আর্কাইভ
কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আঙিনায় পা রাখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। চারপাশে সারি সারি দেবদারু, বাহারি ফুলগাছ, নান্দনিক ভবন আর বিশাল পুকুর দেখে মনে হয় কোনো মনোরম রিসোর্ট। তবে হাসপাতালের প্রধান ফটকের ভেতরে ঢুকলেই পরিস্থিতি ভিন্ন। নান্দনিক পরিবেশের আড়ালে হাসপাতালটি এখন তীব্র জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটে জর্জরিত। তবে প্রধান ফটকের বামে ঝুলানো জরুরি বিভাগের সাইনবোর্ড ও রোগীদের ভিড় দেখলেই সেই ভুল ভেঙে যাবে। কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দু’পাশে সারি সারি দেবদারু ও বাহারি ফুল গাছের মাঝখান দিয়ে পাকা সরু রাস্তা ধরে সামনে এগোতেই চোখে পড়ে ফলজ ও বনজ বৃক্ষের উদ্যান। চারদিকে বহুতল ভবন, পশ্চিমে বাঁধানো ঘাটসহ বিশাল পুকুর ও মসজিদ এবং উত্তরে সারিবদ্ধ আবাসিক ভবন। প্রথম দর্শনে যে কারও মনে হতে পারে এটি কোনো বিনোদন কেন্দ্র বা মনোরম রিসোর্ট। তৈরি করা হয়েছে অত্যন্ত নান্দনিক পরিবেশ। কাটখাল ইউনিয়নের হোসেন আলী বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালের পরিবেশ এত সুন্দর হতে পারে, তা অন্য কোথাও দেখিনি।
দীর্ঘ ৩৮ বছর পর ২০২২ সালে ডা. আব্দুল্লাহ আল শাফির উদ্যোগে হাওর অঞ্চলে প্রথমবারের মতো বিনামূল্যে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার সেবা চালু হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে শল্য চিকিৎসক ও অ্যানাস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ না থাকায় এই কার্যক্রম নিয়মিত চালানো সম্ভব হচ্ছে না। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ৩১টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে বর্তমানে দায়িত্বরত আছেন মাত্র ১২ জন। এছাড়া ৩১টি নার্স ও বয় পদের বিপরীতে মাত্র ১৬ জন কর্মরত, যার মধ্যে ৩ জন প্রেষণে আছেন। মাঠপর্যায়ে ২০ জন স্বাস্থ্য সহকারীর জায়গায় কর্মরত আছেন মাত্র ১১ জন এবং স্বাস্থ্য পরিদর্শকের পদটি দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে আছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডা. শাফির প্রচেষ্টায় হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ৩৮ বছর পর ২০২২ সালে প্রথমবার এই হাওরাঞ্চলে বিনামূল্যে প্রসূতিদের অস্ত্রোপচার (সিজার) চালু করা হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ৩১ জন চিকিৎসকের বিপরীতে বর্তমানে মাত্র ১২ জন কর্মরত আছেন। মাঠপর্যায়ে ২০ জন স্বাস্থ্য সহকারীর বিপরীতে কর্মরত ১১ জন (যার মধ্যে ২ জন সাময়িক বরখাস্ত)। অ্যানাস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ ডা. মরিয়ম আক্তার এক বছরের বেশি সময় ধরে জেলা সদরে প্রেষণে কর্মরত রয়েছেন এবং নেই কোনো গাইনোকোলজিস্টও।
হাসপাতালের বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জনবল সংকটের মধ্যেও প্রতি মাসে প্রায় ৫০০ রোগী ভর্তি হন, এক হাজারের বেশি জরুরি রোগী সেবা নেন এবং বহির্বিভাগে সেবা নেন সাড়ে ৬ হাজার মানুষ। এছাড়া গড়ে ৪ থেকে ৫টি সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। তবে প্রয়োজনীয় কারিগরি টেকনিশিয়ানের অভাবে ডিজিটাল এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাম ও জিন এক্সপার্ট ল্যাবরেটরির মতো আধুনিক যন্ত্রপাতির সুফল রোগীরা পুরোপুরি পাচ্ছেন না। হাসপাতালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই অপ্রতুলতার মধ্যেও প্রতি মাসে গড়ে ৪ থেকে ৫টি সিজার, ৫০০-র বেশি ভর্তি রোগী, ১ হাজার জরুরি রোগী এবং প্রায় সাড়ে ৬ হাজার মানুষ বহির্বিভাগে সেবা নিচ্ছেন। পাশাপাশি বর্তমান এই কর্মকর্তার যোগদানের পর রোগীদের সুবিধার্থে ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন, আল্ট্রাসনোগ্রাম ও জিন এক্সপার্ট ল্যাবরেটরিসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্র বাড়ানো হয়েছে।
হাসপাতালটির নতুন ভবনে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং শিশুদের জন্য রঙিন ডে-কেয়ার সেন্টার গড়ে তোলা হয়েছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে। স্থানীয় রোগী আমেনা বেগম জানান, কম খরচে ভালো চিকিৎসার আশায় তারা এখানে আসেন। তবে জনবলের অভাবে পর্যাপ্ত সেবা না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে অনেককে শহরে ছুটতে হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে বদলে গেছে এই হাসপাতালটির বাহ্যিক চিত্র। নানা রঙের খেলনা, পুতুল, দাবাবোর্ড ও রঙিন কাগজের ফুলের ব্যবহারে সাজানো মনমুগ্ধকর এই সেবাকেন্দ্রগুলো স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুল্লাহ আল শাফি বলেন, সরকারি নির্দেশনায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দিতে আমরা নিরলস চেষ্টা করছি। সংকট থাকা সত্ত্বেও সর্বোচ্চ সেবাদানের বিষয়ে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে পরিস্থিতির উন্নয়নে স্থায়ী জনবল পদায়ন জরুরি। দ্রুত পদায়নের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাইদুর রহমান বলেন, হাওর অঞ্চলে কর্মকর্তাদের যোগদানে অনাগ্রহের বিষয়টি অনস্বীকার্য। তবে সরকার স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন পদে নিয়োগের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করায় এই সংকট স্থায়ী হবে না। শিগগিরই প্রসূতি সেবার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও টেকনোলজিস্ট পদায়ন করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬
কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আঙিনায় পা রাখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। চারপাশে সারি সারি দেবদারু, বাহারি ফুলগাছ, নান্দনিক ভবন আর বিশাল পুকুর দেখে মনে হয় কোনো মনোরম রিসোর্ট। তবে হাসপাতালের প্রধান ফটকের ভেতরে ঢুকলেই পরিস্থিতি ভিন্ন। নান্দনিক পরিবেশের আড়ালে হাসপাতালটি এখন তীব্র জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটে জর্জরিত। তবে প্রধান ফটকের বামে ঝুলানো জরুরি বিভাগের সাইনবোর্ড ও রোগীদের ভিড় দেখলেই সেই ভুল ভেঙে যাবে। কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দু’পাশে সারি সারি দেবদারু ও বাহারি ফুল গাছের মাঝখান দিয়ে পাকা সরু রাস্তা ধরে সামনে এগোতেই চোখে পড়ে ফলজ ও বনজ বৃক্ষের উদ্যান। চারদিকে বহুতল ভবন, পশ্চিমে বাঁধানো ঘাটসহ বিশাল পুকুর ও মসজিদ এবং উত্তরে সারিবদ্ধ আবাসিক ভবন। প্রথম দর্শনে যে কারও মনে হতে পারে এটি কোনো বিনোদন কেন্দ্র বা মনোরম রিসোর্ট। তৈরি করা হয়েছে অত্যন্ত নান্দনিক পরিবেশ। কাটখাল ইউনিয়নের হোসেন আলী বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালের পরিবেশ এত সুন্দর হতে পারে, তা অন্য কোথাও দেখিনি।
দীর্ঘ ৩৮ বছর পর ২০২২ সালে ডা. আব্দুল্লাহ আল শাফির উদ্যোগে হাওর অঞ্চলে প্রথমবারের মতো বিনামূল্যে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার সেবা চালু হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে শল্য চিকিৎসক ও অ্যানাস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ না থাকায় এই কার্যক্রম নিয়মিত চালানো সম্ভব হচ্ছে না। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ৩১টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে বর্তমানে দায়িত্বরত আছেন মাত্র ১২ জন। এছাড়া ৩১টি নার্স ও বয় পদের বিপরীতে মাত্র ১৬ জন কর্মরত, যার মধ্যে ৩ জন প্রেষণে আছেন। মাঠপর্যায়ে ২০ জন স্বাস্থ্য সহকারীর জায়গায় কর্মরত আছেন মাত্র ১১ জন এবং স্বাস্থ্য পরিদর্শকের পদটি দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে আছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডা. শাফির প্রচেষ্টায় হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ৩৮ বছর পর ২০২২ সালে প্রথমবার এই হাওরাঞ্চলে বিনামূল্যে প্রসূতিদের অস্ত্রোপচার (সিজার) চালু করা হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ৩১ জন চিকিৎসকের বিপরীতে বর্তমানে মাত্র ১২ জন কর্মরত আছেন। মাঠপর্যায়ে ২০ জন স্বাস্থ্য সহকারীর বিপরীতে কর্মরত ১১ জন (যার মধ্যে ২ জন সাময়িক বরখাস্ত)। অ্যানাস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ ডা. মরিয়ম আক্তার এক বছরের বেশি সময় ধরে জেলা সদরে প্রেষণে কর্মরত রয়েছেন এবং নেই কোনো গাইনোকোলজিস্টও।
হাসপাতালের বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জনবল সংকটের মধ্যেও প্রতি মাসে প্রায় ৫০০ রোগী ভর্তি হন, এক হাজারের বেশি জরুরি রোগী সেবা নেন এবং বহির্বিভাগে সেবা নেন সাড়ে ৬ হাজার মানুষ। এছাড়া গড়ে ৪ থেকে ৫টি সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। তবে প্রয়োজনীয় কারিগরি টেকনিশিয়ানের অভাবে ডিজিটাল এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাম ও জিন এক্সপার্ট ল্যাবরেটরির মতো আধুনিক যন্ত্রপাতির সুফল রোগীরা পুরোপুরি পাচ্ছেন না। হাসপাতালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই অপ্রতুলতার মধ্যেও প্রতি মাসে গড়ে ৪ থেকে ৫টি সিজার, ৫০০-র বেশি ভর্তি রোগী, ১ হাজার জরুরি রোগী এবং প্রায় সাড়ে ৬ হাজার মানুষ বহির্বিভাগে সেবা নিচ্ছেন। পাশাপাশি বর্তমান এই কর্মকর্তার যোগদানের পর রোগীদের সুবিধার্থে ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন, আল্ট্রাসনোগ্রাম ও জিন এক্সপার্ট ল্যাবরেটরিসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্র বাড়ানো হয়েছে।
হাসপাতালটির নতুন ভবনে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং শিশুদের জন্য রঙিন ডে-কেয়ার সেন্টার গড়ে তোলা হয়েছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে। স্থানীয় রোগী আমেনা বেগম জানান, কম খরচে ভালো চিকিৎসার আশায় তারা এখানে আসেন। তবে জনবলের অভাবে পর্যাপ্ত সেবা না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে অনেককে শহরে ছুটতে হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে বদলে গেছে এই হাসপাতালটির বাহ্যিক চিত্র। নানা রঙের খেলনা, পুতুল, দাবাবোর্ড ও রঙিন কাগজের ফুলের ব্যবহারে সাজানো মনমুগ্ধকর এই সেবাকেন্দ্রগুলো স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুল্লাহ আল শাফি বলেন, সরকারি নির্দেশনায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দিতে আমরা নিরলস চেষ্টা করছি। সংকট থাকা সত্ত্বেও সর্বোচ্চ সেবাদানের বিষয়ে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে পরিস্থিতির উন্নয়নে স্থায়ী জনবল পদায়ন জরুরি। দ্রুত পদায়নের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাইদুর রহমান বলেন, হাওর অঞ্চলে কর্মকর্তাদের যোগদানে অনাগ্রহের বিষয়টি অনস্বীকার্য। তবে সরকার স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন পদে নিয়োগের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করায় এই সংকট স্থায়ী হবে না। শিগগিরই প্রসূতি সেবার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও টেকনোলজিস্ট পদায়ন করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
