মতামতমতামত

স্বাধীন জন্ম, শৃঙ্খলিত জীবন: রুশোর উক্তিটি নয় বন্দুমাত্র মিথ্যা

স্বাধীন জন্ম, শৃঙ্খলিত জীবন: রুশোর উক্তিটি নয় বন্দুমাত্র মিথ্যা
প্রতীকী ছবি

মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন—এই মৌলিক সত্যটি উচ্চারণ করেছিলেন দার্শনিক জাঁ জ্যাক রুশো। তবে তাঁর বিখ্যাত উক্তি, “মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মায়, অথচ সর্বত্রই সে শৃঙ্খলে আবদ্ধ”—আজও সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার বাস্তবতায় গভীর তাৎপর্য বহন করে। বিশেষ করে আদিপত্যবাদ-এর আলোকে এই উক্তি বিশ্লেষণ করলে আধুনিক রাষ্ট্র ও ক্ষমতাকাঠামোর অন্তর্নিহিত রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, আদিপত্যবাদ এমন একটি ক্ষমতাব্যবস্থা যেখানে শাসকগোষ্ঠী কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়; বরং আইন, শিক্ষা, ধর্ম, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং চিন্তার নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এই ব্যবস্থায় শাসনের রূপ এতটাই সূক্ষ্ম হয় যে, মানুষ নিজের অজান্তেই শাসকের তৈরি নিয়ম ও বাস্তবতাকে ‘স্বাভাবিক’ ও ‘অবশ্যম্ভাবী’ হিসেবে গ্রহণ করে নেয়।


রুশোর দর্শনে মানুষ প্রকৃতিগতভাবে স্বাধীন হলেও সমাজে প্রবেশের পর সে নানা সামাজিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রীয় কাঠামো, শ্রেণিবৈষম্য, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, সামাজিক রীতি এবং ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর প্রণীত নিয়ম ধীরে ধীরে ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সংকুচিত করে। আদিপত্যবাদী সমাজে এই শৃঙ্খল শুধু দৃশ্যমান দমন-পীড়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস ও মূল্যবোধের গভীরে প্রোথিত হয়ে যায়।


রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আদিপত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী রূপ হলো চিন্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ। মানুষ যখন বিশ্বাস করতে শুরু করে যে—“এই ব্যবস্থাই একমাত্র সম্ভব”, “এভাবেই সমাজ চলে”, কিংবা “এটাই স্বাভাবিক”—তখন শোষণ ও বৈষম্য থাকা সত্ত্বেও সে প্রতিবাদে মুখর হয় না। এই অদৃশ্য মানসিক শৃঙ্খলই রুশোর উক্ত ‘শৃঙ্খল’-এর সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ বলে মনে করছেন গবেষকরা।


রাষ্ট্র ও ক্ষমতার সম্পর্ক প্রসঙ্গে রুশোর সামাজিক চুক্তি তত্ত্বে বলা হয়, রাষ্ট্রের দায়িত্ব জনগণের সামষ্টিক ইচ্ছা বা General Will রক্ষা করা। কিন্তু বাস্তবে আদিপত্যবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থায় এই সামষ্টিক ইচ্ছা বিকৃত হয়ে যায় ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর স্বার্থে। ফলে রাষ্ট্র নিজেই পরিণত হয় নাগরিকের স্বাধীনতা হরণের প্রধান হাতিয়ারে।


সমসাময়িক সমাজে মানুষ ভোটাধিকার, বাকস্বাধীনতা ও আইনি অধিকার পেলেও বাস্তব জীবনে অর্থনৈতিক নির্ভরতা, কর্পোরেট ও গণমাধ্যমের প্রভাব এবং শ্রেণিভিত্তিক ক্ষমতার বৈষম্যের কারণে অনেকেই নিজেদের স্বাধীন মনে করতে পারছেন না। বিশ্লেষকদের মতে, এসব কাঠামোগত বাস্তবতা আদিপত্যবাদকে আরও শক্তিশালী করে এবং শৃঙ্খলকে স্থায়ী রূপ দেয়।


সব মিলিয়ে রুশোর উক্তিটি কেবল একটি দার্শনিক বক্তব্য নয়; বরং এটি আদিপত্যবাদী সমাজব্যবস্থার এক তীক্ষ্ণ আলোচনা। এটি স্মরণ করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা শুধু জন্মগত বা সংবিধানস্বীকৃত অধিকার নয়—প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন আদিপত্যবাদী চিন্তা ও ক্ষমতাকাঠামোর ভাঙন। অন্যথায় মানুষ স্বাধীন হয়েও আজীবন শৃঙ্খলেই আবদ্ধ থেকে যাবে।

Public Voice

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬


স্বাধীন জন্ম, শৃঙ্খলিত জীবন: রুশোর উক্তিটি নয় বন্দুমাত্র মিথ্যা

প্রকাশের তারিখ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬

featured Image

মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন—এই মৌলিক সত্যটি উচ্চারণ করেছিলেন দার্শনিক জাঁ জ্যাক রুশো। তবে তাঁর বিখ্যাত উক্তি, “মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মায়, অথচ সর্বত্রই সে শৃঙ্খলে আবদ্ধ”—আজও সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার বাস্তবতায় গভীর তাৎপর্য বহন করে। বিশেষ করে আদিপত্যবাদ-এর আলোকে এই উক্তি বিশ্লেষণ করলে আধুনিক রাষ্ট্র ও ক্ষমতাকাঠামোর অন্তর্নিহিত রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, আদিপত্যবাদ এমন একটি ক্ষমতাব্যবস্থা যেখানে শাসকগোষ্ঠী কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়; বরং আইন, শিক্ষা, ধর্ম, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং চিন্তার নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এই ব্যবস্থায় শাসনের রূপ এতটাই সূক্ষ্ম হয় যে, মানুষ নিজের অজান্তেই শাসকের তৈরি নিয়ম ও বাস্তবতাকে ‘স্বাভাবিক’ ও ‘অবশ্যম্ভাবী’ হিসেবে গ্রহণ করে নেয়।


রুশোর দর্শনে মানুষ প্রকৃতিগতভাবে স্বাধীন হলেও সমাজে প্রবেশের পর সে নানা সামাজিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রীয় কাঠামো, শ্রেণিবৈষম্য, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, সামাজিক রীতি এবং ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর প্রণীত নিয়ম ধীরে ধীরে ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সংকুচিত করে। আদিপত্যবাদী সমাজে এই শৃঙ্খল শুধু দৃশ্যমান দমন-পীড়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস ও মূল্যবোধের গভীরে প্রোথিত হয়ে যায়।


রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আদিপত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী রূপ হলো চিন্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ। মানুষ যখন বিশ্বাস করতে শুরু করে যে—“এই ব্যবস্থাই একমাত্র সম্ভব”, “এভাবেই সমাজ চলে”, কিংবা “এটাই স্বাভাবিক”—তখন শোষণ ও বৈষম্য থাকা সত্ত্বেও সে প্রতিবাদে মুখর হয় না। এই অদৃশ্য মানসিক শৃঙ্খলই রুশোর উক্ত ‘শৃঙ্খল’-এর সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ বলে মনে করছেন গবেষকরা।


রাষ্ট্র ও ক্ষমতার সম্পর্ক প্রসঙ্গে রুশোর সামাজিক চুক্তি তত্ত্বে বলা হয়, রাষ্ট্রের দায়িত্ব জনগণের সামষ্টিক ইচ্ছা বা General Will রক্ষা করা। কিন্তু বাস্তবে আদিপত্যবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থায় এই সামষ্টিক ইচ্ছা বিকৃত হয়ে যায় ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর স্বার্থে। ফলে রাষ্ট্র নিজেই পরিণত হয় নাগরিকের স্বাধীনতা হরণের প্রধান হাতিয়ারে।


সমসাময়িক সমাজে মানুষ ভোটাধিকার, বাকস্বাধীনতা ও আইনি অধিকার পেলেও বাস্তব জীবনে অর্থনৈতিক নির্ভরতা, কর্পোরেট ও গণমাধ্যমের প্রভাব এবং শ্রেণিভিত্তিক ক্ষমতার বৈষম্যের কারণে অনেকেই নিজেদের স্বাধীন মনে করতে পারছেন না। বিশ্লেষকদের মতে, এসব কাঠামোগত বাস্তবতা আদিপত্যবাদকে আরও শক্তিশালী করে এবং শৃঙ্খলকে স্থায়ী রূপ দেয়।


সব মিলিয়ে রুশোর উক্তিটি কেবল একটি দার্শনিক বক্তব্য নয়; বরং এটি আদিপত্যবাদী সমাজব্যবস্থার এক তীক্ষ্ণ আলোচনা। এটি স্মরণ করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা শুধু জন্মগত বা সংবিধানস্বীকৃত অধিকার নয়—প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন আদিপত্যবাদী চিন্তা ও ক্ষমতাকাঠামোর ভাঙন। অন্যথায় মানুষ স্বাধীন হয়েও আজীবন শৃঙ্খলেই আবদ্ধ থেকে যাবে।


Public Voice

সম্পাদক: মোঃ বাদশাহ আলমগীর
প্রকাশক: অনন্যা অনসূয়া দিবা

কপিরাইট © ২০২৬ Public Voice । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত