স্মরণ
একটি স্বাক্ষর, আর তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য স্মৃতি। প্রয়াত অধ্যক্ষ মো. ইয়াকুব আলীর স্বাক্ষর আজও তাঁর সাবেক শিক্ষার্থীদের কাছে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আবেগের এক অনন্য স্মারক। বাবার স্বাক্ষরকে ঘিরে এমনই এক আবেগঘন স্মৃতিচারণ করেছেন তাঁর ছোট সন্তান।
২০১২ সালের একটি স্বাক্ষর সম্প্রতি নতুন করে সামনে এসেছে। অধ্যক্ষ ইয়াকুব আলীর এক প্রিয় বন্ধু আতীকুর রহমান আকন্দ একটি বইয়ের ‘আশীর্বাণী’ কপি পাঠান তাঁর ছোট সন্তানের কাছে। বইয়ের পাতায় বাবার স্বাক্ষরটি দেখে ফিরে আসে পুরোনো দিনের নানা স্মৃতি। স্বাক্ষরটি তাঁর বাবার অবসরের প্রায় ১০ বছর পরের।
স্মৃতিচারণে তিনি জানান, অষ্টম বা নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় ‘অটোগ্রাফ’ শব্দটির সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। তখন তাঁর ধারণা ছিল, বিখ্যাত ব্যক্তি, তারকা, খেলোয়াড় কিংবা লেখকদের স্বাক্ষরই সাধারণত ভক্তদের কাছে বিশেষ মূল্য বহন করে। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই তিনি দেখেছেন, তাঁর বাবার অসংখ্য শিক্ষার্থী এসে অনুরোধ করতেন, ‘স্যার, একটি অটোগ্রাফ দিন প্লিজ।’
একজন সাধারণ শিক্ষকের স্বাক্ষর নিতে শিক্ষার্থীদের এমন আগ্রহ তাঁকে বিস্মিত করত। এর কারণ জানতে একদিন তিনি বাবাকেই প্রশ্ন করেন।
স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে এক সাবেক শিক্ষার্থীর কথা, যিনি একটি সরকারি ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। একদিন তিনি স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে অধ্যক্ষ ইয়াকুব আলীর বাসায় বেড়াতে আসেন। গল্প-আড্ডা ও খাওয়াদাওয়া শেষে বিদায় নেওয়ার সময় নিজের ডায়েরি বের করে শিক্ষকের কাছে একটি স্বাক্ষর চান।
ওই সাবেক শিক্ষার্থী জানান, তিন দিনের সরকারি ছুটিতে বাড়ি এসেছেন। সেই ছুটির এক দিন তিনি রেখেছেন প্রিয় শিক্ষকের কাছ থেকে স্বাক্ষর সংগ্রহের জন্য, যা তাঁর কাছে স্মৃতি হয়ে থাকবে।
ঘটনাটি তাঁর ছোট সন্তানের মনে গভীর রেখাপাত করে। একজন শিক্ষার্থীর কাছে শিক্ষকের স্বাক্ষর যে কতটা মূল্যবান হতে পারে, তা তিনি উপলব্ধি করেন।
‘এটা অটোগ্রাফ নয়, আমার প্রতি শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা’। বাবাকে একদিন তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, অটোগ্রাফ তো সাধারণত বিখ্যাত ব্যক্তি কিংবা তারকারা দেন, তাহলে শিক্ষার্থীরা একজন সাধারণ শিক্ষকের কাছ থেকে অটোগ্রাফ নিতে এত আগ্রহী কেন?
উত্তরে স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে অধ্যক্ষ ইয়াকুব আলী বলেছিলেন, ‘বাবা, এটা অটোগ্রাফ না, এটা আমার প্রতি আমার ছাত্রছাত্রীদের ভালোবাসা। আমি খুব নগণ্য মানুষ, অটোগ্রাফ দেওয়ার মতো ক্ষমতা আমার নেই।’
বাবার সেই বিনয়ী উত্তর আজও তাঁর সন্তানের স্মৃতিতে অমলিন। শিক্ষার্থীদের কাছে বিশেষ মর্যাদা পেয়েও নিজেকে সাধারণ মানুষ হিসেবেই দেখতেন তিনি। নিজের স্বাক্ষরের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহকে খ্যাতি নয়, বরং ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করতেন।
স্বাক্ষরের আড়ালে একজন শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব। অধ্যক্ষ মো. ইয়াকুব আলীর এই স্মৃতিচারণে ফুটে উঠেছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের এক মানবিক দিক। একজন শিক্ষকের প্রকৃত অর্জন কেবল পদবি কিংবা কর্মজীবনের সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে তাঁর জন্য তৈরি হওয়া শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাও তাঁর জীবনের বড় প্রাপ্তি।
অবসরের প্রায় এক দশক পরের স্বাক্ষরটি আজও সেই ভালোবাসার স্মারক হয়ে আছে। সময়ের সঙ্গে কর্মজীবনের অধ্যায় শেষ হয়, মানুষও একদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। কিন্তু তাঁর আদর্শ, বিনয় এবং মানুষের মনে রেখে যাওয়া স্মৃতি বেঁচে থাকে দীর্ঘদিন।
মরহুম অধ্যক্ষ মো. ইয়াকুব আলীর স্বাক্ষর তাই নিছক কয়েকটি রেখা নয়; এটি তাঁর শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা এবং একজন শিক্ষকের ব্যক্তিত্বের স্মরণীয় দলিল।

সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬
একটি স্বাক্ষর, আর তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য স্মৃতি। প্রয়াত অধ্যক্ষ মো. ইয়াকুব আলীর স্বাক্ষর আজও তাঁর সাবেক শিক্ষার্থীদের কাছে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আবেগের এক অনন্য স্মারক। বাবার স্বাক্ষরকে ঘিরে এমনই এক আবেগঘন স্মৃতিচারণ করেছেন তাঁর ছোট সন্তান।
২০১২ সালের একটি স্বাক্ষর সম্প্রতি নতুন করে সামনে এসেছে। অধ্যক্ষ ইয়াকুব আলীর এক প্রিয় বন্ধু আতীকুর রহমান আকন্দ একটি বইয়ের ‘আশীর্বাণী’ কপি পাঠান তাঁর ছোট সন্তানের কাছে। বইয়ের পাতায় বাবার স্বাক্ষরটি দেখে ফিরে আসে পুরোনো দিনের নানা স্মৃতি। স্বাক্ষরটি তাঁর বাবার অবসরের প্রায় ১০ বছর পরের।
স্মৃতিচারণে তিনি জানান, অষ্টম বা নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় ‘অটোগ্রাফ’ শব্দটির সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। তখন তাঁর ধারণা ছিল, বিখ্যাত ব্যক্তি, তারকা, খেলোয়াড় কিংবা লেখকদের স্বাক্ষরই সাধারণত ভক্তদের কাছে বিশেষ মূল্য বহন করে। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই তিনি দেখেছেন, তাঁর বাবার অসংখ্য শিক্ষার্থী এসে অনুরোধ করতেন, ‘স্যার, একটি অটোগ্রাফ দিন প্লিজ।’
একজন সাধারণ শিক্ষকের স্বাক্ষর নিতে শিক্ষার্থীদের এমন আগ্রহ তাঁকে বিস্মিত করত। এর কারণ জানতে একদিন তিনি বাবাকেই প্রশ্ন করেন।
স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে এক সাবেক শিক্ষার্থীর কথা, যিনি একটি সরকারি ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। একদিন তিনি স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে অধ্যক্ষ ইয়াকুব আলীর বাসায় বেড়াতে আসেন। গল্প-আড্ডা ও খাওয়াদাওয়া শেষে বিদায় নেওয়ার সময় নিজের ডায়েরি বের করে শিক্ষকের কাছে একটি স্বাক্ষর চান।
ওই সাবেক শিক্ষার্থী জানান, তিন দিনের সরকারি ছুটিতে বাড়ি এসেছেন। সেই ছুটির এক দিন তিনি রেখেছেন প্রিয় শিক্ষকের কাছ থেকে স্বাক্ষর সংগ্রহের জন্য, যা তাঁর কাছে স্মৃতি হয়ে থাকবে।
ঘটনাটি তাঁর ছোট সন্তানের মনে গভীর রেখাপাত করে। একজন শিক্ষার্থীর কাছে শিক্ষকের স্বাক্ষর যে কতটা মূল্যবান হতে পারে, তা তিনি উপলব্ধি করেন।
‘এটা অটোগ্রাফ নয়, আমার প্রতি শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা’। বাবাকে একদিন তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, অটোগ্রাফ তো সাধারণত বিখ্যাত ব্যক্তি কিংবা তারকারা দেন, তাহলে শিক্ষার্থীরা একজন সাধারণ শিক্ষকের কাছ থেকে অটোগ্রাফ নিতে এত আগ্রহী কেন?
উত্তরে স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে অধ্যক্ষ ইয়াকুব আলী বলেছিলেন, ‘বাবা, এটা অটোগ্রাফ না, এটা আমার প্রতি আমার ছাত্রছাত্রীদের ভালোবাসা। আমি খুব নগণ্য মানুষ, অটোগ্রাফ দেওয়ার মতো ক্ষমতা আমার নেই।’
বাবার সেই বিনয়ী উত্তর আজও তাঁর সন্তানের স্মৃতিতে অমলিন। শিক্ষার্থীদের কাছে বিশেষ মর্যাদা পেয়েও নিজেকে সাধারণ মানুষ হিসেবেই দেখতেন তিনি। নিজের স্বাক্ষরের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহকে খ্যাতি নয়, বরং ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করতেন।
স্বাক্ষরের আড়ালে একজন শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব। অধ্যক্ষ মো. ইয়াকুব আলীর এই স্মৃতিচারণে ফুটে উঠেছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের এক মানবিক দিক। একজন শিক্ষকের প্রকৃত অর্জন কেবল পদবি কিংবা কর্মজীবনের সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে তাঁর জন্য তৈরি হওয়া শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাও তাঁর জীবনের বড় প্রাপ্তি।
অবসরের প্রায় এক দশক পরের স্বাক্ষরটি আজও সেই ভালোবাসার স্মারক হয়ে আছে। সময়ের সঙ্গে কর্মজীবনের অধ্যায় শেষ হয়, মানুষও একদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। কিন্তু তাঁর আদর্শ, বিনয় এবং মানুষের মনে রেখে যাওয়া স্মৃতি বেঁচে থাকে দীর্ঘদিন।
মরহুম অধ্যক্ষ মো. ইয়াকুব আলীর স্বাক্ষর তাই নিছক কয়েকটি রেখা নয়; এটি তাঁর শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা এবং একজন শিক্ষকের ব্যক্তিত্বের স্মরণীয় দলিল।
