পাঠকের কথাপাঠকের কথা

কাউকে ভালোবাসতে না পারলে, ঘৃণা করতে নেই

লেখা:
লেখা: মিয়া সুলেমান
|
শেয়ার করুন
অ+ অ-
কাউকে ভালোবাসতে না পারলে, ঘৃণা করতে নেই
প্রতীকী ছবি

একই ব্যক্তিকে ভালোবাসা কিংবা ঘৃণা—এদুটোই আসলে সেই ব্যক্তিরই এক ধরনের জয়। কারণ, ভালোবাসা যেমন গভীর আকর্ষণ তৈরি করে, তেমনি ঘৃণাও এক ধরনের শক্তিশালী আবেগ, যা মানুষকে মানসিকভাবে আবদ্ধ করে রাখে। সাহিত্য বারবার এই সত্যকে নানা রূপে তুলে ধরেছে।

প্রথমত, ভালোবাসা ও ঘৃণা—দুটোই আসলে আসক্তি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানুষের সম্পর্কের এই জটিলতা বোঝাতে লিখেছেন, মানুষ যাকে ভালোবাসে, তার কাছেই নিজেকে সমর্পণ করে; আর যাকে ঘৃণা করে, তার বিরুদ্ধেও সে সমানভাবে আবদ্ধ থাকে। অর্থাৎ, উভয় ক্ষেত্রেই মন সেই ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। ফলে ভালোবাসা হোক বা ঘৃণা—দুটোই সেই ব্যক্তির প্রভাবকে স্বীকার করে নেয়।

দ্বিতীয়ত, শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে এই দ্বৈততা স্পষ্ট। “দেবদাস”-এ দেবদাস ও পার্বতীর সম্পর্ক ভালোবাসা দিয়ে শুরু হলেও, তা পরিণত হয় অভিমান, বেদনা, এমনকি এক ধরনের নীরব ক্ষোভে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায়—এই ভালোবাসা-ঘৃণার মিশ্র আবেগই তাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। তারা কেউই একে অপরের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেনি। এখানেই সেই ব্যক্তির জয়—সে ভালোবাসা পায়, আবার ঘৃণার মধ্যেও জায়গা করে নেয়।

তৃতীয়ত, বিশ্বসাহিত্যে শেক্সপিয়ারের “ওথেলো” একটি শক্তিশালী উদাহরণ। ওথেলোর ভালোবাসা যখন সন্দেহে পরিণত হয়, তখন তা ভয়াবহ ঘৃণায় রূপ নেয়। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যায়—ডেসডিমোনার প্রতি তার এই ঘৃণাও আসলে ভালোবাসারই বিকৃত রূপ। অর্থাৎ, ভালোবাসা ও ঘৃণা এখানে একই উৎস থেকে জন্ম নেয় এবং উভয় ক্ষেত্রেই ডেসডিমোনা ওথেলোর চিন্তা-চেতনার কেন্দ্রে থাকে। এই কেন্দ্রবিন্দু হওয়াটাই সেই ব্যক্তির জয়।

চতুর্থত, কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় প্রেম-বিদ্বেষের মিলন দেখা যায়। তাঁর অনেক কবিতায় ভালোবাসার সঙ্গে বিদ্রোহ, আকর্ষণের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান পাশাপাশি চলে। “আমি চিরবিদ্রোহী বীর”—এই বিদ্রোহের মধ্যেও প্রেমের স্পন্দন আছে। অর্থাৎ, ঘৃণা বা বিদ্রোহও কখনো কখনো গভীর ভালোবাসারই অন্য রূপ।

সবশেষে বলা যায়, ভালোবাসা ও ঘৃণা—দুটোই মানুষকে বেঁধে রাখে। কিন্তু সম্পূর্ণ নির্লিপ্ততা বা উদাসীনতা—সেটাই প্রকৃত পরাজয়। কারণ, যখন কেউ আর ভালোবাসে না, ঘৃণাও করে না—তখন সে ব্যক্তি আর কোনো গুরুত্বই বহন করে না।

তাই সাহিত্য আমাদের শেখায়— “ভালোবাসা হোক বা ঘৃণা—যে হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারে, সেই-ই শেষ পর্যন্ত জয়ী।”

তাই শেষ কথা একটাই— ভালোবাসা মানুষকে কাছে টানে, ঘৃণা দূরে ঠেলে দেয়—কিন্তু দুটোই এক অদৃশ্য বন্ধনে বেঁধে রাখে। যে মানুষকে তুমি ভালোবাসো, সে তোমার হৃদয়ের ভেতরে থাকে; আর যাকে তুমি ঘৃণা করো, সেও তোমার চিন্তার ভেতরেই বাস করে। অর্থাৎ, দুই অবস্থাতেই তুমি তাকে গুরুত্ব দিচ্ছো, তাকে স্থান দিচ্ছো—আর সেই স্থান পাওয়াটাই তার জয়।

আমাদের একটি গভীর সত্যের দিক হলো— প্রকৃত মুক্তি ভালোবাসা বা ঘৃণায় নয়, বরং উদাসীনতায়।

যখন কোনো মানুষ তোমার ভালোবাসা পায় না, ঘৃণাও পায় না—তখনই সে সত্যিকার অর্থে তোমার জীবনে পরাজিত হয়। কারণ, তখন সে আর তোমার অনুভূতির কেন্দ্র নয়, তোমার সময়ের অংশ নয়, এমনকি তোমার স্মৃতিরও ভার নয়।

তাই বলা যায়— ভালোবাসা কিংবা ঘৃণা—দুটোই যার জন্য থাকে, সে-ই জয়ী; আর যে একেবারে ভুলে যায়—সেই সত্যিকারের মুক্ত।

লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক ও মুক্তচিন্তক। 

Public Voice

শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


কাউকে ভালোবাসতে না পারলে, ঘৃণা করতে নেই

প্রকাশের তারিখ : ২৬ মার্চ ২০২৬

featured Image

একই ব্যক্তিকে ভালোবাসা কিংবা ঘৃণা—এদুটোই আসলে সেই ব্যক্তিরই এক ধরনের জয়। কারণ, ভালোবাসা যেমন গভীর আকর্ষণ তৈরি করে, তেমনি ঘৃণাও এক ধরনের শক্তিশালী আবেগ, যা মানুষকে মানসিকভাবে আবদ্ধ করে রাখে। সাহিত্য বারবার এই সত্যকে নানা রূপে তুলে ধরেছে।

প্রথমত, ভালোবাসা ও ঘৃণা—দুটোই আসলে আসক্তি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানুষের সম্পর্কের এই জটিলতা বোঝাতে লিখেছেন, মানুষ যাকে ভালোবাসে, তার কাছেই নিজেকে সমর্পণ করে; আর যাকে ঘৃণা করে, তার বিরুদ্ধেও সে সমানভাবে আবদ্ধ থাকে। অর্থাৎ, উভয় ক্ষেত্রেই মন সেই ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। ফলে ভালোবাসা হোক বা ঘৃণা—দুটোই সেই ব্যক্তির প্রভাবকে স্বীকার করে নেয়।

দ্বিতীয়ত, শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে এই দ্বৈততা স্পষ্ট। “দেবদাস”-এ দেবদাস ও পার্বতীর সম্পর্ক ভালোবাসা দিয়ে শুরু হলেও, তা পরিণত হয় অভিমান, বেদনা, এমনকি এক ধরনের নীরব ক্ষোভে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায়—এই ভালোবাসা-ঘৃণার মিশ্র আবেগই তাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। তারা কেউই একে অপরের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেনি। এখানেই সেই ব্যক্তির জয়—সে ভালোবাসা পায়, আবার ঘৃণার মধ্যেও জায়গা করে নেয়।

তৃতীয়ত, বিশ্বসাহিত্যে শেক্সপিয়ারের “ওথেলো” একটি শক্তিশালী উদাহরণ। ওথেলোর ভালোবাসা যখন সন্দেহে পরিণত হয়, তখন তা ভয়াবহ ঘৃণায় রূপ নেয়। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যায়—ডেসডিমোনার প্রতি তার এই ঘৃণাও আসলে ভালোবাসারই বিকৃত রূপ। অর্থাৎ, ভালোবাসা ও ঘৃণা এখানে একই উৎস থেকে জন্ম নেয় এবং উভয় ক্ষেত্রেই ডেসডিমোনা ওথেলোর চিন্তা-চেতনার কেন্দ্রে থাকে। এই কেন্দ্রবিন্দু হওয়াটাই সেই ব্যক্তির জয়।

চতুর্থত, কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় প্রেম-বিদ্বেষের মিলন দেখা যায়। তাঁর অনেক কবিতায় ভালোবাসার সঙ্গে বিদ্রোহ, আকর্ষণের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান পাশাপাশি চলে। “আমি চিরবিদ্রোহী বীর”—এই বিদ্রোহের মধ্যেও প্রেমের স্পন্দন আছে। অর্থাৎ, ঘৃণা বা বিদ্রোহও কখনো কখনো গভীর ভালোবাসারই অন্য রূপ।

সবশেষে বলা যায়, ভালোবাসা ও ঘৃণা—দুটোই মানুষকে বেঁধে রাখে। কিন্তু সম্পূর্ণ নির্লিপ্ততা বা উদাসীনতা—সেটাই প্রকৃত পরাজয়। কারণ, যখন কেউ আর ভালোবাসে না, ঘৃণাও করে না—তখন সে ব্যক্তি আর কোনো গুরুত্বই বহন করে না।

তাই সাহিত্য আমাদের শেখায়— “ভালোবাসা হোক বা ঘৃণা—যে হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারে, সেই-ই শেষ পর্যন্ত জয়ী।”

তাই শেষ কথা একটাই— ভালোবাসা মানুষকে কাছে টানে, ঘৃণা দূরে ঠেলে দেয়—কিন্তু দুটোই এক অদৃশ্য বন্ধনে বেঁধে রাখে। যে মানুষকে তুমি ভালোবাসো, সে তোমার হৃদয়ের ভেতরে থাকে; আর যাকে তুমি ঘৃণা করো, সেও তোমার চিন্তার ভেতরেই বাস করে। অর্থাৎ, দুই অবস্থাতেই তুমি তাকে গুরুত্ব দিচ্ছো, তাকে স্থান দিচ্ছো—আর সেই স্থান পাওয়াটাই তার জয়।

আমাদের একটি গভীর সত্যের দিক হলো— প্রকৃত মুক্তি ভালোবাসা বা ঘৃণায় নয়, বরং উদাসীনতায়।

যখন কোনো মানুষ তোমার ভালোবাসা পায় না, ঘৃণাও পায় না—তখনই সে সত্যিকার অর্থে তোমার জীবনে পরাজিত হয়। কারণ, তখন সে আর তোমার অনুভূতির কেন্দ্র নয়, তোমার সময়ের অংশ নয়, এমনকি তোমার স্মৃতিরও ভার নয়।

তাই বলা যায়— ভালোবাসা কিংবা ঘৃণা—দুটোই যার জন্য থাকে, সে-ই জয়ী; আর যে একেবারে ভুলে যায়—সেই সত্যিকারের মুক্ত।

লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক ও মুক্তচিন্তক। 


Public Voice

সম্পাদক: মোঃ বাদশাহ আলমগীর
প্রকাশক: অনন্যা অনসূয়া দিবা

কপিরাইট © ২০২৬ Public Voice । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত