ছোট গল্পছোট গল্প

অসম প্রণয় (স্মরণিকা)

সৈমোহোরা
সৈমোহোরা
|
শেয়ার করুন
অ+ অ-

কাউকে ভালোলাগা বা ভালোবাসা অন্যায় নয়, অপরাধও নয়। হৃদয় প্রেমের আধার। ভালোবাসার অনুপস্থিতিতে তা শূন্য উদ্যান ছাড়া কিছু নয়। আর ভালোবাসার বীজ বপন ছাড়া সে উদ্যান আলোড়িত পুষ্পের মূর্ছনায় সুবাসিত হয়না। তবে প্রেমের বাগানে ফুল ফোটানোই যথেষ্ট নয়। মনের হাটে সেই ফুলের উপযুক্ত সওদা হওয়া বাঞ্ছনীয়। প্রেমের বেচাকেনা ছাড়া তাই হৃদয় হাটের স্বার্থকতা নেই।

জগতের সকল প্রাণী, সকল প্রণয়ী হৃদয়, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, যেভাবেই হোক, জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে সে হাটের বলী হয়। সেখানে প্রেমময়ী হৃদয় তার প্রেমতৃষ্ণা নিবারনের উপযুক্ত হৃদয়ের সন্ধান করে।

শুনেছি প্রেম অন্ধ, তাই উচু-নিচু, যোগ্য-অযোগ্য, ভালো-মন্দ, ধনী-গরীর বা কালো-সুন্দর দেখে ভালোবাসা হয়না। যার সাথে যার মন মিলে যায়, তার সাথে তার ভালোবাসা হয়ে যায়।

আমার বেলায়ও তাই-ই হয়েছিল। জীবনে প্রথম যখন তাকে দেখেছিলাম, এক দেখাতেই তাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। যদিও প্রেমময়ী ভালোবাসা কি, তখন তা বুঝতামও না। সেই বয়সে ভালোবাসা বলতে শুধু ভালোকে বাসা-ই বুঝতাম। তবে আমার ভালোবাসার জালে একতরফাভাবে যাকে বন্দী করতে পেরেছিলাম সে শুধু ভালোই ছিলোনা, বরং আমার চেয়ে ঢেরগুন উত্তম ছিলো। আমার কি যোগ্যতা ছিলো যে তাকে বাসিতে ভালো...

সেই সময়ে সবে নিন্ম মাধ্যমিক শেষ করা তেরো চৌদ্দ বছরের ছোট্ট একটা মেয়ে আমি। যদিও বয়সের চেয়ে আমাকে একটু বড়ো মনে হতো সবার। তবুও এখনো তা ভাবলেই লজ্জায় লাল হয়ে যায়। সত্যিই আমি তার যোগ্য ছিলাম না। কিন্তু ভালোবেসেছিলাম। আমি খুব মোটা ছিলাম, কালো ছিলাম, বিভৎস চেহারার অধিকারী ছিলাম। কিন্তু ভালোবেসেছিলাম। যারা মোটা হয়, কালো হয়, তারা কি ভালোবাসার যোগ্য নয়? মোটা কালো চেহারার মেয়েদের কি হৃদয় থাকে না? তাদের হৃদয়ে কি ভালোবাসা থাকেনা?

হয়তো থাকেনা, অথবা থাকলেও তার কোনো মূল্য থাকেনা। যে মেয়ের শারীরিক সৌন্দর্য নেই। অনুপম দৈহিক গঠন নেই, যার রুপে প্রেমিক হৃদয় উন্মাদ, ব্যকূল না হয়, তার ভালোবাসা পাবার অধিকার থাকেনা। খুব অল্প বয়সেই এই সত্যতা আমি মনেপ্রাণে উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম, তাই ভালোবাসার প্রতিদানে তার ভালোবাসা পাবার আগ্রহ কখনোই আমার হৃদয়ে উদ্ভাসিত হয়নি। আমার সে ভালোবাসা একান্ত আমার এবং অনেকদিন পর্যন্ত আমার হৃদয়েই অঙ্কুরোদমহীন, মূল্যহীন বীজের ন্যায় পড়েছিলো।

যেদিন তাকে প্রথম দেখেছিলাম, সেদিন থেকে যেদিন তার হাতটা প্রথম স্পর্শ পেয়েছিলাম সেই দিন পর্যন্ত। তারপর তার সে দিনের সেই অযাচিত ব্যবহারে আমার সদ্য সৃষ্ট ভালোবাসাকে আমারই ভালোবাসার হাটুজল নদীতে অকাল বিসর্জন দিয়েছিলাম।

একদিন আমি আমার বাড় দিদির সাথে তার কলেজে গিয়েছিলাম। তখন কেবল নবম শ্রেণিতে পড়ি। বড়দিদি ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্রী। তার কলেজের সবচেয়ে সুদর্শন, স্মার্ট আর অন্যতম মেধাবী ছাত্রকে দেখে প্রথম দেখাতেই তার প্রেমে পড়ে যায়। আমার পারিপার্শ্বিক বিষয় বিবেচনা করে, কখনো কাউকে তার কথা বলতে পারিনি। তবে হৃদয় কারো নিকট বন্দী নয়, হৃদয় যাকে একবার আপন করে নেই, হয়তো কখনোই তাকে আর ভুলে থাকতে পারেনা।

অনেক সন্ধানের পর তার নামটা জানতে পারি। ভালোবাসার প্রাপ্তিতে এতটুকুই আমার জন্য যতেষ্ঠ ছিল। তার পুরো নাম ধরে কেউ তাকে ডাকত না। সবাই তাকে অনুদা বলে ডাকতো। হ্যা। অনু দা-ই আমার জীবনের প্রথম ভালোবাসার নাম। সম্ভাবত শেষ ভালোবাসাও সে-ই। কারণ ঐদিন লিটনের দোকানে তার ব্যবহার আমাকে এত গভীরভাবে বিষাক্ত করেছিল যে, আর কখনোই কারো প্রতি ভালোবাসার মত অমানুষিকতা আমার মধ্যে সৃষ্টি হয়নি।

সময়টা আমার ঠিক মনে নেই! হয় নাইনের শেষে না হয় টেনের শুরুর দিকের কথা। তবে তখন যে কিছিটা শীত ছিলো এটা ভালোভাবেই মনে আছে। আমাদের স্কুলের সামনে লিটন নামে এক ভাইয়ের কসমেটিক্স এর দোকান ছিলো। স্কুলের সব মেয়েরাই তার দোকানে যেতো। সেদিন সকালে কি যেন প্রয়োজনে আমি তার দোকানে ঢুকলাম। দোকানে সে ছাড়া তখন আর কেউ ছিলোনা। টুকিটাকি দ্রব্যের দামাদামি করতে করতে হঠাৎ উপলব্ধি করতে পারলাম দরজার পাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। হালকা করে ঘাড়টা ঘোরাতেই আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। হঠাৎ স্তব্ধ আতংকিত হয়ে শরীরের প্রত্যেকটা লোম দাড়িয়ে গিয়েছিল আমার।

তখনকার সে অনুভূতি কাউকে বর্ণনা করে বোঝানো যাবেনা। দেখলাম অনুদা ঠিক আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। একদম আমার পিছু। আমি একটু ঘুরে দাড়াতেই আমার সামনে। একদম আমার সামনে। এত সামনে থেকে আমি আগে কখনোই তাকে দেখিনি। ভালো যে বাসে, শুধু সেই জানে, ভালোবাসা পাশে এসে দাড়ালে হৃদয়ের অন্তস্তলে যে আলোড়ন সৃষ্টি হয় তার কম্পন কতটা উত্তেজনাময়।

আমার প্রণের দাবি, আমার ভালোবাসা, আমার এতটা সমনে, তা আমার কল্পনায়ও আসতো না কখনোই। মনে মনে মনের কল্পনায় কতদিন তার পাশে গিয়ে দড়াতে চেয়েছি। তার এতটুকু স্পর্শ পেতে কত রাত, কত ঘুম নষ্ট করে, কত দেবদেবী কত ভগবান, ইশ্বরের আরাধনা করেছি। সেই প্রিয় মানুষটা যখন আমার এতটা সামনে আমার তখনকার অনুভূতি কাউকে বর্ণনা করে বোঝাতে পারবনা।

কসমেটিকসের দোকানে তার আকস্মিক আবির্ভাবে আমি এতটা উত্তোলিত হয়েছিলাম যে, নরীর নারীপনা ভুলে গিয়ে, আপন তৃপ্তিতে দুবাহু প্রসারিত করে তার আলিঙ্গনে নিজেকে আবদ্ধ করার প্রবল ইচ্ছা মনের প্রত্যেকটা দরজায় কড়া নাড়ছিলো।

বহু কষ্টের পর যখন নিজেকে নিবারণ করতে সমর্থ হলাম, তখন আর একবার চোখদুটো কিছুটা উচু করে তার দিকে চেয়ে রইলাম। আমার মনের সাগরে প্রেমের উত্তাল ঢেউ তখন দুকূল ছাপিয়ে সমগ্র বিশ্বলয়ে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। আমর মুখ থেকে আর কোনো শব্দই বের হতে পরল না। শুধু অপলক চেয়ে রইলাম।

কি যেন প্রয়োজনে লিটনদার সাথে কথা বলতে বলতে অনুদা আমার একদম পাশে এসে দাড়ালো। আমার হাতটা তখন কসমেটিকসের কাচের শোকেসের উপর ছিলো। কি যেন কারণে হুট করে অনুদার হাতটা আমার হাতটাকে এক ঝলক ছুঁয়ে গেলো।

জীবনে হয়তো অনেক পুরুষের পাশে দাড়িয়েছি, কত লোকের সাথেই না এমন স্পর্শ হয়েছে। কিন্তু মনের মানুষের স্পর্শ অন্য যেকারো থেকে আলাদা। অনুদার স্পর্শ আমার শরীরে ইলেকট্রিক শকের মত কম্পন সৃষ্টি করল। অনেকের মুখে প্রথম পুরুষের স্পর্শের অনুভূতির কথা শুনেছি। অনেক সিনেমা, গল্পে তার দৃষ্টান্ত দেখেছি। কিন্তু বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন এইমাত্র অনুভব করলাম।

মোক্ষ লাভের লালসা যেমন জিহ্বায় জল আনিয়া দেয়, তেমনি প্রিয়তমের বোধন স্পর্শ কামময়ী শরীরকে দূর্বল করে শীতল উপলব্ধি এনে দেয়। আজ তার বাস্তব প্রমাণ নিজের অকৃত্রিম অভিজ্ঞতা দিয়ে অনুভব করলাম।

দূরত্ব বিরহ বাড়ায়, নৈকট্য ভালোবাসা বাড়ায়। তার এতটা কাছে না আসলে ভালোবাসার অর্থ বুঝতাম না। আমার আর কোনো চাওয়া নেই। তাকে কাছ থেকে অনুভব করতে পেরেছি, তার স্পর্শ পেয়েছি, প্রণয়ী মনে এর চেয়ে বড়ো প্রাপ্তি আর কি আছে। শুধুমাত্র একটি অপ্রাপ্তি মনে মনে আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। যার নেশায় এতোটা মত্ত পাগল আমি, সেকি জানে? সে কি জানে আমার ভালোবাসার গল্প! আমি যেমন তাকে মনে মনে অনুভব করি, সেও কি আমাকে কিছুটা উপলব্ধি করতে পারে। হয়তো জানেনা। জানেনা যে, সকলের অগোচরে কেউ হয়তো তাকে সাধে, হৃদয়ের ঘরে বাঁধে। তার মিলন কামনায় নিশি রাতে নীরবে কাঁদে।

আমি জানি, আমি তার যোগ্য নই, উপযুক্ত নই। আমার চেহারা খারাপ, শারীরিক গঠন তার উপযুক্ত নয়। সে সুন্দর, অকৃত্রিম আর আমি কুৎসিত, তার অনুপোযুক্ত। তাই আমার প্রেম, ভালোবাসা, আবেগ আর কামনাকে আমার হৃদয়ে অঙ্কুরে বিনষ্ট ফুলের ন্যয় কবর দিয়ে নীরবে সরে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ঐদিন কসমেটিকসের দোকানে তার আকস্মিক রূঢ় আচরণ শুধু সে-ই নয় সকল পুরুষের প্রতি আমার মনোভাব পরিবর্তন করে দিয়েছিলো। যখন সে প্রথম বারের মত আমার দিকে তাকিয়েছিলো, তখন আমি স্বর্গ পেয়েছিলাম। কিন্তু তার মুখের অশ্রাব্য বাক্যগুলো তার প্রতি আমার সকল চেতনা ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছিলো।

Public Voice

সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬


অসম প্রণয় (স্মরণিকা)

প্রকাশের তারিখ : ০২ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

কাউকে ভালোলাগা বা ভালোবাসা অন্যায় নয়, অপরাধও নয়। হৃদয় প্রেমের আধার। ভালোবাসার অনুপস্থিতিতে তা শূন্য উদ্যান ছাড়া কিছু নয়। আর ভালোবাসার বীজ বপন ছাড়া সে উদ্যান আলোড়িত পুষ্পের মূর্ছনায় সুবাসিত হয়না। তবে প্রেমের বাগানে ফুল ফোটানোই যথেষ্ট নয়। মনের হাটে সেই ফুলের উপযুক্ত সওদা হওয়া বাঞ্ছনীয়। প্রেমের বেচাকেনা ছাড়া তাই হৃদয় হাটের স্বার্থকতা নেই।


জগতের সকল প্রাণী, সকল প্রণয়ী হৃদয়, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, যেভাবেই হোক, জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে সে হাটের বলী হয়। সেখানে প্রেমময়ী হৃদয় তার প্রেমতৃষ্ণা নিবারনের উপযুক্ত হৃদয়ের সন্ধান করে।


শুনেছি প্রেম অন্ধ, তাই উচু-নিচু, যোগ্য-অযোগ্য, ভালো-মন্দ, ধনী-গরীর বা কালো-সুন্দর দেখে ভালোবাসা হয়না। যার সাথে যার মন মিলে যায়, তার সাথে তার ভালোবাসা হয়ে যায়।


আমার বেলায়ও তাই-ই হয়েছিল। জীবনে প্রথম যখন তাকে দেখেছিলাম, এক দেখাতেই তাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। যদিও প্রেমময়ী ভালোবাসা কি, তখন তা বুঝতামও না। সেই বয়সে ভালোবাসা বলতে শুধু ভালোকে বাসা-ই বুঝতাম। তবে আমার ভালোবাসার জালে একতরফাভাবে যাকে বন্দী করতে পেরেছিলাম সে শুধু ভালোই ছিলোনা, বরং আমার চেয়ে ঢেরগুন উত্তম ছিলো। আমার কি যোগ্যতা ছিলো যে তাকে বাসিতে ভালো...


সেই সময়ে সবে নিন্ম মাধ্যমিক শেষ করা তেরো চৌদ্দ বছরের ছোট্ট একটা মেয়ে আমি। যদিও বয়সের চেয়ে আমাকে একটু বড়ো মনে হতো সবার। তবুও এখনো তা ভাবলেই লজ্জায় লাল হয়ে যায়। সত্যিই আমি তার যোগ্য ছিলাম না। কিন্তু ভালোবেসেছিলাম। আমি খুব মোটা ছিলাম, কালো ছিলাম, বিভৎস চেহারার অধিকারী ছিলাম। কিন্তু ভালোবেসেছিলাম। যারা মোটা হয়, কালো হয়, তারা কি ভালোবাসার যোগ্য নয়? মোটা কালো চেহারার মেয়েদের কি হৃদয় থাকে না? তাদের হৃদয়ে কি ভালোবাসা থাকেনা?


হয়তো থাকেনা, অথবা থাকলেও তার কোনো মূল্য থাকেনা। যে মেয়ের শারীরিক সৌন্দর্য নেই। অনুপম দৈহিক গঠন নেই, যার রুপে প্রেমিক হৃদয় উন্মাদ, ব্যকূল না হয়, তার ভালোবাসা পাবার অধিকার থাকেনা। খুব অল্প বয়সেই এই সত্যতা আমি মনেপ্রাণে উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম, তাই ভালোবাসার প্রতিদানে তার ভালোবাসা পাবার আগ্রহ কখনোই আমার হৃদয়ে উদ্ভাসিত হয়নি। আমার সে ভালোবাসা একান্ত আমার এবং অনেকদিন পর্যন্ত আমার হৃদয়েই অঙ্কুরোদমহীন, মূল্যহীন বীজের ন্যায় পড়েছিলো।


যেদিন তাকে প্রথম দেখেছিলাম, সেদিন থেকে যেদিন তার হাতটা প্রথম স্পর্শ পেয়েছিলাম সেই দিন পর্যন্ত। তারপর তার সে দিনের সেই অযাচিত ব্যবহারে আমার সদ্য সৃষ্ট ভালোবাসাকে আমারই ভালোবাসার হাটুজল নদীতে অকাল বিসর্জন দিয়েছিলাম।


একদিন আমি আমার বাড় দিদির সাথে তার কলেজে গিয়েছিলাম। তখন কেবল নবম শ্রেণিতে পড়ি। বড়দিদি ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্রী। তার কলেজের সবচেয়ে সুদর্শন, স্মার্ট আর অন্যতম মেধাবী ছাত্রকে দেখে প্রথম দেখাতেই তার প্রেমে পড়ে যায়। আমার পারিপার্শ্বিক বিষয় বিবেচনা করে, কখনো কাউকে তার কথা বলতে পারিনি। তবে হৃদয় কারো নিকট বন্দী নয়, হৃদয় যাকে একবার আপন করে নেই, হয়তো কখনোই তাকে আর ভুলে থাকতে পারেনা।


অনেক সন্ধানের পর তার নামটা জানতে পারি। ভালোবাসার প্রাপ্তিতে এতটুকুই আমার জন্য যতেষ্ঠ ছিল। তার পুরো নাম ধরে কেউ তাকে ডাকত না। সবাই তাকে অনুদা বলে ডাকতো। হ্যা। অনু দা-ই আমার জীবনের প্রথম ভালোবাসার নাম। সম্ভাবত শেষ ভালোবাসাও সে-ই। কারণ ঐদিন লিটনের দোকানে তার ব্যবহার আমাকে এত গভীরভাবে বিষাক্ত করেছিল যে, আর কখনোই কারো প্রতি ভালোবাসার মত অমানুষিকতা আমার মধ্যে সৃষ্টি হয়নি।


সময়টা আমার ঠিক মনে নেই! হয় নাইনের শেষে না হয় টেনের শুরুর দিকের কথা। তবে তখন যে কিছিটা শীত ছিলো এটা ভালোভাবেই মনে আছে। আমাদের স্কুলের সামনে লিটন নামে এক ভাইয়ের কসমেটিক্স এর দোকান ছিলো। স্কুলের সব মেয়েরাই তার দোকানে যেতো। সেদিন সকালে কি যেন প্রয়োজনে আমি তার দোকানে ঢুকলাম। দোকানে সে ছাড়া তখন আর কেউ ছিলোনা। টুকিটাকি দ্রব্যের দামাদামি করতে করতে হঠাৎ উপলব্ধি করতে পারলাম দরজার পাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। হালকা করে ঘাড়টা ঘোরাতেই আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। হঠাৎ স্তব্ধ আতংকিত হয়ে শরীরের প্রত্যেকটা লোম দাড়িয়ে গিয়েছিল আমার।


তখনকার সে অনুভূতি কাউকে বর্ণনা করে বোঝানো যাবেনা। দেখলাম অনুদা ঠিক আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। একদম আমার পিছু। আমি একটু ঘুরে দাড়াতেই আমার সামনে। একদম আমার সামনে। এত সামনে থেকে আমি আগে কখনোই তাকে দেখিনি। ভালো যে বাসে, শুধু সেই জানে, ভালোবাসা পাশে এসে দাড়ালে হৃদয়ের অন্তস্তলে যে আলোড়ন সৃষ্টি হয় তার কম্পন কতটা উত্তেজনাময়।


আমার প্রণের দাবি, আমার ভালোবাসা, আমার এতটা সমনে, তা আমার কল্পনায়ও আসতো না কখনোই। মনে মনে মনের কল্পনায় কতদিন তার পাশে গিয়ে দড়াতে চেয়েছি। তার এতটুকু স্পর্শ পেতে কত রাত, কত ঘুম নষ্ট করে, কত দেবদেবী কত ভগবান, ইশ্বরের আরাধনা করেছি। সেই প্রিয় মানুষটা যখন আমার এতটা সামনে আমার তখনকার অনুভূতি কাউকে বর্ণনা করে বোঝাতে পারবনা।


কসমেটিকসের দোকানে তার আকস্মিক আবির্ভাবে আমি এতটা উত্তোলিত হয়েছিলাম যে, নরীর নারীপনা ভুলে গিয়ে, আপন তৃপ্তিতে দুবাহু প্রসারিত করে তার আলিঙ্গনে নিজেকে আবদ্ধ করার প্রবল ইচ্ছা মনের প্রত্যেকটা দরজায় কড়া নাড়ছিলো।


বহু কষ্টের পর যখন নিজেকে নিবারণ করতে সমর্থ হলাম, তখন আর একবার চোখদুটো কিছুটা উচু করে তার দিকে চেয়ে রইলাম। আমার মনের সাগরে প্রেমের উত্তাল ঢেউ তখন দুকূল ছাপিয়ে সমগ্র বিশ্বলয়ে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। আমর মুখ থেকে আর কোনো শব্দই বের হতে পরল না। শুধু অপলক চেয়ে রইলাম।


কি যেন প্রয়োজনে লিটনদার সাথে কথা বলতে বলতে অনুদা আমার একদম পাশে এসে দাড়ালো। আমার হাতটা তখন কসমেটিকসের কাচের শোকেসের উপর ছিলো। কি যেন কারণে হুট করে অনুদার হাতটা আমার হাতটাকে এক ঝলক ছুঁয়ে গেলো।


জীবনে হয়তো অনেক পুরুষের পাশে দাড়িয়েছি, কত লোকের সাথেই না এমন স্পর্শ হয়েছে। কিন্তু মনের মানুষের স্পর্শ অন্য যেকারো থেকে আলাদা। অনুদার স্পর্শ আমার শরীরে ইলেকট্রিক শকের মত কম্পন সৃষ্টি করল। অনেকের মুখে প্রথম পুরুষের স্পর্শের অনুভূতির কথা শুনেছি। অনেক সিনেমা, গল্পে তার দৃষ্টান্ত দেখেছি। কিন্তু বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন এইমাত্র অনুভব করলাম।


মোক্ষ লাভের লালসা যেমন জিহ্বায় জল আনিয়া দেয়, তেমনি প্রিয়তমের বোধন স্পর্শ কামময়ী শরীরকে দূর্বল করে শীতল উপলব্ধি এনে দেয়। আজ তার বাস্তব প্রমাণ নিজের অকৃত্রিম অভিজ্ঞতা দিয়ে অনুভব করলাম।


দূরত্ব বিরহ বাড়ায়, নৈকট্য ভালোবাসা বাড়ায়। তার এতটা কাছে না আসলে ভালোবাসার অর্থ বুঝতাম না। আমার আর কোনো চাওয়া নেই। তাকে কাছ থেকে অনুভব করতে পেরেছি, তার স্পর্শ পেয়েছি, প্রণয়ী মনে এর চেয়ে বড়ো প্রাপ্তি আর কি আছে। শুধুমাত্র একটি অপ্রাপ্তি মনে মনে আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। যার নেশায় এতোটা মত্ত পাগল আমি, সেকি জানে? সে কি জানে আমার ভালোবাসার গল্প! আমি যেমন তাকে মনে মনে অনুভব করি, সেও কি আমাকে কিছুটা উপলব্ধি করতে পারে। হয়তো জানেনা। জানেনা যে, সকলের অগোচরে কেউ হয়তো তাকে সাধে, হৃদয়ের ঘরে বাঁধে। তার মিলন কামনায় নিশি রাতে নীরবে কাঁদে।


আমি জানি, আমি তার যোগ্য নই, উপযুক্ত নই। আমার চেহারা খারাপ, শারীরিক গঠন তার উপযুক্ত নয়। সে সুন্দর, অকৃত্রিম আর আমি কুৎসিত, তার অনুপোযুক্ত। তাই আমার প্রেম, ভালোবাসা, আবেগ আর কামনাকে আমার হৃদয়ে অঙ্কুরে বিনষ্ট ফুলের ন্যয় কবর দিয়ে নীরবে সরে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ঐদিন কসমেটিকসের দোকানে তার আকস্মিক রূঢ় আচরণ শুধু সে-ই নয় সকল পুরুষের প্রতি আমার মনোভাব পরিবর্তন করে দিয়েছিলো। যখন সে প্রথম বারের মত আমার দিকে তাকিয়েছিলো, তখন আমি স্বর্গ পেয়েছিলাম। কিন্তু তার মুখের অশ্রাব্য বাক্যগুলো তার প্রতি আমার সকল চেতনা ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছিলো।


Public Voice

সম্পাদক: মোঃ বাদশাহ আলমগীর
প্রকাশক: অনন্যা অনসূয়া দিবা

কপিরাইট © ২০২৬ Public Voice । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত