা বোধ করি নাই।

তেমনি নিভৃতে নিষ্পন্ন একটি আকস্মিক ঘটনার স্মৃতি অদ্য হঠাৎ হৃদয়ে উদিত হইলো। যখন দক্ষিণে মাধ্যমিকে শিক্ষাকতা করিতাম, তখন বৈদ্যনাথ বলিয়া একজন ষাটোর্ধ পন্ডিত ছিলেন। ধর্মশাস্ত্র শিক্ষা দিতেন ভদ্রলোক। তাহার লকলকে অক্ষিদ্বয় অদ্যবদি আমার নয়নে স্পষ্ট ভাসিয়া উঠে। শুভ্র দেহের শুভ্র নির্মল নিষ্পাপ হৃদয়েের মৃত্তিকা মানব। কাহারো সহিত বিবাদ নায়, অতি উৎসাহিত সম্পর্কও নাই। চুপচাপ আসিতেন। নীরবে গৃহের কোণে আটঘাট করিয়া বসিতেন। আবার নীরবে ফিরিয়া যাইতেন।

তিনি যতটা না ভদ্রলোক ছিলেন, তাহার অধিক দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন যাপন করিতেন। তাহার একপাটি ধূতি-পাঞ্জাবীর অসংখ্য সেলাইয়ের উপর তাহার চরম দারিদ্র্যতা সুস্পষ্ট ফুটিয়া উঠিত। সেকালে প্রায়শই টিফিনকালে সকলে বসিয়া মধ্যান্হ ভোজন করিতাম। তবে তাহাকে দেখিতাম একাকী অন্যকোনো স্থানে বসিয়া ভোজন করিতে। তাহার কারণ অন্যদের অবগত হইলেও আমার বোধগম্য ছিলনা।

একদা নিরঞ্জন মশাই আমাকে উসকানি দিয়া তাহার টিফিন বাক্সটা খুলিয়া দেখিতে বলিলেন। আমি যতটা না উৎসাহ লইয়া তাহার সিপিটি উন্মুক্ত করিলাম, তাহা হইতে অধিক লজ্জিত হইয়া ফিরিয়া আসিলাম। চৈত্রে দাবদাহ শুধু প্রকৃতিই উদবাস্তু হয়না। তাহার কালছায়া গৃহের পাতিলেও আসিয়া পড়ে। তখন লজ্জা নিবারনের মহৎ পন্থা হইল গোপনীয়তা রক্ষা করিয়া চলা।

যেহেতু আমি তাহার বা তাহার পারিবারিক আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে অনভিজ্ঞ ছিলাম, সেহেতু সঠিক দিকনির্দেশনা দানেও ব্যর্থ চিলাম। তথাপিও তাহাকে কাভিকাভি ভৎসনা করিয়া বলিতাম “এইরূপ অর্থ সম্পদ সঞ্চয় করিয়া কি হইবে, তিনকাল কাটিয়া গিয়াছে আর এককাল শ্মশানে গিয়া ঠেকিয়াছে। কতদিন-ই-বা বাঁচিয়া রহিবেন। ভগবানের দরবারে কোনো অভাব নাই। কিছুই লইয়া যাইতে পারিবেন না। অন্তঃপুরে কয়েকটা জমা করিলে দোষ কি?”

আমার যুক্তি কতটা যৌক্তিক ছিলো তাহা আমার অবগত ছিলোনা। তবে একবার ভর মৌসুমে তাহাকে সপ্তাহব্যপি ইলিশের ভোজ করিতে দেখিয়া সকালের চক্ষু চড়কগাছ হইবার উপক্রম হইয়াছিলো । সন্দীপ বাবু আমাকে অভিনন্দন জানায়া বলিলেন, “আপনার কতৃত্ব মহাশয়। তাহার টিফিন বাটি হইতে প্রতিদিন ইলিশের নানান পদ বাহির হইতে আরম্ভ করিয়াছে।” আমিও লক্ষ্য কিরিলাম আস্ত ইলিশটা সে সপ্তাহ ব্যপি সাবাড় করিয়া দিল। একদিন মস্তক, একদিন পেটি, এভাবে পরপর ল্যাজা অবদি।

একদিন আমি তাহাকে বলিলাম, “উত্তম আহারের মধ্যেও আনন্দ বিদ্যমান, বুজিয়াছেন মহাশয়। ” তিনি কিয়ৎক্ষণ আমাদিগকে অপলক চাহিয়া রহিলেন। অতঃপর বলিলেন, “উত্তম আহার যে কতটা আনন্দময় তাহা আমার চেয়ে উত্তম আর কে উপলব্ধি করিতে পারে।”

অতঃপর লক্ষ্য করিলাম তিনি সযতনে অর্ধেকাংশ পেটির মাছ আবার টিফিনবাক্সবন্ধি করিয়া নিয়াছেন। আমি অতি উৎসাহিত হইয়া তাহা ছিনাইয়া লইয়া নিজ হস্তে সমাপ্ত করিলাম। তৎক্ষনাৎ আমি তাহার দিকে তাকাইয়া বিস্মিত হইলাম। এত বৎসর আমি তাহাকে কখোনও রাগান্বিত হইতে দেখিনাই। মুহুর্তে তিনি অগ্নিমূর্তি ধারণ করিলেন। আবার তৎক্ষনাৎ শান্ত হইয়া গেলেন। বিড়বিড় করিয়া বলিলেন, “আপনার ইচ্ছা হইলে আগেই বলিতেন, আমার অংশ আপনাকে দিতে পারিতাম।”

সেদিন আমি কিছুই বুঝিয়া উঠিতে পারি নাই। মনে মনে তাহার আচরণে ক্ষুব্ধ হইয়াছিলাম। তারপর অনেকদিন কাটিয়া যায়। আমিও ঐ পাঠশালা ছাড়িয়া অন্যত্র চলিয়া যাইতেছিলাম। কদিন যাবৎ বৈদ্যনাথ বাবুর উপস্থিতি ছিলোনা। তাই ভাবিলাম তাহার গৃহে উপস্থিত হইয়া তাহার নিকট হইতে বিদায় লইব।

উপস্থিত হইয়া জানিতে পারিলাম, তাহার স্ত্রী গত হইয়াছেন কয়েকদিন হইল। বহুদিন ধরিয়া দুরারোগ্য ব্যমো তাহার শরীরে বসবাস করিতেছিলো। দিনকূলে স্ত্রী ব্যতিত তাহার আর কেহ ছিলোনা। আমাকে পাইয়া আর স্থীর থাকিতে পরিলেন না। অশ্রুসিক্ত কিয়ৎক্ষণ আমাদিগকে চাহিয়া রহিলেন। তাহার কণ্ঠ হইতে কোনো ভাষা বাহির হইল না। তথাপি তাহার হৃদয় বুঝিতে চেষ্টা করিলাম। অনুভূত হইলো, তাহার নিকট আমি কতবড় অপরাধী হইয়া আছি। তখন নিজের অপরিপক্কতার দরুন কৃতকর্মের স্মরণ করিয়া নিজেকে দোষারোপ করিতে থাকি।

এরপর কত দিবস, কাল, বৎসর কাটিয়া গিয়াছে। পন্ডিত মশায় হয়তো এতকালে পরবাসী হইয়াছেন। তাহার ঘটনা প্রায়ই ভুলিয়া গিয়াছিলাম। তথাপি ইলিশ মাছের পেটি দেখিলে তাহাকে মনে পড়িয়া যায়। একজন মানুষ্য, যে শুধুমাত্র স্বয়ং দারিদ্র্যের দারুণ সৃষ্ট লজ্জা নিবারনের নিমিত্তে মাত্র একটি মৎস্যকে খন্ডাকারে প্রত্যাহ আহার হিসাবে নিয়া আসিতেন। হয়তো তাহার গৃহে এমন কেউ আছেন যিনি স্বযত্নে তাহা প্রস্তুত করিয়া রাখিতেন। তথাপি ইচ্ছা থাকিলেও তা আহার করিবার সমর্থ তাহার ছিলোনা। আমার ক্ষেত্রে এহেন পরিস্থিতি উদয় হইলে কেমন করিয়া সেই পেটি আমার জিহ্বা অতিক্রম করিয়া অন্ত্রে প্রবেশ করিত তাহা ভাবিয়া আমার শরীর সংকুচিত হইয়া উঠে।

১৭/৮/২০২৬

ছোট গল্প থেকে আরও পড়ুন
কমেন্ট

এই পোস্টে মন্তব্য বন্ধ আছে।