অর্থনীতি
বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণ গত ১০ বছরে প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ডেট রিপোর্ট ২০২৬’-এ উঠে এসেছে যে, ২০১৫ সালে দেশের মোট বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ৩,৮৭৭ কোটি মার্কিন ডলার। ২০২৫ সালের শেষে এই ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১,৩৪৩ কোটি মার্কিন ডলারে। প্রতি ডলারের বিনিময়মূল্য ১২৫ টাকা হিসাবে স্থানীয় মুদ্রায় এই ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৪ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে মোট বিদেশি ঋণের স্থিতি ৮.৬ শতাংশ বেড়েছে। এতে স্পষ্ট যে নতুন ঋণ গ্রহণ, পুরোনো ঋণ পরিশোধ ও অন্যান্য সমন্বয়ের পরও বিদেশি ঋণের পরিমাণ টানা বাড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের একটি বড় অংশ এসেছে বিভিন্ন বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাসমূহের কাছ থেকে। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মতো সংস্থাগুলোর কাছে দেশের মোট বকেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫,১১৪ কোটি ডলার। এর একক খাত হিসেবে বিশ্বব্যাংকের পাওনা ২,২৬৩ কোটি ডলার এবং এডিবির কাছে পাওনা ১,৭৫১ কোটি ডলার।
অন্যদিকে দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতা দেশগুলোর কাছেও বাংলাদেশের বড় অংকের ঋণ রয়েছে। জাপান, চীন, ভারত ও রাশিয়ার মতো দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতা দেশগুলোর কাছে মোট বকেয়া ঋণের পরিমাণ ৩,২৬৪ কোটি ডলার। এর মধ্যে জাপানের পাওনা ১,২৭২ কোটি ডলার এবং রাশিয়ার পাওনা ৯০২ কোটি ডলার। এছাড়া সরকারি খাতের পাশাপাশি দেশের বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১,০০০ কোটি ডলার এবং স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের স্থিতি রয়েছে প্রায় ১,৫০০ কোটি ডলার।
ঋণের মোট পরিমাণ বাড়লেও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার বেশ কিছু সূচকে বাংলাদেশের অবস্থা তুলনামূলক সহনীয় বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট জাতীয় আয়ের (জিএনআই) তুলনায় বিদেশি ঋণের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ২৪ শতাংশে, যা এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে একটি ইতিবাচক দিক হলো, রপ্তানি আয়ের বিপরীতে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের অনুপাত কমে ১৬ শতাংশে নেমে এসেছে। এটি আগের বছরের তুলনায় ৩.৮ শতাংশ কম। এর অর্থ দাঁড়ায়, রপ্তানি থেকে অর্জিত প্রতি ১০০ ডলারের মধ্যে বর্তমানে ১৬ ডলার ব্যয় হচ্ছে বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ বাবদ, যা ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার ক্ষেত্রে অনুকূল ইঙ্গিত দেয়।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিদেশি ঋণের স্থিতি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তা পরিশোধের বার্ষিক ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদেশি ঋণের বিপরীতে মাত্র ১১০ কোটি ডলার পরিশোধ করেছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২০১ কোটি ডলারে এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে পৌঁছায় প্রায় ৩০০ কোটি ডলারে।
আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের ওপর বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ বেশ কয়েকটি বড় মেগা অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পের নেওয়া ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের নির্ধারিত সময়সীমা কাছে চলে আসছে। বিশেষ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের ঋণের কিস্তি দ্রুত পরিশোধ শুরু করতে হবে, যার বড় অংশই পাবে জাপান। অন্যদিকে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু টানেল ও মেট্রোরেল প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণ গত ১০ বছরে প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ডেট রিপোর্ট ২০২৬’-এ উঠে এসেছে যে, ২০১৫ সালে দেশের মোট বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ৩,৮৭৭ কোটি মার্কিন ডলার। ২০২৫ সালের শেষে এই ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১,৩৪৩ কোটি মার্কিন ডলারে। প্রতি ডলারের বিনিময়মূল্য ১২৫ টাকা হিসাবে স্থানীয় মুদ্রায় এই ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৪ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে মোট বিদেশি ঋণের স্থিতি ৮.৬ শতাংশ বেড়েছে। এতে স্পষ্ট যে নতুন ঋণ গ্রহণ, পুরোনো ঋণ পরিশোধ ও অন্যান্য সমন্বয়ের পরও বিদেশি ঋণের পরিমাণ টানা বাড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের একটি বড় অংশ এসেছে বিভিন্ন বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাসমূহের কাছ থেকে। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মতো সংস্থাগুলোর কাছে দেশের মোট বকেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫,১১৪ কোটি ডলার। এর একক খাত হিসেবে বিশ্বব্যাংকের পাওনা ২,২৬৩ কোটি ডলার এবং এডিবির কাছে পাওনা ১,৭৫১ কোটি ডলার।
অন্যদিকে দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতা দেশগুলোর কাছেও বাংলাদেশের বড় অংকের ঋণ রয়েছে। জাপান, চীন, ভারত ও রাশিয়ার মতো দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতা দেশগুলোর কাছে মোট বকেয়া ঋণের পরিমাণ ৩,২৬৪ কোটি ডলার। এর মধ্যে জাপানের পাওনা ১,২৭২ কোটি ডলার এবং রাশিয়ার পাওনা ৯০২ কোটি ডলার। এছাড়া সরকারি খাতের পাশাপাশি দেশের বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১,০০০ কোটি ডলার এবং স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের স্থিতি রয়েছে প্রায় ১,৫০০ কোটি ডলার।
ঋণের মোট পরিমাণ বাড়লেও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার বেশ কিছু সূচকে বাংলাদেশের অবস্থা তুলনামূলক সহনীয় বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট জাতীয় আয়ের (জিএনআই) তুলনায় বিদেশি ঋণের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ২৪ শতাংশে, যা এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে একটি ইতিবাচক দিক হলো, রপ্তানি আয়ের বিপরীতে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের অনুপাত কমে ১৬ শতাংশে নেমে এসেছে। এটি আগের বছরের তুলনায় ৩.৮ শতাংশ কম। এর অর্থ দাঁড়ায়, রপ্তানি থেকে অর্জিত প্রতি ১০০ ডলারের মধ্যে বর্তমানে ১৬ ডলার ব্যয় হচ্ছে বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ বাবদ, যা ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার ক্ষেত্রে অনুকূল ইঙ্গিত দেয়।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিদেশি ঋণের স্থিতি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তা পরিশোধের বার্ষিক ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদেশি ঋণের বিপরীতে মাত্র ১১০ কোটি ডলার পরিশোধ করেছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২০১ কোটি ডলারে এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে পৌঁছায় প্রায় ৩০০ কোটি ডলারে।
আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের ওপর বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ বেশ কয়েকটি বড় মেগা অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পের নেওয়া ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের নির্ধারিত সময়সীমা কাছে চলে আসছে। বিশেষ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের ঋণের কিস্তি দ্রুত পরিশোধ শুরু করতে হবে, যার বড় অংশই পাবে জাপান। অন্যদিকে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু টানেল ও মেট্রোরেল প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।
