সিলেটসিলেট

সংরক্ষণের অভাবে হুমকির মুখে সিলেটের উছমানপুরের ঐতিহাসিক গায়েবি মসজিদ

সিলেটের উছমানপুর গ্রামের সুলতানি আমলের গায়েবি মসজিদটি সংরক্ষণের অভাবে ও নতুন নির্মাণ পরিকল্পনার কারণে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক এই নিদর্শনের স্বকীয়তা রক্ষায় স্থানীয়রা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।

Publicvoice24
Publicvoice24
|
শেয়ার করুন
অ+ অ-

সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় মুসলিম শাসনামলের সাক্ষী হিসেবে অনেক রাজকীয় স্থাপনা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। স্থানীয়ভাবে এগুলোর বেশির ভাগই ‘গায়েবি’ স্থাপনা বা জলাশয় হিসেবে পরিচিত। জনশূন্যতার সুযোগে এক সময় এসব স্থাপনা জঙ্গল ও মাটির স্তরে ঢাকা পড়েছিল। পরবর্তী সময়ে মানুষ জঙ্গল পরিষ্কার করে বা মাটি খুঁড়ে এগুলোকে প্রকাশ্যে নিয়ে এলেও ‘গায়েবি’ নাম ও রহস্যময় পরিচিতি রয়ে গেছে। এসব স্থাপনা বা পুকুরগুলোর মূল নির্মাতা ও নির্মাণকাল সম্পর্কে অনেক ক্ষেত্রেই সুনির্দিষ্ট ইতিহাস জানা সম্ভব হয়নি। পুকুর বা দিঘির ক্ষেত্রেও মানুষ এই ‘গায়েবি’ শব্দ ব্যবহার করেছে। জনশূন্যতার কারণে গায়েবি স্থাপনা বা জলাশয়গুলো দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে ছিল এবং ক্রমশ জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে উঠেছিল। স্থাপনাগুলোতে আবর্জনা ও মাটির স্তরও জমেছিল। আক্ষরিক অর্থেই মানুষ জঙ্গল কেটে কিংবা মাটি সরিয়ে এগুলোকে বের করে এনেছিল। কিন্তু গায়েবি পরিচয়টি আর কখনোই মুছে যায়নি।

সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার উছমানপুর গ্রামে অবস্থিত ‘গায়েবি মসজিদ’ এ ধরনের প্রত্নসম্পদগুলোর মধ্যে অন্যতম। স্থাপত্যশৈলী বিবেচনায় এটি কোনো নবাব, সুলতান, দেওয়ান বা ফৌজদার ছাড়া অন্য কারও পক্ষে নির্মাণ করা সম্ভব নয় বলে ধারণা করা হয়। বিশাল গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদের চার কোণে চারটি মিনার রয়েছে। খিলান বিহীন নকশা হওয়ায় এর ছাদটি একটি মাত্র বড় গম্বুজ দিয়ে ঢাকা হয়েছে। সংস্কারের ফলে অনেক প্রাচীন কারুকাজ নষ্ট হলেও বর্তমান স্থাপনার ভেতরে ও বাইরের নকশায় নির্মাতার রুচিশীল শৈল্পিক মন ফুটে ওঠে। এর দেয়ালগুলো অস্বাভাবিক পুরু; বিশেষ করে পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ পাশের প্রবেশদ্বার বা দেয়ালের পুরুত্ব এতটাই বেশি যে সেখানে অনায়াসে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করা সম্ভব। গম্বুজের চূড়া ভূমি থেকে বেশ উঁচুতে। ভেতরে একটি খিলান থাকলে ছাদের উপর দুটি এবং দুটি খিলান থাকলে ছাদে তিনটি গম্বুজ বসানো যেত।

মসজিদটির কোনো শিলালিপি না থাকায় সঠিক নির্মাণকাল নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। তবে নিকটবর্তী পশ্চিম তিলাপাড়ায় পাওয়া সুলতানি আমলের একটি শিলালিপি থেকে এর কিছুটা আভাস মেলে। ওই শিলালিপিতে ১৪৭৯ সাল এবং বাংলার তৎকালীন সুলতান শামসুদ্দিন ইউসুফ শাহের নাম উল্লেখ ছিল। ঐতিহাসিকরা ধারণা করেন, নিকটবর্তী উছমানপুর গ্রামের মসজিদটিও সম্ভবত ওই সুলতানি আমলেই নির্মিত হয়েছিল। কিন্তু যথাযথ প্রত্নতাত্ত্বিক তালিকাভুক্ত না থাকায় এই মূল্যবান নিদর্শনের ওপর বৈজ্ঞানিক কোনো গবেষণা বা প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে না। এতে উল্লিখিত সাল ১৪৭৯।

বর্তমানে মসজিদটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। গ্রামবাসীর চাহিদার প্রেক্ষিতে মসজিদ পরিচালনা কমিটি একটি আধুনিক ও বড় মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। তারা প্রাচীন মসজিদটিকে মাঝখানে রেখে তিন পাশ দিয়ে নতুন অবকাঠামো তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে প্রাচীন মসজিদটি পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে ঢাকা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অনেক স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, মূল স্থাপত্যের সৌন্দর্য ও স্বকীয়তা রক্ষায় প্রাচীন মসজিদটি থেকে দূরে আলাদাভাবে নতুন মসজিদ নির্মাণ করা উচিত।

মসজিদ পরিচালনা কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্বপাশে মক্তবের জন্য জায়গা নির্ধারিত থাকায় নতুন মসজিদ নির্মাণের জন্য জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। তাই পুরোনো মসজিদের আশপাশের খালি জায়গা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে প্রাচীন স্থাপত্যটি পুরোপুরি আড়ালে না পড়ার জন্য উত্তর পাশের কমপ্লেক্সে কাচের দেয়াল ব্যবহারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। কমিটির দাবি, কাচের দেয়াল থাকলে তাজপুর-বালাগঞ্জ সড়ক থেকে প্রাচীন মসজিদটি দেখা যাবে। যদিও বিরোধীদের মতে, এই ধরণের নির্মাণকাজে প্রাচীন কাঠামোর অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে।

এই প্রত্নসম্পদ রক্ষায় সম্প্রতি সিলেট শহরের একটি নাগরিক প্রতিনিধিদল উছমানপুর গ্রাম পরিদর্শন করেছে। প্রতিনিধিদলে ছিলেন সিলেট প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি হারুনুজ্জামান চৌধুরী, ভাষাসৈনিক মতিন উদদীন আহমদ জাদুঘরের পরিচালক মোস্তফা শাহজামান চৌধুরী বাহার, ঐতিহ্য ও পরিবেশ সংরক্ষণ ট্রাস্টের সেক্রেটারি আব্দুল করিম চৌধুরী কিম, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী গোলাম সোবহান চৌধুরী দীপন, ইতিহাস গবেষক আসিফ আযহার এবং সাংবাদিক আব্দুর রহমান হীরা। তারা প্রাচীন মসজিদটির মূল কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখে নতুন নির্মাণের অনুরোধ জানিয়েছেন, যাতে এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টিকে থাকে।

Public Voice

শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬


সংরক্ষণের অভাবে হুমকির মুখে সিলেটের উছমানপুরের ঐতিহাসিক গায়েবি মসজিদ

প্রকাশের তারিখ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় মুসলিম শাসনামলের সাক্ষী হিসেবে অনেক রাজকীয় স্থাপনা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। স্থানীয়ভাবে এগুলোর বেশির ভাগই ‘গায়েবি’ স্থাপনা বা জলাশয় হিসেবে পরিচিত। জনশূন্যতার সুযোগে এক সময় এসব স্থাপনা জঙ্গল ও মাটির স্তরে ঢাকা পড়েছিল। পরবর্তী সময়ে মানুষ জঙ্গল পরিষ্কার করে বা মাটি খুঁড়ে এগুলোকে প্রকাশ্যে নিয়ে এলেও ‘গায়েবি’ নাম ও রহস্যময় পরিচিতি রয়ে গেছে। এসব স্থাপনা বা পুকুরগুলোর মূল নির্মাতা ও নির্মাণকাল সম্পর্কে অনেক ক্ষেত্রেই সুনির্দিষ্ট ইতিহাস জানা সম্ভব হয়নি। পুকুর বা দিঘির ক্ষেত্রেও মানুষ এই ‘গায়েবি’ শব্দ ব্যবহার করেছে। জনশূন্যতার কারণে গায়েবি স্থাপনা বা জলাশয়গুলো দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে ছিল এবং ক্রমশ জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে উঠেছিল। স্থাপনাগুলোতে আবর্জনা ও মাটির স্তরও জমেছিল। আক্ষরিক অর্থেই মানুষ জঙ্গল কেটে কিংবা মাটি সরিয়ে এগুলোকে বের করে এনেছিল। কিন্তু গায়েবি পরিচয়টি আর কখনোই মুছে যায়নি।

সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার উছমানপুর গ্রামে অবস্থিত ‘গায়েবি মসজিদ’ এ ধরনের প্রত্নসম্পদগুলোর মধ্যে অন্যতম। স্থাপত্যশৈলী বিবেচনায় এটি কোনো নবাব, সুলতান, দেওয়ান বা ফৌজদার ছাড়া অন্য কারও পক্ষে নির্মাণ করা সম্ভব নয় বলে ধারণা করা হয়। বিশাল গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদের চার কোণে চারটি মিনার রয়েছে। খিলান বিহীন নকশা হওয়ায় এর ছাদটি একটি মাত্র বড় গম্বুজ দিয়ে ঢাকা হয়েছে। সংস্কারের ফলে অনেক প্রাচীন কারুকাজ নষ্ট হলেও বর্তমান স্থাপনার ভেতরে ও বাইরের নকশায় নির্মাতার রুচিশীল শৈল্পিক মন ফুটে ওঠে। এর দেয়ালগুলো অস্বাভাবিক পুরু; বিশেষ করে পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ পাশের প্রবেশদ্বার বা দেয়ালের পুরুত্ব এতটাই বেশি যে সেখানে অনায়াসে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করা সম্ভব। গম্বুজের চূড়া ভূমি থেকে বেশ উঁচুতে। ভেতরে একটি খিলান থাকলে ছাদের উপর দুটি এবং দুটি খিলান থাকলে ছাদে তিনটি গম্বুজ বসানো যেত।

মসজিদটির কোনো শিলালিপি না থাকায় সঠিক নির্মাণকাল নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। তবে নিকটবর্তী পশ্চিম তিলাপাড়ায় পাওয়া সুলতানি আমলের একটি শিলালিপি থেকে এর কিছুটা আভাস মেলে। ওই শিলালিপিতে ১৪৭৯ সাল এবং বাংলার তৎকালীন সুলতান শামসুদ্দিন ইউসুফ শাহের নাম উল্লেখ ছিল। ঐতিহাসিকরা ধারণা করেন, নিকটবর্তী উছমানপুর গ্রামের মসজিদটিও সম্ভবত ওই সুলতানি আমলেই নির্মিত হয়েছিল। কিন্তু যথাযথ প্রত্নতাত্ত্বিক তালিকাভুক্ত না থাকায় এই মূল্যবান নিদর্শনের ওপর বৈজ্ঞানিক কোনো গবেষণা বা প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে না। এতে উল্লিখিত সাল ১৪৭৯।

বর্তমানে মসজিদটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। গ্রামবাসীর চাহিদার প্রেক্ষিতে মসজিদ পরিচালনা কমিটি একটি আধুনিক ও বড় মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। তারা প্রাচীন মসজিদটিকে মাঝখানে রেখে তিন পাশ দিয়ে নতুন অবকাঠামো তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে প্রাচীন মসজিদটি পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে ঢাকা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অনেক স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, মূল স্থাপত্যের সৌন্দর্য ও স্বকীয়তা রক্ষায় প্রাচীন মসজিদটি থেকে দূরে আলাদাভাবে নতুন মসজিদ নির্মাণ করা উচিত।

মসজিদ পরিচালনা কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্বপাশে মক্তবের জন্য জায়গা নির্ধারিত থাকায় নতুন মসজিদ নির্মাণের জন্য জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। তাই পুরোনো মসজিদের আশপাশের খালি জায়গা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে প্রাচীন স্থাপত্যটি পুরোপুরি আড়ালে না পড়ার জন্য উত্তর পাশের কমপ্লেক্সে কাচের দেয়াল ব্যবহারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। কমিটির দাবি, কাচের দেয়াল থাকলে তাজপুর-বালাগঞ্জ সড়ক থেকে প্রাচীন মসজিদটি দেখা যাবে। যদিও বিরোধীদের মতে, এই ধরণের নির্মাণকাজে প্রাচীন কাঠামোর অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে।

এই প্রত্নসম্পদ রক্ষায় সম্প্রতি সিলেট শহরের একটি নাগরিক প্রতিনিধিদল উছমানপুর গ্রাম পরিদর্শন করেছে। প্রতিনিধিদলে ছিলেন সিলেট প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি হারুনুজ্জামান চৌধুরী, ভাষাসৈনিক মতিন উদদীন আহমদ জাদুঘরের পরিচালক মোস্তফা শাহজামান চৌধুরী বাহার, ঐতিহ্য ও পরিবেশ সংরক্ষণ ট্রাস্টের সেক্রেটারি আব্দুল করিম চৌধুরী কিম, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী গোলাম সোবহান চৌধুরী দীপন, ইতিহাস গবেষক আসিফ আযহার এবং সাংবাদিক আব্দুর রহমান হীরা। তারা প্রাচীন মসজিদটির মূল কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখে নতুন নির্মাণের অনুরোধ জানিয়েছেন, যাতে এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টিকে থাকে।


Public Voice

সম্পাদক: মোঃ বাদশাহ আলমগীর
প্রকাশক: অনন্যা অনসূয়া দিবা

কপিরাইট © ২০২৬ Public Voice । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত