আইটি বিশ্বআইটি বিশ্ব

যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরই শুরু ২০২৮ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সমীকরণ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ভোট গণনা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজনৈতিক আঙিনায় নতুন সমীকরণ শুরু হয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ালেও অতীত ইতিহাস বলছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয় পেলেই হোয়াইট হাউস নিশ্চিত হয় না।

Publicvoice24
Publicvoice24
|
শেয়ার করুন
অ+ অ-

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সব আসনের ভোট গণনা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়নি। তবে এরই মধ্যে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে নানামুখী হিসাব-নিকাশ ও কৌশলগত প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। কংগ্রেসে বড় ধরনের সাফল্য পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটিক পার্টি আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতিতে বাড়তি গতি ও রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস পাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তবে অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভালো ফল করলেই দুই বছর পর হোয়াইট হাউসে জয় সুনিশ্চিত হয় না। দুজনই মাত্র অর্ধেকের কিছু বেশি ভোট পেয়েছেন।

মার্কিন রাজনীতির ইতিহাস ঘাটলে এর একাধিক বিপরীত উদাহরণ দেখা যায়। ২০১০ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছিল। কিন্তু সেই ধাক্কা সামলে নিয়ে ২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বারাক ওবামা দ্বিতীয় মেয়াদে দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হন। ফলে ২০২৬ সালের এই মধ্যবর্তী ফলই ২০২৮ সালের চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারণ করে দেবে—এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তবে রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত অঙ্গরাজ্যটিতে তাদের দুজনেরই জয়ের ব্যবধান আগের তুলনায় কমেছে। অর্থনৈতিক বিষয়ে জোর দেওয়া সাহসী জনতুষ্টিবাদী ও প্রচলিত রাজনীতির বাইরের প্রার্থীরাও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে জয়ী হতে পারেন, তা প্রমাণিত হয়েছে। এর ফলে সংগঠনটির বর্তমান আকার প্রায় দ্বিগুণ হতে যাচ্ছে।

সম্ভাব্য প্রার্থীদের পর্দার আড়ালের প্রস্তুতি

এখনো পর্যন্ত কোনো দলেরই কোনো প্রার্থী আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেননি। তবে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—দুই শিবিরেরই বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা পর্দার আড়ালে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে শুরু করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে অংশ নেওয়া এবং জয় পাওয়া বেশ কয়েকজন রাজনীতিবিদের জন্য এই ফলাফল ২০২৮ সালের প্রার্থিতার নতুন পথ খুলে দিয়েছে।

  • জন অসফজর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের এই ডেমোক্র্যাট সিনেটর বড় ব্যবধানে জয় পেয়ে নিজের অবস্থান সুসংহত করেছেন। রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই অঙ্গরাজ্যে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয় পেয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে অসফের এমন বড় জয় ডেমোক্র্যাটদের জাতীয় রাজনীতিতে তার অবস্থান অনেক শক্তিশালী করেছে।
  • জশ শাপিরোপেনসিলভানিয়ার গভর্নর জশ শাপিরোকে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের অন্যতম সম্ভাব্য প্রার্থী মনে করা হচ্ছে। তিনি নিজ অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীকে সহজেই পরাজিত করে নিজের অবস্থান পুনপ্রতিষ্ঠা করেছেন।
  • জেবি প্রিটজকারইলিনয় অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট গভর্নর জেবি প্রিটজকার পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, প্রিটজকারের সাম্প্রতিক নির্বাচনি প্রচারের ধারা মূলত ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট পদে লড়ার একটি পূর্বপ্রস্তুতি।
  • গ্যাভিন নিউজমক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজম এবার পুনর্নির্বাচনে প্রার্থী হতে না পারলেও তিনি ধনীদের ওপর কর আরোপ সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ইস্যুতে প্রচার চালিয়ে দেশজুড়ে রাজনৈতিকভাবে সচল রয়েছেন।

অন্যদিতে রিপাবলিকান শিবিরেও ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য বেশ কয়েকজনের নাম সামনে আসছে। আরকানসাস অঙ্গরাজ্যের সিনেটর টম কটন এবং সারাহ হাকাবি স্যান্ডার্স সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। উল্লেখ্য, সারাহ হাকাবি স্যান্ডার্স ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

চাপের মুখে জেডি ভ্যান্স ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠরা

ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড নিয়ে দেখা দেওয়া ক্ষোভই রিপাবলিকানদের মধ্যবর্তী বিপর্যয়ের মূল কারণ বলে বেশ কিছু জরিপে উঠে এসেছে। এই অবস্থায় ট্রাম্পের বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ওপর বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, ভ্যান্স পরাজয়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যেভাবে নিজেকে দায়মুক্ত রাখার চেষ্টা করছেন, তা প্রকৃতপক্ষে ২০২৮ সালের নির্বাচনে নিজের প্রার্থিতার পথ সুগম করারই একটি অংশ। বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এমন চারটি দিক।

ওহাইও অঙ্গরাজ্যের কেস ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক কারেন বেকউইথ মন্তব্য করেছেন যে, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনি প্রচারে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে।

ভ্যান্স এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া বার্তায় পরাজয়ের পেছনে মধ্যপ্রাচ্যে বা ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের দিকে ইঙ্গিত করে লিখেছেন, ‘আমরা হেরেছি যুদ্ধের কারণে।

অন্যদিকে, ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ২০২৮ সালের নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্য পদ ছাড়ছেন বলে যে গুঞ্জন উঠেছে, তা তিনি অস্বীকার করেছেন।

তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বাইরে থাকা রিপাবলিকান নেতারা মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই ফলাফলে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন। সিনেটর টেড ক্রুজ, যিনি এবার প্রার্থী ছিলেন না, তিনি এক্সে দীর্ঘ পোস্টে দলের নেতাদের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি লেখেন, ‘এখন পরিস্থিতি অন্ধকার। তবে ভোর হওয়ার ঠিক আগেই অন্ধকার সবচেয়ে গভীর হয়। সকাল আসছে।’ এটি তার ব্যক্তিগত আকুতি এবং জনগণের প্রত্যাশা বলে তিনি উল্লেখ করেন। ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিসও দলের এই হারের তীব্র সমালোচনা করেছেন। এরপর তিনি বলেন, এটাই তার আন্তরিক প্রার্থনা এবং জনগণের প্রতি তার অঙ্গীকার। এসব বিষয়ের মধ্যে তথ্যকেন্দ্র বা ডেটা সেন্টার নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।

ডেমোক্র্যাটদের অভ্যন্তরীণ আদর্শগত প্রতিযোগিতা

মধ্যবর্তী নির্বাচনের জয়কে নিজেদের রাজনৈতিক কৌশলের সাফল্য হিসেবে দাবি করছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মধ্যপন্থি ও বামপন্থি—দুই পক্ষই। ফলে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দলের প্রার্থী বাছাইয়ে এই দুই ধারার মধ্যে তীব্র লড়াই হতে পারে। বারাক ওবামার সাবেক উপদেষ্টা জিম মেসিনা জানান, ডেমোক্র্যাটদের অনেক নেতাই ইতোমধ্যে সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক ভিত্তি মজবুত করা শুরু করেছেন। ফলে ২০২৮ সালের নির্বাচনেও অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কৌশল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একসময় রিপাবলিকানদের নিশ্চিত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত অনেক এলাকাতেও এখন আর দলটির জয় নিশ্চিত নয়।

  • বামপন্থিদের অগ্রগতিমিশিগানে প্রগতিশীল বা বামপন্থি নেতা আল-সাইয়েদের জয়কে বড় অর্জন ধরা হচ্ছে। প্রগ্রেসিভ চেঞ্জ ক্যাম্পেইন কমিটির সহপ্রতিষ্ঠাতা অ্যাডাম গ্রিনের মতে, প্রথাগত নির্বাচনি কৌশলের দিন শেষ। ফলে নিউইয়র্কের প্রতিনিধি আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজের মতো প্রগ্রেসিভ নেতাদের ২০২৮ সালের প্রাথমিক বাছাইয়ে ভালো করার বড় সুযোগ রয়েছে।
  • মধ্যপন্থিদের অবস্থানমধ্যপন্থি ও রক্ষণশীল ডেমোক্র্যাটদের সংগঠন ‘ব্লু ডগ ককাস’ কংগ্রেসে অন্তত ১৪টি আসনে জয় তুলে নিয়েছে। এই বিজয়ের পর মধ্যপন্থি নেতারা দাবি করছেন, বাস্তববাদী ও দ্বিদলীয় সমঝোতায় বিশ্বাসী প্রার্থীরাই রিপাবলিকান ভোটারদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম।

দোদুল্যমান ভোটার ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা

ক্যালিফোর্নিয়ার সাবেক সিনেট প্রার্থী ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার ক্রিস্টিনা পাসকুচ্চি জানান, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন দীর্ঘদিনের চেনা রাজনৈতিক ধারণাকে পুরোপুরি উল্টে দিয়েছে। বৈশ্বিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অ্যাটলাস গ্লোবালের এই প্রধান নির্বাহীর মতে, ২০২৮ সালে জিততে হলে উভয় দলকেই দোদুল্যমান ভোটারদের মন জয় করতে হবে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প যেসব স্বতন্ত্র ও দোদুল্যমান ভোটারের সমর্থন পেয়েছিলেন, এবার তার বড় অংশই হাতছাড়া হয়েছে। তবে এবারের নির্বাচনে তার সফল প্রচার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি মুহূর্ত তাকে জাতীয় পর্যায়ে আরো পরিচিত করেছে। তিনি প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়েছেন।

কনজারভেটিভ রাজনৈতিক ভাষ্যকার এবং টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএর সাবেক মুখপাত্র ড্রিয়েনা সিক্সটো মনে করেন, হিস্পানিক ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে রিপাবলিকানদের প্রচারের কৌশল বদলাতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, ‘গতবার নিরাপদ সমাজ ও মানব পাচার রোধের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল।’ সব মিলিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনৈতিক চাপ এবং নিরপেক্ষ ভোটারদের পরিবর্তনশীল মনোভাবই ২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের চূড়ান্ত রায় নির্ধারণ করবে। ওয়ার্কিং ফ্যামিলিজ পার্টির ফেডারেল অ্যাফেয়ার্সবিষয়ক পরিচালক আমিরাহ সিকুয়েরাহ বলেন, ২০২৮ সালে সফল প্রার্থীদের অর্থনৈতিক জনতুষ্টিবাদের পাশাপাশি নতুন কিছু বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে দোদুল্যমান ভোটারদের মনোভাব এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

Public Voice

শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬


যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরই শুরু ২০২৮ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সমীকরণ

প্রকাশের তারিখ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সব আসনের ভোট গণনা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়নি। তবে এরই মধ্যে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে নানামুখী হিসাব-নিকাশ ও কৌশলগত প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। কংগ্রেসে বড় ধরনের সাফল্য পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটিক পার্টি আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতিতে বাড়তি গতি ও রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস পাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তবে অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভালো ফল করলেই দুই বছর পর হোয়াইট হাউসে জয় সুনিশ্চিত হয় না। দুজনই মাত্র অর্ধেকের কিছু বেশি ভোট পেয়েছেন।

মার্কিন রাজনীতির ইতিহাস ঘাটলে এর একাধিক বিপরীত উদাহরণ দেখা যায়। ২০১০ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছিল। কিন্তু সেই ধাক্কা সামলে নিয়ে ২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বারাক ওবামা দ্বিতীয় মেয়াদে দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হন। ফলে ২০২৬ সালের এই মধ্যবর্তী ফলই ২০২৮ সালের চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারণ করে দেবে—এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তবে রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত অঙ্গরাজ্যটিতে তাদের দুজনেরই জয়ের ব্যবধান আগের তুলনায় কমেছে। অর্থনৈতিক বিষয়ে জোর দেওয়া সাহসী জনতুষ্টিবাদী ও প্রচলিত রাজনীতির বাইরের প্রার্থীরাও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে জয়ী হতে পারেন, তা প্রমাণিত হয়েছে। এর ফলে সংগঠনটির বর্তমান আকার প্রায় দ্বিগুণ হতে যাচ্ছে।

সম্ভাব্য প্রার্থীদের পর্দার আড়ালের প্রস্তুতি

এখনো পর্যন্ত কোনো দলেরই কোনো প্রার্থী আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেননি। তবে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—দুই শিবিরেরই বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা পর্দার আড়ালে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে শুরু করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে অংশ নেওয়া এবং জয় পাওয়া বেশ কয়েকজন রাজনীতিবিদের জন্য এই ফলাফল ২০২৮ সালের প্রার্থিতার নতুন পথ খুলে দিয়েছে।

  • জন অসফজর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের এই ডেমোক্র্যাট সিনেটর বড় ব্যবধানে জয় পেয়ে নিজের অবস্থান সুসংহত করেছেন। রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই অঙ্গরাজ্যে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয় পেয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে অসফের এমন বড় জয় ডেমোক্র্যাটদের জাতীয় রাজনীতিতে তার অবস্থান অনেক শক্তিশালী করেছে।
  • জশ শাপিরোপেনসিলভানিয়ার গভর্নর জশ শাপিরোকে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের অন্যতম সম্ভাব্য প্রার্থী মনে করা হচ্ছে। তিনি নিজ অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীকে সহজেই পরাজিত করে নিজের অবস্থান পুনপ্রতিষ্ঠা করেছেন।
  • জেবি প্রিটজকারইলিনয় অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট গভর্নর জেবি প্রিটজকার পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, প্রিটজকারের সাম্প্রতিক নির্বাচনি প্রচারের ধারা মূলত ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট পদে লড়ার একটি পূর্বপ্রস্তুতি।
  • গ্যাভিন নিউজমক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজম এবার পুনর্নির্বাচনে প্রার্থী হতে না পারলেও তিনি ধনীদের ওপর কর আরোপ সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ইস্যুতে প্রচার চালিয়ে দেশজুড়ে রাজনৈতিকভাবে সচল রয়েছেন।

অন্যদিতে রিপাবলিকান শিবিরেও ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য বেশ কয়েকজনের নাম সামনে আসছে। আরকানসাস অঙ্গরাজ্যের সিনেটর টম কটন এবং সারাহ হাকাবি স্যান্ডার্স সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। উল্লেখ্য, সারাহ হাকাবি স্যান্ডার্স ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

চাপের মুখে জেডি ভ্যান্স ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠরা

ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড নিয়ে দেখা দেওয়া ক্ষোভই রিপাবলিকানদের মধ্যবর্তী বিপর্যয়ের মূল কারণ বলে বেশ কিছু জরিপে উঠে এসেছে। এই অবস্থায় ট্রাম্পের বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ওপর বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, ভ্যান্স পরাজয়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যেভাবে নিজেকে দায়মুক্ত রাখার চেষ্টা করছেন, তা প্রকৃতপক্ষে ২০২৮ সালের নির্বাচনে নিজের প্রার্থিতার পথ সুগম করারই একটি অংশ। বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এমন চারটি দিক।

ওহাইও অঙ্গরাজ্যের কেস ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক কারেন বেকউইথ মন্তব্য করেছেন যে, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনি প্রচারে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে।

ভ্যান্স এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া বার্তায় পরাজয়ের পেছনে মধ্যপ্রাচ্যে বা ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের দিকে ইঙ্গিত করে লিখেছেন, ‘আমরা হেরেছি যুদ্ধের কারণে।

অন্যদিকে, ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ২০২৮ সালের নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্য পদ ছাড়ছেন বলে যে গুঞ্জন উঠেছে, তা তিনি অস্বীকার করেছেন।

তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বাইরে থাকা রিপাবলিকান নেতারা মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই ফলাফলে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন। সিনেটর টেড ক্রুজ, যিনি এবার প্রার্থী ছিলেন না, তিনি এক্সে দীর্ঘ পোস্টে দলের নেতাদের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি লেখেন, ‘এখন পরিস্থিতি অন্ধকার। তবে ভোর হওয়ার ঠিক আগেই অন্ধকার সবচেয়ে গভীর হয়। সকাল আসছে।’ এটি তার ব্যক্তিগত আকুতি এবং জনগণের প্রত্যাশা বলে তিনি উল্লেখ করেন। ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিসও দলের এই হারের তীব্র সমালোচনা করেছেন। এরপর তিনি বলেন, এটাই তার আন্তরিক প্রার্থনা এবং জনগণের প্রতি তার অঙ্গীকার। এসব বিষয়ের মধ্যে তথ্যকেন্দ্র বা ডেটা সেন্টার নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।

ডেমোক্র্যাটদের অভ্যন্তরীণ আদর্শগত প্রতিযোগিতা

মধ্যবর্তী নির্বাচনের জয়কে নিজেদের রাজনৈতিক কৌশলের সাফল্য হিসেবে দাবি করছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মধ্যপন্থি ও বামপন্থি—দুই পক্ষই। ফলে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দলের প্রার্থী বাছাইয়ে এই দুই ধারার মধ্যে তীব্র লড়াই হতে পারে। বারাক ওবামার সাবেক উপদেষ্টা জিম মেসিনা জানান, ডেমোক্র্যাটদের অনেক নেতাই ইতোমধ্যে সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক ভিত্তি মজবুত করা শুরু করেছেন। ফলে ২০২৮ সালের নির্বাচনেও অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কৌশল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একসময় রিপাবলিকানদের নিশ্চিত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত অনেক এলাকাতেও এখন আর দলটির জয় নিশ্চিত নয়।

  • বামপন্থিদের অগ্রগতিমিশিগানে প্রগতিশীল বা বামপন্থি নেতা আল-সাইয়েদের জয়কে বড় অর্জন ধরা হচ্ছে। প্রগ্রেসিভ চেঞ্জ ক্যাম্পেইন কমিটির সহপ্রতিষ্ঠাতা অ্যাডাম গ্রিনের মতে, প্রথাগত নির্বাচনি কৌশলের দিন শেষ। ফলে নিউইয়র্কের প্রতিনিধি আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজের মতো প্রগ্রেসিভ নেতাদের ২০২৮ সালের প্রাথমিক বাছাইয়ে ভালো করার বড় সুযোগ রয়েছে।
  • মধ্যপন্থিদের অবস্থানমধ্যপন্থি ও রক্ষণশীল ডেমোক্র্যাটদের সংগঠন ‘ব্লু ডগ ককাস’ কংগ্রেসে অন্তত ১৪টি আসনে জয় তুলে নিয়েছে। এই বিজয়ের পর মধ্যপন্থি নেতারা দাবি করছেন, বাস্তববাদী ও দ্বিদলীয় সমঝোতায় বিশ্বাসী প্রার্থীরাই রিপাবলিকান ভোটারদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম।

দোদুল্যমান ভোটার ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা

ক্যালিফোর্নিয়ার সাবেক সিনেট প্রার্থী ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার ক্রিস্টিনা পাসকুচ্চি জানান, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন দীর্ঘদিনের চেনা রাজনৈতিক ধারণাকে পুরোপুরি উল্টে দিয়েছে। বৈশ্বিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অ্যাটলাস গ্লোবালের এই প্রধান নির্বাহীর মতে, ২০২৮ সালে জিততে হলে উভয় দলকেই দোদুল্যমান ভোটারদের মন জয় করতে হবে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প যেসব স্বতন্ত্র ও দোদুল্যমান ভোটারের সমর্থন পেয়েছিলেন, এবার তার বড় অংশই হাতছাড়া হয়েছে। তবে এবারের নির্বাচনে তার সফল প্রচার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি মুহূর্ত তাকে জাতীয় পর্যায়ে আরো পরিচিত করেছে। তিনি প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়েছেন।

কনজারভেটিভ রাজনৈতিক ভাষ্যকার এবং টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএর সাবেক মুখপাত্র ড্রিয়েনা সিক্সটো মনে করেন, হিস্পানিক ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে রিপাবলিকানদের প্রচারের কৌশল বদলাতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, ‘গতবার নিরাপদ সমাজ ও মানব পাচার রোধের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল।’ সব মিলিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনৈতিক চাপ এবং নিরপেক্ষ ভোটারদের পরিবর্তনশীল মনোভাবই ২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের চূড়ান্ত রায় নির্ধারণ করবে। ওয়ার্কিং ফ্যামিলিজ পার্টির ফেডারেল অ্যাফেয়ার্সবিষয়ক পরিচালক আমিরাহ সিকুয়েরাহ বলেন, ২০২৮ সালে সফল প্রার্থীদের অর্থনৈতিক জনতুষ্টিবাদের পাশাপাশি নতুন কিছু বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে দোদুল্যমান ভোটারদের মনোভাব এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।


Public Voice

সম্পাদক: মোঃ বাদশাহ আলমগীর
প্রকাশক: অনন্যা অনসূয়া দিবা

কপিরাইট © ২০২৬ Public Voice । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত