কৃষিকৃষি

লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে পাট চাষ, ভালো দামে হাসি ফুটেছে ধুনটের কৃষকের মুখে

লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে পাট চাষ, ভালো দামে হাসি ফুটেছে ধুনটের কৃষকের মুখে
কৃষকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন পাট জাগ দেওয়া এবং ধোয়ায়।

এক যুগের সর্বোচ্চ দর পাচ্ছেন কৃষক, মণ ৫ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত; বিঘায় লাভ ১৭ থেকে ২০ হাজার।

সোনালি আঁশের সুদিন ফিরেছে বগুড়ার ধুনটে। অনুকূল আবহাওয়ায় বাম্পার ফলন হওয়ার পাশাপাশি বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় উপজেলার পাটচাষিদের মুখে ফুটেছে হাসি। উৎপাদন খরচ কিছুটা বাড়লেও দামের কারণে এবার পাট চাষে লাভ হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা।

সরেজমিনে উপজেলার মথুরাপুর, ধুনট, চৌকিবাড়ী, গোপালনগর, চিকাশী ও গোসাইবাড়ীসহ বিভিন্ন গ্রামে দেখা যায়, কৃষকেরা পাট কাটা, জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়ানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এবার পর্যাপ্ত বৃষ্টি হওয়ায় অনেকে খেতেই জাগ দেওয়ার কাজ সেরেছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষকের পাট ছাড়ানোর কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।


হাটে ক্রেতার ভিড়, দাম ঊর্ধ্বমুখী।

উপজেলার পাটের হাট হিসেবে পরিচিত মথুরাপুর, ধুনট হাট ও পার্শ্ববর্তী চান্দাইকোনায় প্রায় প্রতিদিন ভোর থেকেই বিভিন্ন যানবাহনে করে দেশি, তোষা ও মেস্তা জাতের পাট নিয়ে আসছেন কৃষকেরা। মানভেদে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ২০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকায়। সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি থাকায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দরদাম করেই পাট বিক্রি করছেন কৃষকেরা।

কৃষকদের হিসাবে, বর্তমান দামে প্রতি বিঘা জমির পাট বিক্রি করে ১৭ থেকে ২০ হাজার টাকা লাভ হচ্ছে। এর সঙ্গে প্রতি বিঘার পাটখড়ি বিক্রি হচ্ছে ৪ থেকে ৮ হাজার টাকায়।

ধুনট বাজারের পাট ব্যবসায়ী মো. আমজাদ হোসেন বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার পাটের রং ও মান ভালো। বাজারে চাহিদা থাকলেও সে তুলনায় আমদানি কম। অনেকে বেশি দামের আশায় পাট গুদামজাত করে রাখছেন। ফলে গত বছরের চেয়ে মণপ্রতি ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা বেশি দামে পাট কিনতে হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, বর্তমানে মানভেদে দেশি ও তোষা পাট ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকা এবং মেস্তা ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার ২০০ টাকা মণ দরে কেনাবেচা হচ্ছে। বাজারে সরবরাহ কম থাকলে দাম আরও বাড়তে পারে বলে জানান তিনি।


গত এক যুগে সর্বোচ্চ দর।

হাটে আসা কৃষক হানিফ মন্ডল বলেন, বিঘাপ্রতি ১৪ হাজার টাকা খরচ করে ১২ মণ করে ফলন পেয়েছি। এবার বৃষ্টি ভালো হওয়ায় সেচের খরচ কমেছে। জলাশয় ও ডোবায় পর্যাপ্ত পানি থাকায় পাট জাগ দেওয়া এবং আঁশ ছাড়াতেও সুবিধা হয়েছে। ৪ হাজার ৬০০ টাকা মণ দরে ২৭ মণ পাট বিক্রি করলাম। গত এক যুগে এটাই সর্বোচ্চ পাটের দর।

চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের শ্যামবাড়ী গ্রামের কৃষক মো. বাহার উদ্দিন জানান, গত বছর দুই বিঘা জমিতে পাট চাষ করে ১৮ মণ পাট পেয়েছিলেন। সে সময় মণপ্রতি গড়ে ৩ হাজার ১০০ টাকা দরে পাট বিক্রি করেছিলেন তিনি। এবার দুই বিঘা জমিতে আবাদ করে প্রতি বিঘায় ১১ মণ করে পাট পেয়েছেন। এ পর্যন্ত তিনি প্রতি মণ পাট ৫ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন।

গোসাইবাড়ী গোয়াডহুড়ী গ্রামের কৃষক আকুল হোসেন জানান, এক বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছিলেন। শুরুতে বৃষ্টিতে কিছুটা হোঁচট খেলেও ৮ মণ পাট পেয়েছেন। ভালো দাম পাওয়ায় খরচ বাদ দিয়েও পাটখড়িসহ ১৮ হাজার টাকা লাভ হয়েছে তাঁর।

একাধিক কৃষক জানান, পাট কাটার পর পানিতে জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া ও শুকানোর কাজ বেশ শ্রমসাধ্য। তবে এবার পর্যাপ্ত বৃষ্টির কারণে জলাশয়গুলোতে পানি থাকায় জাগ দেওয়ার জন্য বাড়তি বিড়ম্বনায় পড়তে হয়নি। এতে আঁশের রংও ভালো হয়েছে। ভালো রং ও মানের কারণে বাজারে চাহিদা আছে। কিছুদিন ঘরে রেখে পরে বিক্রি করতে পারলে মণপ্রতি ৫ হাজার টাকার বেশি দাম পাওয়ার আশা করছেন তাঁরা।


লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আবাদ।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে দুই জাতের পাটের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে তোষা দেশি জাত এবং মেস্তা অন্য জাত। ২০২৬-২৭ সালে পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ হাজার ৬৭০ হেক্টর। কৃষকদের আগ্রহের কারণে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ১ হাজার ৭০৫ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩৫ হেক্টর বেশি।

গত বছর উপজেলায় পাটের আবাদ হয়েছিল ১ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে। সেই তুলনায় এবার ৪৫ হেক্টর বেশি জমিতে পাট চাষ হয়েছে।


উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সামিদুল ইসলাম জানান, চলতি বছর ১ হাজার ৭০৫ হেক্টর জমি থেকে ১৯ হাজার ৭৭৮ বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ায় কৃষকেরা বাম্পার ফলন পাচ্ছেন। কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে বীজসহ বিভিন্নভাবে পরামর্শ দিয়ে কৃষকদের সহযোগিতা করা হয়ে থাকে।

তিনি আরও বলেন, পাট শুধু আঁশ হিসেবে নয়, পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন পাটজাত পণ্য তৈরিতেও ব্যবহার করা সম্ভব। দেশে পাট ও পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো গেলে কৃষক পর্যায়ে পাটের চাহিদা ও দাম দুটিই বাড়বে।

Public Voice

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬


লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে পাট চাষ, ভালো দামে হাসি ফুটেছে ধুনটের কৃষকের মুখে

প্রকাশের তারিখ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

এক যুগের সর্বোচ্চ দর পাচ্ছেন কৃষক, মণ ৫ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত; বিঘায় লাভ ১৭ থেকে ২০ হাজার।


সোনালি আঁশের সুদিন ফিরেছে বগুড়ার ধুনটে। অনুকূল আবহাওয়ায় বাম্পার ফলন হওয়ার পাশাপাশি বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় উপজেলার পাটচাষিদের মুখে ফুটেছে হাসি। উৎপাদন খরচ কিছুটা বাড়লেও দামের কারণে এবার পাট চাষে লাভ হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা।


সরেজমিনে উপজেলার মথুরাপুর, ধুনট, চৌকিবাড়ী, গোপালনগর, চিকাশী ও গোসাইবাড়ীসহ বিভিন্ন গ্রামে দেখা যায়, কৃষকেরা পাট কাটা, জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়ানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এবার পর্যাপ্ত বৃষ্টি হওয়ায় অনেকে খেতেই জাগ দেওয়ার কাজ সেরেছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষকের পাট ছাড়ানোর কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।


হাটে ক্রেতার ভিড়, দাম ঊর্ধ্বমুখী।

উপজেলার পাটের হাট হিসেবে পরিচিত মথুরাপুর, ধুনট হাট ও পার্শ্ববর্তী চান্দাইকোনায় প্রায় প্রতিদিন ভোর থেকেই বিভিন্ন যানবাহনে করে দেশি, তোষা ও মেস্তা জাতের পাট নিয়ে আসছেন কৃষকেরা। মানভেদে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ২০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকায়। সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি থাকায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দরদাম করেই পাট বিক্রি করছেন কৃষকেরা।


কৃষকদের হিসাবে, বর্তমান দামে প্রতি বিঘা জমির পাট বিক্রি করে ১৭ থেকে ২০ হাজার টাকা লাভ হচ্ছে। এর সঙ্গে প্রতি বিঘার পাটখড়ি বিক্রি হচ্ছে ৪ থেকে ৮ হাজার টাকায়।


ধুনট বাজারের পাট ব্যবসায়ী মো. আমজাদ হোসেন বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার পাটের রং ও মান ভালো। বাজারে চাহিদা থাকলেও সে তুলনায় আমদানি কম। অনেকে বেশি দামের আশায় পাট গুদামজাত করে রাখছেন। ফলে গত বছরের চেয়ে মণপ্রতি ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা বেশি দামে পাট কিনতে হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, বর্তমানে মানভেদে দেশি ও তোষা পাট ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকা এবং মেস্তা ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার ২০০ টাকা মণ দরে কেনাবেচা হচ্ছে। বাজারে সরবরাহ কম থাকলে দাম আরও বাড়তে পারে বলে জানান তিনি।


গত এক যুগে সর্বোচ্চ দর।

হাটে আসা কৃষক হানিফ মন্ডল বলেন, বিঘাপ্রতি ১৪ হাজার টাকা খরচ করে ১২ মণ করে ফলন পেয়েছি। এবার বৃষ্টি ভালো হওয়ায় সেচের খরচ কমেছে। জলাশয় ও ডোবায় পর্যাপ্ত পানি থাকায় পাট জাগ দেওয়া এবং আঁশ ছাড়াতেও সুবিধা হয়েছে। ৪ হাজার ৬০০ টাকা মণ দরে ২৭ মণ পাট বিক্রি করলাম। গত এক যুগে এটাই সর্বোচ্চ পাটের দর।


চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের শ্যামবাড়ী গ্রামের কৃষক মো. বাহার উদ্দিন জানান, গত বছর দুই বিঘা জমিতে পাট চাষ করে ১৮ মণ পাট পেয়েছিলেন। সে সময় মণপ্রতি গড়ে ৩ হাজার ১০০ টাকা দরে পাট বিক্রি করেছিলেন তিনি। এবার দুই বিঘা জমিতে আবাদ করে প্রতি বিঘায় ১১ মণ করে পাট পেয়েছেন। এ পর্যন্ত তিনি প্রতি মণ পাট ৫ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন।


গোসাইবাড়ী গোয়াডহুড়ী গ্রামের কৃষক আকুল হোসেন জানান, এক বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছিলেন। শুরুতে বৃষ্টিতে কিছুটা হোঁচট খেলেও ৮ মণ পাট পেয়েছেন। ভালো দাম পাওয়ায় খরচ বাদ দিয়েও পাটখড়িসহ ১৮ হাজার টাকা লাভ হয়েছে তাঁর।


একাধিক কৃষক জানান, পাট কাটার পর পানিতে জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া ও শুকানোর কাজ বেশ শ্রমসাধ্য। তবে এবার পর্যাপ্ত বৃষ্টির কারণে জলাশয়গুলোতে পানি থাকায় জাগ দেওয়ার জন্য বাড়তি বিড়ম্বনায় পড়তে হয়নি। এতে আঁশের রংও ভালো হয়েছে। ভালো রং ও মানের কারণে বাজারে চাহিদা আছে। কিছুদিন ঘরে রেখে পরে বিক্রি করতে পারলে মণপ্রতি ৫ হাজার টাকার বেশি দাম পাওয়ার আশা করছেন তাঁরা।


লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আবাদ।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে দুই জাতের পাটের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে তোষা দেশি জাত এবং মেস্তা অন্য জাত। ২০২৬-২৭ সালে পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ হাজার ৬৭০ হেক্টর। কৃষকদের আগ্রহের কারণে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ১ হাজার ৭০৫ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩৫ হেক্টর বেশি।


গত বছর উপজেলায় পাটের আবাদ হয়েছিল ১ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে। সেই তুলনায় এবার ৪৫ হেক্টর বেশি জমিতে পাট চাষ হয়েছে।


উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সামিদুল ইসলাম জানান, চলতি বছর ১ হাজার ৭০৫ হেক্টর জমি থেকে ১৯ হাজার ৭৭৮ বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ায় কৃষকেরা বাম্পার ফলন পাচ্ছেন। কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে বীজসহ বিভিন্নভাবে পরামর্শ দিয়ে কৃষকদের সহযোগিতা করা হয়ে থাকে।

তিনি আরও বলেন, পাট শুধু আঁশ হিসেবে নয়, পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন পাটজাত পণ্য তৈরিতেও ব্যবহার করা সম্ভব। দেশে পাট ও পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো গেলে কৃষক পর্যায়ে পাটের চাহিদা ও দাম দুটিই বাড়বে।


Public Voice

সম্পাদক: মোঃ বাদশাহ আলমগীর
প্রকাশক: অনন্যা অনসূয়া দিবা

কপিরাইট © ২০২৬ Public Voice । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত