মতামত
সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর পরিচয়, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাইয়ের জন্য ভেরিফিকেশন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। কিন্তু এই যাচাইয়ের পরিধি, কোন কর্তৃপক্ষ থেকে তথ্য নেওয়া হবে এবং কোন ধরনের তথ্য নিয়োগের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট, একীভূত ও সবার জন্য সমান নীতিমালা থাকা জরুরি।
সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি চাকরির নিয়োগপ্রক্রিয়ায় পুলিশ ও গোয়েন্দা ভেরিফিকেশন নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিভিন্ন বিসিএস ব্যাচে চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পরও কিছু প্রার্থীর নিয়োগ নেতিবাচক পুলিশ-গোয়েন্দা প্রতিবেদনের কারণে আটকে যায়। একই সময়ে ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে কয়েকটি বিসিএস ব্যাচের নিয়োগও বিলম্বিত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
অন্যদিকে, হাইকোর্ট এক রায়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন যে পুলিশ ভেরিফিকেশন ও এনএসআই প্রতিবেদন ন্যায্য, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য উপকরণের ভিত্তিতে হতে হবে। আদালতের পর্যবেক্ষণে আরও উঠে এসেছে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া সাধারণ বা অস্পষ্ট মন্তব্যের ভিত্তিতে কাউকে নিয়োগ থেকে বঞ্চিত করা নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন সামনে আসে—রাষ্ট্র যখন একজন নাগরিককে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দায়িত্বে নিয়োগের আগে তার বিষয়ে ভেরিফিকেশন করে, তখন রাষ্ট্রের আরও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে যাঁরা নির্বাচিত হন, তাঁদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতা যাচাইয়ের কাঠামোও কি একইভাবে স্বচ্ছ, নির্দিষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক হওয়া উচিত নয়?
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে অবশ্য সংবিধান ও নির্বাচনী আইনে প্রার্থীর যোগ্যতা-অযোগ্যতার নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র যাচাইয়ের সময় রিটার্নিং কর্মকর্তা প্রার্থীর আইনগত যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিষয় পরীক্ষা করতে পারেন। একই সঙ্গে প্রার্থীদের হলফনামায় শিক্ষাগত যোগ্যতা, ফৌজদারি মামলা ও অতীত রেকর্ড, পেশা, আয়, সম্পদ ও দায়সহ বিভিন্ন তথ্য দেওয়ার বিধান রয়েছে।
অর্থাৎ, সংসদ সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত কাঠামো মূলত আইনগত যোগ্যতা, অযোগ্যতা, মনোনয়নপত্র এবং হলফনামাভিত্তিক তথ্য যাচাইয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। অন্যদিকে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া আরও বিস্তৃত প্রশাসনিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে।
এ অবস্থায় প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের পক্ষে-বিপক্ষে নয়; বরং রাষ্ট্রীয় নিয়োগ ও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে একটি ন্যায্য, স্বচ্ছ ও অভিন্ন যাচাই-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার।
সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশন রাখা হলে অন্তত কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করা যেতে পারে—
প্রথমত, কারা ভেরিফিকেশন করবেন এবং তাঁদের এখতিয়ার কী হবে—তা আইন বা বিধিমালায় সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা।
দ্বিতীয়ত, কোন কোন উৎস থেকে তথ্য নেওয়া যাবে—জাতীয় পরিচয়পত্র, পুলিশ রেকর্ড, আদালতের নথি, সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর কিংবা অন্য কোনো নির্দিষ্ট উৎস—তার একটি একক তালিকা থাকা।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক মতাদর্শ, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক বা আইনসম্মত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নিয়োগের ক্ষেত্রে নেতিবাচক মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার না করা। সরকারি চাকরিতে রাজনৈতিক পরিচয় যাচাইয়ের প্রথা বাতিলের সিদ্ধান্ত এবং এ বিষয়ে সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ইতোমধ্যে প্রকাশ্যে এসেছে।
চতুর্থত, কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে আপত্তি থাকলে সেটি সুনির্দিষ্ট, যাচাইযোগ্য ও প্রমাণভিত্তিক হতে হবে; অস্পষ্ট বা সাধারণ মন্তব্যের ভিত্তিতে কারও নাগরিক অধিকার বা কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত করা উচিত নয়—হাইকোর্টের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়।
পঞ্চমত, ভেরিফিকেশন প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে প্রার্থীর বক্তব্য বা আপিলের সুযোগ এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা প্রয়োজন, যাতে বছরের পর বছর নিয়োগপ্রক্রিয়া ঝুলে না থাকে।
সবশেষে, ভেরিফিকেশন যদি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় হয়, তবে সেটি যেন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিবেচনাধীন কোনো অনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া না হয়ে আইন, নির্দিষ্ট মানদণ্ড, প্রমাণ এবং একই নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা হয়।
একজন নাগরিক সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করবেন কিংবা জনগণের ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন—দুই ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন। তাই কার ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশন হবে, কার কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হবে, কোন তথ্য গ্রহণযোগ্য হবে এবং কোন তথ্যের ভিত্তিতে অযোগ্য ঘোষণা করা যাবে—এসব বিষয়ে এক ও অভিন্ন, স্পষ্ট ও বৈষম্যহীন জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।
এ ধরনের নীতিমালা কেবল নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বাড়াবে না; বরং নাগরিকের অধিকার, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থাও শক্তিশালী করতে পারে।
শিক্ষানুরাগী ও কলামিস্ট

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর পরিচয়, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাইয়ের জন্য ভেরিফিকেশন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। কিন্তু এই যাচাইয়ের পরিধি, কোন কর্তৃপক্ষ থেকে তথ্য নেওয়া হবে এবং কোন ধরনের তথ্য নিয়োগের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট, একীভূত ও সবার জন্য সমান নীতিমালা থাকা জরুরি।
সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি চাকরির নিয়োগপ্রক্রিয়ায় পুলিশ ও গোয়েন্দা ভেরিফিকেশন নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিভিন্ন বিসিএস ব্যাচে চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পরও কিছু প্রার্থীর নিয়োগ নেতিবাচক পুলিশ-গোয়েন্দা প্রতিবেদনের কারণে আটকে যায়। একই সময়ে ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে কয়েকটি বিসিএস ব্যাচের নিয়োগও বিলম্বিত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
অন্যদিকে, হাইকোর্ট এক রায়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন যে পুলিশ ভেরিফিকেশন ও এনএসআই প্রতিবেদন ন্যায্য, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য উপকরণের ভিত্তিতে হতে হবে। আদালতের পর্যবেক্ষণে আরও উঠে এসেছে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া সাধারণ বা অস্পষ্ট মন্তব্যের ভিত্তিতে কাউকে নিয়োগ থেকে বঞ্চিত করা নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন সামনে আসে—রাষ্ট্র যখন একজন নাগরিককে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দায়িত্বে নিয়োগের আগে তার বিষয়ে ভেরিফিকেশন করে, তখন রাষ্ট্রের আরও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে যাঁরা নির্বাচিত হন, তাঁদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতা যাচাইয়ের কাঠামোও কি একইভাবে স্বচ্ছ, নির্দিষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক হওয়া উচিত নয়?
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে অবশ্য সংবিধান ও নির্বাচনী আইনে প্রার্থীর যোগ্যতা-অযোগ্যতার নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র যাচাইয়ের সময় রিটার্নিং কর্মকর্তা প্রার্থীর আইনগত যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিষয় পরীক্ষা করতে পারেন। একই সঙ্গে প্রার্থীদের হলফনামায় শিক্ষাগত যোগ্যতা, ফৌজদারি মামলা ও অতীত রেকর্ড, পেশা, আয়, সম্পদ ও দায়সহ বিভিন্ন তথ্য দেওয়ার বিধান রয়েছে।
অর্থাৎ, সংসদ সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত কাঠামো মূলত আইনগত যোগ্যতা, অযোগ্যতা, মনোনয়নপত্র এবং হলফনামাভিত্তিক তথ্য যাচাইয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। অন্যদিকে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া আরও বিস্তৃত প্রশাসনিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে।
এ অবস্থায় প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের পক্ষে-বিপক্ষে নয়; বরং রাষ্ট্রীয় নিয়োগ ও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে একটি ন্যায্য, স্বচ্ছ ও অভিন্ন যাচাই-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার।
সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশন রাখা হলে অন্তত কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করা যেতে পারে—
প্রথমত, কারা ভেরিফিকেশন করবেন এবং তাঁদের এখতিয়ার কী হবে—তা আইন বা বিধিমালায় সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা।
দ্বিতীয়ত, কোন কোন উৎস থেকে তথ্য নেওয়া যাবে—জাতীয় পরিচয়পত্র, পুলিশ রেকর্ড, আদালতের নথি, সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর কিংবা অন্য কোনো নির্দিষ্ট উৎস—তার একটি একক তালিকা থাকা।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক মতাদর্শ, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক বা আইনসম্মত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নিয়োগের ক্ষেত্রে নেতিবাচক মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার না করা। সরকারি চাকরিতে রাজনৈতিক পরিচয় যাচাইয়ের প্রথা বাতিলের সিদ্ধান্ত এবং এ বিষয়ে সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ইতোমধ্যে প্রকাশ্যে এসেছে।
চতুর্থত, কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে আপত্তি থাকলে সেটি সুনির্দিষ্ট, যাচাইযোগ্য ও প্রমাণভিত্তিক হতে হবে; অস্পষ্ট বা সাধারণ মন্তব্যের ভিত্তিতে কারও নাগরিক অধিকার বা কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত করা উচিত নয়—হাইকোর্টের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়।
পঞ্চমত, ভেরিফিকেশন প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে প্রার্থীর বক্তব্য বা আপিলের সুযোগ এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা প্রয়োজন, যাতে বছরের পর বছর নিয়োগপ্রক্রিয়া ঝুলে না থাকে।
সবশেষে, ভেরিফিকেশন যদি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় হয়, তবে সেটি যেন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিবেচনাধীন কোনো অনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া না হয়ে আইন, নির্দিষ্ট মানদণ্ড, প্রমাণ এবং একই নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা হয়।
একজন নাগরিক সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করবেন কিংবা জনগণের ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন—দুই ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন। তাই কার ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশন হবে, কার কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হবে, কোন তথ্য গ্রহণযোগ্য হবে এবং কোন তথ্যের ভিত্তিতে অযোগ্য ঘোষণা করা যাবে—এসব বিষয়ে এক ও অভিন্ন, স্পষ্ট ও বৈষম্যহীন জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।
এ ধরনের নীতিমালা কেবল নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বাড়াবে না; বরং নাগরিকের অধিকার, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থাও শক্তিশালী করতে পারে।
শিক্ষানুরাগী ও কলামিস্ট
