ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

গোদাগাড়ীতে নৌকার নেতার মুখে ‘ধানের শীষ’: ভোল পাল্টে মাঠে নামা নিয়ে তোলপাড়

রিপন আলী
রিপন আলী নিজস্ব প্রতিবেদক
|
শেয়ার করুন
অ+ অ-
গোদাগাড়ীতে নৌকার নেতার মুখে ‘ধানের শীষ’: ভোল পাল্টে মাঠে নামা নিয়ে তোলপাড়
ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় নামা গোদাগাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা সুনন্দন দাস রতন।

রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ স্থানীয় নেতার বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় নামার ঘটনা এখন জেলার টক অব দ্য টাউন। গোদাগাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহপ্রচার সম্পাদক সুনন্দন দাস রতনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। ভিডিওতে তাকে ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রচারণা চালাতে এবং মানুষকে ‘ছাতা’ বা আশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে দেখা গেছে।

​কী আছে সেই ভাইরাল ভিডিওতে?

​সম্প্রতি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ৫৩ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, সুনন্দন দাস তিনজন ব্যক্তির সাথে নিবিড়ভাবে কথা বলছেন। সেখানে তিনি রীতিমতো রাজনৈতিক নির্দেশনার সুরে বলেন, "এবারকার নির্বাচনটা দলমত-নির্বিশেষে আমাদের ধানের শীষেই, শরীফ সাহেবকে দিতে হবে। তাই না? সে জন্যই আমরা গোটা গোদাগাড়ী উপজেলায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভেতরে যোগাযোগ করছি। আমাদের একটা ছাতা দরকার। এবার শরীফ সাহেবকেই যেন সবাই ভোট দেয়।"

​তিনি আরও যোগ করেন, "সবাইকে বলে দেবেন, সবাই ভোট দেবে। ঠিক আছে? আমরা সেই পথেই আগাচ্ছিলাম। শরীফ সাহেব জিতলে আমাদের একটা আশ্রয়ের দরকার। আমাদের তো এখন ছাতার দরকার। এটা বলার জন্যই এসেছি।"

​সুনন্দন দাসের স্বীকারোক্তি

​ভিডিওর বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সুনন্দন দাস রতন কোনো রাখঢাক না করেই ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন। তিনি জানান, ভিডিওটি গোদাগাড়ীর মোহনপুর ইউনিয়নে কয়েক দিন আগে ধারণ করা। বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় নিয়মিত যাচ্ছেন কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, "যাচ্ছি, মাঝে মাঝেই যাচ্ছি যখন সুযোগ হয়।" তবে বিষয়টি গণমাধ্যমে বড় করে না ছাপানোর জন্য তিনি অনুরোধ জানান।

​সুবিধাভোগী বনাম সুবিধাবাদী বিতর্ক

​ভিডিওটি ফেসবুকে প্রথম আপলোড করেন সাব্বির রহমান নামের নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের এক কর্মী। ভিডিওর ক্যাপশনে তিনি লেখেন, "১৭ বছর আওয়ামী লীগের পোস্ট ব্যবহার করে, সুবিধা নিয়ে আজ বিএনপির জন্য ভোট চাচ্ছে। এই রতন দাস আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সুদিনে আবার বড় নেতার চামচামি করে রাজনীতি করার সুযোগ খুঁজবে।" স্থানীয় তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যেও এই নিয়ে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে।

​বিতর্কিত অতীত ও রাজনৈতিক উত্থান

​সুনন্দন দাস কাস্টমসের একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। চাকরি জীবনে তাঁর বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগের সাবেক প্রভাবশালী এমপি ওমর ফারুক চৌধুরীর অত্যন্ত আস্থাভাজন হওয়ার সুবাদে দলে পদ পান তিনি। ফারুক চৌধুরী তাঁকে শ্রীশ্রী গৌরাঙ্গ দেব ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যও করেছিলেন। কিন্তু অনিয়ম ও নানা বিতর্কের কারণে গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি তাঁকে ট্রাস্টি বোর্ড থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

​২০২৪ সালের মে মাসে উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে লড়াই করে তিনি শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। এর আগেও গত বছরের জুনে জেলা বিএনপির সদস্যসচিব বিশ্বনাথ সরকারের ব্যক্তিগত গাড়িতে তাঁকে চড়তে দেখা গেলে সিসিটিভি ফুটেজ ভাইরাল হয়, যা নিয়ে তৎকালীন সময়ে আওয়ামী লীগের ভেতরে ব্যাপক অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল।

​বিশ্লেষকদের অভিমত

​রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই তিনি এখন 'ছাতা' হিসেবে বিএনপি প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীনের আশ্রয় খুঁজছেন। আওয়ামী লীগের পদে থেকে এমন প্রকাশ্য অবাধ্যতা এবং ধানের শীষের প্রচারণাকে অনেকেই ‘রাজনৈতিক চরম সুবিধাবাদ’ হিসেবে দেখছেন।

​গোদাগাড়ী-তানোর আসনের এই ঘটনা তৃণমূল রাজনীতিতে নেতাকর্মীদের নৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে

Public Voice

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬


গোদাগাড়ীতে নৌকার নেতার মুখে ‘ধানের শীষ’: ভোল পাল্টে মাঠে নামা নিয়ে তোলপাড়

প্রকাশের তারিখ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image

রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ স্থানীয় নেতার বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় নামার ঘটনা এখন জেলার টক অব দ্য টাউন। গোদাগাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহপ্রচার সম্পাদক সুনন্দন দাস রতনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। ভিডিওতে তাকে ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রচারণা চালাতে এবং মানুষকে ‘ছাতা’ বা আশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে দেখা গেছে।

​কী আছে সেই ভাইরাল ভিডিওতে?

​সম্প্রতি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ৫৩ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, সুনন্দন দাস তিনজন ব্যক্তির সাথে নিবিড়ভাবে কথা বলছেন। সেখানে তিনি রীতিমতো রাজনৈতিক নির্দেশনার সুরে বলেন, "এবারকার নির্বাচনটা দলমত-নির্বিশেষে আমাদের ধানের শীষেই, শরীফ সাহেবকে দিতে হবে। তাই না? সে জন্যই আমরা গোটা গোদাগাড়ী উপজেলায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভেতরে যোগাযোগ করছি। আমাদের একটা ছাতা দরকার। এবার শরীফ সাহেবকেই যেন সবাই ভোট দেয়।"

​তিনি আরও যোগ করেন, "সবাইকে বলে দেবেন, সবাই ভোট দেবে। ঠিক আছে? আমরা সেই পথেই আগাচ্ছিলাম। শরীফ সাহেব জিতলে আমাদের একটা আশ্রয়ের দরকার। আমাদের তো এখন ছাতার দরকার। এটা বলার জন্যই এসেছি।"

​সুনন্দন দাসের স্বীকারোক্তি

​ভিডিওর বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সুনন্দন দাস রতন কোনো রাখঢাক না করেই ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন। তিনি জানান, ভিডিওটি গোদাগাড়ীর মোহনপুর ইউনিয়নে কয়েক দিন আগে ধারণ করা। বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় নিয়মিত যাচ্ছেন কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, "যাচ্ছি, মাঝে মাঝেই যাচ্ছি যখন সুযোগ হয়।" তবে বিষয়টি গণমাধ্যমে বড় করে না ছাপানোর জন্য তিনি অনুরোধ জানান।

​সুবিধাভোগী বনাম সুবিধাবাদী বিতর্ক

​ভিডিওটি ফেসবুকে প্রথম আপলোড করেন সাব্বির রহমান নামের নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের এক কর্মী। ভিডিওর ক্যাপশনে তিনি লেখেন, "১৭ বছর আওয়ামী লীগের পোস্ট ব্যবহার করে, সুবিধা নিয়ে আজ বিএনপির জন্য ভোট চাচ্ছে। এই রতন দাস আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সুদিনে আবার বড় নেতার চামচামি করে রাজনীতি করার সুযোগ খুঁজবে।" স্থানীয় তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যেও এই নিয়ে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে।

​বিতর্কিত অতীত ও রাজনৈতিক উত্থান

​সুনন্দন দাস কাস্টমসের একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। চাকরি জীবনে তাঁর বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগের সাবেক প্রভাবশালী এমপি ওমর ফারুক চৌধুরীর অত্যন্ত আস্থাভাজন হওয়ার সুবাদে দলে পদ পান তিনি। ফারুক চৌধুরী তাঁকে শ্রীশ্রী গৌরাঙ্গ দেব ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যও করেছিলেন। কিন্তু অনিয়ম ও নানা বিতর্কের কারণে গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি তাঁকে ট্রাস্টি বোর্ড থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

​২০২৪ সালের মে মাসে উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে লড়াই করে তিনি শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। এর আগেও গত বছরের জুনে জেলা বিএনপির সদস্যসচিব বিশ্বনাথ সরকারের ব্যক্তিগত গাড়িতে তাঁকে চড়তে দেখা গেলে সিসিটিভি ফুটেজ ভাইরাল হয়, যা নিয়ে তৎকালীন সময়ে আওয়ামী লীগের ভেতরে ব্যাপক অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল।

​বিশ্লেষকদের অভিমত

​রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই তিনি এখন 'ছাতা' হিসেবে বিএনপি প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীনের আশ্রয় খুঁজছেন। আওয়ামী লীগের পদে থেকে এমন প্রকাশ্য অবাধ্যতা এবং ধানের শীষের প্রচারণাকে অনেকেই ‘রাজনৈতিক চরম সুবিধাবাদ’ হিসেবে দেখছেন।

​গোদাগাড়ী-তানোর আসনের এই ঘটনা তৃণমূল রাজনীতিতে নেতাকর্মীদের নৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে


Public Voice

সম্পাদক: মোঃ বাদশাহ আলমগীর
প্রকাশক: অনন্যা অনসূয়া দিবা

কপিরাইট © ২০২৬ Public Voice । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত