একুশ শতকের একদম প্রথম দিকের কথা, গ্রামাঞ্চলে এক ধরনের নতুন যানবাহনের প্রচলন শুরু হয়েছিল। একদম দেশীয় ইঞ্জিনিয়ারিং! বিভিন্ন অঞ্চলে তা আবার বিভিন্ন নামে প্রচলিত ছিল। কোথাও নসিমন, কোথাও করিমন, কোথাও ভটভটি, আবার কোথাও হিউম্যান হলার নামেও পরিচিত ছিল। অল্প খরচে দ্রুত যাতায়াতের জন্য যথেষ্ট উপকারী বাহন। তৈরি মেরামতও সহজ। গ্রাম বাংলার সাধারণ মিস্ত্রি/মেকানিকরা সেলো ইঞ্জিনের সাথে অল্পকিছু মোটর পার্টস আর কাটের বডি দিয়ে সহজেই তৈরি করে ফেলতে পারত।
গাড়িটা যেমন গড়গড় করে রাস্তায় দাপিয়ে বেড়াত, তেমন ফারাক বোঝাও টানতে পারত। শুধু যাত্রীই নয়, মালামাল, ইট, কাঠ, পাথর পারাপারে তার জব্বর খ্যাতি ছিল। কখনো কখনো গরু, ছাগল, মহিষও পারাপার হয়ে যেত সহজেই। আজকের অটোরিকশা বা প্রাইভেট কার আসার আগে, তার কদরই ছিলো আলাদা। তা শুধু করিমনই ছিল না। ছিল কালের সাক্ষী, গ্রাম বাংলার যুগপৎ আন্দোলনের দলিল।
এই দাপটদার গাড়ি চালানোর জন্য একজনের দাপটদার গাড়োয়ানও দরকার ছিল। যার-তার হাতে এই ধরনের গাড়ি চালানোর ক্ষমতা ছিলনা। বিভিন্ন এলাকায় এর জন্য দু’একজন জবরদার ড্রাইভার থাকতই। তেমনি একজন ড্রাইভার ছিল ফিরোজ। কুলারহাটের ফিরোজ বক্স। নিমতলী থেকে কুলারহাট, কুলারহাট থেকে পদ্মাপাড়, বসন্তপুর বা মধুখালি, যেখানেই যেতে চাও। ফিরোজ বক্সের করিমন ছাড়া উপায় নাই। বিয়ে-বাড়ি, যাত্রা-বাড়ি, পারাপার কিংবা মালামাল, তার জুড়ি মেলা ভার। যেমন তার কালো পাহাড়ের মত চেহারা, তেমন হাতির মত শক্তি। একশো কেজির চালের বস্তা সে এক ধাক্কায় গাড়ির উপরে উঠিয়ে দিতে পারত। বড় বড় গাছের গুড়িগুলো খুব সহজেই কাঁধে করে গাড়িতে তুলতে পারত। যেমন শক্তি, তেমন উদ্যমে ভরা ছিল সে।
কিন্তু মানুষটা যেমন দেখতে, তার অন্তরটা তেমন ছিলোনা। খুব ভদ্র আর অমাইক ছিলো তার ব্যবহার। গ্রামে সবার প্রিয় পাত্র ছিলো সে। দিনকূলে বাবা ছাড়া কেউই ছিল না তার। নিজের জায়গা জমি ছিলোনা। কুলারহাটে চাতালের পাশে বাবাকে নিয়ে ছোট্ট একটা ঝুপড়ি ঘরে ভাড়া থাকত। বয়স বিশ পার হয়নি হয়তো, তবেও কাজের চাপে কিছুটা বয়স্ক দেখাত। বিবাহিত ছিলোনা। অনেকদিন ধরে বাপে তার বিয়ের চেষ্টা করছিলো। মেয়েও ঠিক করা আছে। কিন্তু ছেলে রাজি হয়না। আগে জমি কিনে বাড়ি করবে, তারপর বিয়ে। সৃষ্টিকর্তাও সহায় ছিল। তার করুনায় ছোট্ট একটা জমিও পাশের গ্রামে কিনে রেখেছে। সামনের আশ্বিন-কার্তিক মাসে বাড়ির কাজে হাত দিবে। নিজের জন্য না হয়, বাবার জন্য হলেও ছনের একটা ঘর হবে। জায়গাটা একটু নিচু ছিল। বাপ-বেটা দু’জনে মিলে পাশের ক্ষেতের মাটি তুলে বেশ উচু করেছে। “এখন বর্ষাকাল। চারিদিকে পদ্মার পানি। শীতকাল আসলেই ঘরের কাজে হাত দেব বাজান।”
“তা দিস, সমস্যা নেই। সাবধানে গাড়ি চালাস। বর্ষায় রাস্তার অবস্থা ভালোনা। কুলার ব্রিজ থেকে নামার সময় প্রায়ই গাড়ি রাস্তা থেকে পড়ে যায়। সাবধানে থাকিস বাপ। নোমানের পোলাডা গড়ি এক্সিডেন্ট করে জেলে গেছে। ঐ পাড়ার শহিদুল্লার পোলারে জনগনে পিটায়া মারছে। তুই একটু সাবধানে চালাস বাবা।”
“তুমি অত চিন্তা করোনা। অমি পাগলের মতো গাড়ি চালাই না।”
এভাবেই সে বাবার কথামত দেখেশুনে গাড়ি চালানোর চেষ্টা করতো। কিন্তু একদিন ভাগ্য তার অনুকূলে রইল না। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির কারণে রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে ছিলো। কাঠবোঝায় গাড়ি নিয়ে কোলার ব্রিজ থেকে নামার সময় গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এক বৃদ্ধের উপর চালিয়ে দেয়। ভয়ে তার শরীরের লোম শিউরে উঠে। দ্রুত আর বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণে প্রায়ই সে ছোটখাটো দূর্ঘটনার শিকার হতো। কিন্তু আজ একটু বেশি হয়ে গেছে। সন্ধ্যা রাতের কারনে লোকটাকে স্পষ্ট দেখতে পারেনি। তার মৃদু আর্তনাদ ফিরোজের হৃদয়াবেগ স্পর্শ করে যায়। মনে হলো তার বাবাই যেন তাকে স্মরণ করে আর্তনাদ করছে। একবার ভাবলো গাড়ি দাড় করিয়ে দেখবে কি অবস্থা। বৃদ্ধের আর্তনাদ তার হৃদয়টাকে পিশে মারছিল। কিন্তু তৎক্ষণে বাজারের লোকজন জড় হয়ে যাচ্ছিল। পেছন থেকে ধর ধর আওয়াজ আসছে।
তাড়াতাড়ি করে সখান থেকে পালিয়ে বসন্তপুর স্টেশনের কাছে স মিলে কাঠ নামিয়ে নিমতলীর মোড়ের দিকে চলে যায় সে। নিমতলী বাজারে রওশন মিঞার সাথে তার দেখা হয়। রওশন মিঞার মেয়ে নওরিনের সাথে তার বিবাহ ঠিক হয়ে আছে। হবু শশুরকে সবকিছু খুলে বলে সে।
রওশন মিঞা তাকে বাড়িতে নিয়ে যায়। রাতে খাওয়ার পর পরামর্শ দেয়, কিছুদিনের জন্য আত্মগোপনে থাকার। ফিরোজ ও তা-ই মেনে নেয়। ইচ্ছা করে, একবার বাবার সঙ্গে দেখা করে আসবে। রওশন মিঞা মানা করে। তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। ঘরের পিছনে দাড়িয়ে শেষ বারের মতো নওরিনকে বিদায় জানায়। নওরিন তার সাথে যেতে চাই।
“দূর পাগলী! তোরে কেমনে নিই। কই যাব, কই থাকব, নিজেই জানিনা। তাছাড়া তোর সাথে কি আমার বিয়ে হইছে এখনো। লোকে কি বলবে?”
“লোকে জানবে কি করে বিয়ে হইছে কিনা? যেখানে যাবা তোমার সাথেই থাকব।”
নওরিনের প্রেমময়ী আচারণে ফিরোজ মুগ্ধ হয়। বাবা ছাড়া পৃথিবীতে আর কেউ ছিলোনা তার, এখন আর একজন তার জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে ভেবে কিছুটা গর্ববোধ করে সে।
“তোরে এইভাবে চুরি করে নেবনারে। রাণীর মত করে সাজিয়ে আমার করিমনে করে নয়ে যাব।”
তারপর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তার আর কোনো খোজ পাওয়া যায় না। যাওয়ার সময় করিমনটা তার নতুন ভিটার সামনে রেখে গেছে। সেটা সেখানে সেভাবেই পড়ে আছে। এ কদিনে দ্রুত বর্ধনশীল অজানা লতাপাতা আপন স্নেহে জড়িয়ে নিয়েছে গাড়িটাকে। ধুলা-কাদা আর বৃষ্টির কারণে মস আর ছত্রাক-শৈবলের আশ্রয়স্থলে পরিনত হয়েছে সে।
এদিকে দেশ বিদেশে ঘুরে ঘুরে ফিরজের মনটা অস্থির হয়ে উঠল। বাবার জন্য হৃদয়টা কাঁদছিলো ভীষণ। নওরিনকে খুব মনে পড়তে লাগলো। এক পর্যায়ে পালিয়ে বেড়ানো অসহ্য যন্ত্রণায় পরিনত হলো। অবশেষে একদিন বিকালে চুপিচুপি বাড়ির দিকে রওনা হলো সে। কিন্তু বাড়ি পর্যন্ত তার আর যাওয়া হয়না। কুলার বাজারে যাওয়ার পথে নিজের ভিটাটার সামনে এসে থমকে যায় সে। আকস্মিক শকে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে সেখানেই।
কিছুক্ষণ পরে জয়না কাকির সাথে দেখা হয় তার। ষাটোর্ধ বৃদ্ধ মহিলা তাদের বাড়িতে রান্নার কাজ করে। ফিরোজকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে।
“ফিরোজ, বাবাজী, কই ছিলি তিই এতদিন। কত বড় সব্বনাস হয়ে গেছে। কুলার বাজারে তোর বাপে এক্সিডেন্ট করছে। সাতদিন পড়ে ছিলো হাসপাতালে। রওশন মিঞা কত খুজছে তোরে। কোথাও পাই নাই। মরার আগে কতবার চিৎকার ডাকছে তোরে। আর যারে পাইছে তারে বলছে, আমার ফিরোজরে তোমরা কিছু কইওনা। ওরে মাফ করে দিও। দেখ! তোর ভিটার উপর তোর বাপের কবর দিছে। যেইখানে বাপের জন্য ঘর তুলে দিতে চাইছিলি, সেইখানে কবর খুঁড়ে তারে মাটি দিছে। কি পোড়া কপাল তোর! মরা বাপের মুখটাও দেখতে পারলিনা।”
“কি অনর্থ হয়ে গেলো রে ফিরোজ। সব শেষ হয়ে গেছে। নওরিনও আর তোর নাই। গত শুক্রবার রওশন মিঞা নওরিনরে অন্যত্র বিয়ে দিয়ে দিছে। আমারে জড়িয়ে ধরে সে কি কান্না মেয়েটার। তোমার সাথেই নাকি যাইতে চাইছিল। বারবার কইল,
আমারে সে নিয়ে গেল না কেন, কাকি?”
সন্ধ্যার একটু পূর্বের মুহুর্ত। চারিদিক নিস্তব্ধ হয়ে এলো। হালকা বৃষ্টিভেজা মৃদু বাতাস বইছে। বিদ্ধস্ত গাড়িটার পাশে দাঁড়িয়ে বাবার কবরের দিকে তাকিয়ে রইলো ফিরোজ বক্স। এক সময় তার বাবা ছাড়া কিছুই ছিলোনা। এই করিমন বছরের পর বছর ধরে তাকে সবকিছু এনে দিয়েছিলো। আবার এই করিমনটাই এক ঝটকায় তার সবকিছু নিয়ে গেছে। বিধির নিয়তি এমনই, গড়তে সময় নেই মহাকাল কিন্তু এক নিমেষেই ধ্বংস হয়ে যায় সব।
বৃষ্টি বাড়তে লাগলো। ফিরোজের গায়ে লেগে থাকা কবরের কাদামাটি কলঙ্কের কালি হয়ে তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল।
২০/০৮/২০২৬






এই পোস্টে মন্তব্য বন্ধ আছে।