আইন-আদালত
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শরীরে নয়টি গুলি লেগে আহত হওয়ার অভিযোগ তুলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৭৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিলেন নূর হোসেন নামের এক যুবক। এই মামলার তদন্ত শেষে অভিযোগের কোনো প্রাথমিক সত্যতা না পাওয়ায় শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ মোট ৮৪ জন আসামিকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ।
তদন্ত কর্মকর্তা ও মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) উক্যমং রাখাইন গত ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে এই প্রতিবেদন জমা দেন। বিষয়টি আদালতের নজরে আসার পর ম্যাজিস্ট্রেট নথিপত্র পর্যালোচনা করে বাদীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য ১ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেছেন।
মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, নূর হোসেন দাবি করেছিলেন যে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বিকালে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন ময়ূর ভিলা এলাকায় আন্দোলনের সময় তিনি হামলার শিকার হন। তার ভাষ্যমতে, পিঠে ছয়টি, বাম পায়ের হাঁটুর উপরে দুটি এবং ডান পায়ের হাঁটুর পাশে একটি গুলি লাগার কারণে তিনি রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। এছাড়া হামলাকারীরা তার ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছিল বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
নূর হোসেনের দায়ের করা এজাহারে উল্লেখ ছিল, গুরুতর আহত অবস্থায় বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে আসামিদের ভয়ে কর্তৃপক্ষ তাকে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এই তথ্যের ভিত্তিতেই ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর তিনি মামলাটি করেছিলেন। তবে পুলিশের তদন্তে মামলার এজাহারের সঙ্গে জমা দেওয়া চিকিৎসাসংক্রান্ত ব্যবস্থাপত্র ও কাগজপত্রগুলো পুরোপুরি জাল বলে প্রমাণিত হয়েছে। চিকিৎসার কাগজপত্রে অসংগতি, তদন্তে জালিয়াতির তথ্য।
পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে হাসপাতালের মূল রেজিস্টার যাচাই করে দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট তারিখে নূর হোসেন নামের কোনো ব্যক্তি ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নেননি।
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, জরুরি বিভাগের চিকিৎসকদের হাতে লেখা ব্যবস্থাপত্র হওয়ার কথা থাকলেও নূর হোসেনের জমা দেওয়া কাগজটি কম্পিউটারে টাইপ করা ছিল। এছাড়া ব্যবস্থাপত্রে থাকা ক্যাশ মেমো নম্বরটি আব্দুস সাত্তার নামের ৫৪ বছর বয়সী অন্য এক ব্যক্তির নামে এবং পেশেন্ট আইডি নম্বরটি জুয়েল নামের ৩২ বছর বয়সী একজনের নামে বরাদ্দ ছিল।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের সরকারি তালিকায়ও নূর হোসেনের নাম পাওয়া যায়নি। এসব তথ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে তদন্ত কর্মকর্তা নিশ্চিত হয়েছেন যে বাদী বাস্তবে আহত হননি, বরং অসৎ উদ্দেশ্যে মিথ্যা দাবি তুলে মামলাটি দায়ের করেছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আরও জানান, মামলা দায়েরের পর বিভিন্ন ঘটনায় কারাগারে থাকা আটজন আসামিকে এ মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়েছিল। তবে এজাহারের ভিত্তিতে নতুন করে কাউকে সরাসরি আটক করা হয়নি। অভিযোগের সত্যতা না মেলায় অব্যাহতি পাওয়া অন্য উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান, সাবেক কাউন্সিলর সলিমুল্লাহ সলু, ছাত্রলীগ নেতা রিয়াজ মাহমুদ, সলিম উল্লাহ পাটোয়ারী, মিলন হোসেন, ইশরাত জাহান তামান্না ও স্বপ্না খন্দকার।
মিথ্যা তথ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার দায়ে বাদী নূর হোসেনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই উক্যমং রাখাইন জানিয়েছেন, পুলিশের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তবে আইন অনুযায়ী বাদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পূর্ণ এখতিয়ার আদালতের রয়েছে।

রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ নভেম্বর ২০২৬
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শরীরে নয়টি গুলি লেগে আহত হওয়ার অভিযোগ তুলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৭৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিলেন নূর হোসেন নামের এক যুবক। এই মামলার তদন্ত শেষে অভিযোগের কোনো প্রাথমিক সত্যতা না পাওয়ায় শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ মোট ৮৪ জন আসামিকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ।
তদন্ত কর্মকর্তা ও মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) উক্যমং রাখাইন গত ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে এই প্রতিবেদন জমা দেন। বিষয়টি আদালতের নজরে আসার পর ম্যাজিস্ট্রেট নথিপত্র পর্যালোচনা করে বাদীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য ১ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেছেন।
মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, নূর হোসেন দাবি করেছিলেন যে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বিকালে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন ময়ূর ভিলা এলাকায় আন্দোলনের সময় তিনি হামলার শিকার হন। তার ভাষ্যমতে, পিঠে ছয়টি, বাম পায়ের হাঁটুর উপরে দুটি এবং ডান পায়ের হাঁটুর পাশে একটি গুলি লাগার কারণে তিনি রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। এছাড়া হামলাকারীরা তার ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছিল বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
নূর হোসেনের দায়ের করা এজাহারে উল্লেখ ছিল, গুরুতর আহত অবস্থায় বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে আসামিদের ভয়ে কর্তৃপক্ষ তাকে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এই তথ্যের ভিত্তিতেই ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর তিনি মামলাটি করেছিলেন। তবে পুলিশের তদন্তে মামলার এজাহারের সঙ্গে জমা দেওয়া চিকিৎসাসংক্রান্ত ব্যবস্থাপত্র ও কাগজপত্রগুলো পুরোপুরি জাল বলে প্রমাণিত হয়েছে। চিকিৎসার কাগজপত্রে অসংগতি, তদন্তে জালিয়াতির তথ্য।
পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে হাসপাতালের মূল রেজিস্টার যাচাই করে দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট তারিখে নূর হোসেন নামের কোনো ব্যক্তি ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নেননি।
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, জরুরি বিভাগের চিকিৎসকদের হাতে লেখা ব্যবস্থাপত্র হওয়ার কথা থাকলেও নূর হোসেনের জমা দেওয়া কাগজটি কম্পিউটারে টাইপ করা ছিল। এছাড়া ব্যবস্থাপত্রে থাকা ক্যাশ মেমো নম্বরটি আব্দুস সাত্তার নামের ৫৪ বছর বয়সী অন্য এক ব্যক্তির নামে এবং পেশেন্ট আইডি নম্বরটি জুয়েল নামের ৩২ বছর বয়সী একজনের নামে বরাদ্দ ছিল।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের সরকারি তালিকায়ও নূর হোসেনের নাম পাওয়া যায়নি। এসব তথ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে তদন্ত কর্মকর্তা নিশ্চিত হয়েছেন যে বাদী বাস্তবে আহত হননি, বরং অসৎ উদ্দেশ্যে মিথ্যা দাবি তুলে মামলাটি দায়ের করেছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আরও জানান, মামলা দায়েরের পর বিভিন্ন ঘটনায় কারাগারে থাকা আটজন আসামিকে এ মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়েছিল। তবে এজাহারের ভিত্তিতে নতুন করে কাউকে সরাসরি আটক করা হয়নি। অভিযোগের সত্যতা না মেলায় অব্যাহতি পাওয়া অন্য উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান, সাবেক কাউন্সিলর সলিমুল্লাহ সলু, ছাত্রলীগ নেতা রিয়াজ মাহমুদ, সলিম উল্লাহ পাটোয়ারী, মিলন হোসেন, ইশরাত জাহান তামান্না ও স্বপ্না খন্দকার।
মিথ্যা তথ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার দায়ে বাদী নূর হোসেনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই উক্যমং রাখাইন জানিয়েছেন, পুলিশের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তবে আইন অনুযায়ী বাদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পূর্ণ এখতিয়ার আদালতের রয়েছে।
