অর্থনীতি-ব্যাবসাঅর্থনীতি-ব্যাবসা

ঋণজালের জালে বন্দি অর্থনীতি: ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখি হতে পারবে কি বিএনপি?

রিপন আলী
রিপন আলী নিজস্ব প্রতিবেদক
|
শেয়ার করুন
অ+ অ-
ঋণজালের জালে বন্দি অর্থনীতি: ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখি হতে পারবে কি বিএনপি?
টাকার মান হ্রাস এবং ঋণের বোঝা—সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এখন খাদের কিনারায়।"

বাংলাদেশ এখন এক কঠিন অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে গগনচুম্বী বৈদেশিক ঋণ, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাতের নড়বড়ে অবস্থা—সব মিলিয়ে অর্থনীতির নাভিশ্বাস দশা। বিশেষ করে বিগত দেড় দশকের পুঞ্জীভূত ঋণ এবং মেগা প্রজেক্টের নামে নেওয়া কঠিন শর্তের ঋণের বোঝা এখন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতার কেন্দ্রে আসা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এই পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষ ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে চলছে ব্যাপক বিশ্লেষণ।

​ঋণের পাহাড়: বর্তমান চিত্র

​আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ এখন ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর বড় অংশই ব্যয় হয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেট্রোরেল ও কর্ণফুলী টানেলের মতো বড় প্রকল্পগুলোতে। যদিও এসব অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয়, কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পের অতিরিক্ত ব্যয় এবং দুর্নীতির কারণে ঋণের বোঝা সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে।

​শুধু বৈদেশিক ঋণই নয়, অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাত থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণও রেকর্ড ছাড়িয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রাক্কালে দেখা যাচ্ছে, বাজেটের একটি বিশাল অংশ কেবল ঋণের সুদ মেটাতেই ব্যয় করতে হচ্ছে।

​দায়ী কে?

​অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতো বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অপরিকল্পিত মেগা প্রজেক্ট এবং আর্থিক খাতে সুশাসনের অভাবই বর্তমান সংকটের মূল কারণ। ঋণের বিপরীতে যে আয় হওয়ার কথা ছিল, অনেক ক্ষেত্রে তা দৃশ্যমান নয়। এছাড়া পাচারকৃত বিপুল পরিমাণ অর্থ এবং খেলাপি ঋণের পাহাড় দেশের ব্যাংক ব্যবস্থাকে ভঙ্গুর করে দিয়েছে।

​বিএনপির সামনে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ

​নির্বাচনী ইশতেহার এবং পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থানে বিএনপি বারবারই দাবি করেছে, তারা ক্ষমতায় এলে অর্থনীতির এই ভগ্নদশা সংস্কার করবে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কতটা বাস্তবসম্মত?

​১. আর্থিক খাত সংস্কার: বিএনপি তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে একটি 'অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন' গঠনের কথা বলেছে। ব্যাংকিং খাতের লুটপাট বন্ধ এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া তাদের জন্য হবে এসিড টেস্ট।

২. আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের শর্ত: বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর ঋণের কিস্তি পেতে হলে ভর্তুকি কমানো এবং রাজস্ব বাড়ানোর যে শর্ত রয়েছে, তা পূরণ করতে গিয়ে জনগণের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে কি না, সেটি বড় দুশ্চিন্তার বিষয়।

৩. বিনিয়োগ বৃদ্ধি: বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা বিএনপির জন্য প্রধান অগ্রাধিকার হবে।

​বিশ্লেষকদের মতামত

​সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষকদের মতে, বিএনপিকে কেবল রাজনৈতিক শক্তি দিয়ে নয়, বরং গভীর অর্থনৈতিক দক্ষতা দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। জনগণের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা হবে এক বিশাল কঠিন কাজ।

​জনগণের প্রত্যাশা

​রাস্তার সাধারণ মানুষ কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী—সবারই একই চাওয়া: নিত্যপণ্যের দাম কমানো এবং স্থিতিশীল অর্থনীতি। বিএনপি যদি দ্রুত বিনিয়োগ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে পারে এবং পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারে, তবেই এই ঋণের জাল থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।

​উপসংহার: বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন আইসিইউতে। ঋণের এই বিশাল পাথর সরিয়ে দেশকে সমৃদ্ধির পথে ফেরাতে হলে কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়, প্রয়োজন হবে দীর্ঘমেয়াদী এবং বাস্তবমুখী মহাপরিকল্পনা। বিএনপি এই পরীক্ষায় কতটুকু সফল হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

Public Voice

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬


ঋণজালের জালে বন্দি অর্থনীতি: ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখি হতে পারবে কি বিএনপি?

প্রকাশের তারিখ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশ এখন এক কঠিন অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে গগনচুম্বী বৈদেশিক ঋণ, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাতের নড়বড়ে অবস্থা—সব মিলিয়ে অর্থনীতির নাভিশ্বাস দশা। বিশেষ করে বিগত দেড় দশকের পুঞ্জীভূত ঋণ এবং মেগা প্রজেক্টের নামে নেওয়া কঠিন শর্তের ঋণের বোঝা এখন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতার কেন্দ্রে আসা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এই পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষ ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে চলছে ব্যাপক বিশ্লেষণ।

​ঋণের পাহাড়: বর্তমান চিত্র

​আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ এখন ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর বড় অংশই ব্যয় হয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেট্রোরেল ও কর্ণফুলী টানেলের মতো বড় প্রকল্পগুলোতে। যদিও এসব অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয়, কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পের অতিরিক্ত ব্যয় এবং দুর্নীতির কারণে ঋণের বোঝা সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে।

​শুধু বৈদেশিক ঋণই নয়, অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাত থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণও রেকর্ড ছাড়িয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রাক্কালে দেখা যাচ্ছে, বাজেটের একটি বিশাল অংশ কেবল ঋণের সুদ মেটাতেই ব্যয় করতে হচ্ছে।

​দায়ী কে?

​অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতো বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অপরিকল্পিত মেগা প্রজেক্ট এবং আর্থিক খাতে সুশাসনের অভাবই বর্তমান সংকটের মূল কারণ। ঋণের বিপরীতে যে আয় হওয়ার কথা ছিল, অনেক ক্ষেত্রে তা দৃশ্যমান নয়। এছাড়া পাচারকৃত বিপুল পরিমাণ অর্থ এবং খেলাপি ঋণের পাহাড় দেশের ব্যাংক ব্যবস্থাকে ভঙ্গুর করে দিয়েছে।

​বিএনপির সামনে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ

​নির্বাচনী ইশতেহার এবং পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থানে বিএনপি বারবারই দাবি করেছে, তারা ক্ষমতায় এলে অর্থনীতির এই ভগ্নদশা সংস্কার করবে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কতটা বাস্তবসম্মত?

​১. আর্থিক খাত সংস্কার: বিএনপি তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে একটি 'অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন' গঠনের কথা বলেছে। ব্যাংকিং খাতের লুটপাট বন্ধ এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া তাদের জন্য হবে এসিড টেস্ট।

২. আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের শর্ত: বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর ঋণের কিস্তি পেতে হলে ভর্তুকি কমানো এবং রাজস্ব বাড়ানোর যে শর্ত রয়েছে, তা পূরণ করতে গিয়ে জনগণের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে কি না, সেটি বড় দুশ্চিন্তার বিষয়।

৩. বিনিয়োগ বৃদ্ধি: বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা বিএনপির জন্য প্রধান অগ্রাধিকার হবে।

​বিশ্লেষকদের মতামত

​সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষকদের মতে, বিএনপিকে কেবল রাজনৈতিক শক্তি দিয়ে নয়, বরং গভীর অর্থনৈতিক দক্ষতা দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। জনগণের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা হবে এক বিশাল কঠিন কাজ।

​জনগণের প্রত্যাশা

​রাস্তার সাধারণ মানুষ কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী—সবারই একই চাওয়া: নিত্যপণ্যের দাম কমানো এবং স্থিতিশীল অর্থনীতি। বিএনপি যদি দ্রুত বিনিয়োগ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে পারে এবং পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারে, তবেই এই ঋণের জাল থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।

​উপসংহার: বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন আইসিইউতে। ঋণের এই বিশাল পাথর সরিয়ে দেশকে সমৃদ্ধির পথে ফেরাতে হলে কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়, প্রয়োজন হবে দীর্ঘমেয়াদী এবং বাস্তবমুখী মহাপরিকল্পনা। বিএনপি এই পরীক্ষায় কতটুকু সফল হবে, তা সময়ই বলে দেবে।


Public Voice

সম্পাদক: মোঃ বাদশাহ আলমগীর
প্রকাশক: অনন্যা অনসূয়া দিবা

কপিরাইট © ২০২৬ Public Voice । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত