সারাদেশসারাদেশ

সিলেটের শ্রমিক হাটে কাজের সন্ধানে ভিড়, দুশ্চিন্তায় দিনমজুরেরা

সিলেট নগরীর বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা শ্রমিক হাটে কাজের সন্ধানে ভিড় বাড়ছে। যন্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকের চাহিদা কমছে, এতে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন শ্রমজীবীরা।

Publicvoice24
Publicvoice24
|
শেয়ার করুন
অ+ অ-

সকাল হলেই জীবনযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হয় ৪৩ বছর বয়সি রোশনা বেগমকে। সকাল হলেই ঘুম থেকে উঠে দিনমজুরের কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন ৪৩ বছর বয়সি রোশনা বেগম।

সংসার চালাতে স্বামীর পাশাপাশি প্রায় এক দশক ধরে দিনমজুরের কাজ করে আসছেন তিনি। প্রতিদিন তার গন্তব্য সিলেট নগরীর মদিনা মার্কেট এলাকার সড়কসংলগ্ন শ্রমিক হাট। কাজ মিললে দিনে ৬০০ টাকা আয় হয় তার, যার মধ্যে ১০০ টাকাই ব্যয় হয়ে যায় দুপুরের খাবারের পেছনে। তবে প্রতিদিন কাজ জোটে না, আর কাজ না পেলে ফিরতে হয় খালি হাতে। অভাবের সংসারে সন্তানদের পড়াশোনা করিয়েছেন রোশনা। তার বড় মেয়ে স্নাতক পাস করেও চাকরি না পাওয়ায় অবশেষে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি গভীর অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। সংসারের অভাব মেটাতে স্বামীর পাশাপাশি প্রায় ১০ বছর ধরে তিনিও ছুটছেন কাজের সন্ধানে। সেখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন কাজের সন্ধানে। নিজের জীবনের কষ্টকে সঙ্গী করেই সন্তানদের লেখাপড়া করিয়েছেন রোশনা বেগম। তার স্বপ্ন ছিল, সন্তানদের কেউ যেন তার মতো দিনমজুরের জীবন বেছে নিতে বাধ্য না হয়। তার বড় মেয়ে ধর্মপাশা কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেছেন। তিনি জানান, একসময় প্রায় প্রতিদিনই কাজ পাওয়া যেত। ফলে প্রতিদিনই অনেকে কাজ না পেয়ে ফিরে যান।

সিলেট নগরীর আম্বরখানা, বন্দরবাজার, উপশহর, শিবগঞ্জ, টিলাগড় ও মেডিকেল রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অন্তত ১০ থেকে ১৫টি শ্রমিক হাট। সকাল ৭টা থেকে ১০টা পর্যন্ত এসব স্থানে ভিড় করেন শ্রমজীবী মানুষ। শ্রমিকদের তথ্যমতে, প্রতিটি হাটে প্রতিদিন দুই থেকে তিনশ শ্রমিকের সমাগম ঘটে। তবে শ্রমিকের তুলনায় কাজের সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেককে প্রতিদিন খালি হাতে ফিরতে হয়। কোনো কোনো দিন প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শ্রমিকই কোনো কাজ পান না বলে দাবি করেছেন তারা।

বন্দরবাজারের শ্রমিক হাটে কথা হয় সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা ৩৫ বছরের অভিজ্ঞ নির্মাণশ্রমিক বশির মিয়ার সঙ্গে। কর্মজীবনের শুরুতে ২৫ টাকা মজুরিতে কাজ করা বশির জানান, আগে প্রতিদিন কাজ মিলত, কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। তিনি জানান, নির্মাণকাজে আগে বালু-সিমেন্ট মেশানো, ওপরে মালামাল তোলা, পানি আনা এবং মালামাল বহনের জন্য অনেক মানুষের প্রয়োজন হতো। বর্তমানে যন্ত্রের ব্যবহারের ফলে সেই কাজের চাহিদা কমেছে। এই পরিবর্তনের কারণেই আগের মতো দৈনিক কাজ পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন বশির। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার বাসিন্দা রোশনা বেগমের তিন সন্তান। তার ছেলে বর্তমানে ইন্টারমিডিয়েটে পড়াশোনা করছেন। পড়াশোনা শেষ করে সন্তানরা চাকরি পাবেন কি না, তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি। তার কথায় উঠে আসে শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘশ্বাস, সন্তানদের নিয়ে স্বপ্ন এবং সেই স্বপ্ন পূরণের পথে প্রতিদিনের সংগ্রাম।

কিশোরগঞ্জ থেকে সিলেটে আসা বাবুল মিয়া জানালেন, পুরুষ শ্রমিকদের জন্য দৈনিক ৮০০ টাকা এবং নারী শ্রমিকদের জন্য ৬০০ টাকা মজুরি নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে তা পাওয়া কঠিন। অনেক সময় কাজ পেতে ৫০০ টাকা মজুরিতেই রাজি হতে হয় তাদের। এই সামান্য আয় থেকে খাবার খরচ ও সংসারের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হয় শ্রমজীবী পরিবারগুলোকে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে বাসাভাড়া, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের পর তাদের হাতে সঞ্চয় কিছুই থাকে না। তিনি জানান, একজন পুরুষ শ্রমিককে সাধারণত আট ঘণ্টা কাজ করে দৈনিক ৮০০ টাকা মজুরি দেওয়া হয়। একদিকে কাজের অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দাম-দুইয়ের চাপে দিশাহারা শ্রমজীবী পরিবারগুলো।

শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণের বিষয়ে সিলেট আঞ্চলিক শ্রম অধিদপ্তরের শ্রম কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, কোনো শ্রমিক কর্মস্থলে দুর্ঘটনার শিকার হলে বা আহত হলে আর্থিক সহায়তার জন্য অধিদপ্তরে আবেদন করতে হয়। আবেদনের পর সেটি যথাযথ প্রক্রিয়ায় মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় এবং অনুদান অনুমোদনের পর সংশ্লিষ্ট শ্রমিক আর্থিক সহায়তা পান। কিন্তু কাজের অনিশ্চয়তা আর জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধিতে এই অসহায় শ্রমজীবীদের কষ্টের শেষ নেই। সন্তানদের পড়ালেখার খরচ জোগাতে স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই শ্রম বিক্রি করতে হচ্ছে।

Public Voice

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬


সিলেটের শ্রমিক হাটে কাজের সন্ধানে ভিড়, দুশ্চিন্তায় দিনমজুরেরা

প্রকাশের তারিখ : ৩০ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

সকাল হলেই জীবনযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হয় ৪৩ বছর বয়সি রোশনা বেগমকে। সকাল হলেই ঘুম থেকে উঠে দিনমজুরের কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন ৪৩ বছর বয়সি রোশনা বেগম।

সংসার চালাতে স্বামীর পাশাপাশি প্রায় এক দশক ধরে দিনমজুরের কাজ করে আসছেন তিনি। প্রতিদিন তার গন্তব্য সিলেট নগরীর মদিনা মার্কেট এলাকার সড়কসংলগ্ন শ্রমিক হাট। কাজ মিললে দিনে ৬০০ টাকা আয় হয় তার, যার মধ্যে ১০০ টাকাই ব্যয় হয়ে যায় দুপুরের খাবারের পেছনে। তবে প্রতিদিন কাজ জোটে না, আর কাজ না পেলে ফিরতে হয় খালি হাতে। অভাবের সংসারে সন্তানদের পড়াশোনা করিয়েছেন রোশনা। তার বড় মেয়ে স্নাতক পাস করেও চাকরি না পাওয়ায় অবশেষে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি গভীর অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। সংসারের অভাব মেটাতে স্বামীর পাশাপাশি প্রায় ১০ বছর ধরে তিনিও ছুটছেন কাজের সন্ধানে। সেখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন কাজের সন্ধানে। নিজের জীবনের কষ্টকে সঙ্গী করেই সন্তানদের লেখাপড়া করিয়েছেন রোশনা বেগম। তার স্বপ্ন ছিল, সন্তানদের কেউ যেন তার মতো দিনমজুরের জীবন বেছে নিতে বাধ্য না হয়। তার বড় মেয়ে ধর্মপাশা কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেছেন। তিনি জানান, একসময় প্রায় প্রতিদিনই কাজ পাওয়া যেত। ফলে প্রতিদিনই অনেকে কাজ না পেয়ে ফিরে যান।

সিলেট নগরীর আম্বরখানা, বন্দরবাজার, উপশহর, শিবগঞ্জ, টিলাগড় ও মেডিকেল রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অন্তত ১০ থেকে ১৫টি শ্রমিক হাট। সকাল ৭টা থেকে ১০টা পর্যন্ত এসব স্থানে ভিড় করেন শ্রমজীবী মানুষ। শ্রমিকদের তথ্যমতে, প্রতিটি হাটে প্রতিদিন দুই থেকে তিনশ শ্রমিকের সমাগম ঘটে। তবে শ্রমিকের তুলনায় কাজের সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেককে প্রতিদিন খালি হাতে ফিরতে হয়। কোনো কোনো দিন প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শ্রমিকই কোনো কাজ পান না বলে দাবি করেছেন তারা।

বন্দরবাজারের শ্রমিক হাটে কথা হয় সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা ৩৫ বছরের অভিজ্ঞ নির্মাণশ্রমিক বশির মিয়ার সঙ্গে। কর্মজীবনের শুরুতে ২৫ টাকা মজুরিতে কাজ করা বশির জানান, আগে প্রতিদিন কাজ মিলত, কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। তিনি জানান, নির্মাণকাজে আগে বালু-সিমেন্ট মেশানো, ওপরে মালামাল তোলা, পানি আনা এবং মালামাল বহনের জন্য অনেক মানুষের প্রয়োজন হতো। বর্তমানে যন্ত্রের ব্যবহারের ফলে সেই কাজের চাহিদা কমেছে। এই পরিবর্তনের কারণেই আগের মতো দৈনিক কাজ পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন বশির। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার বাসিন্দা রোশনা বেগমের তিন সন্তান। তার ছেলে বর্তমানে ইন্টারমিডিয়েটে পড়াশোনা করছেন। পড়াশোনা শেষ করে সন্তানরা চাকরি পাবেন কি না, তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি। তার কথায় উঠে আসে শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘশ্বাস, সন্তানদের নিয়ে স্বপ্ন এবং সেই স্বপ্ন পূরণের পথে প্রতিদিনের সংগ্রাম।

কিশোরগঞ্জ থেকে সিলেটে আসা বাবুল মিয়া জানালেন, পুরুষ শ্রমিকদের জন্য দৈনিক ৮০০ টাকা এবং নারী শ্রমিকদের জন্য ৬০০ টাকা মজুরি নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে তা পাওয়া কঠিন। অনেক সময় কাজ পেতে ৫০০ টাকা মজুরিতেই রাজি হতে হয় তাদের। এই সামান্য আয় থেকে খাবার খরচ ও সংসারের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হয় শ্রমজীবী পরিবারগুলোকে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে বাসাভাড়া, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের পর তাদের হাতে সঞ্চয় কিছুই থাকে না। তিনি জানান, একজন পুরুষ শ্রমিককে সাধারণত আট ঘণ্টা কাজ করে দৈনিক ৮০০ টাকা মজুরি দেওয়া হয়। একদিকে কাজের অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দাম-দুইয়ের চাপে দিশাহারা শ্রমজীবী পরিবারগুলো।

শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণের বিষয়ে সিলেট আঞ্চলিক শ্রম অধিদপ্তরের শ্রম কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, কোনো শ্রমিক কর্মস্থলে দুর্ঘটনার শিকার হলে বা আহত হলে আর্থিক সহায়তার জন্য অধিদপ্তরে আবেদন করতে হয়। আবেদনের পর সেটি যথাযথ প্রক্রিয়ায় মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় এবং অনুদান অনুমোদনের পর সংশ্লিষ্ট শ্রমিক আর্থিক সহায়তা পান। কিন্তু কাজের অনিশ্চয়তা আর জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধিতে এই অসহায় শ্রমজীবীদের কষ্টের শেষ নেই। সন্তানদের পড়ালেখার খরচ জোগাতে স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই শ্রম বিক্রি করতে হচ্ছে।


Public Voice

সম্পাদক: মোঃ বাদশাহ আলমগীর
প্রকাশক: অনন্যা অনসূয়া দিবা

কপিরাইট © ২০২৬ Public Voice । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত