শিক্ষা
একসময় শিক্ষার্থীরা তাঁকে দেখলেই ভয়ে পালিয়ে যেত। তাঁর আগমনের খবরেই শ্রেণিকক্ষে তৈরি হতো একধরনের আতঙ্ক। কঠোর শাসনের জন্য পরিচিত সেই শিক্ষিকাই একসময় হয়ে উঠেছিলেন এক শিক্ষার্থীর শৈশবের সবচেয়ে নির্ভরতার মানুষ। সেই শিক্ষার্থীর নাম মারুফ আল মাহমুদ। আর তাঁর প্রিয় শিক্ষিকা কল্পনা সাহা।
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার দরগাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন কল্পনা সাহা। দীর্ঘ ৩১ বছর শিক্ষকতা শেষে সম্প্রতি অবসরে গেছেন তিনি। তাঁর বিদায়বেলায় আবেগাপ্লুত হয়ে নিজের শৈশব, শিক্ষাজীবন এবং শিক্ষিকার সঙ্গে গড়ে ওঠা দীর্ঘ সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করেছেন সাবেক শিক্ষার্থী মারুফ আল মাহমুদ।
মারুফের স্মৃতিতে, তাঁদের বাড়ির বৈঠকঘরেই একসময় পরিচালিত হতো ব্র্যাক স্কুল। শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হতো সেখানে। পরে তারা ভর্তি হতো দরগাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ছোটবেলায় মারুফও অপেক্ষা করতেন, কবে ব্র্যাক স্কুল পেরিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ হবে।
একদিন বাবার হাত ধরে স্কুলে গেলে শিক্ষক হাশেম স্যার মজা করে বলেছিলেন, ‘কান ধরতে পারে না, আসছে স্কুল পড়তে!’ সেদিনই প্রথম কল্পনা সাহার সঙ্গে তাঁর চোখাচোখি হয়। কল্পনা সাহা স্নেহভরে তাঁকে কাছে টেনে বলেছিলেন, ‘আরেকটু বড়ো হতে হবে। তারপরই এখানে চলে আসবা।’
পরিবারের অন্য ভাইবোনদেরও ছাত্রী হিসেবে পেয়েছিলেন কল্পনা সাহা। ফলে তাঁদের বাড়িতে শিক্ষিকাকে নিয়ে আলোচনা ছিল নিয়মিত। একসময় বয়স বাড়ল, স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগও হলো মারুফের।
স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে শিক্ষিকার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। কঠোর শাসনের জন্য পরিচিত কল্পনা সাহার কাছের শিক্ষার্থীদের একজন হয়ে ওঠেন তিনি। স্কুলের নানা কাজে সহযোগিতা করতে করতে একপর্যায়ে হয়ে ওঠেন বিদ্যালয়ের অঘোষিত দপ্তরি।
বিদ্যালয়ে তখন কোনো দারোয়ান বা দপ্তরি ছিলেন না। সব কক্ষের চাবি কোথায় থাকে, তা জানা ছিল মারুফের। পরীক্ষার খাতায় সিল মারা, সরকারি বিস্কুট বিতরণ, ক্লাস শেষে কক্ষগুলোর দরজা-জানালা বন্ধ আছে কি না, তা দেখে আসা—এসব কাজেই শিক্ষিকাকে সহযোগিতা করতেন তিনি।
দুষ্টুমির কারণে তাঁর নামে অভিযোগও আসত নিয়মিত। তবে অন্য শিক্ষার্থীদের মতো তাঁকে কখনো শাসন বা মারধর করেননি কল্পনা সাহা। অভিযোগ পেলে একান্তে কক্ষে ডেকে নিয়ে আদর-সোহাগের সঙ্গে বুঝিয়ে বলতেন, ‘সব ছেলেদের মতো হলে চলবে না, মারুফ!’
পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় একদিন কল্পনা সাহা তাঁকে বলেছিলেন, ‘মারুফ, তুমি তো মাদ্রাসায় চলে যাবা। সেখানে গিয়ে কি আমাকে ভুলে যাবা?’ সেদিন কোনো উত্তর দিতে পারেননি মারুফ। মাদ্রাসায় যাওয়ার আগে শেষবার দেখা করতে গেলে শিক্ষিকা তাঁকে বলেছিলেন, ‘তোমাকে এএএতো বড়ো হুজুর হতে হবে, যেন মানুষকে গর্ব করে বলতে পারি—ওই যে আমার মারুফ! আর হ্যাঁ, ফাইভের পরীক্ষা কিন্তু দিতে হবে।’
মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পরও শিক্ষিকার সঙ্গে সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হয়নি। ছুটিতে বাড়ি এসে একদিন স্কুলে গেলে মারুফের পরনে ছিল স্কুলের নির্ধারিত সবুজ শার্ট-প্যান্ট। তাঁকে দেখে কল্পনা সাহা বলেছিলেন, ‘আমার মারুফ আইছে!’
এরপর কাছে ডেকে কানে কানে বলেছিলেন, ‘তোমাকে মাদ্রাসায় পাঠাইছে এমনে দেহনের লাইজ্ঞা? পাঞ্জাবি-পায়জামা কই? যাও, বাড়ি থেইকা দৌড় দিয়া পাঞ্জাবি পরে আসো। তোমার নূরানি চেহারাটা দেখব!’
পরে পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে ফিরে এলে মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘এই তো! মাশাআল্লাহ! সুন্দর লাগে!’
মারুফের ভাষায়, ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে একজন শিক্ষার্থীর প্রতি এমন অকৃত্রিম ভালোবাসা ও অসাম্প্রদায়িক মমত্ববোধ তিনি কল্পনা সাহার মধ্যেই দেখেছেন। মাদ্রাসা থেকে বাড়িতে ফিরলে জানালার ফাঁক দিয়ে তাঁকে দেখতেন শিক্ষিকা। এক-দুই দিন দেখা না হলে নিজেই ডাক পাঠাতেন। কাছে পেলে বলতেন, ‘দিদিকে বুঝি ভুলে গেছ?’
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ হয়েছে প্রায় ১৫ বছর আগে। কিন্তু এত বছর পরও স্কুলের অফিসকক্ষে প্রবেশ করলে কল্পনা সাহার মুখে শোনা যেত সেই পরিচিত ডাক—‘এই তো আমার মারুফ আইছে!’ বিদ্যালয়ের নতুন-পুরোনো শিক্ষকদের কাছেও মারুফ ছিলেন শিক্ষিকার অত্যন্ত স্নেহভাজন সাবেক শিক্ষার্থী।
অবসরের আগে গত মাসে একদিন মারুফকে ডেকে কল্পনা সাহা বলেছিলেন, ‘মারুফ, আমার দিন তো শেষ। আগামী মাসের ২৯ তারিখ বিদায় নিবো। তুমি কিন্তু থাকবা!’ এরপর একাধিকবার তাঁকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা মনে করিয়ে দেন। এমনকি বিদায় অনুষ্ঠানের শুরুতে কোরআন তেলাওয়াত করার দায়িত্বও দেন।
মারুফ জানান, নামাজে ইমামতি করা ছাড়া জনসমক্ষে দাঁড়িয়ে কোরআন তেলাওয়াত করার অভিজ্ঞতা তাঁর আগে ছিল না। তবু শিক্ষিকার কথা রেখেছেন। বিদায় অনুষ্ঠানের শুরুতে কোরআন তেলাওয়াত করেছেন এবং পুরো অনুষ্ঠানজুড়েই তাঁর পাশে ছিলেন।
বিদায় অনুষ্ঠানে সারাদিন কল্পনা সাহা বারবার ‘মারুফ, মারুফ’ বলে ডাকছিলেন। সেই ডাক শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। অনেক কথা বলতে চেয়েও বলতে পারেননি। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষাও খুঁজে পাননি।
মারুফের উপলব্ধি, ৩১ বছর ধরে একটি গ্রামকে আলোকিত করতে নিজের শ্রম, মেধা ও সময় বিলিয়ে দিয়েছেন কল্পনা সাহা। নীরবে সয়েছেন নানা প্রতিকূলতা। গড়ে তুলেছেন অসংখ্য শিক্ষার্থী, যাঁদের অনেককেই নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছেন। তাঁর এই অবদানের ঋণ কয়েকটি প্রজন্মের পক্ষেও শোধ করা কঠিন।
বিদায়বেলায় তাই মারুফের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে একটাই প্রশ্ন—এখন থেকে স্কুলের সামনে দিয়ে গেলে কে আর জানালার ফাঁক দিয়ে তাঁকে দেখে ডাকবেন? কে বলবেন, ‘মারুফ কি আমাকে ভুলে গেছে?’ কিংবা ‘এই যে, আমার মারুফ আসছে!’
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে মারুফ বলেন, কল্পনা সাহা অবসর নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর জীবনে শিক্ষিকার জায়গাটি কখনো অবসর নেবে না। তিনি থেকে যাবেন শৈশবের স্কুলের বারান্দায়, সেই জানালার ফাঁকে, সবুজ শার্ট-প্যান্ট পরা ছোট্ট মারুফের স্মৃতিতে এবং সবচেয়ে বেশি তাঁর সেই চিরচেনা ডাকে।
বিদায়বেলায় প্রিয় শিক্ষিকার উদ্দেশে মারুফের প্রার্থনা, তাঁর অবসরজীবন যেন সুস্থ, শান্তিময় ও সুন্দর হয়। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা অসংখ্য মানুষের ভালোবাসাই হোক জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।
আর কোনো একদিন, কোনো এক পথের মোড়ে দেখা হলে শিক্ষিকা যেন আগের মতোই বলে ওঠেন—
‘এই যে, আমার মারুফ আসছে!’
কারণ, কিছু সম্পর্কের কোনো অবসর নেই। কিছু মানুষের কাছে মানুষ সত্যিই এক জীবনের ঋণী হয়ে থাকে।

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ অক্টোবর ২০২৬
একসময় শিক্ষার্থীরা তাঁকে দেখলেই ভয়ে পালিয়ে যেত। তাঁর আগমনের খবরেই শ্রেণিকক্ষে তৈরি হতো একধরনের আতঙ্ক। কঠোর শাসনের জন্য পরিচিত সেই শিক্ষিকাই একসময় হয়ে উঠেছিলেন এক শিক্ষার্থীর শৈশবের সবচেয়ে নির্ভরতার মানুষ। সেই শিক্ষার্থীর নাম মারুফ আল মাহমুদ। আর তাঁর প্রিয় শিক্ষিকা কল্পনা সাহা।
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার দরগাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন কল্পনা সাহা। দীর্ঘ ৩১ বছর শিক্ষকতা শেষে সম্প্রতি অবসরে গেছেন তিনি। তাঁর বিদায়বেলায় আবেগাপ্লুত হয়ে নিজের শৈশব, শিক্ষাজীবন এবং শিক্ষিকার সঙ্গে গড়ে ওঠা দীর্ঘ সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করেছেন সাবেক শিক্ষার্থী মারুফ আল মাহমুদ।
মারুফের স্মৃতিতে, তাঁদের বাড়ির বৈঠকঘরেই একসময় পরিচালিত হতো ব্র্যাক স্কুল। শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হতো সেখানে। পরে তারা ভর্তি হতো দরগাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ছোটবেলায় মারুফও অপেক্ষা করতেন, কবে ব্র্যাক স্কুল পেরিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ হবে।
একদিন বাবার হাত ধরে স্কুলে গেলে শিক্ষক হাশেম স্যার মজা করে বলেছিলেন, ‘কান ধরতে পারে না, আসছে স্কুল পড়তে!’ সেদিনই প্রথম কল্পনা সাহার সঙ্গে তাঁর চোখাচোখি হয়। কল্পনা সাহা স্নেহভরে তাঁকে কাছে টেনে বলেছিলেন, ‘আরেকটু বড়ো হতে হবে। তারপরই এখানে চলে আসবা।’
পরিবারের অন্য ভাইবোনদেরও ছাত্রী হিসেবে পেয়েছিলেন কল্পনা সাহা। ফলে তাঁদের বাড়িতে শিক্ষিকাকে নিয়ে আলোচনা ছিল নিয়মিত। একসময় বয়স বাড়ল, স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগও হলো মারুফের।
স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে শিক্ষিকার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। কঠোর শাসনের জন্য পরিচিত কল্পনা সাহার কাছের শিক্ষার্থীদের একজন হয়ে ওঠেন তিনি। স্কুলের নানা কাজে সহযোগিতা করতে করতে একপর্যায়ে হয়ে ওঠেন বিদ্যালয়ের অঘোষিত দপ্তরি।
বিদ্যালয়ে তখন কোনো দারোয়ান বা দপ্তরি ছিলেন না। সব কক্ষের চাবি কোথায় থাকে, তা জানা ছিল মারুফের। পরীক্ষার খাতায় সিল মারা, সরকারি বিস্কুট বিতরণ, ক্লাস শেষে কক্ষগুলোর দরজা-জানালা বন্ধ আছে কি না, তা দেখে আসা—এসব কাজেই শিক্ষিকাকে সহযোগিতা করতেন তিনি।
দুষ্টুমির কারণে তাঁর নামে অভিযোগও আসত নিয়মিত। তবে অন্য শিক্ষার্থীদের মতো তাঁকে কখনো শাসন বা মারধর করেননি কল্পনা সাহা। অভিযোগ পেলে একান্তে কক্ষে ডেকে নিয়ে আদর-সোহাগের সঙ্গে বুঝিয়ে বলতেন, ‘সব ছেলেদের মতো হলে চলবে না, মারুফ!’
পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় একদিন কল্পনা সাহা তাঁকে বলেছিলেন, ‘মারুফ, তুমি তো মাদ্রাসায় চলে যাবা। সেখানে গিয়ে কি আমাকে ভুলে যাবা?’ সেদিন কোনো উত্তর দিতে পারেননি মারুফ। মাদ্রাসায় যাওয়ার আগে শেষবার দেখা করতে গেলে শিক্ষিকা তাঁকে বলেছিলেন, ‘তোমাকে এএএতো বড়ো হুজুর হতে হবে, যেন মানুষকে গর্ব করে বলতে পারি—ওই যে আমার মারুফ! আর হ্যাঁ, ফাইভের পরীক্ষা কিন্তু দিতে হবে।’
মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পরও শিক্ষিকার সঙ্গে সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হয়নি। ছুটিতে বাড়ি এসে একদিন স্কুলে গেলে মারুফের পরনে ছিল স্কুলের নির্ধারিত সবুজ শার্ট-প্যান্ট। তাঁকে দেখে কল্পনা সাহা বলেছিলেন, ‘আমার মারুফ আইছে!’
এরপর কাছে ডেকে কানে কানে বলেছিলেন, ‘তোমাকে মাদ্রাসায় পাঠাইছে এমনে দেহনের লাইজ্ঞা? পাঞ্জাবি-পায়জামা কই? যাও, বাড়ি থেইকা দৌড় দিয়া পাঞ্জাবি পরে আসো। তোমার নূরানি চেহারাটা দেখব!’
পরে পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে ফিরে এলে মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘এই তো! মাশাআল্লাহ! সুন্দর লাগে!’
মারুফের ভাষায়, ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে একজন শিক্ষার্থীর প্রতি এমন অকৃত্রিম ভালোবাসা ও অসাম্প্রদায়িক মমত্ববোধ তিনি কল্পনা সাহার মধ্যেই দেখেছেন। মাদ্রাসা থেকে বাড়িতে ফিরলে জানালার ফাঁক দিয়ে তাঁকে দেখতেন শিক্ষিকা। এক-দুই দিন দেখা না হলে নিজেই ডাক পাঠাতেন। কাছে পেলে বলতেন, ‘দিদিকে বুঝি ভুলে গেছ?’
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ হয়েছে প্রায় ১৫ বছর আগে। কিন্তু এত বছর পরও স্কুলের অফিসকক্ষে প্রবেশ করলে কল্পনা সাহার মুখে শোনা যেত সেই পরিচিত ডাক—‘এই তো আমার মারুফ আইছে!’ বিদ্যালয়ের নতুন-পুরোনো শিক্ষকদের কাছেও মারুফ ছিলেন শিক্ষিকার অত্যন্ত স্নেহভাজন সাবেক শিক্ষার্থী।
অবসরের আগে গত মাসে একদিন মারুফকে ডেকে কল্পনা সাহা বলেছিলেন, ‘মারুফ, আমার দিন তো শেষ। আগামী মাসের ২৯ তারিখ বিদায় নিবো। তুমি কিন্তু থাকবা!’ এরপর একাধিকবার তাঁকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা মনে করিয়ে দেন। এমনকি বিদায় অনুষ্ঠানের শুরুতে কোরআন তেলাওয়াত করার দায়িত্বও দেন।
মারুফ জানান, নামাজে ইমামতি করা ছাড়া জনসমক্ষে দাঁড়িয়ে কোরআন তেলাওয়াত করার অভিজ্ঞতা তাঁর আগে ছিল না। তবু শিক্ষিকার কথা রেখেছেন। বিদায় অনুষ্ঠানের শুরুতে কোরআন তেলাওয়াত করেছেন এবং পুরো অনুষ্ঠানজুড়েই তাঁর পাশে ছিলেন।
বিদায় অনুষ্ঠানে সারাদিন কল্পনা সাহা বারবার ‘মারুফ, মারুফ’ বলে ডাকছিলেন। সেই ডাক শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। অনেক কথা বলতে চেয়েও বলতে পারেননি। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষাও খুঁজে পাননি।
মারুফের উপলব্ধি, ৩১ বছর ধরে একটি গ্রামকে আলোকিত করতে নিজের শ্রম, মেধা ও সময় বিলিয়ে দিয়েছেন কল্পনা সাহা। নীরবে সয়েছেন নানা প্রতিকূলতা। গড়ে তুলেছেন অসংখ্য শিক্ষার্থী, যাঁদের অনেককেই নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছেন। তাঁর এই অবদানের ঋণ কয়েকটি প্রজন্মের পক্ষেও শোধ করা কঠিন।
বিদায়বেলায় তাই মারুফের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে একটাই প্রশ্ন—এখন থেকে স্কুলের সামনে দিয়ে গেলে কে আর জানালার ফাঁক দিয়ে তাঁকে দেখে ডাকবেন? কে বলবেন, ‘মারুফ কি আমাকে ভুলে গেছে?’ কিংবা ‘এই যে, আমার মারুফ আসছে!’
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে মারুফ বলেন, কল্পনা সাহা অবসর নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর জীবনে শিক্ষিকার জায়গাটি কখনো অবসর নেবে না। তিনি থেকে যাবেন শৈশবের স্কুলের বারান্দায়, সেই জানালার ফাঁকে, সবুজ শার্ট-প্যান্ট পরা ছোট্ট মারুফের স্মৃতিতে এবং সবচেয়ে বেশি তাঁর সেই চিরচেনা ডাকে।
বিদায়বেলায় প্রিয় শিক্ষিকার উদ্দেশে মারুফের প্রার্থনা, তাঁর অবসরজীবন যেন সুস্থ, শান্তিময় ও সুন্দর হয়। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা অসংখ্য মানুষের ভালোবাসাই হোক জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।
আর কোনো একদিন, কোনো এক পথের মোড়ে দেখা হলে শিক্ষিকা যেন আগের মতোই বলে ওঠেন—
‘এই যে, আমার মারুফ আসছে!’
কারণ, কিছু সম্পর্কের কোনো অবসর নেই। কিছু মানুষের কাছে মানুষ সত্যিই এক জীবনের ঋণী হয়ে থাকে।
