ফুটবলফুটবল

শেষ দেখা থেকে আর্জেন্টিনার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

খেলার স্কোরলাইন অনেক কিছু বলে, কিন্তু সবকিছু বলে না। অনেকেই শুধু গোল দেখবেন। তবে যারা ম্যাচটি ট্যাকটিক্যালি বিশ্লেষণ করেছেন, তারা বুঝেছেন—লিওনেল মেসি কীভাবে পুরো ম্যাচের ছন্দ নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন।

ইংল্যান্ডের পরিকল্পনা ছিল স্পষ্ট। বল পায়ে মেসিকে একা ছেড়ে দেওয়া যাবে না। তাই প্রায় প্রতিটি মুহূর্তে তাকে ডাবল-টিম করা হয়েছে। প্রয়োজনে ট্যাকটিক্যাল ফাউল করে খেলার গতি থামানোরও চেষ্টা হয়েছে।

কিন্তু এখানেই মহান খেলোয়াড়দের পার্থক্য। মেসি ড্রিবল দিয়ে নয়, সিদ্ধান্ত দিয়ে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছেন। কখন বল ধরে রাখতে হবে, কখন প্রতিপক্ষের প্রেস নিজের দিকে টেনে আনতে হবে, আর কখন এক টাচে বল ছেড়ে দিতে হবে—প্রতিটি সিদ্ধান্ত ছিল সময়োপযোগী ও কার্যকর।

তার দুটি অ্যাসিস্ট কেবল পরিসংখ্যান নয়; বরং প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে নিজের দিকে টেনে এনে সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করার অসাধারণ ফুটবল বুদ্ধিমত্তার প্রতিফলন। এদিন মেসি শুধু প্লেমেকার ছিলেন না, পুরো আর্জেন্টিনার আক্রমণের ছন্দের নিয়ন্ত্রক ছিলেন।

ফুটবলে সব নায়ক গোল করেন না। কেউ কেউ পুরো ম্যাচের গল্পটাই লিখে দেন। এই ম্যাচে সেই গল্পের লেখক ছিলেন লিওনেল মেসি।

তবে এই জয়ের তাৎপর্য কেবল একটি ম্যাচের সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি কোটি আর্জেন্টিনা সমর্থকের দীর্ঘ প্রতীক্ষা, অসংখ্য হতাশা, বিদ্রুপ ও অবিচল বিশ্বাসের প্রতীক।

১৯৯৮ বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায়, ২০০২ সালে গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায়, ২০০৬ ও ২০১০ সালের অপূর্ণতা, ২০১৪ সালে ফাইনালে উঠেও শিরোপা হাতছাড়া, ২০১৮ সালের হতাশা—দীর্ঘ সময় ধরেই আর্জেন্টিনা সমর্থকদের অপেক্ষা করতে হয়েছে। এমনকি ২০২২ বিশ্বকাপের শুরুতেও সৌদি আরবের কাছে পরাজয়ের পর অনেকেই দলটির সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

বাংলাদেশেও বছরের পর বছর আর্জেন্টিনা সমর্থকদের নানা বিদ্রুপের মুখোমুখি হতে হয়েছে। "আর জিতি না"—এমন মন্তব্যও শুনতে হয়েছে দীর্ঘদিন। কিন্তু ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে। শুধু তাই নয়, সর্বশেষ চারটি বিশ্বকাপের মধ্যে তিনবার ফাইনালে উঠে আর্জেন্টিনা নিজেদের ধারাবাহিকতারও প্রমাণ দিয়েছে।

অন্যদিকে, ২০০৬ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত ছয়টি বিশ্বকাপে ব্রাজিল মাত্র একবার সেমিফাইনালে উঠেছে। সেই সেমিফাইনালেও নিজেদের মাঠে ৭-১ গোলের ঐতিহাসিক পরাজয়ের স্মৃতি বহন করতে হয়েছে। টানা ছয় বিশ্বকাপে ফাইনালে উঠতে না পারাও তাদের জন্য হতাশার বিষয়।

তবে ফুটবলের সৌন্দর্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, বিদ্বেষে নয়। নতুন প্রজন্মের অনেক দর্শক ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জিততে দেখেনি। আবার আর্জেন্টিনা সমর্থকেরাও দীর্ঘ ৩৬ বছর শিরোপার অপেক্ষায় ছিলেন। তাই প্রতিপক্ষকে ছোট করার বদলে খেলাটিকে উপভোগ করাই হওয়া উচিত প্রকৃত ক্রীড়াসুলভ মানসিকতা।

ফুটবল বারবার প্রমাণ করেছে—সময়ই সবচেয়ে বড় বিচারক। আজ যে দল জয়ী, আগামীকাল তারাও কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে পারে। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত মনে রাখে ধৈর্য, বিশ্বাস এবং ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।

আর সেই গল্পের অন্যতম উজ্জ্বল নাম—লিওনেল মেসি এবং আর্জেন্টিনা।

Public Voice

বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬


শেষ দেখা থেকে আর্জেন্টিনার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুলাই ২০২৬

featured Image

খেলার স্কোরলাইন অনেক কিছু বলে, কিন্তু সবকিছু বলে না। অনেকেই শুধু গোল দেখবেন। তবে যারা ম্যাচটি ট্যাকটিক্যালি বিশ্লেষণ করেছেন, তারা বুঝেছেন—লিওনেল মেসি কীভাবে পুরো ম্যাচের ছন্দ নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন।

ইংল্যান্ডের পরিকল্পনা ছিল স্পষ্ট। বল পায়ে মেসিকে একা ছেড়ে দেওয়া যাবে না। তাই প্রায় প্রতিটি মুহূর্তে তাকে ডাবল-টিম করা হয়েছে। প্রয়োজনে ট্যাকটিক্যাল ফাউল করে খেলার গতি থামানোরও চেষ্টা হয়েছে।

কিন্তু এখানেই মহান খেলোয়াড়দের পার্থক্য। মেসি ড্রিবল দিয়ে নয়, সিদ্ধান্ত দিয়ে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছেন। কখন বল ধরে রাখতে হবে, কখন প্রতিপক্ষের প্রেস নিজের দিকে টেনে আনতে হবে, আর কখন এক টাচে বল ছেড়ে দিতে হবে—প্রতিটি সিদ্ধান্ত ছিল সময়োপযোগী ও কার্যকর।

তার দুটি অ্যাসিস্ট কেবল পরিসংখ্যান নয়; বরং প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে নিজের দিকে টেনে এনে সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করার অসাধারণ ফুটবল বুদ্ধিমত্তার প্রতিফলন। এদিন মেসি শুধু প্লেমেকার ছিলেন না, পুরো আর্জেন্টিনার আক্রমণের ছন্দের নিয়ন্ত্রক ছিলেন।

ফুটবলে সব নায়ক গোল করেন না। কেউ কেউ পুরো ম্যাচের গল্পটাই লিখে দেন। এই ম্যাচে সেই গল্পের লেখক ছিলেন লিওনেল মেসি।

তবে এই জয়ের তাৎপর্য কেবল একটি ম্যাচের সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি কোটি আর্জেন্টিনা সমর্থকের দীর্ঘ প্রতীক্ষা, অসংখ্য হতাশা, বিদ্রুপ ও অবিচল বিশ্বাসের প্রতীক।

১৯৯৮ বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায়, ২০০২ সালে গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায়, ২০০৬ ও ২০১০ সালের অপূর্ণতা, ২০১৪ সালে ফাইনালে উঠেও শিরোপা হাতছাড়া, ২০১৮ সালের হতাশা—দীর্ঘ সময় ধরেই আর্জেন্টিনা সমর্থকদের অপেক্ষা করতে হয়েছে। এমনকি ২০২২ বিশ্বকাপের শুরুতেও সৌদি আরবের কাছে পরাজয়ের পর অনেকেই দলটির সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

বাংলাদেশেও বছরের পর বছর আর্জেন্টিনা সমর্থকদের নানা বিদ্রুপের মুখোমুখি হতে হয়েছে। "আর জিতি না"—এমন মন্তব্যও শুনতে হয়েছে দীর্ঘদিন। কিন্তু ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে। শুধু তাই নয়, সর্বশেষ চারটি বিশ্বকাপের মধ্যে তিনবার ফাইনালে উঠে আর্জেন্টিনা নিজেদের ধারাবাহিকতারও প্রমাণ দিয়েছে।

অন্যদিকে, ২০০৬ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত ছয়টি বিশ্বকাপে ব্রাজিল মাত্র একবার সেমিফাইনালে উঠেছে। সেই সেমিফাইনালেও নিজেদের মাঠে ৭-১ গোলের ঐতিহাসিক পরাজয়ের স্মৃতি বহন করতে হয়েছে। টানা ছয় বিশ্বকাপে ফাইনালে উঠতে না পারাও তাদের জন্য হতাশার বিষয়।

তবে ফুটবলের সৌন্দর্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, বিদ্বেষে নয়। নতুন প্রজন্মের অনেক দর্শক ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জিততে দেখেনি। আবার আর্জেন্টিনা সমর্থকেরাও দীর্ঘ ৩৬ বছর শিরোপার অপেক্ষায় ছিলেন। তাই প্রতিপক্ষকে ছোট করার বদলে খেলাটিকে উপভোগ করাই হওয়া উচিত প্রকৃত ক্রীড়াসুলভ মানসিকতা।

ফুটবল বারবার প্রমাণ করেছে—সময়ই সবচেয়ে বড় বিচারক। আজ যে দল জয়ী, আগামীকাল তারাও কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে পারে। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত মনে রাখে ধৈর্য, বিশ্বাস এবং ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।

আর সেই গল্পের অন্যতম উজ্জ্বল নাম—লিওনেল মেসি এবং আর্জেন্টিনা।


Public Voice

সম্পাদক: মোঃ বাদশাহ আলমগীর
প্রকাশক: অনন্যা অনসূয়া দিবা

কপিরাইট © ২০২৬ Public Voice । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত