মানবতা
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্যস্ত করিডোরে সাদা অ্যাপ্রন বা দামি ডিগ্রির ভিড়ে একজন নারীকে প্রায়ই দেখা যায় অতি ব্যস্ততায়। তিনি চিকিৎসক নন, নার্সও নন; তবুও হাসপাতালের অজ্ঞাতনামা আর স্বজনহীন রোগীদের কাছে তিনি দেবদূতের চেয়ে কম কিছু নন। তিনি আলিয়া বেগম। গত দুই যুগ ধরে হাসপাতালের স্ট্রেচার আর ট্রলি ঠেলার পাশাপাশি তিনি কুড়িয়ে নিচ্ছেন অসহায় মানুষের আশীর্বাদ।
সিরাজগঞ্জের মেয়ে আলিয়ার জীবনটা মোটেও মসৃণ ছিল না। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছিল। কিন্তু যৌতুকের নিষ্ঠুর দাবিতে তিন বছরের মাথায় প্রতিবন্ধী কন্যাসন্তানসহ তাঁকে ফেলে চলে যান স্বামী। জীবন বাঁচানোর তাগিদে মা রওশন আরাকে নিয়ে রাজশাহী চলে আসেন আলিয়া। শুরু হয় এক কঠিন সংগ্রাম। এক সময় বই বাঁধাইয়ের কাজ করতেন, যেখানে এক হাজার পৃষ্ঠা বাঁধাই করলে মিলত মাত্র ২৫ টাকা। সেই অভাবের দিনগুলোতেই পরিচয় হয় হাসপাতালের নার্স নূরজাহান বেগমের সাথে, যাঁর হাত ধরে হাসপাতালের ট্রলি টানার কাজ শুরু করেন আলিয়া।
১৯৯৯ সালের কথা। হাসপাতালের ট্রলি ঠেলতে গিয়ে আলিয়া দেখলেন দুজন অজ্ঞাতনামা মানুষের মৃত্যু। কেউ ছিল না তাঁদের পাশে, ছিল না শেষ বিদায়ের কোনো স্বজন। এই দৃশ্য আলিয়াকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সেই থেকে শুরু। এরপর থেকে হাসপাতালে কোনো অভিভাবকহীন রোগী এলেই আলিয়া সেখানে উপস্থিত। নিজের সামান্য আয়ের টাকা দিয়ে ওষুধ কেনা, খাইয়ে দেওয়া আর পরম মমতায় শুশ্রূষা করাটাই তাঁর জীবনের ব্রত হয়ে দাঁড়ায়।
"মানুষ যখন সুস্থ হয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফেরে, তখন নিজের সব কষ্ট ভুলে যাই। আমি চাই না কেউ বিনা পরিচয়ে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিক।" — আলিয়া বেগম
আগে শুধু সুস্থ হওয়ার পর রোগীদের ঠিকানা জোগাড় করতেন আলিয়া। এখন প্রযুক্তির সহায়তায় তিনি এক ধাপ এগিয়ে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে তিনি এখন শুরুতেই পুলিশের সহায়তায় অজ্ঞাত রোগীদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে পরিচয় শনাক্ত করেন। গত দুই দশকে কয়েক শ রোগীকে তিনি পৌঁছে দিয়েছেন তাঁদের আপন ঠিকানায়।
সম্প্রতি যশোরের প্রতিবন্ধী পারুল বেগম কিংবা দিনাজপুরের ৯ বছর ধরে নিখোঁজ থাকা পারভীনের ঠিকানা খুঁজে বের করেছেন তিনি। কখনো কখনো স্বজনদের অবহেলা তাঁকে ব্যথিত করে, কিন্তু দমে যান না তিনি।
আলিয়ার মমতার গল্প ছড়িয়ে আছে হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে। ২০১২ সালে ট্রেনে হাত-পা কাটা পড়া এক ১০ বছরের শিশুকে দীর্ঘ ১৩ বছর নিজের কাছে আগলে রেখেছিলেন তিনি। গত ২৭ জানুয়ারি ছেলেটি মারা গেলেও আলিয়ার স্মৃতিতে সে অমর। বর্তমানে চিকিৎসাধীন আর্জিনা নামের এক অনাথ তরুণী পচন ধরা পা নিয়ে লড়ছেন। আলিয়াকে দেখে আর্জিনার সরল স্বীকারোক্তি— "জীবনে কখনো মায়ের আদর পাইনি, আপনিই আমার মা।"
আলিয়ার এই বিশাল কর্মযজ্ঞের স্বীকৃতিস্বরূপ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। তাঁর এই মানবিক উদ্যোগে পাশে দাঁড়িয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। আলিয়ার মেয়ে এখন নার্সিংয়ে ডিপ্লোমা করছেন—মায়ের সেবার উত্তরাধিকার হয়তো মেয়েই বহন করবেন।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করিডোরে আলিয়া বেগম এক জীবন্ত কিংবদন্তি। যেখানে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান হার মানে, সেখানে আলিয়ার মমতা আর সেবা অনেককে ফিরিয়ে দিচ্ছে নতুন জীবন

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্যস্ত করিডোরে সাদা অ্যাপ্রন বা দামি ডিগ্রির ভিড়ে একজন নারীকে প্রায়ই দেখা যায় অতি ব্যস্ততায়। তিনি চিকিৎসক নন, নার্সও নন; তবুও হাসপাতালের অজ্ঞাতনামা আর স্বজনহীন রোগীদের কাছে তিনি দেবদূতের চেয়ে কম কিছু নন। তিনি আলিয়া বেগম। গত দুই যুগ ধরে হাসপাতালের স্ট্রেচার আর ট্রলি ঠেলার পাশাপাশি তিনি কুড়িয়ে নিচ্ছেন অসহায় মানুষের আশীর্বাদ।
সিরাজগঞ্জের মেয়ে আলিয়ার জীবনটা মোটেও মসৃণ ছিল না। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছিল। কিন্তু যৌতুকের নিষ্ঠুর দাবিতে তিন বছরের মাথায় প্রতিবন্ধী কন্যাসন্তানসহ তাঁকে ফেলে চলে যান স্বামী। জীবন বাঁচানোর তাগিদে মা রওশন আরাকে নিয়ে রাজশাহী চলে আসেন আলিয়া। শুরু হয় এক কঠিন সংগ্রাম। এক সময় বই বাঁধাইয়ের কাজ করতেন, যেখানে এক হাজার পৃষ্ঠা বাঁধাই করলে মিলত মাত্র ২৫ টাকা। সেই অভাবের দিনগুলোতেই পরিচয় হয় হাসপাতালের নার্স নূরজাহান বেগমের সাথে, যাঁর হাত ধরে হাসপাতালের ট্রলি টানার কাজ শুরু করেন আলিয়া।
১৯৯৯ সালের কথা। হাসপাতালের ট্রলি ঠেলতে গিয়ে আলিয়া দেখলেন দুজন অজ্ঞাতনামা মানুষের মৃত্যু। কেউ ছিল না তাঁদের পাশে, ছিল না শেষ বিদায়ের কোনো স্বজন। এই দৃশ্য আলিয়াকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সেই থেকে শুরু। এরপর থেকে হাসপাতালে কোনো অভিভাবকহীন রোগী এলেই আলিয়া সেখানে উপস্থিত। নিজের সামান্য আয়ের টাকা দিয়ে ওষুধ কেনা, খাইয়ে দেওয়া আর পরম মমতায় শুশ্রূষা করাটাই তাঁর জীবনের ব্রত হয়ে দাঁড়ায়।
"মানুষ যখন সুস্থ হয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফেরে, তখন নিজের সব কষ্ট ভুলে যাই। আমি চাই না কেউ বিনা পরিচয়ে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিক।" — আলিয়া বেগম
আগে শুধু সুস্থ হওয়ার পর রোগীদের ঠিকানা জোগাড় করতেন আলিয়া। এখন প্রযুক্তির সহায়তায় তিনি এক ধাপ এগিয়ে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে তিনি এখন শুরুতেই পুলিশের সহায়তায় অজ্ঞাত রোগীদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে পরিচয় শনাক্ত করেন। গত দুই দশকে কয়েক শ রোগীকে তিনি পৌঁছে দিয়েছেন তাঁদের আপন ঠিকানায়।
সম্প্রতি যশোরের প্রতিবন্ধী পারুল বেগম কিংবা দিনাজপুরের ৯ বছর ধরে নিখোঁজ থাকা পারভীনের ঠিকানা খুঁজে বের করেছেন তিনি। কখনো কখনো স্বজনদের অবহেলা তাঁকে ব্যথিত করে, কিন্তু দমে যান না তিনি।
আলিয়ার মমতার গল্প ছড়িয়ে আছে হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে। ২০১২ সালে ট্রেনে হাত-পা কাটা পড়া এক ১০ বছরের শিশুকে দীর্ঘ ১৩ বছর নিজের কাছে আগলে রেখেছিলেন তিনি। গত ২৭ জানুয়ারি ছেলেটি মারা গেলেও আলিয়ার স্মৃতিতে সে অমর। বর্তমানে চিকিৎসাধীন আর্জিনা নামের এক অনাথ তরুণী পচন ধরা পা নিয়ে লড়ছেন। আলিয়াকে দেখে আর্জিনার সরল স্বীকারোক্তি— "জীবনে কখনো মায়ের আদর পাইনি, আপনিই আমার মা।"
আলিয়ার এই বিশাল কর্মযজ্ঞের স্বীকৃতিস্বরূপ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। তাঁর এই মানবিক উদ্যোগে পাশে দাঁড়িয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। আলিয়ার মেয়ে এখন নার্সিংয়ে ডিপ্লোমা করছেন—মায়ের সেবার উত্তরাধিকার হয়তো মেয়েই বহন করবেন।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করিডোরে আলিয়া বেগম এক জীবন্ত কিংবদন্তি। যেখানে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান হার মানে, সেখানে আলিয়ার মমতা আর সেবা অনেককে ফিরিয়ে দিচ্ছে নতুন জীবন
