অন্যান্য
একটি গ্রন্থাগার যেকোনো জনপদের জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্র। অথচ ৪৩ বছরের পুরোনো ধুনট পাবলিক লাইব্রেরি এখন বই সংকট, জায়গা সংকট ও জনবল সংকটের মধ্যে দিয়ে কোনোরকমে টিকে আছে। দিন দিন পাঠক বাড়লেও জায়গার অভাবে অনেককেই ফিরে যেতে হচ্ছে।
১৯৮৩ সালে ধুনট উপজেলা প্রতিষ্ঠার সময়ই গড়ে ওঠে এই পাবলিক লাইব্রেরি। ২০১৩ সালের ২৬ মার্চ এটি জাতীয় গ্রন্থাগার অধিদপ্তরের নিবন্ধনভুক্ত হয়। তবে ২০০৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৭ বছর প্রতিষ্ঠানটি কার্যত বন্ধ ছিল। এই অচলাবস্থা কাটাতে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আমরা ধুনটবাসী কল্যাণ সংস্থা ২০১৮ সাল থেকে তৎকালীন ইউএনও সঞ্জয় মহন্ত, তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করেও তালাবদ্ধ পাঠাগারটি উন্মুক্ত করাতে পারেনি। নিজস্ব অর্থায়নে সংস্কার করে স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে পরিচালনার অনুমতি চেয়ে সংগঠনের প্যাডে আবেদন করেও ব্যর্থ হতে হয় তাদের।
সবশেষে ২০২৪ সালের নভেম্বরে ক্রিস্টোফার হিমেল রিচেল ইউএনও হিসেবে যোগদান করলে সংগঠনের সভাপতি আঁখিনূর জামান বকুল পুনরায় আবেদন জানান, আর তিনি শর্তসাপেক্ষে পাঠাগারটি স্বেচ্ছাসেবীদের সমন্বয়ে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে সম্মত হন। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে একটি তালিকা তৈরি করে সংগঠনের প্যাডে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষরে তা ইউএনওর কাছে হস্তান্তর করা হয়। তাঁর আন্তরিক সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনায় ২৬ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে আমরা ধুনটবাসী কল্যাণ সংস্থার তত্ত্বাবধানে ধুনট পাবলিক লাইব্রেরি নতুনভাবে পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
সে সময় উপজেলা প্রশাসনের দেড় লাখ টাকা বরাদ্দে ওয়াশরুম, চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন অংশ সংস্কার করা হয় এবং ৬০ হাজার টাকার নতুন বই কেনা হয়। শুরুতে কে এম ফজলে রাব্বি, জান্নাতুল ফেরদৌসি জ্যোতি, আরিয়ান খন্দকার হৃদয়, তাফসির, শাহ আলম, জিসান, শেখ আলমগীর, মেহেদী, আব্দুল মান্নান, রুহুল আমিন, নাবিলা তাবাসসুমসহ কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী পালাক্রমে লাইব্রেরিটি দেখাশোনা করতেন। দিনে দিনে পাঠাগারের পরিচিতি ও প্রসার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাঠক সংখ্যাও বেড়েছে। কর্মব্যস্ততার কারণে শুরুর দিকের অনেকে আর সময় দিতে না পারলেও কে এম ফজলে রাব্বি এখনো প্রায় প্রতিদিন লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখভাল করছেন।
তবে পুনরায় চালু হওয়ার পরও সংকট কাটেনি। লাইব্রেরিতে প্রায় এক হাজার বই থাকলেও পাঠযোগ্য বইয়ের সংখ্যা মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০টি, বাকিগুলো পুরোনো হয়ে পড়ার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বর্তমান পাঠকদের চাহিদা অনুযায়ী নতুন বইয়ের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। অবকাঠামোর অবস্থাও নাজুক।
একটি রিডিং টেবিল ইতিমধ্যে ভেঙে কাত হয়ে আছে, ১০-১২টি চেয়ার ও ছয়টি আলমারির মধ্যে মাত্র একটি নতুন, বাকিগুলো ভাঙাচোরা। বই রাখার কয়েকটি সেলফ ভেঙে পড়েছে, কিছু ভাঙার উপক্রম। ভবনের সিলিংও দুর্বল হয়ে পড়েছে, যা যেকোনো সময় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৬০ জন পাঠক লাইব্রেরিতে আসেন, যাদের বড় অংশ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থী, পাশাপাশি আছেন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরাও।
কিন্তু মূল সমস্যা হলো লাইব্রেরিতে বর্তমানে কোনো কার্যকর গ্রন্থাগারিক নেই, নেই কোনো পরিচালনা কমিটি বা সদস্য তালিকা, নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তি বা নবায়নেরও কোনো নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেই। এ বিষয়ে তৎকালীন লাইব্রেরিয়ান আব্দুস সাত্তার বলেন, শুরুর দিকে এসব থাকলেও দীর্ঘদিন কার্যক্রম না থাকায় তা আর অবশিষ্ট নেই। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে লাইব্রেরিয়ান হিসেবে নিযুক্ত থাকলেও দীর্ঘদিন নিয়মিত উপস্থিত না থেকে ব্যক্তিগত কাজে সময় ব্যয় করতেন বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, লাইব্রেরিটি পুনরায় চালু হওয়ার বিষয়ে আমাকে যথাযথভাবে অবহিত করা হয়নি। বিষয়টি আমার নজরে এসেছিল, তবে আনুষ্ঠানিকভাবে না জানানোর কারণে অভিমানে আমি সেখানে যাইনি।
লাইব্রেরির দায়িত্বে থাকা স্বেচ্ছাসেবী কে এম ফজলে রাব্বি বলেন, আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করে পাবলিক লাইব্রেরিটিকে কার্যকর ও প্রাণবন্ত করার চেষ্টা করছি। প্রশাসনের কাছে আমাদের বিশেষ আবেদন—নতুন বই, আধুনিকায়ন, কম্পিউটার, সিসি ক্যামেরা, ই-বুক ও ইন্টারনেট সুবিধা সংযোজনের পাশাপাশি অবকাঠামোর প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হোক। জনবল ও স্থান সংকটের মধ্যেও প্রতিদিন পঞ্চাশের অধিক শিক্ষার্থী এখান থেকে উপকৃত হচ্ছেন।
প্রত্নতত্ত্ব সংগ্রাহক ও বর্ণবিলাস পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ সাদিকুল বাশার শিশির বলেন, প্রায় এক যুগের অধিক সময় ধুনট পাবলিক লাইব্রেরি বন্ধ ছিল, বই-আসবাবপত্র জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছিল। অনেক শিক্ষার্থীই জানত না যে ধুনটে এমন একটি লাইব্রেরি আছে। আমরা ধুনটবাসী কল্যাণ সংস্থার সভাপতিসহ আমরা কয়েকজন সদস্য তৎকালীন ইউএনও সঞ্জয় কুমার মহন্তর সঙ্গে বারবার কথা বলেও ফল হয়নি, পরে সংস্কৃতিমনা ইউএনও হিমেল রিছিল দায়িত্ব নিয়ে লাইব্রেরির দেখভাল স্বেচ্ছাসেবীদের হাতে তুলে দেন। এরপর থেকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
আমরা ধুনটবাসী কল্যাণ সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মোনাজ্জেমুল ইসলাম সুমন বলেন, প্রযুক্তিনির্ভরতা ও পাঠাগারের অভাবে ধুনটে বই পড়ার সংস্কৃতি অনেকটাই কমে গিয়েছিল। এই সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে পাঠাগার পুনরায় চালু করা ছিল সময়ের দাবি। আমাদের উদ্দেশ্য শুধু লাইব্রেরির দরজা খুলে দেওয়া নয়, বরং শিশু-কিশোর, শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও গবেষকদের জন্য ডিজিটাল রিসোর্স ও পাঠচক্রসহ একটি পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানকেন্দ্র গড়ে তোলা। একটি ভালো পাঠাগার একটি প্রজন্মের চিন্তাভাবনা বদলে দিতে পারে, তবে এজন্য প্রয়োজন সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা।
এ বিষয়ে বগুড়া জেলা গ্রন্থাগারের সিনিয়র লাইব্রেরিয়ান রেমিনা জান্নাত বলেন, ধুনট পাবলিক লাইব্রেরি জেলা গ্রন্থাগারের নিবন্ধিত হলেও সেখানে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত নেই। জনবল নিয়োগে আমাদের কোনো এখতিয়ার না থাকায় স্থানীয় প্রশাসন বা গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ চাইলে নিজ উদ্যোগে নিয়োগ দিতে পারে। অধিদপ্তর থেকে সরাসরি সহায়তা এলে তা গ্রহণেরও সুযোগ রয়েছে।
লাইব্রেরির বই সংকট ও ভগ্নদশা নিয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ উল্লাহ নিজামী বলেন, লাইব্রেরির বিষয়টি নিয়ে আমরা ভাবছি এবং ইতিমধ্যে সংস্কার, নতুন বই ও আধুনিকায়নের জন্য বরাদ্দ চেয়ে জেলা পরিষদে চিঠি দেওয়া হয়েছে। খুব দ্রুতই আমরা এটি আধুনিকায়ন করে সবার জন্য উপযুক্ত করে দিতে পারব।
দুই যুগের অচলাবস্থা কাটিয়ে স্বেচ্ছাসেবীদের হাত ধরে ধুনট পাবলিক লাইব্রেরি আজ আবার পাঠকমুখর। কিন্তু বই, জনবল ও অবকাঠামোর এই সংকট না কাটলে এই প্রাণচাঞ্চল্য দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, সেই প্রশ্নই থেকে যাচ্ছে। প্রশাসনের প্রতিশ্রুত বরাদ্দ কতটা দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে ধুনটের এই একমাত্র পাবলিক লাইব্রেরির ভবিষ্যৎ।

শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ আগস্ট ২০২৬
একটি গ্রন্থাগার যেকোনো জনপদের জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্র। অথচ ৪৩ বছরের পুরোনো ধুনট পাবলিক লাইব্রেরি এখন বই সংকট, জায়গা সংকট ও জনবল সংকটের মধ্যে দিয়ে কোনোরকমে টিকে আছে। দিন দিন পাঠক বাড়লেও জায়গার অভাবে অনেককেই ফিরে যেতে হচ্ছে।
১৯৮৩ সালে ধুনট উপজেলা প্রতিষ্ঠার সময়ই গড়ে ওঠে এই পাবলিক লাইব্রেরি। ২০১৩ সালের ২৬ মার্চ এটি জাতীয় গ্রন্থাগার অধিদপ্তরের নিবন্ধনভুক্ত হয়। তবে ২০০৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৭ বছর প্রতিষ্ঠানটি কার্যত বন্ধ ছিল। এই অচলাবস্থা কাটাতে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আমরা ধুনটবাসী কল্যাণ সংস্থা ২০১৮ সাল থেকে তৎকালীন ইউএনও সঞ্জয় মহন্ত, তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করেও তালাবদ্ধ পাঠাগারটি উন্মুক্ত করাতে পারেনি। নিজস্ব অর্থায়নে সংস্কার করে স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে পরিচালনার অনুমতি চেয়ে সংগঠনের প্যাডে আবেদন করেও ব্যর্থ হতে হয় তাদের।
সবশেষে ২০২৪ সালের নভেম্বরে ক্রিস্টোফার হিমেল রিচেল ইউএনও হিসেবে যোগদান করলে সংগঠনের সভাপতি আঁখিনূর জামান বকুল পুনরায় আবেদন জানান, আর তিনি শর্তসাপেক্ষে পাঠাগারটি স্বেচ্ছাসেবীদের সমন্বয়ে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে সম্মত হন। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে একটি তালিকা তৈরি করে সংগঠনের প্যাডে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষরে তা ইউএনওর কাছে হস্তান্তর করা হয়। তাঁর আন্তরিক সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনায় ২৬ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে আমরা ধুনটবাসী কল্যাণ সংস্থার তত্ত্বাবধানে ধুনট পাবলিক লাইব্রেরি নতুনভাবে পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
সে সময় উপজেলা প্রশাসনের দেড় লাখ টাকা বরাদ্দে ওয়াশরুম, চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন অংশ সংস্কার করা হয় এবং ৬০ হাজার টাকার নতুন বই কেনা হয়। শুরুতে কে এম ফজলে রাব্বি, জান্নাতুল ফেরদৌসি জ্যোতি, আরিয়ান খন্দকার হৃদয়, তাফসির, শাহ আলম, জিসান, শেখ আলমগীর, মেহেদী, আব্দুল মান্নান, রুহুল আমিন, নাবিলা তাবাসসুমসহ কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী পালাক্রমে লাইব্রেরিটি দেখাশোনা করতেন। দিনে দিনে পাঠাগারের পরিচিতি ও প্রসার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাঠক সংখ্যাও বেড়েছে। কর্মব্যস্ততার কারণে শুরুর দিকের অনেকে আর সময় দিতে না পারলেও কে এম ফজলে রাব্বি এখনো প্রায় প্রতিদিন লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখভাল করছেন।
তবে পুনরায় চালু হওয়ার পরও সংকট কাটেনি। লাইব্রেরিতে প্রায় এক হাজার বই থাকলেও পাঠযোগ্য বইয়ের সংখ্যা মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০টি, বাকিগুলো পুরোনো হয়ে পড়ার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বর্তমান পাঠকদের চাহিদা অনুযায়ী নতুন বইয়ের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। অবকাঠামোর অবস্থাও নাজুক।
একটি রিডিং টেবিল ইতিমধ্যে ভেঙে কাত হয়ে আছে, ১০-১২টি চেয়ার ও ছয়টি আলমারির মধ্যে মাত্র একটি নতুন, বাকিগুলো ভাঙাচোরা। বই রাখার কয়েকটি সেলফ ভেঙে পড়েছে, কিছু ভাঙার উপক্রম। ভবনের সিলিংও দুর্বল হয়ে পড়েছে, যা যেকোনো সময় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৬০ জন পাঠক লাইব্রেরিতে আসেন, যাদের বড় অংশ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থী, পাশাপাশি আছেন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরাও।
কিন্তু মূল সমস্যা হলো লাইব্রেরিতে বর্তমানে কোনো কার্যকর গ্রন্থাগারিক নেই, নেই কোনো পরিচালনা কমিটি বা সদস্য তালিকা, নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তি বা নবায়নেরও কোনো নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেই। এ বিষয়ে তৎকালীন লাইব্রেরিয়ান আব্দুস সাত্তার বলেন, শুরুর দিকে এসব থাকলেও দীর্ঘদিন কার্যক্রম না থাকায় তা আর অবশিষ্ট নেই। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে লাইব্রেরিয়ান হিসেবে নিযুক্ত থাকলেও দীর্ঘদিন নিয়মিত উপস্থিত না থেকে ব্যক্তিগত কাজে সময় ব্যয় করতেন বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, লাইব্রেরিটি পুনরায় চালু হওয়ার বিষয়ে আমাকে যথাযথভাবে অবহিত করা হয়নি। বিষয়টি আমার নজরে এসেছিল, তবে আনুষ্ঠানিকভাবে না জানানোর কারণে অভিমানে আমি সেখানে যাইনি।
লাইব্রেরির দায়িত্বে থাকা স্বেচ্ছাসেবী কে এম ফজলে রাব্বি বলেন, আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করে পাবলিক লাইব্রেরিটিকে কার্যকর ও প্রাণবন্ত করার চেষ্টা করছি। প্রশাসনের কাছে আমাদের বিশেষ আবেদন—নতুন বই, আধুনিকায়ন, কম্পিউটার, সিসি ক্যামেরা, ই-বুক ও ইন্টারনেট সুবিধা সংযোজনের পাশাপাশি অবকাঠামোর প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হোক। জনবল ও স্থান সংকটের মধ্যেও প্রতিদিন পঞ্চাশের অধিক শিক্ষার্থী এখান থেকে উপকৃত হচ্ছেন।
প্রত্নতত্ত্ব সংগ্রাহক ও বর্ণবিলাস পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ সাদিকুল বাশার শিশির বলেন, প্রায় এক যুগের অধিক সময় ধুনট পাবলিক লাইব্রেরি বন্ধ ছিল, বই-আসবাবপত্র জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছিল। অনেক শিক্ষার্থীই জানত না যে ধুনটে এমন একটি লাইব্রেরি আছে। আমরা ধুনটবাসী কল্যাণ সংস্থার সভাপতিসহ আমরা কয়েকজন সদস্য তৎকালীন ইউএনও সঞ্জয় কুমার মহন্তর সঙ্গে বারবার কথা বলেও ফল হয়নি, পরে সংস্কৃতিমনা ইউএনও হিমেল রিছিল দায়িত্ব নিয়ে লাইব্রেরির দেখভাল স্বেচ্ছাসেবীদের হাতে তুলে দেন। এরপর থেকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
আমরা ধুনটবাসী কল্যাণ সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মোনাজ্জেমুল ইসলাম সুমন বলেন, প্রযুক্তিনির্ভরতা ও পাঠাগারের অভাবে ধুনটে বই পড়ার সংস্কৃতি অনেকটাই কমে গিয়েছিল। এই সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে পাঠাগার পুনরায় চালু করা ছিল সময়ের দাবি। আমাদের উদ্দেশ্য শুধু লাইব্রেরির দরজা খুলে দেওয়া নয়, বরং শিশু-কিশোর, শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও গবেষকদের জন্য ডিজিটাল রিসোর্স ও পাঠচক্রসহ একটি পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানকেন্দ্র গড়ে তোলা। একটি ভালো পাঠাগার একটি প্রজন্মের চিন্তাভাবনা বদলে দিতে পারে, তবে এজন্য প্রয়োজন সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা।
এ বিষয়ে বগুড়া জেলা গ্রন্থাগারের সিনিয়র লাইব্রেরিয়ান রেমিনা জান্নাত বলেন, ধুনট পাবলিক লাইব্রেরি জেলা গ্রন্থাগারের নিবন্ধিত হলেও সেখানে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত নেই। জনবল নিয়োগে আমাদের কোনো এখতিয়ার না থাকায় স্থানীয় প্রশাসন বা গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ চাইলে নিজ উদ্যোগে নিয়োগ দিতে পারে। অধিদপ্তর থেকে সরাসরি সহায়তা এলে তা গ্রহণেরও সুযোগ রয়েছে।
লাইব্রেরির বই সংকট ও ভগ্নদশা নিয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ উল্লাহ নিজামী বলেন, লাইব্রেরির বিষয়টি নিয়ে আমরা ভাবছি এবং ইতিমধ্যে সংস্কার, নতুন বই ও আধুনিকায়নের জন্য বরাদ্দ চেয়ে জেলা পরিষদে চিঠি দেওয়া হয়েছে। খুব দ্রুতই আমরা এটি আধুনিকায়ন করে সবার জন্য উপযুক্ত করে দিতে পারব।
দুই যুগের অচলাবস্থা কাটিয়ে স্বেচ্ছাসেবীদের হাত ধরে ধুনট পাবলিক লাইব্রেরি আজ আবার পাঠকমুখর। কিন্তু বই, জনবল ও অবকাঠামোর এই সংকট না কাটলে এই প্রাণচাঞ্চল্য দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, সেই প্রশ্নই থেকে যাচ্ছে। প্রশাসনের প্রতিশ্রুত বরাদ্দ কতটা দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে ধুনটের এই একমাত্র পাবলিক লাইব্রেরির ভবিষ্যৎ।
