মতামতমতামত

রাজনীতিতে ধর্মের অভিনয় ও ভোটারের মনস্তত্ত্ব

রাজনীতিতে ধর্মের অভিনয় ও ভোটারের মনস্তত্ত্ব
ইন্টারনেট

নির্বাচন এলেই আমাদের সমাজে এক অদ্ভুত রূপান্তর চোখে পড়ে। যাঁরা সারা বছর ক্ষমতার অলিন্দে ধর্ম, সংস্কৃতি কিংবা নৈতিকতার ধার ধারে না, ভোটের মৌসুমে তাঁদের অনেকের মধ্যেই হঠাৎ করে দাঁড়ি গজায়, মাথায় টুপি বসে, নারীর ঘোমটা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক প্রতীক। এগুলো তখন আর ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা ধর্মীয় অনুশীলনের চিহ্ন থাকে না; হয়ে ওঠে নিছক ভোট টানার কৌশল।

সমস্যা এখানেই শেষ নয়। এই কৌশল তখনই সফল হয়, যখন এক শ্রেণির ভোটার যুক্তিবোধের বদলে আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। উন্নয়ন, দুর্নীতি, যোগ্যতা কিংবা নীতির প্রশ্নে তারা প্রশ্ন তোলে না; বরং দেখে—কে কতটা “আমাদের মতো”, কে কতটা “ধর্মপ্রাণ” দেখাতে পারছে। ফলে রাজনীতি পরিণত হয় অভিনয়ের মঞ্চে, আর ভোটার হয়ে ওঠে সেই নাটকের সহজ শিকার।

এই সাইকোলজির মূল দুর্বলতা হলো—পরিচয়কে নীতির ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া। ভোটার ভাবে, “আমার ধর্মের, আমার সংস্কৃতির লোক মানেই ভালো।” বাস্তবে ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, পোশাক বা বাহ্যিক ধর্মীয় চিহ্ন চরিত্রের গ্যারান্টি নয়। কিন্তু বারবার প্রতারিত হয়েও আমরা একই ফাঁদে পা দিই। কারণ প্রশ্ন করার অভ্যাস নেই, তথ্য যাচাই করার সংস্কৃতি নেই, আছে শুধু আবেগ আর দলান্ধতা।

রাজনীতিকরা বিষয়টি ভালোই বোঝে। তাই তারা জানে, পাঁচ বছরের কাজের হিসাব দেওয়ার চেয়ে নির্বাচনের আগে দাঁড়ি-টুপি-ঘোমটার প্রদর্শনী অনেক বেশি কার্যকর। আর ভোটার যদি সেটাকেই বিশ্বাসযোগ্যতার মানদণ্ড ধরে নেয়, তবে দায় শুধু রাজনীতিকের নয়—ভোটারেরও।

গণতন্ত্র টিকে থাকে সচেতন নাগরিকের ওপর, অন্ধ অনুসারীর ওপর নয়। ভোট যদি হয় পোশাক, প্রতীক আর ভান করা ধার্মিকতার ভিত্তিতে, তবে সেই ভোট গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না; বরং তাকে দুর্বল করে। তাই প্রশ্নটা এখন আর রাজনীতিকদের উদ্দেশে নয়, আমাদের নিজেদের দিকে—আমরা কি সত্যিই নাগরিক, নাকি শুধু ব্যবহৃত হওয়ার মতো ভোটার?


লেখক- মিয়া সুলেমান, গণমাধ্যমকর্মী ও মুক্তচিন্তক

Public Voice

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬


রাজনীতিতে ধর্মের অভিনয় ও ভোটারের মনস্তত্ত্ব

প্রকাশের তারিখ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬

featured Image

নির্বাচন এলেই আমাদের সমাজে এক অদ্ভুত রূপান্তর চোখে পড়ে। যাঁরা সারা বছর ক্ষমতার অলিন্দে ধর্ম, সংস্কৃতি কিংবা নৈতিকতার ধার ধারে না, ভোটের মৌসুমে তাঁদের অনেকের মধ্যেই হঠাৎ করে দাঁড়ি গজায়, মাথায় টুপি বসে, নারীর ঘোমটা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক প্রতীক। এগুলো তখন আর ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা ধর্মীয় অনুশীলনের চিহ্ন থাকে না; হয়ে ওঠে নিছক ভোট টানার কৌশল।

সমস্যা এখানেই শেষ নয়। এই কৌশল তখনই সফল হয়, যখন এক শ্রেণির ভোটার যুক্তিবোধের বদলে আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। উন্নয়ন, দুর্নীতি, যোগ্যতা কিংবা নীতির প্রশ্নে তারা প্রশ্ন তোলে না; বরং দেখে—কে কতটা “আমাদের মতো”, কে কতটা “ধর্মপ্রাণ” দেখাতে পারছে। ফলে রাজনীতি পরিণত হয় অভিনয়ের মঞ্চে, আর ভোটার হয়ে ওঠে সেই নাটকের সহজ শিকার।

এই সাইকোলজির মূল দুর্বলতা হলো—পরিচয়কে নীতির ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া। ভোটার ভাবে, “আমার ধর্মের, আমার সংস্কৃতির লোক মানেই ভালো।” বাস্তবে ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, পোশাক বা বাহ্যিক ধর্মীয় চিহ্ন চরিত্রের গ্যারান্টি নয়। কিন্তু বারবার প্রতারিত হয়েও আমরা একই ফাঁদে পা দিই। কারণ প্রশ্ন করার অভ্যাস নেই, তথ্য যাচাই করার সংস্কৃতি নেই, আছে শুধু আবেগ আর দলান্ধতা।

রাজনীতিকরা বিষয়টি ভালোই বোঝে। তাই তারা জানে, পাঁচ বছরের কাজের হিসাব দেওয়ার চেয়ে নির্বাচনের আগে দাঁড়ি-টুপি-ঘোমটার প্রদর্শনী অনেক বেশি কার্যকর। আর ভোটার যদি সেটাকেই বিশ্বাসযোগ্যতার মানদণ্ড ধরে নেয়, তবে দায় শুধু রাজনীতিকের নয়—ভোটারেরও।

গণতন্ত্র টিকে থাকে সচেতন নাগরিকের ওপর, অন্ধ অনুসারীর ওপর নয়। ভোট যদি হয় পোশাক, প্রতীক আর ভান করা ধার্মিকতার ভিত্তিতে, তবে সেই ভোট গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না; বরং তাকে দুর্বল করে। তাই প্রশ্নটা এখন আর রাজনীতিকদের উদ্দেশে নয়, আমাদের নিজেদের দিকে—আমরা কি সত্যিই নাগরিক, নাকি শুধু ব্যবহৃত হওয়ার মতো ভোটার?


লেখক- মিয়া সুলেমান, গণমাধ্যমকর্মী ও মুক্তচিন্তক


Public Voice

সম্পাদক: মোঃ বাদশাহ আলমগীর
প্রকাশক: অনন্যা অনসূয়া দিবা

কপিরাইট © ২০২৬ Public Voice । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত