আইটি বিশ্ব
একটি রাষ্ট্র কীভাবে কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ না থাকা সত্ত্বেও শূন্য থেকে বিশ্বমঞ্চের সর্বোচ্চ সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছাতে পারে, সিঙ্গাপুরের ইতিহাস এই প্রশ্নগুলোর একটি বাস্তব উত্তর। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয় উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত ছোট্ট দ্বীপদেশ সিঙ্গাপুর। আয়তন, জনসংখ্যা ও প্রাকৃতিক সম্পদের বিচারে দেশটি অনেক রাষ্ট্রের তুলনায় ক্ষুদ্র। অথচ স্বাধীনতার সময় দেশটি ছিল বেকারত্ব, দারিদ্র্য, দুর্বল অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় আক্রান্ত। প্রাকৃতিক সম্পদ এবং বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার না থাকার পরও, স্বাধীনতার সময়কার ভয়াবহ আবাসনসংকট, জাতিগত উত্তেজনা ও রাজনৈতিক সংকট পেরিয়ে দলটি আজ বিশ্বমঞ্চে এক অভূতপূর্ব বিস্ময় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এমনকি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকা নিয়েও একসময় ঘোর সংশয় প্রকাশ পেয়েছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে সিঙ্গাপুর পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ অর্থনীতি, বিশ্ব বাণিজ্যের মূল কেন্দ্র এবং দক্ষ শাসনের অনন্য দৃষ্টান্তে। ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরকে সংযুক্তকারী গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের কাছে অবস্থিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা ছিল। বিনিয়োগকারীর প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দক্ষ শ্রমিক, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, দ্রুত প্রশাসনিক সেবা, চুক্তির নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু নগদ অর্থ নয়, উপহার, চাকরি, চুক্তি, সুবিধা কিংবা অন্য কোনো প্রতিদানও দুর্নীতির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে উচ্চ বেতনই দুর্নীতির সমাধান নয়।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের বিশ্বব্যাপী তথ্য অনুযায়ী, সিঙ্গাপুরের মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রায় ৯৮ হাজার ৮১৪ মার্কিন ডলার এবং দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন পৌঁছেছে প্রায় ৬০৪ বিলিয়ন ডলারে। এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মূল কেন্দ্রে অবস্থান করছিলেন দেশটির প্রতিষ্ঠাতা প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ। তবে সিঙ্গাপুরের এই অভাবনীয় উত্থানকে শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির একক ক্যারিশমা দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। তার পাশাপাশি ছিলেন দক্ষ অর্থনীতিবিদ, প্রশাসক, পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণে নিবেদিত একঝাঁক নেতৃত্ব। লি কুয়ান ইউর দুটি সুপরিচিত গ্রন্থ ‘দ্য সিঙ্গাপুর স্টোরি: মেমোয়ার্স অব লি কুয়ান ইউ’ এবং ‘ফ্রম থার্ড ওয়ার্ল্ড টু ফার্স্ট: দ্য সিঙ্গাপুর স্টোরি ১৯৬৫–২০০০’ বিশ্লেষণ করলে এই ঐতিহাসিক রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি, নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার রূপরেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সুতরাং সিঙ্গাপুরের পূর্ণাঙ্গ উন্নয়নযাত্রা বুঝতে দুটি বইকেই পাশাপাশি পড়া প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের মানবসম্পদ সূচক প্লাসে সিঙ্গাপুরের অবস্থান বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর মধ্যে।
লি কুয়ান ইউর বিখ্যাত স্মৃতিকথা ‘দ্য সিঙ্গাপুর স্টোরি: মেমোয়ার্স অব লি কুয়ান ইউ’ গ্রন্থটি ১৯৯৮ সালে প্রথম আত্মপ্রকাশ করে। প্রায় ৬৮০ পৃষ্ঠার এই বিস্তৃত প্রথম খণ্ডে তার শৈশবকাল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কঠিন দিনগুলো, জাপানি সেনাদের দখলদারত্ব, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বাস্তবতা, আইন পেশার অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক আন্দোলনের উত্থান-পতন, পিপলস অ্যাকশন পার্টির (পিএপি) প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতা লাভ, মালয়েশিয়ার সঙ্গে একীভূত হওয়া এবং চূড়ান্তভাবে ১৯৬৫ সালে সিঙ্গাপুরের স্বাধীনতা লাভের আগের ঘটনাবলি গভীরভাবে ফুটে উঠেছে।
গ্রন্থভিত্তিক আলোচনার ক্ষেত্রে একটি বিষয় অনুধাবন করা জরুরি। ‘দ্য সিঙ্গাপুর স্টোরি’ মূলত স্বাধীনতার পূর্ববর্তী জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সংগ্রামের ইতিহাস। অন্যদিকে, স্বাধীনতার পর ১৯৬৫ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রের অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোগত রূপান্তরের পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সমৃদ্ধ রয়েছে তার রচিত দ্বিতীয় আত্মজীবনী ‘ফ্রম থার্ড ওয়ার্ল্ড টু ফার্স্ট: দ্য সিঙ্গাপুর স্টোরি ১৯৬৫–২০০০’ গ্রন্থে। লি কুয়ান ইউর এই লেখালিখির মূল বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি রাষ্ট্র গঠনকে কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শুষ্ক পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা না করে আইন শৃঙ্খলা, আবাসন, শিক্ষা, জাতিগত সম্প্রীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার সমন্বিত প্রয়াস হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে যেহেতু এটি একজন রাষ্ট্রনায়কের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে লিখিত স্মৃতিকথা, এতে স্বাভাবিকভাবেই নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে আত্মপক্ষসমর্থন এবং প্রতিপক্ষের সমালোচনার প্রবণতা রয়েছে। তাই ইতিহাসবিদদের মতে, এই বইটিকে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক উৎস হিসেবে বিবেচনা করলেও এর তথ্যাবলি স্বাধীন বিচার-বিশ্লেষণ ও অন্যান্য নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে পড়া আবশ্যক। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান এবং অর্থনীতির একটি বড় অংশ ঝুঁকির মুখে পড়ে। বাংলাদেশের জন্য এখানকার শিক্ষা অত্যন্ত সরাসরি।
সিঙ্গাপুরের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ তারিখ হলো ৯ আগস্ট ১৯৬৫। এই দিনে চরম রাজনৈতিক দ্বিমত ও উত্তেজনার মুখে মালয়েশিয়ার ফেডারেশন থেকে সিঙ্গাপুর সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এর আগে ১৯৬৩ সালে সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ার সঙ্গেই যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা, রাজনৈতিক ক্ষমতার বণ্টন, জাতিগত প্রতিনিধিত্ব এবং অর্থনৈতিক নীতির মতো মৌলিক বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য তৈরি হয়। লি কুয়ান ইউ একটি নির্দিষ্ট জাতিগত পরিচয়ভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিবর্তে মালয়, চীনা, ভারতীয়সহ সব জাতির সম-অধিকারভিত্তিক বহুজাতিক রাষ্ট্রের পক্ষে অনড় অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন।
১৯৬৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার সময় লি কুয়ান ইউ আবেগাপ্লুত ও বাষ্পরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। তিনি জানতেন, কোনো বিস্তৃত ভূখণ্ড বা সম্পদ ছাড়া কেবল একটি দ্বীপ নিয়ে রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখা কতটা দুরূহ। সিঙ্গাপুরের নিজস্ব কোনো খাদ্য ও পানির পর্যাপ্ত উৎস ছিল না, শিল্পকারখানাও ছিল সীমিত। এর পাশাপাশি বেকারত্ব, অনুন্নত আবাসন এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছিল। তদুপরি, ১৯৬৮ সালে ব্রিটিশ সরকার সিঙ্গাপুরে অবস্থানরত তাদের সমস্ত সামরিক ঘাঁটি গুটিয়ে নেওয়ার ও সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত দিলে তা দেশটির অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থানের ওপর আরেকটি মারাত্মক আঘাত হয়ে আসে। ব্রিটিশদের এই উপস্থিতি সিঙ্গাপুরের তৎকালীন অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের প্রধান স্তম্ভগুলোর একটি ছিল। তবে এই চরম বাস্তবতা স্বীকার করে নিয়েই সিঙ্গাপুরের নেতৃত্ব দ্রুত বিকল্প অর্থনৈতিক পথ তৈরিতে মননিবেশ করে।
সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক বাধা ছিল তার প্রাকৃতিক সম্পদের শূন্যতা। তবে তাদের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক ছিল মালাক্কা প্রণালীর কৌশলগত আন্তর্জাতিক ভৌগোলিক অবস্থান। লি কুয়ান ইউ ও তার সহকর্মীরা এই ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে দেশকে বৈশ্বিক বন্দর ও বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এই মহাযজ্ঞে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন সিঙ্গাপুরের তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এবং প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. গোহ কেং সুই। তার দূরদর্শী নেতৃত্বে দেশের সার্বিক শিল্পায়ন কৌশল নির্ধারিত হয়েছিল।
এই রূপ পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে ১৯৬১ সালে গঠন করা হয়েছিল ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (ইডিবি)। সংস্থাটির মূল কাজ ছিল বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এবং সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কাজের মধ্য সমন্বিত পরিবেশ তৈরি করা। শুরুতেই শ্রমঘন শিল্প প্রতিষ্ঠায় জোর দেওয়া হয়েছিল, কারণ তখন তাৎক্ষণিকভাবে বেকারত্ব দূর করাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে পোশাক শিল্প ও সাধারণ পণ্যের কারখানা দ্রুত গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে সিঙ্গাপুর কম মূল্যের উৎপাদনী শিল্প থেকে সরে এসে উচ্চপ্রযুক্তির ইলেকট্রনিক্স, পেট্রোকেমিক্যাল, ওষুধশিল্প এবং বিশ্বমানের আর্থিক সেবার দিকে যাত্রা সম্প্রসারিত করে। বিশ্বব্যাংকের ঐতিহাসিক তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৬৫ থেকে ১৯৭০ সালের মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৮০ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। এই গতিশীল নীতি ও তার বাস্তবায়ন বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। প্রতিষ্ঠার মাত্র তিন বছরের মধ্যে সংস্থাটি ২১ হাজারের বেশি আবাসন ইউনিট নির্মাণ করে। এর দায়িত্ব ছিল বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা, শিল্পকারখানা স্থাপনের পরিবেশ তৈরি করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার আধুনিক জ্ঞান দেশে নিয়ে আসা। বর্তমানে সিঙ্গাপুরের প্রায় ৮০ শতাংশ বাসিন্দা এইচডিবির নির্মিত আবাসনে বসবাস করেন। উদ্দেশ্য ছিল মেধাবীদের প্রশাসনে আকৃষ্ট করা এবং অবৈধ আয়ের প্রলোভন কমানো।
সিঙ্গাপুরের অভাবনীয় অগ্রগতির অপর একটি মূল ভিত্তি হলো দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর রাষ্ট্রীয় অবস্থান। সিঙ্গাপুরি নেতৃত্ব স্পষ্ট বুঝেছিল যে, দুর্নীতিগ্রস্ত একটি সমাজ বা প্রশাসনে কখনোই স্থায়িত্ব ও বহুজাতিক বিনিয়োগ বজায় রাখা সম্ভব নয়। ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত দুর্নীতির প্রতিরোধ সংক্রান্ত ‘করপ্ট প্র্যাকটিসেস ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো’ (সিপিআইবি)-কে লি কুয়ান ইউ সরকার পুনর্গঠন করে সম্পূর্ণ স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা প্রদান করে। এই ব্যবস্থার আওতায় সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রের অপরাধমূলক ঘুষ ও স্বজনপ্রীতিকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হয়।
শুধু কঠোর আইন কার্যকর করেই শান্ত থাকা হয়নি; দক্ষ ও সৎ ব্যক্তিদের প্রশাসনে ধরে রাখার জন্য সরকারি বেতন কাঠামো অত্যন্ত আকর্ষণীয় করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সরকারের প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্য এবং ২০২৬ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ধারাবাহিক কঠোর প্রয়োগ প্রমাণ করে যে, কেবল মৌখিক বক্তব্যে দুর্নীতি দূর হয় না, তার জন্য দরকার প্রশাসনিক স্বাধীন তদন্ত সংস্থা, স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক সর্বোচ্চ জবাবদিহিতা।
স্বাধীনতার সময় সিংহভাগ মানুষের জন্য মানসম্মত বাসস্থান নিশ্চিত করা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই সংকট মোকাবিলায় ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় হাউজিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (এইচডিবি)। সংস্থাটির মূল লক্ষ্য ছিল কম খরচে পরিকল্পিত আধুনিক বহুতল ভবন নির্মাণ করা, যেন প্রতিটি নাগরিকের মাথার ওপর স্থায়ী ছাদ নিশ্চিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালে সেন্ট্রাল প্রভিডেন্ট ফান্ডের (সিপিএফ) অর্থ ব্যবহারের সুযোগ দিলে সাধারণ কর্মজীবীরা নিজেদের জমানো টাকা দিয়েই সরকারি ফ্ল্যাট কেনার সুযোগ লাভ করেন।
কেবল বাসস্থান নিশ্চিত করাই নয়, জাতিগত বিরোধ ও সংঘর্ষ এড়াতেও আবাসন নীতি সংস্কার করা হয়েছিল। ১৯৬৪ সালে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকার ১৯৮৯ সালে চালু করে ‘ইথনিক ইন্টিগ্রেশন পলিসি’। এই নীতির মাধ্যমে সরকারি প্রতিটি আবাসন ব্লকে নির্দিষ্ট অনুপাতে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর (চীনা, মালয়, ভারতীয়) বসবাসের বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হয়। ফলে বিচ্ছিন্ন কোনো জাতিগত এলাকা বা বস্তি গড়ে উঠতে পারেনি এবং সব নাগরিকের সমন্বয়ে একটি সংহত বহুজাতিক সমাজ ও জাতীয় পরিচয় গড়ে ওঠে, যা ১৯৬৫ সালের স্বাধীনতার মূল জাতীয় প্রতিশ্রুতির সঙ্গেও সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। ১৯৬৪ সালে চালু হয় হোম ওনারশিপ ফর দ্য পিপল কর্মসূচি। ২০১৫ সালে চালু হওয়া স্কিলসফিউচার কর্মসূচির মাধ্যমে নাগরিকদের কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা হয়।
কঠোর সুশাসন, দক্ষ লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা এবং ধারাবাহিক নীতির ফলে সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিশ্বসেরা স্থান দখল করে নেয়। বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের লজিস্টিকস পারফরম্যান্স সূচকে (এলপিআই) সিঙ্গাপুর বিশ্বজুড়ে প্রথম স্থান অর্জনে সক্ষম হয়। যা দেশটির আধুনিক যোগাযোগ, বিশ্বমানের বন্দর ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক আমদানির সহজিকরণের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য পেলেও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, বাকস্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে সিঙ্গাপুরকে। ফ্রিডম হাউসের ২০২৬ সালের ‘ফ্রিডম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে ১০০-এর মধ্যে ৪৮ নম্বর দিয়ে সিঙ্গাপুরকে ‘পার্টলি ফ্রি’ বা আংশিক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের বার্ষিক নথিতেও সে দেশে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের ওপর আইনি বাধানিষেধ ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে নানা গভীর উদ্বেগ ব্যক্ত করা হয়। এই সকল তথ্য ও বাস্তবতা নির্দেশ করে যে, একটি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ ও সুশাসিত রাষ্ট্রের ভেতরেও নাগরিক অধিকার ও বাকস্বাধীনতার ভারসাম্য বজায় রাখার বিতর্ক ইতিহাসজুড়ে বিদ্যমান। তদন্তকারী সংস্থার স্বাধীনতা, সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, সম্পদের হিসাব, আদালতের কার্যকারিতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন ছাড়া দুর্নীতিবিরোধী অভিযান দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
একটি চরম অনিশ্চয়তা ও প্রাকৃতিক সম্পদহীনতা থেকে বিশ্বের শীর্ষে পৌঁছানোর এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমা কেবল ইতিহাস নয়, বরং উদীয়মান অর্থনৈতিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী পাঠাগার। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে শুধু বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বান করাই যথেষ্ট নয়, বরং অবকাঠামো উন্নয়ন, দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ, প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা তৈরি করা আবশ্যক। সিঙ্গাপুর প্রমাণ করেছে যে সঠিক কৌশলগত পরিকল্পনা এবং কঠোর বাস্তবায়নের মাধ্যমে যেকোনো ভৌগোলিক কিংবা প্রাকৃতিক শূন্যতাকে মহামূল্যবান অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তরিত করা সম্ভব।

শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ নভেম্বর ২০২৬
একটি রাষ্ট্র কীভাবে কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ না থাকা সত্ত্বেও শূন্য থেকে বিশ্বমঞ্চের সর্বোচ্চ সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছাতে পারে, সিঙ্গাপুরের ইতিহাস এই প্রশ্নগুলোর একটি বাস্তব উত্তর। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয় উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত ছোট্ট দ্বীপদেশ সিঙ্গাপুর। আয়তন, জনসংখ্যা ও প্রাকৃতিক সম্পদের বিচারে দেশটি অনেক রাষ্ট্রের তুলনায় ক্ষুদ্র। অথচ স্বাধীনতার সময় দেশটি ছিল বেকারত্ব, দারিদ্র্য, দুর্বল অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় আক্রান্ত। প্রাকৃতিক সম্পদ এবং বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার না থাকার পরও, স্বাধীনতার সময়কার ভয়াবহ আবাসনসংকট, জাতিগত উত্তেজনা ও রাজনৈতিক সংকট পেরিয়ে দলটি আজ বিশ্বমঞ্চে এক অভূতপূর্ব বিস্ময় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এমনকি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকা নিয়েও একসময় ঘোর সংশয় প্রকাশ পেয়েছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে সিঙ্গাপুর পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ অর্থনীতি, বিশ্ব বাণিজ্যের মূল কেন্দ্র এবং দক্ষ শাসনের অনন্য দৃষ্টান্তে। ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরকে সংযুক্তকারী গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের কাছে অবস্থিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা ছিল। বিনিয়োগকারীর প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দক্ষ শ্রমিক, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, দ্রুত প্রশাসনিক সেবা, চুক্তির নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু নগদ অর্থ নয়, উপহার, চাকরি, চুক্তি, সুবিধা কিংবা অন্য কোনো প্রতিদানও দুর্নীতির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে উচ্চ বেতনই দুর্নীতির সমাধান নয়।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের বিশ্বব্যাপী তথ্য অনুযায়ী, সিঙ্গাপুরের মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রায় ৯৮ হাজার ৮১৪ মার্কিন ডলার এবং দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন পৌঁছেছে প্রায় ৬০৪ বিলিয়ন ডলারে। এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মূল কেন্দ্রে অবস্থান করছিলেন দেশটির প্রতিষ্ঠাতা প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ। তবে সিঙ্গাপুরের এই অভাবনীয় উত্থানকে শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির একক ক্যারিশমা দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। তার পাশাপাশি ছিলেন দক্ষ অর্থনীতিবিদ, প্রশাসক, পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণে নিবেদিত একঝাঁক নেতৃত্ব। লি কুয়ান ইউর দুটি সুপরিচিত গ্রন্থ ‘দ্য সিঙ্গাপুর স্টোরি: মেমোয়ার্স অব লি কুয়ান ইউ’ এবং ‘ফ্রম থার্ড ওয়ার্ল্ড টু ফার্স্ট: দ্য সিঙ্গাপুর স্টোরি ১৯৬৫–২০০০’ বিশ্লেষণ করলে এই ঐতিহাসিক রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি, নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার রূপরেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সুতরাং সিঙ্গাপুরের পূর্ণাঙ্গ উন্নয়নযাত্রা বুঝতে দুটি বইকেই পাশাপাশি পড়া প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের মানবসম্পদ সূচক প্লাসে সিঙ্গাপুরের অবস্থান বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর মধ্যে।
লি কুয়ান ইউর বিখ্যাত স্মৃতিকথা ‘দ্য সিঙ্গাপুর স্টোরি: মেমোয়ার্স অব লি কুয়ান ইউ’ গ্রন্থটি ১৯৯৮ সালে প্রথম আত্মপ্রকাশ করে। প্রায় ৬৮০ পৃষ্ঠার এই বিস্তৃত প্রথম খণ্ডে তার শৈশবকাল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কঠিন দিনগুলো, জাপানি সেনাদের দখলদারত্ব, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বাস্তবতা, আইন পেশার অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক আন্দোলনের উত্থান-পতন, পিপলস অ্যাকশন পার্টির (পিএপি) প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতা লাভ, মালয়েশিয়ার সঙ্গে একীভূত হওয়া এবং চূড়ান্তভাবে ১৯৬৫ সালে সিঙ্গাপুরের স্বাধীনতা লাভের আগের ঘটনাবলি গভীরভাবে ফুটে উঠেছে।
গ্রন্থভিত্তিক আলোচনার ক্ষেত্রে একটি বিষয় অনুধাবন করা জরুরি। ‘দ্য সিঙ্গাপুর স্টোরি’ মূলত স্বাধীনতার পূর্ববর্তী জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সংগ্রামের ইতিহাস। অন্যদিকে, স্বাধীনতার পর ১৯৬৫ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রের অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোগত রূপান্তরের পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সমৃদ্ধ রয়েছে তার রচিত দ্বিতীয় আত্মজীবনী ‘ফ্রম থার্ড ওয়ার্ল্ড টু ফার্স্ট: দ্য সিঙ্গাপুর স্টোরি ১৯৬৫–২০০০’ গ্রন্থে। লি কুয়ান ইউর এই লেখালিখির মূল বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি রাষ্ট্র গঠনকে কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শুষ্ক পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা না করে আইন শৃঙ্খলা, আবাসন, শিক্ষা, জাতিগত সম্প্রীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার সমন্বিত প্রয়াস হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে যেহেতু এটি একজন রাষ্ট্রনায়কের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে লিখিত স্মৃতিকথা, এতে স্বাভাবিকভাবেই নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে আত্মপক্ষসমর্থন এবং প্রতিপক্ষের সমালোচনার প্রবণতা রয়েছে। তাই ইতিহাসবিদদের মতে, এই বইটিকে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক উৎস হিসেবে বিবেচনা করলেও এর তথ্যাবলি স্বাধীন বিচার-বিশ্লেষণ ও অন্যান্য নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে পড়া আবশ্যক। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান এবং অর্থনীতির একটি বড় অংশ ঝুঁকির মুখে পড়ে। বাংলাদেশের জন্য এখানকার শিক্ষা অত্যন্ত সরাসরি।
সিঙ্গাপুরের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ তারিখ হলো ৯ আগস্ট ১৯৬৫। এই দিনে চরম রাজনৈতিক দ্বিমত ও উত্তেজনার মুখে মালয়েশিয়ার ফেডারেশন থেকে সিঙ্গাপুর সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এর আগে ১৯৬৩ সালে সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ার সঙ্গেই যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা, রাজনৈতিক ক্ষমতার বণ্টন, জাতিগত প্রতিনিধিত্ব এবং অর্থনৈতিক নীতির মতো মৌলিক বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য তৈরি হয়। লি কুয়ান ইউ একটি নির্দিষ্ট জাতিগত পরিচয়ভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিবর্তে মালয়, চীনা, ভারতীয়সহ সব জাতির সম-অধিকারভিত্তিক বহুজাতিক রাষ্ট্রের পক্ষে অনড় অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন।
১৯৬৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার সময় লি কুয়ান ইউ আবেগাপ্লুত ও বাষ্পরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। তিনি জানতেন, কোনো বিস্তৃত ভূখণ্ড বা সম্পদ ছাড়া কেবল একটি দ্বীপ নিয়ে রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখা কতটা দুরূহ। সিঙ্গাপুরের নিজস্ব কোনো খাদ্য ও পানির পর্যাপ্ত উৎস ছিল না, শিল্পকারখানাও ছিল সীমিত। এর পাশাপাশি বেকারত্ব, অনুন্নত আবাসন এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছিল। তদুপরি, ১৯৬৮ সালে ব্রিটিশ সরকার সিঙ্গাপুরে অবস্থানরত তাদের সমস্ত সামরিক ঘাঁটি গুটিয়ে নেওয়ার ও সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত দিলে তা দেশটির অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থানের ওপর আরেকটি মারাত্মক আঘাত হয়ে আসে। ব্রিটিশদের এই উপস্থিতি সিঙ্গাপুরের তৎকালীন অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের প্রধান স্তম্ভগুলোর একটি ছিল। তবে এই চরম বাস্তবতা স্বীকার করে নিয়েই সিঙ্গাপুরের নেতৃত্ব দ্রুত বিকল্প অর্থনৈতিক পথ তৈরিতে মননিবেশ করে।
সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক বাধা ছিল তার প্রাকৃতিক সম্পদের শূন্যতা। তবে তাদের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক ছিল মালাক্কা প্রণালীর কৌশলগত আন্তর্জাতিক ভৌগোলিক অবস্থান। লি কুয়ান ইউ ও তার সহকর্মীরা এই ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে দেশকে বৈশ্বিক বন্দর ও বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এই মহাযজ্ঞে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন সিঙ্গাপুরের তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এবং প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. গোহ কেং সুই। তার দূরদর্শী নেতৃত্বে দেশের সার্বিক শিল্পায়ন কৌশল নির্ধারিত হয়েছিল।
এই রূপ পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে ১৯৬১ সালে গঠন করা হয়েছিল ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (ইডিবি)। সংস্থাটির মূল কাজ ছিল বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এবং সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কাজের মধ্য সমন্বিত পরিবেশ তৈরি করা। শুরুতেই শ্রমঘন শিল্প প্রতিষ্ঠায় জোর দেওয়া হয়েছিল, কারণ তখন তাৎক্ষণিকভাবে বেকারত্ব দূর করাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে পোশাক শিল্প ও সাধারণ পণ্যের কারখানা দ্রুত গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে সিঙ্গাপুর কম মূল্যের উৎপাদনী শিল্প থেকে সরে এসে উচ্চপ্রযুক্তির ইলেকট্রনিক্স, পেট্রোকেমিক্যাল, ওষুধশিল্প এবং বিশ্বমানের আর্থিক সেবার দিকে যাত্রা সম্প্রসারিত করে। বিশ্বব্যাংকের ঐতিহাসিক তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৬৫ থেকে ১৯৭০ সালের মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৮০ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। এই গতিশীল নীতি ও তার বাস্তবায়ন বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। প্রতিষ্ঠার মাত্র তিন বছরের মধ্যে সংস্থাটি ২১ হাজারের বেশি আবাসন ইউনিট নির্মাণ করে। এর দায়িত্ব ছিল বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা, শিল্পকারখানা স্থাপনের পরিবেশ তৈরি করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার আধুনিক জ্ঞান দেশে নিয়ে আসা। বর্তমানে সিঙ্গাপুরের প্রায় ৮০ শতাংশ বাসিন্দা এইচডিবির নির্মিত আবাসনে বসবাস করেন। উদ্দেশ্য ছিল মেধাবীদের প্রশাসনে আকৃষ্ট করা এবং অবৈধ আয়ের প্রলোভন কমানো।
সিঙ্গাপুরের অভাবনীয় অগ্রগতির অপর একটি মূল ভিত্তি হলো দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর রাষ্ট্রীয় অবস্থান। সিঙ্গাপুরি নেতৃত্ব স্পষ্ট বুঝেছিল যে, দুর্নীতিগ্রস্ত একটি সমাজ বা প্রশাসনে কখনোই স্থায়িত্ব ও বহুজাতিক বিনিয়োগ বজায় রাখা সম্ভব নয়। ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত দুর্নীতির প্রতিরোধ সংক্রান্ত ‘করপ্ট প্র্যাকটিসেস ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো’ (সিপিআইবি)-কে লি কুয়ান ইউ সরকার পুনর্গঠন করে সম্পূর্ণ স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা প্রদান করে। এই ব্যবস্থার আওতায় সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রের অপরাধমূলক ঘুষ ও স্বজনপ্রীতিকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হয়।
শুধু কঠোর আইন কার্যকর করেই শান্ত থাকা হয়নি; দক্ষ ও সৎ ব্যক্তিদের প্রশাসনে ধরে রাখার জন্য সরকারি বেতন কাঠামো অত্যন্ত আকর্ষণীয় করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সরকারের প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্য এবং ২০২৬ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ধারাবাহিক কঠোর প্রয়োগ প্রমাণ করে যে, কেবল মৌখিক বক্তব্যে দুর্নীতি দূর হয় না, তার জন্য দরকার প্রশাসনিক স্বাধীন তদন্ত সংস্থা, স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক সর্বোচ্চ জবাবদিহিতা।
স্বাধীনতার সময় সিংহভাগ মানুষের জন্য মানসম্মত বাসস্থান নিশ্চিত করা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই সংকট মোকাবিলায় ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় হাউজিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (এইচডিবি)। সংস্থাটির মূল লক্ষ্য ছিল কম খরচে পরিকল্পিত আধুনিক বহুতল ভবন নির্মাণ করা, যেন প্রতিটি নাগরিকের মাথার ওপর স্থায়ী ছাদ নিশ্চিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালে সেন্ট্রাল প্রভিডেন্ট ফান্ডের (সিপিএফ) অর্থ ব্যবহারের সুযোগ দিলে সাধারণ কর্মজীবীরা নিজেদের জমানো টাকা দিয়েই সরকারি ফ্ল্যাট কেনার সুযোগ লাভ করেন।
কেবল বাসস্থান নিশ্চিত করাই নয়, জাতিগত বিরোধ ও সংঘর্ষ এড়াতেও আবাসন নীতি সংস্কার করা হয়েছিল। ১৯৬৪ সালে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকার ১৯৮৯ সালে চালু করে ‘ইথনিক ইন্টিগ্রেশন পলিসি’। এই নীতির মাধ্যমে সরকারি প্রতিটি আবাসন ব্লকে নির্দিষ্ট অনুপাতে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর (চীনা, মালয়, ভারতীয়) বসবাসের বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হয়। ফলে বিচ্ছিন্ন কোনো জাতিগত এলাকা বা বস্তি গড়ে উঠতে পারেনি এবং সব নাগরিকের সমন্বয়ে একটি সংহত বহুজাতিক সমাজ ও জাতীয় পরিচয় গড়ে ওঠে, যা ১৯৬৫ সালের স্বাধীনতার মূল জাতীয় প্রতিশ্রুতির সঙ্গেও সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। ১৯৬৪ সালে চালু হয় হোম ওনারশিপ ফর দ্য পিপল কর্মসূচি। ২০১৫ সালে চালু হওয়া স্কিলসফিউচার কর্মসূচির মাধ্যমে নাগরিকদের কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা হয়।
কঠোর সুশাসন, দক্ষ লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা এবং ধারাবাহিক নীতির ফলে সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিশ্বসেরা স্থান দখল করে নেয়। বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের লজিস্টিকস পারফরম্যান্স সূচকে (এলপিআই) সিঙ্গাপুর বিশ্বজুড়ে প্রথম স্থান অর্জনে সক্ষম হয়। যা দেশটির আধুনিক যোগাযোগ, বিশ্বমানের বন্দর ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক আমদানির সহজিকরণের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য পেলেও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, বাকস্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে সিঙ্গাপুরকে। ফ্রিডম হাউসের ২০২৬ সালের ‘ফ্রিডম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে ১০০-এর মধ্যে ৪৮ নম্বর দিয়ে সিঙ্গাপুরকে ‘পার্টলি ফ্রি’ বা আংশিক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের বার্ষিক নথিতেও সে দেশে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের ওপর আইনি বাধানিষেধ ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে নানা গভীর উদ্বেগ ব্যক্ত করা হয়। এই সকল তথ্য ও বাস্তবতা নির্দেশ করে যে, একটি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ ও সুশাসিত রাষ্ট্রের ভেতরেও নাগরিক অধিকার ও বাকস্বাধীনতার ভারসাম্য বজায় রাখার বিতর্ক ইতিহাসজুড়ে বিদ্যমান। তদন্তকারী সংস্থার স্বাধীনতা, সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, সম্পদের হিসাব, আদালতের কার্যকারিতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন ছাড়া দুর্নীতিবিরোধী অভিযান দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
একটি চরম অনিশ্চয়তা ও প্রাকৃতিক সম্পদহীনতা থেকে বিশ্বের শীর্ষে পৌঁছানোর এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমা কেবল ইতিহাস নয়, বরং উদীয়মান অর্থনৈতিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী পাঠাগার। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে শুধু বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বান করাই যথেষ্ট নয়, বরং অবকাঠামো উন্নয়ন, দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ, প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা তৈরি করা আবশ্যক। সিঙ্গাপুর প্রমাণ করেছে যে সঠিক কৌশলগত পরিকল্পনা এবং কঠোর বাস্তবায়নের মাধ্যমে যেকোনো ভৌগোলিক কিংবা প্রাকৃতিক শূন্যতাকে মহামূল্যবান অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তরিত করা সম্ভব।
