মতামত
একটি আদিপত্যবাদী বয়ানের সমাজতাত্ত্বিক পাঠ।
ক্ষমতাহীন মানুষদের অবহেলা করা, অন্যের আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি করা এবং সামাজিক বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পেছনে যে বয়ানটি সবচেয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করে, তা হলো— “তিনি অমুক পদে আছেন।”
এই কথাটি নিছক একটি পরিচয় নয়; এটি এক ধরনের আদিপত্যবাদী ভাষা। এখানে মানুষ নয়, মানুষের ক্ষমতার অবস্থানই মুখ্য হয়ে ওঠে। ব্যক্তি কী ভাবেন, কী করেন, কতটা নৈতিক বা দায়িত্বশীল—এসব প্রশ্ন গৌণ হয়ে পড়ে; মুখ্য হয়ে ওঠে তিনি কোন চেয়ারে বসে আছেন। এর অনিবার্য পরিণতিতে ক্ষমতাহীন মানুষ সমাজের চোখে স্বাভাবিকভাবেই ‘কম গুরুত্বপূর্ণ’ বলে বিবেচিত হন।
এই বয়ান ক্ষমতার প্রতি এক ধরনের অন্ধ আনুগত্য তৈরি করে। “তিনি অমুক পদে আছেন” বলা মানেই অঘোষিতভাবে জানিয়ে দেওয়া—এই মানুষকে প্রশ্ন করা যাবে না, সমালোচনা করা যাবে না, এমনকি নৈতিক বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোও শোভন নয়। ফলে জবাবদিহির জায়গা সংকুচিত হয়, আর ক্ষমতা পেয়ে যায় এক ধরনের অযাচিত পবিত্রতা।
এর আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো—এ ভাষা মানুষের আত্মপরিচয়কে ভেঙে দেয়। যাদের কোনো পদ নেই, তারা ধীরে ধীরে নিজেদের অপ্রাসঙ্গিক ভাবতে শুরু করে। নিজের নাম, চিন্তা বা শ্রম নয়—পদহীনতাই হয়ে ওঠে তাদের প্রধান পরিচয়। এভাবেই আদিপত্যবাদ কেবল রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় নয়, মানুষের মনোজগতেও বাসা বাঁধে।
সবচেয়ে বড় কথা, এই ভাষা সামাজিক বৈষম্যকে স্বাভাবিক ও বৈধ করে তোলে। ক্ষমতাবানকে স্বাভাবিকভাবেই শ্রদ্ধেয় এবং ক্ষমতাহীনকে স্বাভাবিকভাবেই অবহেলাযোগ্য ভাবার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। একসময় এটি আর ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি থাকে না; এটি হয়ে ওঠে একটি সামাজিক নিয়ম—যা প্রশ্নহীনভাবে মেনে নেওয়া হয়।
অতএব, “তিনি অমুক পদে আছেন”—এই আপাত নিরীহ বাক্যটি আদতে নিরপেক্ষ নয়। এটি ক্ষমতার পক্ষের ভাষা, বৈষম্যের বাহন এবং প্রশ্নহীন আনুগত্যের চর্চা। এই ভাষাই আদিপত্যবাদকে দৈনন্দিন কথাবার্তায় স্বাভাবিক করে তোলে—নীরবে, কিন্তু গভীরভাবে।
এই কারণেই এই ভাষাকে প্রশ্ন করা জরুরি। কারণ যতদিন আমরা মানুষকে মানুষ হিসেবে নয়, পদের প্রতীক হিসেবে বিচার করব, ততদিন সমাজে সমতা কেবল একটি স্লোগান হয়েই থাকবে। “তিনি অমুক পদে আছেন”—এই যুক্তি চলতে থাকলে ন্যায়বোধ দুর্বল হবে, বিবেক নীরব হবে, আর ক্ষমতা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে উঠে যাবে।
একটি সুস্থ ও গণতান্ত্রিক সমাজে পরিচয়ের কেন্দ্র হবে মানুষের নাম, চিন্তা ও দায়িত্ববোধ—পদ নয়। পদ হতে পারে সাময়িক দায়িত্বের চিহ্ন, কিন্তু সম্মান ও মর্যাদার একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না। নইলে আমরা অজান্তেই এমন এক সমাজ গড়ে তুলব, যেখানে ক্ষমতাই সত্য, আর মানুষ কেবল তার ছায়া।
এই আদিপত্যবাদী ভাষা থেকে বেরিয়ে আসাই প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজ নির্মাণের প্রথম শর্ত।

শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬
একটি আদিপত্যবাদী বয়ানের সমাজতাত্ত্বিক পাঠ।
ক্ষমতাহীন মানুষদের অবহেলা করা, অন্যের আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি করা এবং সামাজিক বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পেছনে যে বয়ানটি সবচেয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করে, তা হলো— “তিনি অমুক পদে আছেন।”
এই কথাটি নিছক একটি পরিচয় নয়; এটি এক ধরনের আদিপত্যবাদী ভাষা। এখানে মানুষ নয়, মানুষের ক্ষমতার অবস্থানই মুখ্য হয়ে ওঠে। ব্যক্তি কী ভাবেন, কী করেন, কতটা নৈতিক বা দায়িত্বশীল—এসব প্রশ্ন গৌণ হয়ে পড়ে; মুখ্য হয়ে ওঠে তিনি কোন চেয়ারে বসে আছেন। এর অনিবার্য পরিণতিতে ক্ষমতাহীন মানুষ সমাজের চোখে স্বাভাবিকভাবেই ‘কম গুরুত্বপূর্ণ’ বলে বিবেচিত হন।
এই বয়ান ক্ষমতার প্রতি এক ধরনের অন্ধ আনুগত্য তৈরি করে। “তিনি অমুক পদে আছেন” বলা মানেই অঘোষিতভাবে জানিয়ে দেওয়া—এই মানুষকে প্রশ্ন করা যাবে না, সমালোচনা করা যাবে না, এমনকি নৈতিক বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোও শোভন নয়। ফলে জবাবদিহির জায়গা সংকুচিত হয়, আর ক্ষমতা পেয়ে যায় এক ধরনের অযাচিত পবিত্রতা।
এর আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো—এ ভাষা মানুষের আত্মপরিচয়কে ভেঙে দেয়। যাদের কোনো পদ নেই, তারা ধীরে ধীরে নিজেদের অপ্রাসঙ্গিক ভাবতে শুরু করে। নিজের নাম, চিন্তা বা শ্রম নয়—পদহীনতাই হয়ে ওঠে তাদের প্রধান পরিচয়। এভাবেই আদিপত্যবাদ কেবল রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় নয়, মানুষের মনোজগতেও বাসা বাঁধে।
সবচেয়ে বড় কথা, এই ভাষা সামাজিক বৈষম্যকে স্বাভাবিক ও বৈধ করে তোলে। ক্ষমতাবানকে স্বাভাবিকভাবেই শ্রদ্ধেয় এবং ক্ষমতাহীনকে স্বাভাবিকভাবেই অবহেলাযোগ্য ভাবার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। একসময় এটি আর ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি থাকে না; এটি হয়ে ওঠে একটি সামাজিক নিয়ম—যা প্রশ্নহীনভাবে মেনে নেওয়া হয়।
অতএব, “তিনি অমুক পদে আছেন”—এই আপাত নিরীহ বাক্যটি আদতে নিরপেক্ষ নয়। এটি ক্ষমতার পক্ষের ভাষা, বৈষম্যের বাহন এবং প্রশ্নহীন আনুগত্যের চর্চা। এই ভাষাই আদিপত্যবাদকে দৈনন্দিন কথাবার্তায় স্বাভাবিক করে তোলে—নীরবে, কিন্তু গভীরভাবে।
এই কারণেই এই ভাষাকে প্রশ্ন করা জরুরি। কারণ যতদিন আমরা মানুষকে মানুষ হিসেবে নয়, পদের প্রতীক হিসেবে বিচার করব, ততদিন সমাজে সমতা কেবল একটি স্লোগান হয়েই থাকবে। “তিনি অমুক পদে আছেন”—এই যুক্তি চলতে থাকলে ন্যায়বোধ দুর্বল হবে, বিবেক নীরব হবে, আর ক্ষমতা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে উঠে যাবে।
একটি সুস্থ ও গণতান্ত্রিক সমাজে পরিচয়ের কেন্দ্র হবে মানুষের নাম, চিন্তা ও দায়িত্ববোধ—পদ নয়। পদ হতে পারে সাময়িক দায়িত্বের চিহ্ন, কিন্তু সম্মান ও মর্যাদার একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না। নইলে আমরা অজান্তেই এমন এক সমাজ গড়ে তুলব, যেখানে ক্ষমতাই সত্য, আর মানুষ কেবল তার ছায়া।
এই আদিপত্যবাদী ভাষা থেকে বেরিয়ে আসাই প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজ নির্মাণের প্রথম শর্ত।
