উপ-সম্পাদকীয়উপ-সম্পাদকীয়

পশ্চিমের আকাশে ‘প্রযুক্তি-ফ্যাসিবাদ’-এর ছায়া

পশ্চিমের আকাশে ‘প্রযুক্তি-ফ্যাসিবাদ’-এর ছায়া
প্রতীকী ছবি। সূত্র: জেমিনাই এআই

নব্বইয়ের দশকে ইন্টারনেট উদ্ভাবিত হওয়ার পর থেকেই প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় নতুন বিপ্লব সাধিত হয়েছে। একবিংশ শতাব্দী শুরুর পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আগমন, মুঠোফোনের অব্যাহত বিস্তার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ক্রমবর্ধমান দাপটে সেই বিপ্লব চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে আজ। কয়েক দশকের ব্যবধানে এসব প্রযুক্তি মানব সমাজে গণতন্ত্র, বিশ্বায়ন, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য আর বাকস্বাধীনতার উন্নয়ন যেমন ঘটিয়েছে, তেমনই ক্রমে ক্রমে প্রাযুক্তিক সব সিদ্ধান্তকে ধীরে ধীরে অমানবিক করে তুলতেও ভূমিকা রেখেছে।

গুগল, আমাজন, ফেসবুক, এক্সের (সাবেক টুইটার) মতো প্রভাবশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বব্যাপী সুবিস্তীর্ণ কর্মযজ্ঞের খাতিরে কর্মক্ষেত্রে ব্যাপক রূপান্তর ঘটেছে। তথ্য উৎপাদন, বিশ্লেষণ, প্রক্রিয়াকরণ কিংবা সরবরাহের সকল নিয়ন্ত্রণ ক্রমান্বয়ে এখন মানুষের হাত থেকে এআই দ্বারা পরিচালিত অ্যালগরিদমগুলোর করায়ত্ত হয়েছে। 

তবে এর থেকেও বড় ঝুঁকি প্রকট হয়ে উঠছে পশ্চিমের দেশগুলোতে। সম্প্রতি মার্কিন সামরিক বাহিনীতে প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের নিয়োগ কিংবা মার্কিন ডেটা কোম্পানি প্যালান্টিরের যুদ্ধ প্রযুক্তি উৎপাদনে হার্ড পাওয়ার সংক্রান্ত মতাদর্শের বয়ান প্রচারের মতো উদ্যোগ পৃথিবীতে ‘প্রযুক্তি-ফ্যাসিবাদ’-এর দিনকে ঘনিয়ে আনছে কি-না সেই প্রশ্নই এখন ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে।

‘প্রযুক্তি-ফ্যাসিবাদ’ আসলে কী

একসময়ে বামপন্থী আদর্শে উজ্জীবিত প্যালান্টিরের সহ-প্রতিষ্ঠাতা অ্যালেক্স কার্প সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার এআই ডেটা কোম্পানিকে স্রেফ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিসেবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে বিরোধিতা শুরু করেছেন। শুধু তাই নয়, বাম আদর্শ থেকে ক্রমেই ডানে সরে আসা কার্প বর্তমানে বেশকিছু বই লিখে প্রযুক্তি ও বাণিজ্যকে সামরিকীকরণের এক অদ্ভুত বয়ান তৈরি করছেন।

২০২৫ সালে অ্যালেক্স কার্প ও নিকোলাস জামিসকা তাদের লেখা ‘দ্য টেকনোলজিক্যাল রিপাবলিক: হার্ড পাওয়ার, সফট বিলিফ অ্যান্ড ফিউচার অব দ্য ওয়েস্ট’ গ্রন্থে ব্যাপক সামরিকীকৃত ও প্রযুক্তিনির্ভর এক কাল্পনিক পশ্চিমা রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বরূপ তুলে ধরেছেন। কার্পের সহকর্মী ও প্যালান্টিরের চিফ টেকনোলজি অফিসার শ্যাম সংকরও তাঁর লেখা ‘মবিলাইজ: হাউ টু রিবুট দ্য আমেরিকান ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন অ্যান্ড স্টপ ওয়ার্ল্ড ওয়ার থ্রি’ শীর্ষক বইয়ে মার্কিন পুঁজিবাদ ও সামরিক শক্তির মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তুলে সামরিক উৎপাদনকে ব্যাপক হারে ত্বরান্বিত করার মতো ভয়ানক পরামর্শ দিয়েছেন।

এ ছাড়া, তাঁদের প্রতিষ্ঠান প্যালান্টিরও সম্প্রতি ২২ দফার এক অদ্ভুত প্রাতিষ্ঠানিক “ইশতেহার” প্রকাশ করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে পশ্চিমের রাষ্ট্রগুলোর জাতীয় নিরাপত্তার “অতন্দ্র প্রহরী” হিসেবে চিত্রিত করে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে কঠোর সামরিক পদক্ষেপ তথা ‘হার্ড পাওয়ার’ প্রয়োগের মতো অগণতান্ত্রিক, শান্তিবিনষ্টকারী এবং কর্তৃত্ববাদী মনোভঙ্গি বিস্তারের পক্ষে সাফাই গেয়েছে ডানপন্থী “কার্প-শংকর টেক জায়ান্ট” অক্ষ। এমনকি এই মতাদর্শ প্রচারের ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, বহুত্ববাদ এবং অর্ন্তভুক্তিমূলক ব্যবস্থাগুলোকেও নাকচ করে দিয়ে বিশ্বায়নের ধারণার ওপর চপেটাঘাত করা হয়েছে।

আর এ কারণেই বেলজিয়ান দার্শনিক মার্ক কোয়েকেলবার্গের মতো বিশ্লেষকেরা এই মতবাদকে কোনোরূপ রাখঢাক না করেই “প্রযুক্তি-ফ্যাসিবাদ” বা “টেকনো-ফ্যাসিজম” বলে আখ্যা দিয়েছেন। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের চোখে, পশ্চিমে এই ধরনের মতবাদের প্রচার ও প্রসার বৈশ্বিক নিরাপত্তা, শান্তি প্রক্রিয়া, সমতা, প্রগতিশীলতা, আন্তর্জাতিকতাবাদ, ন্যায্যতা তদুপরি সামষ্টিক মানবতাবাদী চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করতে পারে শোচনীয়ভাবে।

সংকটের গভীরতার স্বরূপ

প্রযুক্তি-ফ্যাসিবাদ শব্দটি শুনতে চটকদার মনে হলেও এর ভেতরে রয়েছে সমাজবিধ্বংসী সব গভীর সংকটের শেকড়। কেননা এই মতাদর্শের প্রচারকরা তথাকথিত “জাতীয় নিরাপত্তার” ওপর সর্বদা গুরুত্বারোপ করলেও বহির্বিশ্বে অযাচিত শক্তিশালী সামরিক অভিযান চালিয়ে যুদ্ধ-সংঘাত অব্যাহত রেখে নিজেদের প্রযুক্তি বাণিজ্য অবৈধভাবে টিকিয়ে রাখতে অস্বাভাবিকভাবে পটু। গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলকে প্যালান্টির কর্তৃপক্ষের অকুণ্ঠ সমর্থন করার প্রসঙ্গটি তারই বড় প্রমাণ।

পাশাপাশি, এ ধরনের প্রবণতার আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো: প্রযুক্তিকে ধীরে ধীরে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার বাইরে নিয়ে গিয়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ক্ষমতা কাঠামোতে পরিণত করা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা, নজরদারি প্রযুক্তি ও অ্যালগরিদমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ যখন সামরিক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে একীভূত হয়, তখন নাগরিকের স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং মতপ্রকাশের অধিকার ক্রমেই সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

উত্তরণের পথ কী?

নিরাপত্তার নামে মানুষের প্রতিটি আচরণ পর্যবেক্ষণ, তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা কিংবা বিরোধী মতকে সম্ভাব্য "ঝুঁকি" হিসেবে চিহ্নিত করার এই অপসংস্কৃতি উদার গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিতে পারে বলে মনে করছেন ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ প্রযুক্তি কখনোই নিজে নিরপেক্ষ হতে পারে না। যাদের হাতে প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ, তারাই যে কোনো মূল্যে নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে স্বেচ্ছাচারীভাবে।

তাই প্রযুক্তি-ফ্যাসিবাদের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামরিক প্রযুক্তির ব্যবহার বিষয়ক কার্যকর নীতিমালা ও জবাবদিহিতামূলক কাঠামো গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। এছাড়া প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর গণতান্ত্রিকভাবে নজরদারি করা, অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় কঠোর আইন মেনে চলতে বাধ্য করা এবং প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণমুখী গবেষণা ও উদ্ভাবনের সঙ্গে সংযুক্ত করতেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জোর দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে প্রযুক্তির রাজনৈতিক ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। সবার ওপরে মানবিক মূল্যবোধকে স্থান দিতে হবে। রুখে দিতে হবে প্রাযুক্তিক ও পুঁজিবাদী সকল ফ্যাসিবাদী উদ্যোগ।

মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি সভ্যতার অন্যতম বড় অর্জন হলেও ক্ষমতার একচেটিয়া হাতিয়ার হিসেবে একে যুদ্ধ অর্থনীতির অনুঘটক কিংবা আধিপত্য বিস্তারের অস্ত্রে পরিণত করলে তা মানবজাতির অগ্রগতির পরিবর্তে নতুন ধরনের বৈশ্বিক বিভাজন ও সংঘাতের জন্ম দেবে। এ কারণে বর্তমানে প্রযুক্তিকে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শান্তি ও ন্যায়ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অধীনে বিকশিত হতে দেওয়া সবচেয়ে বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। অন্যথায়, পশ্চিমের আকাশে যে ‘প্রযুক্তি-ফ্যাসিবাদ’-এর ছায়া ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে, তা একসময় সমগ্র বিশ্বের ওপরই দীর্ঘ ও অশুভ ছায়া বিস্তার করবে। গ্রাস করবে মানবসভ্যতা আর মানবতাকে। ইউক্রেন, ইরান, ইরাক, লিবিয়া, ফিলিস্তিনের মতো দেশগুলোর সমসাময়িক পরিস্থিতির দিকে তাকালেই বিষয়টি সকলের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

Public Voice

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬


পশ্চিমের আকাশে ‘প্রযুক্তি-ফ্যাসিবাদ’-এর ছায়া

প্রকাশের তারিখ : ১২ আগস্ট ২০২৬

featured Image

নব্বইয়ের দশকে ইন্টারনেট উদ্ভাবিত হওয়ার পর থেকেই প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় নতুন বিপ্লব সাধিত হয়েছে। একবিংশ শতাব্দী শুরুর পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আগমন, মুঠোফোনের অব্যাহত বিস্তার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ক্রমবর্ধমান দাপটে সেই বিপ্লব চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে আজ। কয়েক দশকের ব্যবধানে এসব প্রযুক্তি মানব সমাজে গণতন্ত্র, বিশ্বায়ন, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য আর বাকস্বাধীনতার উন্নয়ন যেমন ঘটিয়েছে, তেমনই ক্রমে ক্রমে প্রাযুক্তিক সব সিদ্ধান্তকে ধীরে ধীরে অমানবিক করে তুলতেও ভূমিকা রেখেছে।

গুগল, আমাজন, ফেসবুক, এক্সের (সাবেক টুইটার) মতো প্রভাবশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বব্যাপী সুবিস্তীর্ণ কর্মযজ্ঞের খাতিরে কর্মক্ষেত্রে ব্যাপক রূপান্তর ঘটেছে। তথ্য উৎপাদন, বিশ্লেষণ, প্রক্রিয়াকরণ কিংবা সরবরাহের সকল নিয়ন্ত্রণ ক্রমান্বয়ে এখন মানুষের হাত থেকে এআই দ্বারা পরিচালিত অ্যালগরিদমগুলোর করায়ত্ত হয়েছে। 

তবে এর থেকেও বড় ঝুঁকি প্রকট হয়ে উঠছে পশ্চিমের দেশগুলোতে। সম্প্রতি মার্কিন সামরিক বাহিনীতে প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের নিয়োগ কিংবা মার্কিন ডেটা কোম্পানি প্যালান্টিরের যুদ্ধ প্রযুক্তি উৎপাদনে হার্ড পাওয়ার সংক্রান্ত মতাদর্শের বয়ান প্রচারের মতো উদ্যোগ পৃথিবীতে ‘প্রযুক্তি-ফ্যাসিবাদ’-এর দিনকে ঘনিয়ে আনছে কি-না সেই প্রশ্নই এখন ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে।

‘প্রযুক্তি-ফ্যাসিবাদ’ আসলে কী

একসময়ে বামপন্থী আদর্শে উজ্জীবিত প্যালান্টিরের সহ-প্রতিষ্ঠাতা অ্যালেক্স কার্প সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার এআই ডেটা কোম্পানিকে স্রেফ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিসেবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে বিরোধিতা শুরু করেছেন। শুধু তাই নয়, বাম আদর্শ থেকে ক্রমেই ডানে সরে আসা কার্প বর্তমানে বেশকিছু বই লিখে প্রযুক্তি ও বাণিজ্যকে সামরিকীকরণের এক অদ্ভুত বয়ান তৈরি করছেন।

২০২৫ সালে অ্যালেক্স কার্প ও নিকোলাস জামিসকা তাদের লেখা ‘দ্য টেকনোলজিক্যাল রিপাবলিক: হার্ড পাওয়ার, সফট বিলিফ অ্যান্ড ফিউচার অব দ্য ওয়েস্ট’ গ্রন্থে ব্যাপক সামরিকীকৃত ও প্রযুক্তিনির্ভর এক কাল্পনিক পশ্চিমা রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বরূপ তুলে ধরেছেন। কার্পের সহকর্মী ও প্যালান্টিরের চিফ টেকনোলজি অফিসার শ্যাম সংকরও তাঁর লেখা ‘মবিলাইজ: হাউ টু রিবুট দ্য আমেরিকান ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন অ্যান্ড স্টপ ওয়ার্ল্ড ওয়ার থ্রি’ শীর্ষক বইয়ে মার্কিন পুঁজিবাদ ও সামরিক শক্তির মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তুলে সামরিক উৎপাদনকে ব্যাপক হারে ত্বরান্বিত করার মতো ভয়ানক পরামর্শ দিয়েছেন।

এ ছাড়া, তাঁদের প্রতিষ্ঠান প্যালান্টিরও সম্প্রতি ২২ দফার এক অদ্ভুত প্রাতিষ্ঠানিক “ইশতেহার” প্রকাশ করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে পশ্চিমের রাষ্ট্রগুলোর জাতীয় নিরাপত্তার “অতন্দ্র প্রহরী” হিসেবে চিত্রিত করে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে কঠোর সামরিক পদক্ষেপ তথা ‘হার্ড পাওয়ার’ প্রয়োগের মতো অগণতান্ত্রিক, শান্তিবিনষ্টকারী এবং কর্তৃত্ববাদী মনোভঙ্গি বিস্তারের পক্ষে সাফাই গেয়েছে ডানপন্থী “কার্প-শংকর টেক জায়ান্ট” অক্ষ। এমনকি এই মতাদর্শ প্রচারের ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, বহুত্ববাদ এবং অর্ন্তভুক্তিমূলক ব্যবস্থাগুলোকেও নাকচ করে দিয়ে বিশ্বায়নের ধারণার ওপর চপেটাঘাত করা হয়েছে।

আর এ কারণেই বেলজিয়ান দার্শনিক মার্ক কোয়েকেলবার্গের মতো বিশ্লেষকেরা এই মতবাদকে কোনোরূপ রাখঢাক না করেই “প্রযুক্তি-ফ্যাসিবাদ” বা “টেকনো-ফ্যাসিজম” বলে আখ্যা দিয়েছেন। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের চোখে, পশ্চিমে এই ধরনের মতবাদের প্রচার ও প্রসার বৈশ্বিক নিরাপত্তা, শান্তি প্রক্রিয়া, সমতা, প্রগতিশীলতা, আন্তর্জাতিকতাবাদ, ন্যায্যতা তদুপরি সামষ্টিক মানবতাবাদী চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করতে পারে শোচনীয়ভাবে।

সংকটের গভীরতার স্বরূপ

প্রযুক্তি-ফ্যাসিবাদ শব্দটি শুনতে চটকদার মনে হলেও এর ভেতরে রয়েছে সমাজবিধ্বংসী সব গভীর সংকটের শেকড়। কেননা এই মতাদর্শের প্রচারকরা তথাকথিত “জাতীয় নিরাপত্তার” ওপর সর্বদা গুরুত্বারোপ করলেও বহির্বিশ্বে অযাচিত শক্তিশালী সামরিক অভিযান চালিয়ে যুদ্ধ-সংঘাত অব্যাহত রেখে নিজেদের প্রযুক্তি বাণিজ্য অবৈধভাবে টিকিয়ে রাখতে অস্বাভাবিকভাবে পটু। গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলকে প্যালান্টির কর্তৃপক্ষের অকুণ্ঠ সমর্থন করার প্রসঙ্গটি তারই বড় প্রমাণ।

পাশাপাশি, এ ধরনের প্রবণতার আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো: প্রযুক্তিকে ধীরে ধীরে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার বাইরে নিয়ে গিয়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ক্ষমতা কাঠামোতে পরিণত করা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা, নজরদারি প্রযুক্তি ও অ্যালগরিদমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ যখন সামরিক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে একীভূত হয়, তখন নাগরিকের স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং মতপ্রকাশের অধিকার ক্রমেই সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

উত্তরণের পথ কী?

নিরাপত্তার নামে মানুষের প্রতিটি আচরণ পর্যবেক্ষণ, তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা কিংবা বিরোধী মতকে সম্ভাব্য "ঝুঁকি" হিসেবে চিহ্নিত করার এই অপসংস্কৃতি উদার গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিতে পারে বলে মনে করছেন ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ প্রযুক্তি কখনোই নিজে নিরপেক্ষ হতে পারে না। যাদের হাতে প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ, তারাই যে কোনো মূল্যে নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে স্বেচ্ছাচারীভাবে।

তাই প্রযুক্তি-ফ্যাসিবাদের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামরিক প্রযুক্তির ব্যবহার বিষয়ক কার্যকর নীতিমালা ও জবাবদিহিতামূলক কাঠামো গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। এছাড়া প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর গণতান্ত্রিকভাবে নজরদারি করা, অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় কঠোর আইন মেনে চলতে বাধ্য করা এবং প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণমুখী গবেষণা ও উদ্ভাবনের সঙ্গে সংযুক্ত করতেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জোর দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে প্রযুক্তির রাজনৈতিক ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। সবার ওপরে মানবিক মূল্যবোধকে স্থান দিতে হবে। রুখে দিতে হবে প্রাযুক্তিক ও পুঁজিবাদী সকল ফ্যাসিবাদী উদ্যোগ।

মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি সভ্যতার অন্যতম বড় অর্জন হলেও ক্ষমতার একচেটিয়া হাতিয়ার হিসেবে একে যুদ্ধ অর্থনীতির অনুঘটক কিংবা আধিপত্য বিস্তারের অস্ত্রে পরিণত করলে তা মানবজাতির অগ্রগতির পরিবর্তে নতুন ধরনের বৈশ্বিক বিভাজন ও সংঘাতের জন্ম দেবে। এ কারণে বর্তমানে প্রযুক্তিকে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শান্তি ও ন্যায়ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অধীনে বিকশিত হতে দেওয়া সবচেয়ে বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। অন্যথায়, পশ্চিমের আকাশে যে ‘প্রযুক্তি-ফ্যাসিবাদ’-এর ছায়া ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে, তা একসময় সমগ্র বিশ্বের ওপরই দীর্ঘ ও অশুভ ছায়া বিস্তার করবে। গ্রাস করবে মানবসভ্যতা আর মানবতাকে। ইউক্রেন, ইরান, ইরাক, লিবিয়া, ফিলিস্তিনের মতো দেশগুলোর সমসাময়িক পরিস্থিতির দিকে তাকালেই বিষয়টি সকলের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।


Public Voice

সম্পাদক: মোঃ বাদশাহ আলমগীর
প্রকাশক: অনন্যা অনসূয়া দিবা

কপিরাইট © ২০২৬ Public Voice । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত