শিক্ষাশিক্ষা

শিক্ষার বাতিঘর রাজশাহী কলেজ: দেড় শতাব্দীর আভিজাত্য ও শ্রেষ্ঠত্বের মহাকাব্য

রিপন আলী
রিপন আলী নিজস্ব প্রতিবেদক
|
শেয়ার করুন
অ+ অ-
শিক্ষার বাতিঘর রাজশাহী কলেজ: দেড় শতাব্দীর আভিজাত্য ও শ্রেষ্ঠত্বের মহাকাব্য
স্থাপত্যের আভিজাত্যে দেড়শ বছর: চীনা মিস্ত্রিদের নিপুণ ছোঁয়ায় ব্রিটিশ শৈলীতে নির্মিত রাজশাহী কলেজের লাল রঙের এই প্রশাসনিক ভবনটি আজও ঐতিহ্যের সগৌরবে দাঁড়িয়ে। ১৮৭৩ সালে যাত্রা শুরু করা এই ভবনটি উত্তরবঙ্গের শিক্ষা ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল।

অবিভক্ত বাংলার শিক্ষা-দীক্ষার মানচিত্রে যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করছে, তার মধ্যে অন্যতম ‘রাজশাহী কলেজ’। শুধু উত্তরবঙ্গ নয়, এক সময় অবিভক্ত ভারতজুড়ে রাজশাহীর যে পরিচিতি ছিল, তার মূলে ছিল এই বিদ্যাপীঠ। প্রথিতযশা অধ্যাপক আবু হেনা তাঁর ‘রিঅ্যাকশন অ্যান্ড রিকনসিলমেন্ট’ গ্রন্থে যথার্থই লিখেছিলেন, “রাজশাহীর গর্ব করার মতো একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে রাজশাহী কলেজ।”

​ঐতিহ্যের সূচনা ও স্বর্ণালী অতীত

​১৮৭৩ সালে মাত্র ছয়জন ছাত্র নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে তৎকালীন পূর্ব বাংলায় একমাত্র এই কলেজেই স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে পাঠদান করা হতো। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তখন শুধু বাংলা নয়, বরং আসাম, বিহার ও উড়িষ্যার মেধাবী শিক্ষার্থীরাও উচ্চশিক্ষার নেশায় এই ক্যাম্পাসে ভিড় জমাতেন।

​স্থাপত্যশৈলীর নান্দনিকতা

​রাজশাহী কলেজের প্রশাসন ভবনটি যেন জীবন্ত ইতিহাস। ব্রিটিশ স্থাপত্যশৈলীর সাথে চীনা মিস্ত্রিদের নিপুণ হস্তশিল্পের এক অনন্য মেলবন্ধন এই গাঢ় লাল বর্ণের দ্বিতল দালানটি। এছাড়া ঐতিহাসিক মোহামেডান ফুলার হোস্টেল, লাইব্রেরি-সমৃদ্ধ দ্বিতল মসজিদ এবং নয়নাভিরাম পদ্মফোটা পুকুর ক্যাম্পাসটিকে দিয়েছে রাজকীয় রূপ। খরস্রোতা পদ্মা নদীর পাশেই এর অবস্থান, যা প্রকৃতির সান্নিধ্যে শিক্ষার এক অসাধারণ পরিবেশ তৈরি করেছে।

​একনজরে বর্তমান রাজশাহী কলেজ

​বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি আর কেবল ইতিহাসের অংশ নয়, বরং আধুনিক শিক্ষার এক ‘রোল মডেল’।

  • ​শিক্ষার্থী সংখ্যা: উচ্চমাধ্যমিকসহ ২৪টি বিভাগে প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী।
  • ​শিক্ষক: ২২৬ জন অভিজ্ঞ শিক্ষকমণ্ডলী।
  • ​সাফল্য: ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে উচ্চমাধ্যমিক চালুর পর থেকেই এটি বোর্ডের সেরা তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।
  • ​সুযোগ-সুবিধা: সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার (যেখানে রয়েছে দুষ্প্রাপ্য পুঁথি ও সাময়িকী), আধুনিক ব্যায়ামাগার ও বোটানিক্যাল গার্ডেন।

​ভাষা আন্দোলন ও দেশপ্রেমের স্মারক

​এই কলেজের একটি বিশেষ গর্বের জায়গা হলো এর শহীদ মিনার। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে জীবন উৎসর্গকারীদের স্মরণে দেশের প্রথম শহীদ মিনারটি নির্মিত হয়েছিল এই কলেজ প্রাঙ্গণেই, যা আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক।

​যেখানে নক্ষত্রদের মেলা

​রাজশাহী কলেজ মানেই একঝাঁক বিশ্ববরণ্য কৃতি মানুষের আঁতুড়ঘর। শিক্ষক হিসেবে এখানে পদচারণা করেছেন বিজ্ঞানী কুদরত-ই-খুদা, আবদুল্লাহ আলমুতী শরফুদ্দীন এবং ভাষাবিজ্ঞানী এনামুল হকের মতো মনীষীরা। অন্যদিকে, এই কলেজের শিক্ষার্থীদের তালিকা দেখলে যে কেউ বিস্মিত হবেন:

  • ​রাজনীতিবিদ: জ্যোতি বসু (পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী), শহীদ এ.এইচ.এম কামারুজ্জামান (জাতীয় নেতা)।
  • ​সংস্কৃতি ও সাহিত্য: ঋত্বিক ঘটক, প্রমথনাথ বিশী, রজনীকান্ত সেন, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়।
  • ​শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী: স্যার যদুনাথ সরকার, ড. ওয়াজেদ আলী মিয়া, ড. এমাজউদ্দীন আহমদ।
  • ​আইন ও বিচার: বিচারপতি হাবিবুর রহমান, বিচারপতি রাধা বিনোদ পাল।

​আজকের রাজশাহী কলেজ: এক অনুকরণীয় রোল মডেল

​সাংস্কৃতিক চর্চার অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত এই ক্যাম্পাসে বাঁধন, রোভার স্কাউট, বিতর্ক ক্লাব এবং বরেন্দ্র থিয়েটারের মতো অসংখ্য সংগঠন সক্রিয়। ক্লাসে শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে এখানে রয়েছে বিশেষ পুরস্কারের ব্যবস্থা।

​বর্তমান অধ্যক্ষ অধ্যাপক ইব্রাহিম আলীর মতে, এই প্রতিষ্ঠানটি এখন সারা দেশের সরকারি-বেসরকারি কলেজগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের গৌরব ধরে রেখেছে। তিনি বলেন, "শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা আমাদের এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চাই।"

​দেড়শ বছরের পথচলায় রাজশাহী কলেজ কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি সংস্কৃতি, একটি চেতনা এবং বাংলার অহংকার

Public Voice

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬


শিক্ষার বাতিঘর রাজশাহী কলেজ: দেড় শতাব্দীর আভিজাত্য ও শ্রেষ্ঠত্বের মহাকাব্য

প্রকাশের তারিখ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image

অবিভক্ত বাংলার শিক্ষা-দীক্ষার মানচিত্রে যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করছে, তার মধ্যে অন্যতম ‘রাজশাহী কলেজ’। শুধু উত্তরবঙ্গ নয়, এক সময় অবিভক্ত ভারতজুড়ে রাজশাহীর যে পরিচিতি ছিল, তার মূলে ছিল এই বিদ্যাপীঠ। প্রথিতযশা অধ্যাপক আবু হেনা তাঁর ‘রিঅ্যাকশন অ্যান্ড রিকনসিলমেন্ট’ গ্রন্থে যথার্থই লিখেছিলেন, “রাজশাহীর গর্ব করার মতো একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে রাজশাহী কলেজ।”

​ঐতিহ্যের সূচনা ও স্বর্ণালী অতীত

​১৮৭৩ সালে মাত্র ছয়জন ছাত্র নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে তৎকালীন পূর্ব বাংলায় একমাত্র এই কলেজেই স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে পাঠদান করা হতো। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তখন শুধু বাংলা নয়, বরং আসাম, বিহার ও উড়িষ্যার মেধাবী শিক্ষার্থীরাও উচ্চশিক্ষার নেশায় এই ক্যাম্পাসে ভিড় জমাতেন।

​স্থাপত্যশৈলীর নান্দনিকতা

​রাজশাহী কলেজের প্রশাসন ভবনটি যেন জীবন্ত ইতিহাস। ব্রিটিশ স্থাপত্যশৈলীর সাথে চীনা মিস্ত্রিদের নিপুণ হস্তশিল্পের এক অনন্য মেলবন্ধন এই গাঢ় লাল বর্ণের দ্বিতল দালানটি। এছাড়া ঐতিহাসিক মোহামেডান ফুলার হোস্টেল, লাইব্রেরি-সমৃদ্ধ দ্বিতল মসজিদ এবং নয়নাভিরাম পদ্মফোটা পুকুর ক্যাম্পাসটিকে দিয়েছে রাজকীয় রূপ। খরস্রোতা পদ্মা নদীর পাশেই এর অবস্থান, যা প্রকৃতির সান্নিধ্যে শিক্ষার এক অসাধারণ পরিবেশ তৈরি করেছে।

​একনজরে বর্তমান রাজশাহী কলেজ

​বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি আর কেবল ইতিহাসের অংশ নয়, বরং আধুনিক শিক্ষার এক ‘রোল মডেল’।

  • ​শিক্ষার্থী সংখ্যা: উচ্চমাধ্যমিকসহ ২৪টি বিভাগে প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী।
  • ​শিক্ষক: ২২৬ জন অভিজ্ঞ শিক্ষকমণ্ডলী।
  • ​সাফল্য: ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে উচ্চমাধ্যমিক চালুর পর থেকেই এটি বোর্ডের সেরা তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।
  • ​সুযোগ-সুবিধা: সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার (যেখানে রয়েছে দুষ্প্রাপ্য পুঁথি ও সাময়িকী), আধুনিক ব্যায়ামাগার ও বোটানিক্যাল গার্ডেন।

​ভাষা আন্দোলন ও দেশপ্রেমের স্মারক

​এই কলেজের একটি বিশেষ গর্বের জায়গা হলো এর শহীদ মিনার। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে জীবন উৎসর্গকারীদের স্মরণে দেশের প্রথম শহীদ মিনারটি নির্মিত হয়েছিল এই কলেজ প্রাঙ্গণেই, যা আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক।

​যেখানে নক্ষত্রদের মেলা

​রাজশাহী কলেজ মানেই একঝাঁক বিশ্ববরণ্য কৃতি মানুষের আঁতুড়ঘর। শিক্ষক হিসেবে এখানে পদচারণা করেছেন বিজ্ঞানী কুদরত-ই-খুদা, আবদুল্লাহ আলমুতী শরফুদ্দীন এবং ভাষাবিজ্ঞানী এনামুল হকের মতো মনীষীরা। অন্যদিকে, এই কলেজের শিক্ষার্থীদের তালিকা দেখলে যে কেউ বিস্মিত হবেন:

  • ​রাজনীতিবিদ: জ্যোতি বসু (পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী), শহীদ এ.এইচ.এম কামারুজ্জামান (জাতীয় নেতা)।
  • ​সংস্কৃতি ও সাহিত্য: ঋত্বিক ঘটক, প্রমথনাথ বিশী, রজনীকান্ত সেন, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়।
  • ​শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী: স্যার যদুনাথ সরকার, ড. ওয়াজেদ আলী মিয়া, ড. এমাজউদ্দীন আহমদ।
  • ​আইন ও বিচার: বিচারপতি হাবিবুর রহমান, বিচারপতি রাধা বিনোদ পাল।

​আজকের রাজশাহী কলেজ: এক অনুকরণীয় রোল মডেল

​সাংস্কৃতিক চর্চার অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত এই ক্যাম্পাসে বাঁধন, রোভার স্কাউট, বিতর্ক ক্লাব এবং বরেন্দ্র থিয়েটারের মতো অসংখ্য সংগঠন সক্রিয়। ক্লাসে শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে এখানে রয়েছে বিশেষ পুরস্কারের ব্যবস্থা।

​বর্তমান অধ্যক্ষ অধ্যাপক ইব্রাহিম আলীর মতে, এই প্রতিষ্ঠানটি এখন সারা দেশের সরকারি-বেসরকারি কলেজগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের গৌরব ধরে রেখেছে। তিনি বলেন, "শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা আমাদের এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চাই।"

​দেড়শ বছরের পথচলায় রাজশাহী কলেজ কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি সংস্কৃতি, একটি চেতনা এবং বাংলার অহংকার


Public Voice

সম্পাদক: মোঃ বাদশাহ আলমগীর
প্রকাশক: অনন্যা অনসূয়া দিবা

কপিরাইট © ২০২৬ Public Voice । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত