কৃষিকৃষি

শীতের আগমনে রাজশাহীতে খেজুর রসের প্রস্তুতি, ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা

শেয়ার করুন
অ+ অ-
শীতের আগমনে রাজশাহীতে খেজুর রসের প্রস্তুতি, ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা
শীতের আগমনে রাজশাহীতে খেজুর রসের প্রস্তুতি, ব্যস্ত গাছিরা

রাজশাহীতে শীতের হালকা ছোঁয়া লাগতেই শুরু হয়েছে খেজুর রস সংগ্রহের প্রস্তুতি। জেলার দুর্গাপুর, চারঘাট, বাঘা, পুঠিয়া, গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলাজুড়ে গাছিরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছ ঝোড়া, হাঁড়ি-পাতিল গোছানো ও রস সংগ্রহের প্রাথমিক কাজে। লাখ লাখ খেজুরগাছ থেকে রস নামানোর অপেক্ষায় দিন গুনছেন তারা।

প্রতি বছর এসব খেজুরগাছ থেকে কোটি কোটি টাকার গুড় উৎপাদিত হয়। শীত যত বাড়ে, রসের পরিমাণ তত বৃদ্ধি পায়—আর তাতেই গাছিদের মুখে ফুটে ওঠে হাসি। খেজুরের রস শুধু একটি খাবার নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতির এক মিষ্টি প্রতীক।

রাজশাহী জেলা জুড়ে শীতের আগমনের বার্তা নিয়ে দেখা যাচ্ছে খেজুরগাছ কাটার চিরচেনা দৃশ্য। হাতে হাঁসুয়া, কোমরে ঠুঙ্গি আর পিঠে দড়ি বেঁধে গাছিরা এক গাছ থেকে আরেক গাছে ওঠেন। গাছের মাথায় উঠে খেজুর পাতার খোসা ছেঁচে দেন—যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘গাছ ঝোড়া’। এটিই রস নামানোর প্রথম ধাপ।

দুর্গাপুর উপজেলা দীর্ঘদিন ধরেই খেজুর রস ও গুড় উৎপাদনের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। এখানকার মিষ্টি রসের সুখ্যাতি সারা দেশেই ছড়িয়ে আছে। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, দুর্গাপুরে বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার ৬২৫টি খেজুরগাছ রয়েছে। এসব গাছ থেকে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৪৫৫ টন গুড় উৎপাদিত হয়। হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি গাছ থেকে গড়ে ৯ কেজি করে গুড় পাওয়া যায়।

দুর্গাপুর উপজেলার গাছি মনোয়ার হোসেন বলেন,

‘গত বছর ৪০টি গাছ থেকে রস তুলেছিলাম। এবার ৫০টি গাছ নিয়েছি। প্রতিটি গাছের জন্য ৬০০ টাকা করে টেন্ডার দিয়েছি। ঠাণ্ডা বেশি পড়লে রসও ভালো হয়। আশা করছি, ২০ দিনের মধ্যেই রস নামানো শুরু হবে।’

শীত মৌসুমে শুধু রস নয়, গুড়ের ব্যবসাও জমে ওঠে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা জানান, দুর্গাপুর উপজেলায় প্রতি মৌসুমে প্রায় ৭০ কোটি টাকার গুড়ের লেনদেন হয়ে থাকে। এ সময় গাছিরা পুরোনো মাটির হাঁড়ি ধোয়া, শুকানো, দড়ি লাগানো এবং রস জ্বাল দেওয়ার চুলা প্রস্তুত করছেন। কেউ নতুন হাঁড়ি-পাতিল কিনছেন, কেউ আবার পুরোনো চুলার ফাঁকফোকর মেরামত করছেন।

চারঘাট উপজেলার আজাদ প্রামানিক বলেন,

‘আমার পাঁচটি খেজুরগাছ আছে। প্রতিটি গাছ থেকে তিন কেজি গুড় দেওয়ার শর্তে গাছগুলো গাছিদের বর্গা দিয়েছি।’

বাঘা উপজেলার গাছি মামুন প্রামানিক বলেন,

‘এবার শতাধিক গাছের সঙ্গে চুক্তি করেছি। রস কম হলে গুড়ও কম হয়। তবে দাম ভালো থাকলে লাভ হবে।’

পবা উপজেলার হোজা গ্রামের গাছি মনিরুল ইসলাম বলেন,

‘আমার ৭০টি খেজুরগাছ আছে। গাছগুলো পরিষ্কার করে রাখছি, যেন ঠাণ্ডা পড়তেই রস নামাতে পারি।’

তার মুখে ফুটে ওঠে পরিশ্রমের তৃপ্তি—কারণ এই রসই একসময় রূপ নেবে সোনালি মিষ্টি গুড়ে।

শীতের সকালে গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘরেই দেখা যায় এক চেনা দৃশ্য। গরম গরম খেজুর রস আর মুড়ি হাতে পরিবারের সবাই বসে আড্ডায় মেতে ওঠে। পিঠা, পায়েস, পাটালি ও ঝোলা গুড়ে মিশে যায় শীতের উৎসবের রং। এই মৌসুম কেবল খাদ্যরসিকদের জন্য নয়, কৃষক ও গাছিদের কাছেও আনন্দের সময়। গুড় বিক্রির মাধ্যমে সচল হয় গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা।

পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ এম এ মান্নান বলেন,

‘গাছ পরিষ্কার করার কাজ অবশ্যই দক্ষ গাছিদের দিয়ে করানো উচিত। গাছ ঝোড়ার সময় এক পাশ কাটা ভালো—না হলে গাছ মারা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।’

তিনি আরও জানান, ‘ভালো রস উৎপাদনের জন্য প্রতিটি গাছের গোড়ায় ১০০ থেকে ১৫০ গ্রাম ইউরিয়া সার দেওয়া যেতে পারে। সঠিক পরিচর্যা করলে অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকেই রস সংগ্রহ শুরু করা সম্ভব।’

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক উম্মে ছালমা জানান, রাজশাহী জেলার চারঘাট, বাঘা, পুঠিয়া, গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলায় মোট খেজুরগাছের সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ৮০ হাজার। এর মধ্যে চারঘাটে ৩ লাখ ৯৬ হাজার, বাঘায় ২ লাখ ৯৯ হাজার এবং পুঠিয়ায় ৮৫ হাজার গাছ রয়েছে। গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলাতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক খেজুরগাছ থেকে রস ও গুড় উৎপাদন হয়ে থাকে।

এসব গাছ থেকে চলতি মৌসুমে প্রায় ৮ হাজার টন গুড় উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৬০ কোটি টাকা।

গাছিদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি খেজুরগাছ থেকে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ দিন পর্যন্ত রস পাওয়া যায়। প্রতি হাঁড়ি রস ৫০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হয়। এর বড় অংশ গুড় তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, আর কিছু অংশ ঝোলা রস হিসেবেও বাজারে বিক্রি হয়। রাজশাহীর বাঘা, চারঘাট ও গোদাগাড়ীর গুড় দেশের বিভিন্ন বড় শহরে সরবরাহ করা হয়।

Public Voice

শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬


শীতের আগমনে রাজশাহীতে খেজুর রসের প্রস্তুতি, ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা

প্রকাশের তারিখ : ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫

featured Image

রাজশাহীতে শীতের হালকা ছোঁয়া লাগতেই শুরু হয়েছে খেজুর রস সংগ্রহের প্রস্তুতি। জেলার দুর্গাপুর, চারঘাট, বাঘা, পুঠিয়া, গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলাজুড়ে গাছিরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছ ঝোড়া, হাঁড়ি-পাতিল গোছানো ও রস সংগ্রহের প্রাথমিক কাজে। লাখ লাখ খেজুরগাছ থেকে রস নামানোর অপেক্ষায় দিন গুনছেন তারা।

প্রতি বছর এসব খেজুরগাছ থেকে কোটি কোটি টাকার গুড় উৎপাদিত হয়। শীত যত বাড়ে, রসের পরিমাণ তত বৃদ্ধি পায়—আর তাতেই গাছিদের মুখে ফুটে ওঠে হাসি। খেজুরের রস শুধু একটি খাবার নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতির এক মিষ্টি প্রতীক।

রাজশাহী জেলা জুড়ে শীতের আগমনের বার্তা নিয়ে দেখা যাচ্ছে খেজুরগাছ কাটার চিরচেনা দৃশ্য। হাতে হাঁসুয়া, কোমরে ঠুঙ্গি আর পিঠে দড়ি বেঁধে গাছিরা এক গাছ থেকে আরেক গাছে ওঠেন। গাছের মাথায় উঠে খেজুর পাতার খোসা ছেঁচে দেন—যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘গাছ ঝোড়া’। এটিই রস নামানোর প্রথম ধাপ।

দুর্গাপুর উপজেলা দীর্ঘদিন ধরেই খেজুর রস ও গুড় উৎপাদনের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। এখানকার মিষ্টি রসের সুখ্যাতি সারা দেশেই ছড়িয়ে আছে। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, দুর্গাপুরে বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার ৬২৫টি খেজুরগাছ রয়েছে। এসব গাছ থেকে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৪৫৫ টন গুড় উৎপাদিত হয়। হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি গাছ থেকে গড়ে ৯ কেজি করে গুড় পাওয়া যায়।

দুর্গাপুর উপজেলার গাছি মনোয়ার হোসেন বলেন,

‘গত বছর ৪০টি গাছ থেকে রস তুলেছিলাম। এবার ৫০টি গাছ নিয়েছি। প্রতিটি গাছের জন্য ৬০০ টাকা করে টেন্ডার দিয়েছি। ঠাণ্ডা বেশি পড়লে রসও ভালো হয়। আশা করছি, ২০ দিনের মধ্যেই রস নামানো শুরু হবে।’

শীত মৌসুমে শুধু রস নয়, গুড়ের ব্যবসাও জমে ওঠে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা জানান, দুর্গাপুর উপজেলায় প্রতি মৌসুমে প্রায় ৭০ কোটি টাকার গুড়ের লেনদেন হয়ে থাকে। এ সময় গাছিরা পুরোনো মাটির হাঁড়ি ধোয়া, শুকানো, দড়ি লাগানো এবং রস জ্বাল দেওয়ার চুলা প্রস্তুত করছেন। কেউ নতুন হাঁড়ি-পাতিল কিনছেন, কেউ আবার পুরোনো চুলার ফাঁকফোকর মেরামত করছেন।

চারঘাট উপজেলার আজাদ প্রামানিক বলেন,

‘আমার পাঁচটি খেজুরগাছ আছে। প্রতিটি গাছ থেকে তিন কেজি গুড় দেওয়ার শর্তে গাছগুলো গাছিদের বর্গা দিয়েছি।’

বাঘা উপজেলার গাছি মামুন প্রামানিক বলেন,

‘এবার শতাধিক গাছের সঙ্গে চুক্তি করেছি। রস কম হলে গুড়ও কম হয়। তবে দাম ভালো থাকলে লাভ হবে।’

পবা উপজেলার হোজা গ্রামের গাছি মনিরুল ইসলাম বলেন,

‘আমার ৭০টি খেজুরগাছ আছে। গাছগুলো পরিষ্কার করে রাখছি, যেন ঠাণ্ডা পড়তেই রস নামাতে পারি।’

তার মুখে ফুটে ওঠে পরিশ্রমের তৃপ্তি—কারণ এই রসই একসময় রূপ নেবে সোনালি মিষ্টি গুড়ে।

শীতের সকালে গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘরেই দেখা যায় এক চেনা দৃশ্য। গরম গরম খেজুর রস আর মুড়ি হাতে পরিবারের সবাই বসে আড্ডায় মেতে ওঠে। পিঠা, পায়েস, পাটালি ও ঝোলা গুড়ে মিশে যায় শীতের উৎসবের রং। এই মৌসুম কেবল খাদ্যরসিকদের জন্য নয়, কৃষক ও গাছিদের কাছেও আনন্দের সময়। গুড় বিক্রির মাধ্যমে সচল হয় গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা।

পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ এম এ মান্নান বলেন,

‘গাছ পরিষ্কার করার কাজ অবশ্যই দক্ষ গাছিদের দিয়ে করানো উচিত। গাছ ঝোড়ার সময় এক পাশ কাটা ভালো—না হলে গাছ মারা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।’

তিনি আরও জানান, ‘ভালো রস উৎপাদনের জন্য প্রতিটি গাছের গোড়ায় ১০০ থেকে ১৫০ গ্রাম ইউরিয়া সার দেওয়া যেতে পারে। সঠিক পরিচর্যা করলে অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকেই রস সংগ্রহ শুরু করা সম্ভব।’

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক উম্মে ছালমা জানান, রাজশাহী জেলার চারঘাট, বাঘা, পুঠিয়া, গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলায় মোট খেজুরগাছের সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ৮০ হাজার। এর মধ্যে চারঘাটে ৩ লাখ ৯৬ হাজার, বাঘায় ২ লাখ ৯৯ হাজার এবং পুঠিয়ায় ৮৫ হাজার গাছ রয়েছে। গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলাতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক খেজুরগাছ থেকে রস ও গুড় উৎপাদন হয়ে থাকে।

এসব গাছ থেকে চলতি মৌসুমে প্রায় ৮ হাজার টন গুড় উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৬০ কোটি টাকা।

গাছিদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি খেজুরগাছ থেকে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ দিন পর্যন্ত রস পাওয়া যায়। প্রতি হাঁড়ি রস ৫০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হয়। এর বড় অংশ গুড় তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, আর কিছু অংশ ঝোলা রস হিসেবেও বাজারে বিক্রি হয়। রাজশাহীর বাঘা, চারঘাট ও গোদাগাড়ীর গুড় দেশের বিভিন্ন বড় শহরে সরবরাহ করা হয়।


Public Voice

সম্পাদক: মোঃ বাদশাহ আলমগীর
প্রকাশক: অনন্যা অনসূয়া দিবা

কপিরাইট © ২০২৬ Public Voice । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত