মতামতমতামত

আসন্ন নির্বাচন যদি হয় বিশ্বাসযোগ্য, তখন-ই গণতন্ত্র হবে কার্যকর

আসন্ন নির্বাচন যদি হয় বিশ্বাসযোগ্য, তখন-ই গণতন্ত্র হবে কার্যকর
ইন্টারেনট

আমার মতে, আসন্ন নির্বাচন যদি বিশ্বাসযোগ্য না হয়, তবে গণতন্ত্র থাকবে শুধু সংবিধানের শোকেসে—ব্যবহারের জন্য নয়, প্রদর্শনের জন্য। তখন গণতন্ত্রের অস্তিত্ব থাকবে বক্তৃতায়, ব্যানারে আর ক্ষমতাবানদের মুখে মুখে; কিন্তু জনগণের হাতে থাকবে না। কারণ ভয় আর পূর্বনির্ধারিত ফলাফলের মধ্যে যে ভোট হয়, তাকে নির্বাচন বলা যেতে পারে, গণতন্ত্র বলা যায় না।

আমি মনে করি, আমাদের রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রতারণা শুরু হয় এখান থেকেই—প্রাথমিক মনোনয়নকে চূড়ান্ত রায় বানিয়ে ফেলার মাধ্যমে। মনোনয়ন পেলেই কিছু নেতা এমন ভঙ্গি করেন, যেন জনগণ ইতোমধ্যেই ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, আর তারা ক্ষমতায় গিয়ে সেই ভুল সংশোধন করবেন। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে নির্বাচন আর জনগণের মতামত নয়; এটি হয়ে ওঠে ক্ষমতা বৈধ করার একটি আনুষ্ঠানিক ধাপ।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে একটি সহজ তুলনা যথেষ্ট। বিসিএস প্রিলি পাস করেই কেউ নিজেকে ক্যাডার দাবি করলে সমাজ তাকে হাস্যকর বলেই গণ্য করে। অথচ রাজনীতিতে মনোনয়ন পাওয়ার পর যারা নিজেকে “নিশ্চিত জনপ্রতিনিধি/বড় নেতা কিংবা হেনতেন যদু-মধু-কদু” ঘোষণা করেন, তাদের নিয়ে প্রশ্ন তুললেই দেশদ্রোহসহ ভিন্ন পোষণের তকমা দেওয়া হয়। আমার কাছে এই দ্বিমুখী নৈতিকতাই আমাদের গণতান্ত্রিক চর্চার সবচেয়ে করুণ প্রতিচ্ছবি।

বাস্তব সত্য হলো—রাজনীতিতে প্রাথমিক মনোনয়ন হলো বিসিএস প্রিলি, আর চূড়ান্ত পরীক্ষক জনগণ। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, অনেক নেতা জনগণকে পরীক্ষক হিসেবে মানতেই নারাজ। তারা জনগণকে দেখে কেবল ভোটার তালিকার সংখ্যা হিসেবে, সিদ্ধান্তদাতা হিসেবে নয়। এই মানসিকতায় ভোট একটি অধিকার নয়, একটি আনুষ্ঠানিকতা।

পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতা আমাকে এই আশঙ্কাই সত্য বলে মনে করায়। আমরা দেখেছি—ভোট হয়েছে, কিন্তু ভোটাধিকার কার্যকর হয়নি। কেন্দ্র খোলা ছিল, কিন্তু রায় দেওয়ার সুযোগ ছিল সীমিত। ফলাফল এসেছে, কিন্তু প্রতিযোগিতার ছাপ ছিল না। এরপরও নির্লজ্জভাবে বলা হয়েছে—“গণতন্ত্র এগোচ্ছে।” আমার প্রশ্ন—এগিয়েছে কি গণতন্ত্র, নাকি শুধু ক্ষমতা?

এই প্রেক্ষাপটে আমি মনে করি, নেতাকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি। তাদের ভূমিকা হওয়া উচিত আনসারের মতো—নিরপেক্ষ, শৃঙ্খলার রক্ষক। কিন্তু বাস্তবে অনেকেই হয়েছেন পরীক্ষার্থী, পরীক্ষক ও ফল ঘোষক—সব একসঙ্গে। ব্যালট পাহারা দেওয়ার বদলে ব্যালট নিয়ন্ত্রণ করাকে দায়িত্ব মনে করা হয়েছে। এটাকে রাজনৈতিক সচেতনতা বলা যায় না; এটাকে আমি ক্ষমতার লালসাই বলব। সামনের দিনসমূহে তাই হতে যাচ্ছে বলে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে।

যখন নেতারা আগেই জিতে যান, আর জনগণকে পরে ভোট দিতে ডাকা হয়, তখন আমার চোখে ভোট আর নাগরিক অধিকার থাকে না—তা হয়ে যায় আনুগত্যের পরীক্ষা। গণতন্ত্র তখন একটি সাজানো মঞ্চে পরিণত হয়, যেখানে স্ক্রিপ্ট লেখা থাকে আগেই, আর অভিনয় চলে শুধু নিয়মরক্ষার জন্য।

আমি বিশ্বাস করি, জনগণ এই ভূমিকা মানতে বাধ্য নয়, মানবেও না। গণতন্ত্র কোনো সাজানো নাটক নয়, আর জনগণ কোনো ভাড়াটে দর্শক নয়। স্ক্রিপ্ট লেখা থাকলে অভিনয় করতে অস্বীকার করাই নাগরিকের প্রথম ও সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ।

এই প্রতিরোধ সহিংসতা নয়; এটি সচেতনতা। এটি অধিকারকে চিনে নেওয়া, রায়কে নিজের হাতে রাখা এবং স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া—জনগণের ভোট কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি মালিকানার ঘোষণা।

মানসিকভাবে পাগল ছাড়া অন্যান্যদের মতে, আসন্ন নির্বাচন তখন-ই বিশ্বাসযোগ্য হবে, যখন নেতা/দল সমর্থকরা মেনে নেবে—মনোনয়ন/জয়ী হওয়া ক্ষমতার দলিল নয়, জনগণই প্রকৃত বিজয়ী। যখন নেতাকর্মীরা ক্ষমতার দাবিদার নয়, দায়িত্বপ্রাপ্ত আনসার হবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, যখন জনগণ আর দর্শক থাকবে না—থাকবে মালিক।

এর বাইরে যা কিছু হবে, তা নির্বাচন হতে পারে—কিন্তু গণতন্ত্র নয়।

Public Voice

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬


আসন্ন নির্বাচন যদি হয় বিশ্বাসযোগ্য, তখন-ই গণতন্ত্র হবে কার্যকর

প্রকাশের তারিখ : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬

featured Image

আমার মতে, আসন্ন নির্বাচন যদি বিশ্বাসযোগ্য না হয়, তবে গণতন্ত্র থাকবে শুধু সংবিধানের শোকেসে—ব্যবহারের জন্য নয়, প্রদর্শনের জন্য। তখন গণতন্ত্রের অস্তিত্ব থাকবে বক্তৃতায়, ব্যানারে আর ক্ষমতাবানদের মুখে মুখে; কিন্তু জনগণের হাতে থাকবে না। কারণ ভয় আর পূর্বনির্ধারিত ফলাফলের মধ্যে যে ভোট হয়, তাকে নির্বাচন বলা যেতে পারে, গণতন্ত্র বলা যায় না।

আমি মনে করি, আমাদের রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রতারণা শুরু হয় এখান থেকেই—প্রাথমিক মনোনয়নকে চূড়ান্ত রায় বানিয়ে ফেলার মাধ্যমে। মনোনয়ন পেলেই কিছু নেতা এমন ভঙ্গি করেন, যেন জনগণ ইতোমধ্যেই ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, আর তারা ক্ষমতায় গিয়ে সেই ভুল সংশোধন করবেন। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে নির্বাচন আর জনগণের মতামত নয়; এটি হয়ে ওঠে ক্ষমতা বৈধ করার একটি আনুষ্ঠানিক ধাপ।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে একটি সহজ তুলনা যথেষ্ট। বিসিএস প্রিলি পাস করেই কেউ নিজেকে ক্যাডার দাবি করলে সমাজ তাকে হাস্যকর বলেই গণ্য করে। অথচ রাজনীতিতে মনোনয়ন পাওয়ার পর যারা নিজেকে “নিশ্চিত জনপ্রতিনিধি/বড় নেতা কিংবা হেনতেন যদু-মধু-কদু” ঘোষণা করেন, তাদের নিয়ে প্রশ্ন তুললেই দেশদ্রোহসহ ভিন্ন পোষণের তকমা দেওয়া হয়। আমার কাছে এই দ্বিমুখী নৈতিকতাই আমাদের গণতান্ত্রিক চর্চার সবচেয়ে করুণ প্রতিচ্ছবি।

বাস্তব সত্য হলো—রাজনীতিতে প্রাথমিক মনোনয়ন হলো বিসিএস প্রিলি, আর চূড়ান্ত পরীক্ষক জনগণ। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, অনেক নেতা জনগণকে পরীক্ষক হিসেবে মানতেই নারাজ। তারা জনগণকে দেখে কেবল ভোটার তালিকার সংখ্যা হিসেবে, সিদ্ধান্তদাতা হিসেবে নয়। এই মানসিকতায় ভোট একটি অধিকার নয়, একটি আনুষ্ঠানিকতা।

পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতা আমাকে এই আশঙ্কাই সত্য বলে মনে করায়। আমরা দেখেছি—ভোট হয়েছে, কিন্তু ভোটাধিকার কার্যকর হয়নি। কেন্দ্র খোলা ছিল, কিন্তু রায় দেওয়ার সুযোগ ছিল সীমিত। ফলাফল এসেছে, কিন্তু প্রতিযোগিতার ছাপ ছিল না। এরপরও নির্লজ্জভাবে বলা হয়েছে—“গণতন্ত্র এগোচ্ছে।” আমার প্রশ্ন—এগিয়েছে কি গণতন্ত্র, নাকি শুধু ক্ষমতা?

এই প্রেক্ষাপটে আমি মনে করি, নেতাকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি। তাদের ভূমিকা হওয়া উচিত আনসারের মতো—নিরপেক্ষ, শৃঙ্খলার রক্ষক। কিন্তু বাস্তবে অনেকেই হয়েছেন পরীক্ষার্থী, পরীক্ষক ও ফল ঘোষক—সব একসঙ্গে। ব্যালট পাহারা দেওয়ার বদলে ব্যালট নিয়ন্ত্রণ করাকে দায়িত্ব মনে করা হয়েছে। এটাকে রাজনৈতিক সচেতনতা বলা যায় না; এটাকে আমি ক্ষমতার লালসাই বলব। সামনের দিনসমূহে তাই হতে যাচ্ছে বলে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে।

যখন নেতারা আগেই জিতে যান, আর জনগণকে পরে ভোট দিতে ডাকা হয়, তখন আমার চোখে ভোট আর নাগরিক অধিকার থাকে না—তা হয়ে যায় আনুগত্যের পরীক্ষা। গণতন্ত্র তখন একটি সাজানো মঞ্চে পরিণত হয়, যেখানে স্ক্রিপ্ট লেখা থাকে আগেই, আর অভিনয় চলে শুধু নিয়মরক্ষার জন্য।

আমি বিশ্বাস করি, জনগণ এই ভূমিকা মানতে বাধ্য নয়, মানবেও না। গণতন্ত্র কোনো সাজানো নাটক নয়, আর জনগণ কোনো ভাড়াটে দর্শক নয়। স্ক্রিপ্ট লেখা থাকলে অভিনয় করতে অস্বীকার করাই নাগরিকের প্রথম ও সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ।

এই প্রতিরোধ সহিংসতা নয়; এটি সচেতনতা। এটি অধিকারকে চিনে নেওয়া, রায়কে নিজের হাতে রাখা এবং স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া—জনগণের ভোট কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি মালিকানার ঘোষণা।

মানসিকভাবে পাগল ছাড়া অন্যান্যদের মতে, আসন্ন নির্বাচন তখন-ই বিশ্বাসযোগ্য হবে, যখন নেতা/দল সমর্থকরা মেনে নেবে—মনোনয়ন/জয়ী হওয়া ক্ষমতার দলিল নয়, জনগণই প্রকৃত বিজয়ী। যখন নেতাকর্মীরা ক্ষমতার দাবিদার নয়, দায়িত্বপ্রাপ্ত আনসার হবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, যখন জনগণ আর দর্শক থাকবে না—থাকবে মালিক।

এর বাইরে যা কিছু হবে, তা নির্বাচন হতে পারে—কিন্তু গণতন্ত্র নয়।


Public Voice

সম্পাদক: মোঃ বাদশাহ আলমগীর
প্রকাশক: অনন্যা অনসূয়া দিবা

কপিরাইট © ২০২৬ Public Voice । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত