আর্কাইভআর্কাইভ

নেতানিয়াহুর ক্ষমতা কি থাকছে, সরকার গঠনে কি নির্ধারক হবেন মুসলিমরা

ইসরাইলের ২৬তম নেসেট নির্বাচনে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটবে নাকি তিনি ক্ষমতায় টিকবেন, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। জটিল নির্বাচনি সমীকরণে আরব ও মুসলিম ভোটাররা বড় নির্ধারক হতে পারেন।

AutoHix
AutoHix
|
শেয়ার করুন
অ+ অ-

ইসরাইলের নির্বাচনে কোনো পক্ষই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে কি না, তা নিয়ে ব্যাপক অনিশ্চয়তা ও জটিলতা তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবারের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের শাসনের অবসান হতে পারে, আবার বিরোধী পক্ষগুলো সম্মিলিতভাবে বেশি ভোট পেলেও বিভিন্ন কৌশলে তিনি ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেন। দ্য টাইমস অব ইসরাইলের রাজনৈতিক প্রতিবেদক আরিয়েলা কারমেলের একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এসব জটিল সমীকরণ উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ দেওয়া হয়নি।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলা, মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক ফ্রন্টে ধারাবাহিক যুদ্ধ, তীব্র অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার প্রেক্ষাপটে এই ঐতিহাসিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মঙ্গলবারের এই ভোটে ইসরাইলের প্রায় ৭৩ লাখ ভোটার দেশটির ২৬তম নেসেটের (পার্লামেন্ট) সদস্য নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জনমত জরিপগুলোতে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি ও অতি-ধর্মীয় দলগুলোর জোটের সঙ্গে বিরোধীদের অত্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে।

যেভাবে পরিচালিত হয় ইসরাইলের জটিল নির্বাচনি ব্যবস্থা

যুক্তরাজ্য, কানাডা ও জার্মানির মতো ইসরাইলও একটি সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তবে দেশটির নির্বাচনি কাঠামো কিছুটা ভিন্ন। এখানে নাগরিকরা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের জন্য ভোট দেন না; বরং নেসেটের সদস্য নির্বাচনের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে সরকার গঠনের পথ নির্ধারিত হয়। পুরো ইসরাইলকে একটি মাত্র একক ভৌগোলিক নির্বাচনি এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে তেল আবিব, জেরুজালেম কিংবা হাইফার ভোটাররা নিজ নিজ স্থানীয় প্রার্থীর বদলে কেবল একই কেন্দ্রীয় দলীয় তালিকায় ভোট প্রদান করে থাকেন।

ইসরাইলে পূর্ণাঙ্গ আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়। নেসেটের মোট ১২০টি আসন দলগুলোর প্রাপ্ত মোট বৈধ ভোটের অনুপাত অনুযায়ী বণ্টন করা হয়ে থাকে। তবে পার্লামেন্টে প্রবেশের জন্য যেকোনো দলকে মোট বৈধ ভোটের অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ন্যূনতম নির্বাচনি সীমা (থ্রেশহোল্ড) অতিক্রম করতে হয়। ২০২২ সালের নির্বাচনে প্রতি একটি আসনের জন্য দলগুলোকে গড়ে প্রায় ৩৬ হাজার ভোট পেতে হয়েছিল। তবে সামগ্রিক ভোটারের উপস্থিতি এবং দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের ওপর নির্ভর করে এই সংখ্যা পরিবর্তন হতে পারে। ভোট গ্রহণ শেষ হলে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো প্রাথমিক বুথফেরত জরিপ প্রকাশ করবে। তবে আনুষ্ঠানিক ফল পেতে আরো সময় লাগবে। বিশেষ করে দুই পক্ষের আসনসংখ্যার ব্যবধান কম হলে সেনাসদস্য ও অন্যান্য বিশেষ ব্যবস্থায় দেওয়া ভোটের ফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। জালিয়াতির অভিযোগ তুলে আরব ভোটকেন্দ্রগুলোতে দুই হাজার ‘স্বেচ্ছাসেবক’ মোতায়েনের পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে দলটি। এ উদ্যোগের কারণে বর্ণবাদী উসকানি ও ভোটারদের ভয় দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। ওফের উইন্টারের পিপল অব ইসরায়েল, ইয়োজ হেন্ডেলের রিজার্ভিস্টস এবং মোতি লেইটনারের চারেদি পাবলিক দলগুলো জরিপে প্রয়োজনীয় সীমা অতিক্রম করতে হিমশিম খাচ্ছে। ফলে প্রায় ২ লাখ ৮৯ হাজার ভোট আসন পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো কাজে আসেনি, যা সাতটির বেশি আসনের সমান।

ছোট দলগুলোর ভূমিকা ও নির্বাচনি সীমার সমীকরণ

নির্ধারিত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ সীমার নিচে থাকা দলগুলো কোনো আসন পায় না এবং তাদের প্রাপ্ত ভোটগুলো আসন বণ্টনের হিসাবের বাইরে চলে যায়। আনুপাতিক পদ্ধতির কারণে ছোট রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর জন্য পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে পার্লামেন্টে একাধিক ছোট-বড় দলের উপস্থিতি সরকার গঠনের প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত জটিল করে তোলে। কোনো একক দল এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে ছোট দলগুলোই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার মূল নিয়ামক বা কি-মেকার হয়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়া কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত গড়াতে পারে। বিকল্প ১: বিরোধীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও সরকার গঠন।

ইসরাইলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ভোট গ্রহণের জন্য দেশজুড়ে ১২ হাজারের বেশি ভোটকেন্দ্র এবং প্রায় ১৮ হাজার ব্যালট বাক্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে। অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র স্থানীয় সময় সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য খোলা রাখা হবে। ভোটাররা নির্দিষ্ট কেন্দ্রে কাগজের ব্যালট ব্যবহার করে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। আনুষ্ঠানিকভাবে ফল প্রকাশের নির্ধারিত তারিখ ৪ নভেম্বর, আর ফলাফলের বিরুদ্ধে আগামী ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত আদালতে আপিল আবেদন করা যাবে। ভোট গ্রহণের কার্যক্রম তদারকিতে প্রায় এক লাখ কর্মী নিয়োজিত থাকবেন।

ভোটাধিকার ও সরকার গঠনের দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া

ইসরাইলের ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সি প্রায় ৭৩ লাখ নাগরিক ভোট দেওয়ার যোগ্য। দেশের অভ্যন্তরে থাকা প্রায় ৬৫ লাখ ভোটারের বাইরে কূটনৈতিক মিশন ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের জন্য বিশেষ আগাম ভোটাধিকারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফল চূড়ান্ত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব পাওয়া প্রতিটি দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে পরামর্শ সভা করবেন এবং এরপর সরকার গঠনের সর্বোচ্চ সম্ভাবনা থাকা নেতাকে নতুন সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাবেন। দেশটির প্রায় ৭৩ লাখ যোগ্য ভোটারের মধ্যে ৬৫ লাখ ইসরাইলে বসবাস করেন এবং প্রায় ৮ লাখ ১০ হাজার থাকেন বিদেশে। তবে বিদেশে অবস্থানরত অধিকাংশ নাগরিকের জন্য অনুপস্থিত অবস্থায় ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই; সাধারণত ভোট দিতে তাদের দেশে ফিরতে হয়।

প্রেসিডেন্টের আহ্বান ও আস্থাভোটের সমীকরণ

ইসরাইলের নেসেটে মোট ১২০টি আসনের মধ্যে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য অন্তর্বর্তীকালীনভাবে ৬১টি আসনের সমর্থন প্রয়োজন হয়।

প্রথম দফায় সরকার গঠনের দায়িত্ব পাওয়া মনোনীত নেতা ২৮ দিন সময় পান জোট বাঁধার জন্য, যা প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন বাড়ানো সম্ভব।

তবে ইসরাইলি আইনে সব সময় শুরুতেই ৬১ জন সদস্যের সরাসরি সমর্থন আবশ্যক নয়; নেসেটে ভোটাভুটির সময় বিরোধীদের চেয়ে বেশি ভোট পেয়ে আস্থাভোটে জয়ী হতে পারলেই সংখ্যালঘু সরকার গঠিত হতে পারে। গ্যান্টজ, আইজেনকোট, নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের মতো বিরোধী নেতারা নেতানিয়াহুকে হটাতে একজোট হওয়ার চেষ্টা করলেও নীতিগত বিভেদের কারণে আলোচনা দীর্ঘায়িত হতে পারে। এরপরও সমাধান না হলে অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতা পরবর্তী ২১ দিনের মধ্যে প্রেসিডেন্টকে নির্দিষ্ট কোনো সদস্যকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার অনুরোধ জানাতে পারেন। নাফতালি বেনেটের বি’ইয়াখাদ, আভিগদর লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেনু এবং ইয়ার গোলানের ডেমোক্র্যাটস—এই দলগুলোর অবস্থান সরকার গঠনের হিসাব পাল্টে দিতে পারে। ২০২১ সালে নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বে গঠিত সরকারে ডান, বাম ও আরব দলগুলো একসঙ্গে ছিল। কিন্তু বেনেটের ডানপন্থি ইয়ামিনা দলের কয়েকজন সদস্য সমর্থন প্রত্যাহার করায় এক বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে সেই সরকারের পতন ঘটে। ১৯৯৩ সালে শাস জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী ইয়িৎসহাক রবিন আরব দলগুলোর বাইরের সমর্থনে ৫৬ জন জোটসঙ্গী নিয়ে দুই বছরের বেশি সময় সরকার পরিচালনা করেন। তার উত্তরসূরি শিমন পেরেজও ১৯৯৫-৯৬ সালে আরব দলগুলোর সমর্থনে সংখ্যালঘু সরকার পরিচালনা করেন।

নেতানিয়াহুর জোটের আসন ও বিরোধী শিবিরের সম্ভাবনা

নির্বাচনের আগের জরিপ অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর ডানপন্থি ও ধর্মীয় জোট ৫০ থেকে ৫১টি আসন পেতে পারে, যা সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন থেকে বেশ দূরে। অন্যদিকে, গ্যান্টজ ও আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ও তাদের সহযোগীরা ৫৮ থেকে ৬০টি আসনে পৌঁছাতে পারে। তবে হিসাবের বাইরে থাকা আরব-নেতৃত্বাধীন রা’আম এবং জয়েন্ট লিস্ট আরও ১৪ থেকে ১৫টি আসন পেতে পারে। যদি বিরোধী পক্ষগুলো আরব দলগুলোর অপ্রকাশ্য সমর্থন গ্রহণ করে, তবে তারা নেতানিয়াহুকে সহজেই ক্ষমতাচ্যুত করতে পারবে। বিপরীতে, চারটি ইহুদি-নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল পেতে পারে ৫২ থেকে ৫৬টি আসন। তবে মূল প্রশ্ন হলো, আইজেনকোট এবং তার সম্ভাব্য জোটসঙ্গীরা আরব দলগুলোর সমর্থন নিতে রাজি হবেন কি না। অন্যদিকে, লেইটনারের দল নেতানিয়াহুর মিত্র শাস ও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের ভোটে ভাগ বসাতে পারে।

আরব ও মুসলিম ভোটারদের উপস্থিতিই মূল নির্ধারক

ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশ নাগরিক আরব বা মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত। নির্বাচনে তাদের ভোটার উপস্থিতির হার রা’আম ও জয়েন্ট লিস্টের আসন সংখ্যা বাড়াতে মূল ভূমিকা রাখবে। বেশি ভোট পড়লে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশের পার করার ন্যূনতম ভোটের সংখ্যাও বেড়ে যাবে, যা অনেক ছোট ডানপন্থি দলের পার্লামেন্টে ঢোকা কঠিন করে তুলবে। নেতানিয়াহুর দল লিকুদ তাদের প্রচারে সরকারে আরব দলগুলোর অংশগ্রহণের তীব্র বিরোধিতা করেছে। তবে ২০২৩ সালের ঘটনার পর এবং সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর রাজনৈতিক ভূমিকার মধ্যে আরব ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণই চূড়ান্ত ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

  • মঙ্গলবারের ভোটে ১২০ সদস্যের ২৬তম নেসেট নির্বাচিত হবে।
  • মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ৭৩ লাখ, কেন্দ্র ১২ হাজার এবং ব্যালট বাক্স ১৮ হাজার।
  • সংসদীয় আসন পেতে দলগুলোকে অন্তত ৩.২৫% ভোট নিশ্চিত করতে হবে।
  • চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হবে ৪ নভেম্বর এবং আপিল করা যাবে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত।
  • নেতানিয়াহু সেনাপ্রধান ও ট্রাম্পকে সামরিক পদক্ষেপের জন্য চাপ দিচ্ছেন—এমন খবর অস্বীকার করেছেন।
  • ২১% আরব নাগরিকের উপস্থিতি এবং ছোট দলগুলোর পারফরম্যান্স সরকার গঠনের আসল চিত্র ঠিক করবে।

Public Voice

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬


নেতানিয়াহুর ক্ষমতা কি থাকছে, সরকার গঠনে কি নির্ধারক হবেন মুসলিমরা

প্রকাশের তারিখ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

ইসরাইলের নির্বাচনে কোনো পক্ষই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে কি না, তা নিয়ে ব্যাপক অনিশ্চয়তা ও জটিলতা তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবারের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের শাসনের অবসান হতে পারে, আবার বিরোধী পক্ষগুলো সম্মিলিতভাবে বেশি ভোট পেলেও বিভিন্ন কৌশলে তিনি ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেন। দ্য টাইমস অব ইসরাইলের রাজনৈতিক প্রতিবেদক আরিয়েলা কারমেলের একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এসব জটিল সমীকরণ উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ দেওয়া হয়নি।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলা, মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক ফ্রন্টে ধারাবাহিক যুদ্ধ, তীব্র অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার প্রেক্ষাপটে এই ঐতিহাসিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মঙ্গলবারের এই ভোটে ইসরাইলের প্রায় ৭৩ লাখ ভোটার দেশটির ২৬তম নেসেটের (পার্লামেন্ট) সদস্য নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জনমত জরিপগুলোতে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি ও অতি-ধর্মীয় দলগুলোর জোটের সঙ্গে বিরোধীদের অত্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে।

যেভাবে পরিচালিত হয় ইসরাইলের জটিল নির্বাচনি ব্যবস্থা

যুক্তরাজ্য, কানাডা ও জার্মানির মতো ইসরাইলও একটি সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তবে দেশটির নির্বাচনি কাঠামো কিছুটা ভিন্ন। এখানে নাগরিকরা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের জন্য ভোট দেন না; বরং নেসেটের সদস্য নির্বাচনের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে সরকার গঠনের পথ নির্ধারিত হয়। পুরো ইসরাইলকে একটি মাত্র একক ভৌগোলিক নির্বাচনি এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে তেল আবিব, জেরুজালেম কিংবা হাইফার ভোটাররা নিজ নিজ স্থানীয় প্রার্থীর বদলে কেবল একই কেন্দ্রীয় দলীয় তালিকায় ভোট প্রদান করে থাকেন।

ইসরাইলে পূর্ণাঙ্গ আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়। নেসেটের মোট ১২০টি আসন দলগুলোর প্রাপ্ত মোট বৈধ ভোটের অনুপাত অনুযায়ী বণ্টন করা হয়ে থাকে। তবে পার্লামেন্টে প্রবেশের জন্য যেকোনো দলকে মোট বৈধ ভোটের অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ন্যূনতম নির্বাচনি সীমা (থ্রেশহোল্ড) অতিক্রম করতে হয়। ২০২২ সালের নির্বাচনে প্রতি একটি আসনের জন্য দলগুলোকে গড়ে প্রায় ৩৬ হাজার ভোট পেতে হয়েছিল। তবে সামগ্রিক ভোটারের উপস্থিতি এবং দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের ওপর নির্ভর করে এই সংখ্যা পরিবর্তন হতে পারে। ভোট গ্রহণ শেষ হলে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো প্রাথমিক বুথফেরত জরিপ প্রকাশ করবে। তবে আনুষ্ঠানিক ফল পেতে আরো সময় লাগবে। বিশেষ করে দুই পক্ষের আসনসংখ্যার ব্যবধান কম হলে সেনাসদস্য ও অন্যান্য বিশেষ ব্যবস্থায় দেওয়া ভোটের ফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। জালিয়াতির অভিযোগ তুলে আরব ভোটকেন্দ্রগুলোতে দুই হাজার ‘স্বেচ্ছাসেবক’ মোতায়েনের পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে দলটি। এ উদ্যোগের কারণে বর্ণবাদী উসকানি ও ভোটারদের ভয় দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। ওফের উইন্টারের পিপল অব ইসরায়েল, ইয়োজ হেন্ডেলের রিজার্ভিস্টস এবং মোতি লেইটনারের চারেদি পাবলিক দলগুলো জরিপে প্রয়োজনীয় সীমা অতিক্রম করতে হিমশিম খাচ্ছে। ফলে প্রায় ২ লাখ ৮৯ হাজার ভোট আসন পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো কাজে আসেনি, যা সাতটির বেশি আসনের সমান।

ছোট দলগুলোর ভূমিকা ও নির্বাচনি সীমার সমীকরণ

নির্ধারিত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ সীমার নিচে থাকা দলগুলো কোনো আসন পায় না এবং তাদের প্রাপ্ত ভোটগুলো আসন বণ্টনের হিসাবের বাইরে চলে যায়। আনুপাতিক পদ্ধতির কারণে ছোট রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর জন্য পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে পার্লামেন্টে একাধিক ছোট-বড় দলের উপস্থিতি সরকার গঠনের প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত জটিল করে তোলে। কোনো একক দল এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে ছোট দলগুলোই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার মূল নিয়ামক বা কি-মেকার হয়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়া কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত গড়াতে পারে। বিকল্প ১: বিরোধীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও সরকার গঠন।

ইসরাইলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ভোট গ্রহণের জন্য দেশজুড়ে ১২ হাজারের বেশি ভোটকেন্দ্র এবং প্রায় ১৮ হাজার ব্যালট বাক্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে। অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র স্থানীয় সময় সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য খোলা রাখা হবে। ভোটাররা নির্দিষ্ট কেন্দ্রে কাগজের ব্যালট ব্যবহার করে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। আনুষ্ঠানিকভাবে ফল প্রকাশের নির্ধারিত তারিখ ৪ নভেম্বর, আর ফলাফলের বিরুদ্ধে আগামী ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত আদালতে আপিল আবেদন করা যাবে। ভোট গ্রহণের কার্যক্রম তদারকিতে প্রায় এক লাখ কর্মী নিয়োজিত থাকবেন।

ভোটাধিকার ও সরকার গঠনের দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া

ইসরাইলের ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সি প্রায় ৭৩ লাখ নাগরিক ভোট দেওয়ার যোগ্য। দেশের অভ্যন্তরে থাকা প্রায় ৬৫ লাখ ভোটারের বাইরে কূটনৈতিক মিশন ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের জন্য বিশেষ আগাম ভোটাধিকারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফল চূড়ান্ত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব পাওয়া প্রতিটি দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে পরামর্শ সভা করবেন এবং এরপর সরকার গঠনের সর্বোচ্চ সম্ভাবনা থাকা নেতাকে নতুন সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাবেন। দেশটির প্রায় ৭৩ লাখ যোগ্য ভোটারের মধ্যে ৬৫ লাখ ইসরাইলে বসবাস করেন এবং প্রায় ৮ লাখ ১০ হাজার থাকেন বিদেশে। তবে বিদেশে অবস্থানরত অধিকাংশ নাগরিকের জন্য অনুপস্থিত অবস্থায় ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই; সাধারণত ভোট দিতে তাদের দেশে ফিরতে হয়।

প্রেসিডেন্টের আহ্বান ও আস্থাভোটের সমীকরণ

ইসরাইলের নেসেটে মোট ১২০টি আসনের মধ্যে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য অন্তর্বর্তীকালীনভাবে ৬১টি আসনের সমর্থন প্রয়োজন হয়।

প্রথম দফায় সরকার গঠনের দায়িত্ব পাওয়া মনোনীত নেতা ২৮ দিন সময় পান জোট বাঁধার জন্য, যা প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন বাড়ানো সম্ভব।

তবে ইসরাইলি আইনে সব সময় শুরুতেই ৬১ জন সদস্যের সরাসরি সমর্থন আবশ্যক নয়; নেসেটে ভোটাভুটির সময় বিরোধীদের চেয়ে বেশি ভোট পেয়ে আস্থাভোটে জয়ী হতে পারলেই সংখ্যালঘু সরকার গঠিত হতে পারে। গ্যান্টজ, আইজেনকোট, নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের মতো বিরোধী নেতারা নেতানিয়াহুকে হটাতে একজোট হওয়ার চেষ্টা করলেও নীতিগত বিভেদের কারণে আলোচনা দীর্ঘায়িত হতে পারে। এরপরও সমাধান না হলে অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতা পরবর্তী ২১ দিনের মধ্যে প্রেসিডেন্টকে নির্দিষ্ট কোনো সদস্যকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার অনুরোধ জানাতে পারেন। নাফতালি বেনেটের বি’ইয়াখাদ, আভিগদর লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেনু এবং ইয়ার গোলানের ডেমোক্র্যাটস—এই দলগুলোর অবস্থান সরকার গঠনের হিসাব পাল্টে দিতে পারে। ২০২১ সালে নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বে গঠিত সরকারে ডান, বাম ও আরব দলগুলো একসঙ্গে ছিল। কিন্তু বেনেটের ডানপন্থি ইয়ামিনা দলের কয়েকজন সদস্য সমর্থন প্রত্যাহার করায় এক বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে সেই সরকারের পতন ঘটে। ১৯৯৩ সালে শাস জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী ইয়িৎসহাক রবিন আরব দলগুলোর বাইরের সমর্থনে ৫৬ জন জোটসঙ্গী নিয়ে দুই বছরের বেশি সময় সরকার পরিচালনা করেন। তার উত্তরসূরি শিমন পেরেজও ১৯৯৫-৯৬ সালে আরব দলগুলোর সমর্থনে সংখ্যালঘু সরকার পরিচালনা করেন।

নেতানিয়াহুর জোটের আসন ও বিরোধী শিবিরের সম্ভাবনা

নির্বাচনের আগের জরিপ অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর ডানপন্থি ও ধর্মীয় জোট ৫০ থেকে ৫১টি আসন পেতে পারে, যা সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন থেকে বেশ দূরে। অন্যদিকে, গ্যান্টজ ও আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ও তাদের সহযোগীরা ৫৮ থেকে ৬০টি আসনে পৌঁছাতে পারে। তবে হিসাবের বাইরে থাকা আরব-নেতৃত্বাধীন রা’আম এবং জয়েন্ট লিস্ট আরও ১৪ থেকে ১৫টি আসন পেতে পারে। যদি বিরোধী পক্ষগুলো আরব দলগুলোর অপ্রকাশ্য সমর্থন গ্রহণ করে, তবে তারা নেতানিয়াহুকে সহজেই ক্ষমতাচ্যুত করতে পারবে। বিপরীতে, চারটি ইহুদি-নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল পেতে পারে ৫২ থেকে ৫৬টি আসন। তবে মূল প্রশ্ন হলো, আইজেনকোট এবং তার সম্ভাব্য জোটসঙ্গীরা আরব দলগুলোর সমর্থন নিতে রাজি হবেন কি না। অন্যদিকে, লেইটনারের দল নেতানিয়াহুর মিত্র শাস ও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের ভোটে ভাগ বসাতে পারে।

আরব ও মুসলিম ভোটারদের উপস্থিতিই মূল নির্ধারক

ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশ নাগরিক আরব বা মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত। নির্বাচনে তাদের ভোটার উপস্থিতির হার রা’আম ও জয়েন্ট লিস্টের আসন সংখ্যা বাড়াতে মূল ভূমিকা রাখবে। বেশি ভোট পড়লে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশের পার করার ন্যূনতম ভোটের সংখ্যাও বেড়ে যাবে, যা অনেক ছোট ডানপন্থি দলের পার্লামেন্টে ঢোকা কঠিন করে তুলবে। নেতানিয়াহুর দল লিকুদ তাদের প্রচারে সরকারে আরব দলগুলোর অংশগ্রহণের তীব্র বিরোধিতা করেছে। তবে ২০২৩ সালের ঘটনার পর এবং সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর রাজনৈতিক ভূমিকার মধ্যে আরব ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণই চূড়ান্ত ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

  • মঙ্গলবারের ভোটে ১২০ সদস্যের ২৬তম নেসেট নির্বাচিত হবে।
  • মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ৭৩ লাখ, কেন্দ্র ১২ হাজার এবং ব্যালট বাক্স ১৮ হাজার।
  • সংসদীয় আসন পেতে দলগুলোকে অন্তত ৩.২৫% ভোট নিশ্চিত করতে হবে।
  • চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হবে ৪ নভেম্বর এবং আপিল করা যাবে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত।
  • নেতানিয়াহু সেনাপ্রধান ও ট্রাম্পকে সামরিক পদক্ষেপের জন্য চাপ দিচ্ছেন—এমন খবর অস্বীকার করেছেন।
  • ২১% আরব নাগরিকের উপস্থিতি এবং ছোট দলগুলোর পারফরম্যান্স সরকার গঠনের আসল চিত্র ঠিক করবে।

Public Voice

সম্পাদক: মোঃ বাদশাহ আলমগীর
প্রকাশক: অনন্যা অনসূয়া দিবা

কপিরাইট © ২০২৬ Public Voice । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত