আন্তর্জাতিক
বিশ্বের অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র উইলিয়াম ডি. নর্ডহাউস আর নেই। গত ৩০ অক্টোবর ৮৫ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই খ্যাতিমান মার্কিন অর্থনীতিবিদ। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নর্ডহাউসের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তিনি মস্তিষ্কের ক্যানসারে ভুগছিলেন। ২০১৮ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত এই মেধাবী মানুষটি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অর্থনীতির নিবিড় সম্পর্ককে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করে স্মরণীয় হয়ে আছেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির তথ্য অনুযায়ী, আগ্রাসী ধরনের মস্তিষ্কের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়। এগুলো একবার ব্যবহার হয়ে গেলে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায় না। একদিকে আশঙ্কা ছিল, দ্রুত সম্পদ নিঃশেষ হয়ে গেলে শিল্পোন্নত অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি থমকে যেতে পারে। অন্যদিকে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বিকল্প সম্পদ ও উৎপাদনপ্রক্রিয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে—এমন সম্ভাবনাও সামনে আসছিল। নর্ডহাউস এই বিতর্ককে সরলভাবে দেখেননি। অর্থনীতিতে এ ধরনের সমস্যাকে বলা হয় ‘বহিঃপ্রভাব’ বা এক্সটার্নালিটি। তার প্রস্তাবিত মডেল ও নীতির সব অনুমান নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে।
১৯৪১ সালের ৩১ মে নিউ মেক্সিকোর আলবুকার্কিতে জন্মগ্রহণ করেন নর্ডহাউস।
পড়াশোনার ক্ষেত্রে তিনি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে ১৯৬৭ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
একই বছর তিনি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা জীবন শুরু করেন এবং পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্টসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে সফলভাবে কাজ করেছেন।
এছাড়া ১৯৭৭ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রথাগত অর্থনীতির সংজ্ঞাকে ভেঙে নর্ডহাউস নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কেবল উৎপাদন, আয় বা বাজারের হিসাব নয়, বরং এর সঙ্গে পরিবেশ ও প্রকৃতির গভীর সংযোগ রয়েছে। কয়লা, তেল ও গ্যাসের মতো সীমিত সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর যে প্রভাব পড়ছে, তা তিনি অর্থনীতির মূল আলোচনায় নিয়ে আসেন। অর্থনীতি বলতে সাধারণত উৎপাদন, আয়, ব্যয়, বিনিয়োগ কিংবা বাজারের হিসাবকেই বোঝানো হয়। কিন্তু এসব হিসাবের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক কী। অর্থাৎ কোনো সম্পদ সীমিত হলেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অবধারিতভাবে থেমে যাবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। একটি কারখানা কয়লা পুড়িয়ে পণ্য উৎপাদন করলে জ্বালানির দাম ও উৎপাদন ব্যয় হিসাব করে।
তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল অনবায়নযোগ্য সম্পদের সঠিক ব্যবহারের পরিকল্পনা করা। ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত তার বিখ্যাত গবেষণাপত্র ‘দ্য অ্যালোকেশন অব এনার্জি রিসোর্সেস’-এ তিনি জ্বালানি সম্পদের সুষম বণ্টন, বাজারব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ সরবরাহের চ্যালেঞ্জগুলো বিশ্লেষণ করেন। সত্তরের দশকে যখন প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ছিল, তখন তিনি প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও সম্পদের মজুত নিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ধারণার অবতারণা করেন। ১৯৭০-এর দশকে বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছিল। তার যুক্তি ছিল, সম্পদের মজুত কতটা আছে, শুধু তা জানলেই হবে না; প্রযুক্তির পরিবর্তন, বিকল্প সম্পদের প্রাপ্যতা, বাজারের আচরণ এবং উত্তোলনের খরচও বিবেচনায় নিতে হবে।
নর্ডহাউসের সবচেয়ে বড় অবদান হলো ‘ডাইস’ (ডাইনামিক ইন্টিগ্রেটেড ক্লাইমেট-ইকোনমি) মডেল। ১৯৯২ সালে প্রবর্তিত এই মডেলটির মাধ্যমে তিনি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কার্বন নিঃসরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতির যোগসূত্র স্থাপন করেন। নীতিনির্ধারকদের জন্য এটি একটি বড় হাতিয়ার হয়ে ওঠে, যা কার্বন নিঃসরণ কমাতে এবং জলবায়ু সুরক্ষায় ব্যয় ও সম্ভাব্য ক্ষতির তুলনা করতে সহায়তা করে। ফলে নীতিনির্ধারকেরা জলবায়ু সুরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণের খরচের সঙ্গে ব্যবস্থা না নিলে সম্ভাব্য ক্ষতির তুলনা করতে পারেন।
তিনি মনে করতেন, কার্বন নিঃসরণের ফলে যে পরিবেশগত ক্ষতি হয়, তার একটি অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করা আবশ্যক। এই চিন্তা থেকেই তিনি কার্বন করের ধারণা জনপ্রিয় করেন, যার মাধ্যমে দূষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের কাজের অর্থনৈতিক দায়ভার নিতে বাধ্য করা সম্ভব হয়। তার মতে, দূষণের ব্যয় যদি পণ্যের দামে প্রতিফলিত না হয়, তবে সমাজকে দীর্ঘমেয়াদে বড় ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে। কিন্তু সেই কার্বন নিঃসরণের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষির ক্ষতি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি কিংবা মানুষের জীবনযাত্রায় যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে, তা পণ্যের বাজারদরে সরাসরি যুক্ত থাকে না। অন্যথায় দূষণকারী প্রতিষ্ঠান বা ভোক্তা প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে কম খরচে জ্বালানি ব্যবহার করতে পারবে, আর ক্ষতির বোঝা বহন করবে পুরো সমাজ।
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় কেবল এক দেশের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়—এই সত্যটি তিনি খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিলেন। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সীমাবদ্ধতা এবং অন্যের উদ্যোগের সুফল বিনা খরচে ভোগ করার প্রবণতা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। এ প্রেক্ষাপটে তিনি ‘ক্লাইমেট ক্লাব’ বা জলবায়ু জোটের প্রস্তাব দেন, যেখানে জলবায়ু সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ দেশগুলো একটি সাধারণ নীতিমালার আওতায় কাজ করবে এবং জোটের বাইরের দেশগুলোর জন্য বাণিজ্যিক সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হবে। তার মতে, জলবায়ু চুক্তিতে অংশ নেওয়া ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য দেশগুলোর মধ্যে কার্যকর প্রণোদনা থাকা জরুরি।
অর্থনীতির মৌলিক বিষয়গুলো বোঝাতেও তার অবদান ছিল অপরিসীম। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ পল স্যামুয়েলসনের সঙ্গে তিনি বিশ্ববিখ্যাত অর্থনীতি বিষয়ক পাঠ্যবইয়ের সহলেখক ছিলেন। ১৯৮৫ সালে তিনি এই বইটির সঙ্গে যুক্ত হন এবং স্যামুয়েলসনের মৃত্যুর পরও ধারাবাহিকভাবে বইটির নতুন সংস্করণ হালনাগাদ করার গুরুদায়িত্ব পালন করেন।
তার গবেষণার মূল শিক্ষা ছিল, আজকের উৎপাদন ও ভোগ যেন ভবিষ্যতের জন্য সংকট তৈরি না করে। পরিবেশকে কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে না দেখে তাকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি অবিচ্ছেদ্য ও সংবেদনশীল অংশ হিসেবে দেখার শিক্ষা তিনি আমাদের দিয়ে গেছেন। নোবেলজয়ী এই অর্থনীতিবিদের বিদায় বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে এক গভীর শূন্যতা তৈরি করল, যা তার রেখে যাওয়া তত্ত্ব ও চিন্তার মাধ্যমে চিরকাল অনুরণিত হবে। তার কাজের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, অর্থনীতিকে কেবল বাজার ও মুনাফার হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রকৃতি, প্রযুক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি মানবকল্যাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা। দীর্ঘ কয়েক দশকের গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তন ও দীর্ঘমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনীতির সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার জন্য তাকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। ফলে এসব সম্পদ কী হারে উত্তোলন ও ব্যবহার করা হবে, বর্তমানের চাহিদা মেটাতে গিয়ে ভবিষ্যতের জন্য কতটা অবশিষ্ট রাখা হবে—এসব প্রশ্ন অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ নভেম্বর ২০২৬
বিশ্বের অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র উইলিয়াম ডি. নর্ডহাউস আর নেই। গত ৩০ অক্টোবর ৮৫ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই খ্যাতিমান মার্কিন অর্থনীতিবিদ। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নর্ডহাউসের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তিনি মস্তিষ্কের ক্যানসারে ভুগছিলেন। ২০১৮ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত এই মেধাবী মানুষটি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অর্থনীতির নিবিড় সম্পর্ককে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করে স্মরণীয় হয়ে আছেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির তথ্য অনুযায়ী, আগ্রাসী ধরনের মস্তিষ্কের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়। এগুলো একবার ব্যবহার হয়ে গেলে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায় না। একদিকে আশঙ্কা ছিল, দ্রুত সম্পদ নিঃশেষ হয়ে গেলে শিল্পোন্নত অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি থমকে যেতে পারে। অন্যদিকে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বিকল্প সম্পদ ও উৎপাদনপ্রক্রিয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে—এমন সম্ভাবনাও সামনে আসছিল। নর্ডহাউস এই বিতর্ককে সরলভাবে দেখেননি। অর্থনীতিতে এ ধরনের সমস্যাকে বলা হয় ‘বহিঃপ্রভাব’ বা এক্সটার্নালিটি। তার প্রস্তাবিত মডেল ও নীতির সব অনুমান নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে।
১৯৪১ সালের ৩১ মে নিউ মেক্সিকোর আলবুকার্কিতে জন্মগ্রহণ করেন নর্ডহাউস।
পড়াশোনার ক্ষেত্রে তিনি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে ১৯৬৭ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
একই বছর তিনি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা জীবন শুরু করেন এবং পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্টসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে সফলভাবে কাজ করেছেন।
এছাড়া ১৯৭৭ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রথাগত অর্থনীতির সংজ্ঞাকে ভেঙে নর্ডহাউস নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কেবল উৎপাদন, আয় বা বাজারের হিসাব নয়, বরং এর সঙ্গে পরিবেশ ও প্রকৃতির গভীর সংযোগ রয়েছে। কয়লা, তেল ও গ্যাসের মতো সীমিত সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর যে প্রভাব পড়ছে, তা তিনি অর্থনীতির মূল আলোচনায় নিয়ে আসেন। অর্থনীতি বলতে সাধারণত উৎপাদন, আয়, ব্যয়, বিনিয়োগ কিংবা বাজারের হিসাবকেই বোঝানো হয়। কিন্তু এসব হিসাবের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক কী। অর্থাৎ কোনো সম্পদ সীমিত হলেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অবধারিতভাবে থেমে যাবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। একটি কারখানা কয়লা পুড়িয়ে পণ্য উৎপাদন করলে জ্বালানির দাম ও উৎপাদন ব্যয় হিসাব করে।
তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল অনবায়নযোগ্য সম্পদের সঠিক ব্যবহারের পরিকল্পনা করা। ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত তার বিখ্যাত গবেষণাপত্র ‘দ্য অ্যালোকেশন অব এনার্জি রিসোর্সেস’-এ তিনি জ্বালানি সম্পদের সুষম বণ্টন, বাজারব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ সরবরাহের চ্যালেঞ্জগুলো বিশ্লেষণ করেন। সত্তরের দশকে যখন প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ছিল, তখন তিনি প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও সম্পদের মজুত নিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ধারণার অবতারণা করেন। ১৯৭০-এর দশকে বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছিল। তার যুক্তি ছিল, সম্পদের মজুত কতটা আছে, শুধু তা জানলেই হবে না; প্রযুক্তির পরিবর্তন, বিকল্প সম্পদের প্রাপ্যতা, বাজারের আচরণ এবং উত্তোলনের খরচও বিবেচনায় নিতে হবে।
নর্ডহাউসের সবচেয়ে বড় অবদান হলো ‘ডাইস’ (ডাইনামিক ইন্টিগ্রেটেড ক্লাইমেট-ইকোনমি) মডেল। ১৯৯২ সালে প্রবর্তিত এই মডেলটির মাধ্যমে তিনি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কার্বন নিঃসরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতির যোগসূত্র স্থাপন করেন। নীতিনির্ধারকদের জন্য এটি একটি বড় হাতিয়ার হয়ে ওঠে, যা কার্বন নিঃসরণ কমাতে এবং জলবায়ু সুরক্ষায় ব্যয় ও সম্ভাব্য ক্ষতির তুলনা করতে সহায়তা করে। ফলে নীতিনির্ধারকেরা জলবায়ু সুরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণের খরচের সঙ্গে ব্যবস্থা না নিলে সম্ভাব্য ক্ষতির তুলনা করতে পারেন।
তিনি মনে করতেন, কার্বন নিঃসরণের ফলে যে পরিবেশগত ক্ষতি হয়, তার একটি অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করা আবশ্যক। এই চিন্তা থেকেই তিনি কার্বন করের ধারণা জনপ্রিয় করেন, যার মাধ্যমে দূষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের কাজের অর্থনৈতিক দায়ভার নিতে বাধ্য করা সম্ভব হয়। তার মতে, দূষণের ব্যয় যদি পণ্যের দামে প্রতিফলিত না হয়, তবে সমাজকে দীর্ঘমেয়াদে বড় ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে। কিন্তু সেই কার্বন নিঃসরণের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষির ক্ষতি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি কিংবা মানুষের জীবনযাত্রায় যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে, তা পণ্যের বাজারদরে সরাসরি যুক্ত থাকে না। অন্যথায় দূষণকারী প্রতিষ্ঠান বা ভোক্তা প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে কম খরচে জ্বালানি ব্যবহার করতে পারবে, আর ক্ষতির বোঝা বহন করবে পুরো সমাজ।
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় কেবল এক দেশের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়—এই সত্যটি তিনি খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিলেন। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সীমাবদ্ধতা এবং অন্যের উদ্যোগের সুফল বিনা খরচে ভোগ করার প্রবণতা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। এ প্রেক্ষাপটে তিনি ‘ক্লাইমেট ক্লাব’ বা জলবায়ু জোটের প্রস্তাব দেন, যেখানে জলবায়ু সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ দেশগুলো একটি সাধারণ নীতিমালার আওতায় কাজ করবে এবং জোটের বাইরের দেশগুলোর জন্য বাণিজ্যিক সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হবে। তার মতে, জলবায়ু চুক্তিতে অংশ নেওয়া ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য দেশগুলোর মধ্যে কার্যকর প্রণোদনা থাকা জরুরি।
অর্থনীতির মৌলিক বিষয়গুলো বোঝাতেও তার অবদান ছিল অপরিসীম। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ পল স্যামুয়েলসনের সঙ্গে তিনি বিশ্ববিখ্যাত অর্থনীতি বিষয়ক পাঠ্যবইয়ের সহলেখক ছিলেন। ১৯৮৫ সালে তিনি এই বইটির সঙ্গে যুক্ত হন এবং স্যামুয়েলসনের মৃত্যুর পরও ধারাবাহিকভাবে বইটির নতুন সংস্করণ হালনাগাদ করার গুরুদায়িত্ব পালন করেন।
তার গবেষণার মূল শিক্ষা ছিল, আজকের উৎপাদন ও ভোগ যেন ভবিষ্যতের জন্য সংকট তৈরি না করে। পরিবেশকে কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে না দেখে তাকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি অবিচ্ছেদ্য ও সংবেদনশীল অংশ হিসেবে দেখার শিক্ষা তিনি আমাদের দিয়ে গেছেন। নোবেলজয়ী এই অর্থনীতিবিদের বিদায় বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে এক গভীর শূন্যতা তৈরি করল, যা তার রেখে যাওয়া তত্ত্ব ও চিন্তার মাধ্যমে চিরকাল অনুরণিত হবে। তার কাজের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, অর্থনীতিকে কেবল বাজার ও মুনাফার হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রকৃতি, প্রযুক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি মানবকল্যাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা। দীর্ঘ কয়েক দশকের গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তন ও দীর্ঘমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনীতির সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার জন্য তাকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। ফলে এসব সম্পদ কী হারে উত্তোলন ও ব্যবহার করা হবে, বর্তমানের চাহিদা মেটাতে গিয়ে ভবিষ্যতের জন্য কতটা অবশিষ্ট রাখা হবে—এসব প্রশ্ন অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
