ছোট গল্প
জলপাইগুড়ির অতি প্রত্যান্ত অঞ্চলের অজানা একটি পহাড়ী গ্রাম। শিক্ষা, জ্ঞান, সভ্যতার আলো এখনো যেখানে পৌছায়নি। যদিও এখানে ব্রিটিশ হুকুমত চলে কিন্তু সবাই স্বাধীন। মানুষের জীবন ধারা অতি নিন্ম থেকে নিন্ম শ্রেণির। সেই গ্রামের কাঁচা পথ বেয়ে হেঁটে চলেছেন, কোলকাতার এক সভ্য, সৌখিন বৃদ্ধ। বয়স নব্বইয়ের কাছাকাছি হলেও যথেষ্ঠ উদ্যমী। নিজ নিজে চলতে পারেন। কারো সাহায্যের প্রয়োজন হয়না। বিকাল বেলায় গ্রামের পথে কয়েকটি বাচ্চাদের হাতে বইখাতা দেখে আগ্রহী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।
তোমাদের এখানেকি পাঠশালা আছে?
না, নেই।
তাহলে তোমাদের হাতে যে, বইখাতা। তোমরা কি পড়াশোনা কর।
হ্যা, আমরা রাঙা দীদার কাছে পড়ি। বেতবাড়ির জয়শ্রীদের বাড়িতে।
বয়সের ভারে তার কথা বলতে কষ্ট হলেও আগ্রহভরে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের রাঙা দীদা হয়তো ঐ বাড়িতেই থাকেন?
না, তিনি কারো বাড়িতে থাকেন না। কারো ঘরেও উঠেন না। বাইরে দাঁড়িয়ে পড়ান, বাইরে থেকেই চলে যান।
কথাটা শোনা মাত্রই কোনো এক অজানা আতঙ্কে শিউরে উঠলেন মানসুর মিঞা। কথা বলার মত স্নায়ুবিক শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। তবুও আত্মশক্তি সঞ্চয় করে বললেন।
কারো বাড়িতে খাইওনা। বাকিতেও পড়ায়না। নিজে রাধে নিজে খায়, এক কাপড়ে জীবন বায়।
একথা তুমি কি করে জানলে দাদু, তুমিকি তাকে চিন?
না! হয়তো চিনিনা। কিন্তু তাকে অনুধাবন করতে পারি। সে যে কোন গুরুর শিষ্য তাও জানি। আচ্ছা বলতে পারো, কোথায় গেলে পাবো তাকে?
এই রাস্তা ধরে সামনে, নদীর তীরে ছোট্ট একটা কুঁড়ে ঘরে সে থাকে। কিন্তু দাদু, ওদিকে যেওনা। ওদিকে যেতে মানা।
মানসুর মিঞা আর কোনো কথা না বলে নীরবে হাটতে লাগলেন। এই পথ তার কত চেনা। জীবনের কতদিন, কতক্ষণ এইপথে হেটেছেন তিনি। হাটতে হাটতে নদীর কাছে পৌছে গেলেন তিনি। নদীর পাড়ে এক বৃদ্ধ নারীর সাথে দেখা হয় তার। অনেক কষ্ট করে হলেও তাকে চিনতে পারে সে। তার ছোটবেলার খেলার সাথী। বাল্যকালে তার হাত ধরে এই নদী, এই পথ, এই মাঠ, এই ক্ষেতধরে কতইনা ছুটে বেড়িয়েছেন তিনি। কিছুক্ষণ কথায় কথায় তারই কিছু স্মৃতিচারণ করলেন দুজনে।
তোমার কি খগেন স্যারের কথা মনে আছে। নদীপাড়ের সেই খগেন্দ্র স্যার।
কেন মনে থাকবে না? আবশ্যই মনে আছে।
না, ভাবলাম,, বয়স হয়েছে, চুল পেঁকে ঝরে যাচ্ছে, দাঁতগুলো প্রায় শেষ হয়ে গেছে, শরীরের চামড়া কুঁচকে মুচড়ে হাড় মাংসের সঙ্গে কোনোমতে ঝুলে আছে। এই বয়সে সেই সত্তর বছর আগের শিশুকালের একজন সাধারণ শিক্ষকের কথাতো মনে থাকার নয়।
সে কথা সঠিকই বলেছো। এই বয়সে বাল্যকালের কারো কথা মনে রাখা খুবই দুঃসাধ্য। তবে খগেন স্যার না হয়ে অন্য কারো কথা বললে হয়তো মনে রাখতে পারতাব না। তাকে মনে রাখার অবশ্য বিশেষ একটা কারন আছে। কেননা তার শিক্ষক জীবনে আমিই একমাত্র ছাত্রী ছিলাম, যার মাথায় হাত রেখে স্যার আশীর্বাদ করেছিলেন। যদিও তার আশীর্বাদ, যা তিনি দিয়েছিলেন তা আমার কাজে আসেনি। বরং তার কছে আমি যা চেয়েছিলাম, তাই শেষ জীবনে এসে উপলব্ধি করতে পারছি। যেদিন স্যার আমার মাথায় হাত রেখে আশির্বাদ করে বলেছিলেন যেন জীবনের শেষ অবদি তোমার সাথেই থাকি। অথচ দেখ, সত্তর বছর পার হয়ে গেল। জীবনে একটি বারের জন্যও তোমার দেখা পেলাম না। বরং তার পায়ের ধূলী নিয়ে আমি যে বলেছিলাম, "স্যার আশীর্বাদ করবেন। যেন আপনার মত হতে পারি।" দেখ? আজ তা-ই সত্য হতে চলেছে। স্যার যেমন নদীপাড়ের ছোট্ট কুঁড়ে ঘরটায় একাকী মরে পড়ে ছিলো। গ্রামের কেউই তার খবর রাখেনি। কাক, শকুন আর পোকামাকড়গগুলোর উপদ্রব তার মৃত্যুর খবর কতদিন পরে গ্রামবাসীর কাছ পৌঁছাতে পেরেছিল তাও কারো জানা নেই। আমার বেলায়ও তেমনি হতে চলেছে। পৃথিবীটা আমার জন্য কত অসহ্য হয়ে উটেছে। হয়তো স্যারের মত নীরবে হুট করে একদিন এই মোহ মায়া ছেড়ে চলে যাব, কেউ জানতেও পারবেনা, খবরও পাবেনা।
আসলে শেষ বয়সে এসে আমরা সবাই ই খগেন স্যার। পার্থক্য শুধু এতটুকু, খগেন স্যার নিঃসঙ্গ একা ছিলেন। আর আমরা সকলের মাঝে থেকেও একা। নাহলে দেখ! ছেলেমেয়েরা সবাই ব্রিটিশ হাওয়ায় গা ভাসিয়ে বিলাতের জাহাজ ধরেছে। আর আমি অসহায়ের মতো তাদের পথ চেয়ে নিঃশব্দে কবরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
তুমিওতো পারতে তাদের সাথে বিলাতের টিকিট ধরতে বা কোলকাতার আলিশান জীবন যাপন করতে। বুড়োকালে আবার জলপাইগুড়ির পাহাড়ি নদীর তীরে এই বসবাসের অযোগ্য পাড়াগাঁয়ে এসে মরার সাধ হলো কেন?
শেষ বয়সে একটা বিষয় জানার খুব আগ্রহ হলো। এখানে মরলে, এই মাটিতেই আমার কবর হবে, তাই না? তোমারও তো এই মাটিতেই কবর হবে। নাকি তোমার জাতের মানুষ মরলে স্বর্গে কবর হয়।
আমিতো হিন্দু বাপু, আমাদের কবর হয়না। পুড়িয়ে ভস্ম করে দেওয়া হয়। আমাকে হয়তো পোড়াতে কেউ আসবে না। আমিযে অনূঢ়া, জীবনে বিয়ে সাদি করিনি। ঐ নদীর পাড়ে আমার ছোট্ট একটা কুঁড়ে ঘর আছে। সত্তর বছর নদীর পানে চেয়ে কাটিয়ে দিয়েছি। খগেন্দ্রনাথের যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে একদিন ঐ কুঁড়েঘর থেকেই আমার দেহাবসান হবে। কাক, শকুনেরা খুবলে খুবলে আমার হাড় মাংস দুনিয়া থেকে পরপারে নিয়ে যাব।
মনিষা কিছুক্ষণ নীরবে দাড়িয়ে রইল, তারপর আবার বলতে শুরু করল, বলতে পারো? তারাকি আমায় স্বর্গে নিবে, নাকি নরকে? কাক, শকুনরা দুর্গন্ধযুক্ত, পঁচা খাবার খায়। তারা হয়তো স্বর্গে যাবেনা। এই দেখ, তোমার সাথে কথা বলতে বলতে সন্ধ্যা হয়ে এলো। আমার পূজার সময় হয়ে এসেছে। তারপর আর কোনো কথাটি না বলেই ধীরে ধীরে গুটিগুটি পায়ে বাঁশের একটা লাঠির উপর ভর দিয়ে নদীপাড়ের ছোট্ট কুঁড়ে ঘরটার দিকে এগিয়ে গেল মনীষা।
সেদিকে নিঃশব্দে চেয়ে রইলেন মানসুর মিঞা। যতক্ষণ অন্ধকার না আসে ততক্ষণ সেদিকেই চেয়ে রইলেন। শিশুকালে এই গ্রামেরই বাসিন্দা ছিলেন তিনি। মূলত হিন্দু গ্রাম। কয়েকঘর মুসলমানদেরও বসবাস ছিলো। পিতামাতাহীন চৌদ্দ পনেরো বছরের বালক। এবাড়ি ওবাড়িতে কাজ করে জীবন চালাতো। পড়াশোনার প্রতি তার প্রচন্ড আগ্রহ ছিলো। কিন্তু দশ গ্রামে পাঠশালা বলতে কিছুই ছিলো না। সরল মানুষ একে অপরের মুখে মুখে সাধারণ হিসাব নিকাশ আর ধর্মশাস্ত্রজ্ঞান লাভ করত। এই সাধারণ জ্ঞান যিনি দান করতেন তাকে পন্ডিত বলা হতো। প্রতি গ্রামেই এমন দুএকজন পন্ডিত থাকতেন। আর এই গ্রামের যে পন্ডিত ছিলেন তার নাম খগেন্দ্রনাথ। তাকে পন্ডিত না বলে স্যার সম্মোধন করতে বলতেন। তিনি নাকি কোলকাতায় বেকারির দোকান থেকে কড়া, গন্ডাসহ বহুবিধ হিসাব নিকাশ শিখেছিলেন। বাংলা, ইংরেজি, সংস্কৃত অক্ষর লেখাতেও তার পারদর্শিতা ছিল। সে কারনেই শিক্ষা দানে গ্রাম বাসীর আস্থার প্রতিক ছিলেন তিনি। তবে তার কোনো পাঠশালা ছিলোনা। কারো ঘরে তিনি উঠতেন না। কারো হাতের রান্নাও খেতেন না। জীবনভর নদীপাড়ের ছোট্ট কুঁড়ে ঘরটায় একাকী কাটিয়েছেন। তার পরনে একটা মাত্র ধূতি ছিলো। ঐ এক কাপড়েই তার জীবন কেটে গেছে। তিনি হিন্দু ছিলেন সত্যি, কিন্তু ব্রাহ্মণ ছিলেন না শূদ্র ছিলেন তা কখনোই স্বীকার করেননি। সকালে নদীতে স্নান করে ভিজা কাপড়েই বেরিয়ে পড়তেন। প্রতিটি বাড়িতেই বারান্দায় উঠার জন্য ছোট্ট ছোট্ট দুই এক ধাপ সিঁড়ির মত থাকত। গ্রামের লোকেরা এগুলোকে পইঠা বা পইঠে বলে ডাকত। খগেন বাবু সেই পইঠের উপর একপা রাখতেন, আর ছাত্রছাত্রীরা বারান্দায় এসে বসত। ওভাবেই দাড়িয়ে পাঠদান চলত। খগেন বাবু বাকিতে পড়াতেন না আর নগদ অর্থও নিতেন না। বিনিময়ে চাল, ডাল, তরকারি, তেল, মসলা কোরচ পেতে নিয়ে যেতেন। তারপর কুঁড়ে ঘরটাতে গিয়ে নিজে রান্না করে আয়েশ করে খেতেন।
গ্রামে প্রায় সব বাড়িতেই তার শিষ্য ছিল। একেকদিন তিনি একেক পাড়ায় যেতেন। সব বাড়ি ঘুরে শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্যের সন্ধান করতেন। কারো কাছ থেকে কিছুই চেয়ে নিতেন না। যে যা দিতেন তা দিয়েই তার হাড়ি চলত। কখনো কিছু মজুদ করতেন না। কিছু অবশিষ্ট থাকলে নদীতে ফেলে দিতেন। যে কারণে প্রতিদিন তার খবারে কোনো না কোনো ত্রুটি থাকত। গ্রামবাসীর মধ্যে এ বিষয়ে কোনো সমন্বয় ছিলোনা। তাই দেখা যেতো একদিন খাবারে লবন নেই তো অন্যদিন মরিচ। অথবা অন্য কোনো দিন লবণ, মরিচ, ডাল আছে কিন্তু চাল নেই।
যদিও একথা গ্রামবাসী কখনোই জানত না, শুধু একজন জানত, মানসুর। কখনো বিদ্যা, কখনো খুধা, কখনো উভয় কারণেই মানসুর খগেন স্যারের পিছিু, পিছু ঘুরত।
বেজাতের ছেলে, তাই কোনো বাড়িতে তার আশ্রয় হতোনা। কিন্তু বাইরে দাঁড়িয়ে পাঠদান প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করায় অধিকার তাকে দিয়েছিলেন খগেন বাবু। সে কারণে কোনো কোনো বাড়িতে খগেন বাবুর পাশে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেতো। তবে কথা বলার বা কিছু জানতে চাওয়ার অধিকার তার ছিলো না।
এই বিদ্যালাভের সূত্র ধরেই মনিষার সাথে তার পরিচয়। তারপর ঘনিষ্ঠতা। তাদের ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি গ্রামের কেউই মেনে নেয়নি, শুধু মেনে নিয়েছিলেন খগেন বাবু। তার জন্যেই হয়তো খগেন বাবুর জীবনাবসান হয়েছিল। গ্রাম থেকে কোলকাতায় পালিয়ে যায় মানসুর মিঞা। তারপর কি হয়েছিল, তার কিছই তার জানা নেই।

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬
জলপাইগুড়ির অতি প্রত্যান্ত অঞ্চলের অজানা একটি পহাড়ী গ্রাম। শিক্ষা, জ্ঞান, সভ্যতার আলো এখনো যেখানে পৌছায়নি। যদিও এখানে ব্রিটিশ হুকুমত চলে কিন্তু সবাই স্বাধীন। মানুষের জীবন ধারা অতি নিন্ম থেকে নিন্ম শ্রেণির। সেই গ্রামের কাঁচা পথ বেয়ে হেঁটে চলেছেন, কোলকাতার এক সভ্য, সৌখিন বৃদ্ধ। বয়স নব্বইয়ের কাছাকাছি হলেও যথেষ্ঠ উদ্যমী। নিজ নিজে চলতে পারেন। কারো সাহায্যের প্রয়োজন হয়না। বিকাল বেলায় গ্রামের পথে কয়েকটি বাচ্চাদের হাতে বইখাতা দেখে আগ্রহী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।
তোমাদের এখানেকি পাঠশালা আছে?
না, নেই।
তাহলে তোমাদের হাতে যে, বইখাতা। তোমরা কি পড়াশোনা কর।
হ্যা, আমরা রাঙা দীদার কাছে পড়ি। বেতবাড়ির জয়শ্রীদের বাড়িতে।
বয়সের ভারে তার কথা বলতে কষ্ট হলেও আগ্রহভরে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের রাঙা দীদা হয়তো ঐ বাড়িতেই থাকেন?
না, তিনি কারো বাড়িতে থাকেন না। কারো ঘরেও উঠেন না। বাইরে দাঁড়িয়ে পড়ান, বাইরে থেকেই চলে যান।
কথাটা শোনা মাত্রই কোনো এক অজানা আতঙ্কে শিউরে উঠলেন মানসুর মিঞা। কথা বলার মত স্নায়ুবিক শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। তবুও আত্মশক্তি সঞ্চয় করে বললেন।
কারো বাড়িতে খাইওনা। বাকিতেও পড়ায়না। নিজে রাধে নিজে খায়, এক কাপড়ে জীবন বায়।
একথা তুমি কি করে জানলে দাদু, তুমিকি তাকে চিন?
না! হয়তো চিনিনা। কিন্তু তাকে অনুধাবন করতে পারি। সে যে কোন গুরুর শিষ্য তাও জানি। আচ্ছা বলতে পারো, কোথায় গেলে পাবো তাকে?
এই রাস্তা ধরে সামনে, নদীর তীরে ছোট্ট একটা কুঁড়ে ঘরে সে থাকে। কিন্তু দাদু, ওদিকে যেওনা। ওদিকে যেতে মানা।
মানসুর মিঞা আর কোনো কথা না বলে নীরবে হাটতে লাগলেন। এই পথ তার কত চেনা। জীবনের কতদিন, কতক্ষণ এইপথে হেটেছেন তিনি। হাটতে হাটতে নদীর কাছে পৌছে গেলেন তিনি। নদীর পাড়ে এক বৃদ্ধ নারীর সাথে দেখা হয় তার। অনেক কষ্ট করে হলেও তাকে চিনতে পারে সে। তার ছোটবেলার খেলার সাথী। বাল্যকালে তার হাত ধরে এই নদী, এই পথ, এই মাঠ, এই ক্ষেতধরে কতইনা ছুটে বেড়িয়েছেন তিনি। কিছুক্ষণ কথায় কথায় তারই কিছু স্মৃতিচারণ করলেন দুজনে।
তোমার কি খগেন স্যারের কথা মনে আছে। নদীপাড়ের সেই খগেন্দ্র স্যার।
কেন মনে থাকবে না? আবশ্যই মনে আছে।
না, ভাবলাম,, বয়স হয়েছে, চুল পেঁকে ঝরে যাচ্ছে, দাঁতগুলো প্রায় শেষ হয়ে গেছে, শরীরের চামড়া কুঁচকে মুচড়ে হাড় মাংসের সঙ্গে কোনোমতে ঝুলে আছে। এই বয়সে সেই সত্তর বছর আগের শিশুকালের একজন সাধারণ শিক্ষকের কথাতো মনে থাকার নয়।
সে কথা সঠিকই বলেছো। এই বয়সে বাল্যকালের কারো কথা মনে রাখা খুবই দুঃসাধ্য। তবে খগেন স্যার না হয়ে অন্য কারো কথা বললে হয়তো মনে রাখতে পারতাব না। তাকে মনে রাখার অবশ্য বিশেষ একটা কারন আছে। কেননা তার শিক্ষক জীবনে আমিই একমাত্র ছাত্রী ছিলাম, যার মাথায় হাত রেখে স্যার আশীর্বাদ করেছিলেন। যদিও তার আশীর্বাদ, যা তিনি দিয়েছিলেন তা আমার কাজে আসেনি। বরং তার কছে আমি যা চেয়েছিলাম, তাই শেষ জীবনে এসে উপলব্ধি করতে পারছি। যেদিন স্যার আমার মাথায় হাত রেখে আশির্বাদ করে বলেছিলেন যেন জীবনের শেষ অবদি তোমার সাথেই থাকি। অথচ দেখ, সত্তর বছর পার হয়ে গেল। জীবনে একটি বারের জন্যও তোমার দেখা পেলাম না। বরং তার পায়ের ধূলী নিয়ে আমি যে বলেছিলাম, "স্যার আশীর্বাদ করবেন। যেন আপনার মত হতে পারি।" দেখ? আজ তা-ই সত্য হতে চলেছে। স্যার যেমন নদীপাড়ের ছোট্ট কুঁড়ে ঘরটায় একাকী মরে পড়ে ছিলো। গ্রামের কেউই তার খবর রাখেনি। কাক, শকুন আর পোকামাকড়গগুলোর উপদ্রব তার মৃত্যুর খবর কতদিন পরে গ্রামবাসীর কাছ পৌঁছাতে পেরেছিল তাও কারো জানা নেই। আমার বেলায়ও তেমনি হতে চলেছে। পৃথিবীটা আমার জন্য কত অসহ্য হয়ে উটেছে। হয়তো স্যারের মত নীরবে হুট করে একদিন এই মোহ মায়া ছেড়ে চলে যাব, কেউ জানতেও পারবেনা, খবরও পাবেনা।
আসলে শেষ বয়সে এসে আমরা সবাই ই খগেন স্যার। পার্থক্য শুধু এতটুকু, খগেন স্যার নিঃসঙ্গ একা ছিলেন। আর আমরা সকলের মাঝে থেকেও একা। নাহলে দেখ! ছেলেমেয়েরা সবাই ব্রিটিশ হাওয়ায় গা ভাসিয়ে বিলাতের জাহাজ ধরেছে। আর আমি অসহায়ের মতো তাদের পথ চেয়ে নিঃশব্দে কবরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
তুমিওতো পারতে তাদের সাথে বিলাতের টিকিট ধরতে বা কোলকাতার আলিশান জীবন যাপন করতে। বুড়োকালে আবার জলপাইগুড়ির পাহাড়ি নদীর তীরে এই বসবাসের অযোগ্য পাড়াগাঁয়ে এসে মরার সাধ হলো কেন?
শেষ বয়সে একটা বিষয় জানার খুব আগ্রহ হলো। এখানে মরলে, এই মাটিতেই আমার কবর হবে, তাই না? তোমারও তো এই মাটিতেই কবর হবে। নাকি তোমার জাতের মানুষ মরলে স্বর্গে কবর হয়।
আমিতো হিন্দু বাপু, আমাদের কবর হয়না। পুড়িয়ে ভস্ম করে দেওয়া হয়। আমাকে হয়তো পোড়াতে কেউ আসবে না। আমিযে অনূঢ়া, জীবনে বিয়ে সাদি করিনি। ঐ নদীর পাড়ে আমার ছোট্ট একটা কুঁড়ে ঘর আছে। সত্তর বছর নদীর পানে চেয়ে কাটিয়ে দিয়েছি। খগেন্দ্রনাথের যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে একদিন ঐ কুঁড়েঘর থেকেই আমার দেহাবসান হবে। কাক, শকুনেরা খুবলে খুবলে আমার হাড় মাংস দুনিয়া থেকে পরপারে নিয়ে যাব।
মনিষা কিছুক্ষণ নীরবে দাড়িয়ে রইল, তারপর আবার বলতে শুরু করল, বলতে পারো? তারাকি আমায় স্বর্গে নিবে, নাকি নরকে? কাক, শকুনরা দুর্গন্ধযুক্ত, পঁচা খাবার খায়। তারা হয়তো স্বর্গে যাবেনা। এই দেখ, তোমার সাথে কথা বলতে বলতে সন্ধ্যা হয়ে এলো। আমার পূজার সময় হয়ে এসেছে। তারপর আর কোনো কথাটি না বলেই ধীরে ধীরে গুটিগুটি পায়ে বাঁশের একটা লাঠির উপর ভর দিয়ে নদীপাড়ের ছোট্ট কুঁড়ে ঘরটার দিকে এগিয়ে গেল মনীষা।
সেদিকে নিঃশব্দে চেয়ে রইলেন মানসুর মিঞা। যতক্ষণ অন্ধকার না আসে ততক্ষণ সেদিকেই চেয়ে রইলেন। শিশুকালে এই গ্রামেরই বাসিন্দা ছিলেন তিনি। মূলত হিন্দু গ্রাম। কয়েকঘর মুসলমানদেরও বসবাস ছিলো। পিতামাতাহীন চৌদ্দ পনেরো বছরের বালক। এবাড়ি ওবাড়িতে কাজ করে জীবন চালাতো। পড়াশোনার প্রতি তার প্রচন্ড আগ্রহ ছিলো। কিন্তু দশ গ্রামে পাঠশালা বলতে কিছুই ছিলো না। সরল মানুষ একে অপরের মুখে মুখে সাধারণ হিসাব নিকাশ আর ধর্মশাস্ত্রজ্ঞান লাভ করত। এই সাধারণ জ্ঞান যিনি দান করতেন তাকে পন্ডিত বলা হতো। প্রতি গ্রামেই এমন দুএকজন পন্ডিত থাকতেন। আর এই গ্রামের যে পন্ডিত ছিলেন তার নাম খগেন্দ্রনাথ। তাকে পন্ডিত না বলে স্যার সম্মোধন করতে বলতেন। তিনি নাকি কোলকাতায় বেকারির দোকান থেকে কড়া, গন্ডাসহ বহুবিধ হিসাব নিকাশ শিখেছিলেন। বাংলা, ইংরেজি, সংস্কৃত অক্ষর লেখাতেও তার পারদর্শিতা ছিল। সে কারনেই শিক্ষা দানে গ্রাম বাসীর আস্থার প্রতিক ছিলেন তিনি। তবে তার কোনো পাঠশালা ছিলোনা। কারো ঘরে তিনি উঠতেন না। কারো হাতের রান্নাও খেতেন না। জীবনভর নদীপাড়ের ছোট্ট কুঁড়ে ঘরটায় একাকী কাটিয়েছেন। তার পরনে একটা মাত্র ধূতি ছিলো। ঐ এক কাপড়েই তার জীবন কেটে গেছে। তিনি হিন্দু ছিলেন সত্যি, কিন্তু ব্রাহ্মণ ছিলেন না শূদ্র ছিলেন তা কখনোই স্বীকার করেননি। সকালে নদীতে স্নান করে ভিজা কাপড়েই বেরিয়ে পড়তেন। প্রতিটি বাড়িতেই বারান্দায় উঠার জন্য ছোট্ট ছোট্ট দুই এক ধাপ সিঁড়ির মত থাকত। গ্রামের লোকেরা এগুলোকে পইঠা বা পইঠে বলে ডাকত। খগেন বাবু সেই পইঠের উপর একপা রাখতেন, আর ছাত্রছাত্রীরা বারান্দায় এসে বসত। ওভাবেই দাড়িয়ে পাঠদান চলত। খগেন বাবু বাকিতে পড়াতেন না আর নগদ অর্থও নিতেন না। বিনিময়ে চাল, ডাল, তরকারি, তেল, মসলা কোরচ পেতে নিয়ে যেতেন। তারপর কুঁড়ে ঘরটাতে গিয়ে নিজে রান্না করে আয়েশ করে খেতেন।
গ্রামে প্রায় সব বাড়িতেই তার শিষ্য ছিল। একেকদিন তিনি একেক পাড়ায় যেতেন। সব বাড়ি ঘুরে শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্যের সন্ধান করতেন। কারো কাছ থেকে কিছুই চেয়ে নিতেন না। যে যা দিতেন তা দিয়েই তার হাড়ি চলত। কখনো কিছু মজুদ করতেন না। কিছু অবশিষ্ট থাকলে নদীতে ফেলে দিতেন। যে কারণে প্রতিদিন তার খবারে কোনো না কোনো ত্রুটি থাকত। গ্রামবাসীর মধ্যে এ বিষয়ে কোনো সমন্বয় ছিলোনা। তাই দেখা যেতো একদিন খাবারে লবন নেই তো অন্যদিন মরিচ। অথবা অন্য কোনো দিন লবণ, মরিচ, ডাল আছে কিন্তু চাল নেই।
যদিও একথা গ্রামবাসী কখনোই জানত না, শুধু একজন জানত, মানসুর। কখনো বিদ্যা, কখনো খুধা, কখনো উভয় কারণেই মানসুর খগেন স্যারের পিছিু, পিছু ঘুরত।
বেজাতের ছেলে, তাই কোনো বাড়িতে তার আশ্রয় হতোনা। কিন্তু বাইরে দাঁড়িয়ে পাঠদান প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করায় অধিকার তাকে দিয়েছিলেন খগেন বাবু। সে কারণে কোনো কোনো বাড়িতে খগেন বাবুর পাশে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেতো। তবে কথা বলার বা কিছু জানতে চাওয়ার অধিকার তার ছিলো না।
এই বিদ্যালাভের সূত্র ধরেই মনিষার সাথে তার পরিচয়। তারপর ঘনিষ্ঠতা। তাদের ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি গ্রামের কেউই মেনে নেয়নি, শুধু মেনে নিয়েছিলেন খগেন বাবু। তার জন্যেই হয়তো খগেন বাবুর জীবনাবসান হয়েছিল। গ্রাম থেকে কোলকাতায় পালিয়ে যায় মানসুর মিঞা। তারপর কি হয়েছিল, তার কিছই তার জানা নেই।
