আন্তর্জাতিক
২০০৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন মঞ্চে বক্তব্য রাখার সময় সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন আবদুল রহমান মোহাম্মদ আল-সাইয়েদ। প্রায় ১৯ বছর পর সেই তরুণই মিশিগান অঙ্গরাজ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছেন। একজন চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং রাজনীতিক হিসেবে তার দীর্ঘ এই পথচলা যুক্তরাষ্ট্রের বহুসাংস্কৃতিক সমাজ ও বিশেষ করে মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’—অর্থাৎ সকালের সূর্যই দিনের পূর্বাভাস দেয়।
ইংরেজি এই প্রবাদটি আবদুল রহমানের জীবনের একটি ঘটনার সাথে দারুণভাবে মিলে যায়। সেই সমাবর্তনে তার বলিষ্ঠ বক্তব্য শুনে বিল ক্লিনটন যে রাজনৈতিক সম্ভাবনা দেখেছিলেন, দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর তার এক ঐতিহাসিক প্রতিফলন ঘটল। ২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ও সাবেক কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্সকে পরাজিত করেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আল-সাইয়েদ। ৪ নভেম্বর অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস তার এই ঐতিহাসিক বিজয় নিশ্চিত করে। এর মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম হিসেবে মার্কিন সিনেটে জয়লাভের নজির স্থাপন করলেন।
১৯৮৪ সালে মিশিগানে জন্মগ্রহণ করা আল-সাইয়েদ মিসরীয় অভিবাসী দম্পতির সন্তান। শৈশবে মিশিগানের ব্লুমফিল্ড হিলসে বেড়ে ওঠা এই তরুণ ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান থেকে জীববিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেন। ২০০৭ সালের বসন্তকালীন সমাবর্তনে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি ক্লিনটনের প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। তৎকালীন ৪২তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন তার বক্তব্যে মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, আল-সাইয়েদের কথা যদি বিশ্বের প্রতিটি মানুষ শুনত, তবে পৃথিবীটা ভিন্ন হতো। আল-সাইয়েদের বক্তব্য এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছিল যে ক্লিনটন তাকে বলেছিলেন, তার বক্তব্য যেন পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষ শুনতে পেতেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রিজেন্টস বোর্ডের ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নথিতেও এই প্রশংসার কথা উল্লেখ রয়েছে। শুধু মৌখিক প্রশংসাই নয়, অনুষ্ঠানের পর ক্লিনটন তাকে সরাসরি রাজনীতিতে আসার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে সেই সময় আল-সাইয়েদ বিষয়টিকে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে দেওয়া একাধিক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তার মুসলিম পরিচয় এবং দীর্ঘ আরবি নামের কারণে তিনি মনে করতেন যুক্তরাষ্ট্রে মূলধারার রাজনীতিতে তার মতো কারো জায়গা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। ক্লিনটনের সেই পরামর্শ যে একদিন বাস্তবে পরিণত হবে, তা তিনি তখন কল্পনাও করেননি।
বিল ক্লিনটনের সেই ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তবে রূপ পেতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে আল-সাইয়েদকে। তাকে শিক্ষাজীবন, গবেষণা, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং একাধিক রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠার মোহে বন্দি না থেকে তিনি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। পরাজিত হওয়ার পরও তিনি দমে না গিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থেকেছেন, যা শেষ পর্যন্ত তাকে এই বড় সাফল্যে পৌঁছে দিয়েছে। তার জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য শিক্ষা হলো, ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কল্যাণকে লক্ষ্য করে কাজ করলে তার প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য কাজ করেছেন। পরাজিত হয়েও রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে দাঁড়াননি।
সিনেট নির্বাচনের এই জয় কেবল একটি রাজনৈতিক অর্জন নয়, বরং তার দীর্ঘ অধ্যবসায়ের ফসল। এখন তার সামনে রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার, জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, অভিবাসী ও সংখ্যালঘু অধিকার সুরক্ষা, স্বচ্ছ রাজনৈতিক অর্থায়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যনীতি নিয়ে তাকে এখন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। জনগণ তাকে বড় দায়িত্ব অর্পণ করেছে এবং এই প্রত্যাশা পূরণের ওপরই তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সার্থকতা নির্ভর করছে। এটি কেবল একজন রাজনীতিকের নির্বাচনী সাফল্য নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসেও একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। সিনেট নির্বাচনে জয়লাভ করা যেমন ঐতিহাসিক, তেমনি জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা আরো কঠিন।
আল-সাইয়েদের জীবনকাহিনি শিক্ষা দেয় যে, প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের লক্ষ্য স্থির রাখলে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখানো সম্ভব। ২০০৭ সালে ক্লিনটন তার মাঝে যে নেতৃত্বের সম্ভাবনা দেখেছিলেন, ২০২৬ সালে তা নতুন এক অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, আইন প্রণেতা হিসেবে তিনি কতটা সফলভাবে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারেন।

শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ নভেম্বর ২০২৬
২০০৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন মঞ্চে বক্তব্য রাখার সময় সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন আবদুল রহমান মোহাম্মদ আল-সাইয়েদ। প্রায় ১৯ বছর পর সেই তরুণই মিশিগান অঙ্গরাজ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছেন। একজন চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং রাজনীতিক হিসেবে তার দীর্ঘ এই পথচলা যুক্তরাষ্ট্রের বহুসাংস্কৃতিক সমাজ ও বিশেষ করে মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’—অর্থাৎ সকালের সূর্যই দিনের পূর্বাভাস দেয়।
ইংরেজি এই প্রবাদটি আবদুল রহমানের জীবনের একটি ঘটনার সাথে দারুণভাবে মিলে যায়। সেই সমাবর্তনে তার বলিষ্ঠ বক্তব্য শুনে বিল ক্লিনটন যে রাজনৈতিক সম্ভাবনা দেখেছিলেন, দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর তার এক ঐতিহাসিক প্রতিফলন ঘটল। ২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ও সাবেক কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্সকে পরাজিত করেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আল-সাইয়েদ। ৪ নভেম্বর অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস তার এই ঐতিহাসিক বিজয় নিশ্চিত করে। এর মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম হিসেবে মার্কিন সিনেটে জয়লাভের নজির স্থাপন করলেন।
১৯৮৪ সালে মিশিগানে জন্মগ্রহণ করা আল-সাইয়েদ মিসরীয় অভিবাসী দম্পতির সন্তান। শৈশবে মিশিগানের ব্লুমফিল্ড হিলসে বেড়ে ওঠা এই তরুণ ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান থেকে জীববিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেন। ২০০৭ সালের বসন্তকালীন সমাবর্তনে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি ক্লিনটনের প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। তৎকালীন ৪২তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন তার বক্তব্যে মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, আল-সাইয়েদের কথা যদি বিশ্বের প্রতিটি মানুষ শুনত, তবে পৃথিবীটা ভিন্ন হতো। আল-সাইয়েদের বক্তব্য এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছিল যে ক্লিনটন তাকে বলেছিলেন, তার বক্তব্য যেন পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষ শুনতে পেতেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রিজেন্টস বোর্ডের ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নথিতেও এই প্রশংসার কথা উল্লেখ রয়েছে। শুধু মৌখিক প্রশংসাই নয়, অনুষ্ঠানের পর ক্লিনটন তাকে সরাসরি রাজনীতিতে আসার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে সেই সময় আল-সাইয়েদ বিষয়টিকে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে দেওয়া একাধিক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তার মুসলিম পরিচয় এবং দীর্ঘ আরবি নামের কারণে তিনি মনে করতেন যুক্তরাষ্ট্রে মূলধারার রাজনীতিতে তার মতো কারো জায়গা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। ক্লিনটনের সেই পরামর্শ যে একদিন বাস্তবে পরিণত হবে, তা তিনি তখন কল্পনাও করেননি।
বিল ক্লিনটনের সেই ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তবে রূপ পেতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে আল-সাইয়েদকে। তাকে শিক্ষাজীবন, গবেষণা, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং একাধিক রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠার মোহে বন্দি না থেকে তিনি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। পরাজিত হওয়ার পরও তিনি দমে না গিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থেকেছেন, যা শেষ পর্যন্ত তাকে এই বড় সাফল্যে পৌঁছে দিয়েছে। তার জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য শিক্ষা হলো, ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কল্যাণকে লক্ষ্য করে কাজ করলে তার প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য কাজ করেছেন। পরাজিত হয়েও রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে দাঁড়াননি।
সিনেট নির্বাচনের এই জয় কেবল একটি রাজনৈতিক অর্জন নয়, বরং তার দীর্ঘ অধ্যবসায়ের ফসল। এখন তার সামনে রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার, জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, অভিবাসী ও সংখ্যালঘু অধিকার সুরক্ষা, স্বচ্ছ রাজনৈতিক অর্থায়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যনীতি নিয়ে তাকে এখন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। জনগণ তাকে বড় দায়িত্ব অর্পণ করেছে এবং এই প্রত্যাশা পূরণের ওপরই তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সার্থকতা নির্ভর করছে। এটি কেবল একজন রাজনীতিকের নির্বাচনী সাফল্য নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসেও একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। সিনেট নির্বাচনে জয়লাভ করা যেমন ঐতিহাসিক, তেমনি জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা আরো কঠিন।
আল-সাইয়েদের জীবনকাহিনি শিক্ষা দেয় যে, প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের লক্ষ্য স্থির রাখলে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখানো সম্ভব। ২০০৭ সালে ক্লিনটন তার মাঝে যে নেতৃত্বের সম্ভাবনা দেখেছিলেন, ২০২৬ সালে তা নতুন এক অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, আইন প্রণেতা হিসেবে তিনি কতটা সফলভাবে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারেন।
