স্বাস্থ্য
বগুড়ার ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দিন দিন বাড়ছে স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের (নরমাল ডেলিভারি) সংখ্যা। প্রতিদিনই এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রসূতিরা নিরাপদে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সন্তান প্রসব করছেন, যা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী সম্ভব হচ্ছে চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফদের আন্তরিকতা ও দক্ষতার কারণে।
দেশজুড়ে যখন সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান জন্মদানের জন্য গড়ে উঠছে অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল, এবং দালালচক্রের মাধ্যমে ভালো চিকিৎসার নাম করে কিংবা বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে গর্ভবতী মা ও তার স্বজনদের সিজার করাতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠছে—যার ফলে অনেক নারী চিরতরে শারীরিক জটিলতার শিকার হচ্ছেন এবং অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে—ঠিক তখনই ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। অহেতুক সিজার বাণিজ্য, দালালচক্র ও অদক্ষ ধাত্রীর হাত থেকে প্রসূতিদের রক্ষা করে নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসব নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানটি।
যেভাবে শুরু হয়েছিল এই উদ্যোগ।
২০২২ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. দিবাকর বসাকের নেতৃত্বে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একটি চিকিৎসক দল টিমওয়ার্কের মাধ্যমে স্বাভাবিক প্রসব কার্যক্রম শুরু করে। প্রসূতিদের স্বাভাবিক প্রসবে উদ্বুদ্ধ করতে বিভিন্ন কৌশল ও প্রচারণা চালানো হয়, যার সুফল মেলে হাতেনাতে। ধারাবাহিক এই প্রচেষ্টার সফলতায় ধুনট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বগুড়া জেলায় একটি মডেল হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালে এখানে ৪১০টি, ২০২৩ সালে ৪৮১টি এবং ২০২৪ সালে ৫২১টি স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন হয়। সিজারিয়ান ডেলিভারি কার্যক্রম শুরুর প্রথম বছরে (২০২৪) মাত্র ৩৯টি সিজার সম্পন্ন হয়েছিল, যেখানে নরমাল ডেলিভারি হয়েছিল ৫২১টি। ২০২৫ সালেও রেকর্ড ৫২১টি স্বাভাবিক প্রসবের বিপরীতে সিজার হয়েছে মাত্র ১১৪টি।
চলতি বছরের (২০২৬) জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৩২৮ জন শিশুর ডেলিভারি সম্পন্ন হয়েছে, তবে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে ৬০ টি শিশুর সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে জন্ম দিতে হয়েছে বাকি ২৬৮ জন শিশু নরমাল ডেলিভারি হয়।
সবমিলিয়ে ২০২২ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ২ হাজার ৪১৪টি ডেলিভারি সম্পন্ন হয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ২১৩টি সিজারিয়ান এবং বাকি ২ হাজার ২০১টি স্বাভাবিক প্রসব।
এই সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ হাসপাতালটি ১০১ শয্যায় উন্নীত হওয়ার সুসংবাদ পেয়েছে, যা বগুড়া জেলায় এ যাবৎকালের সেরা অর্জনগুলোর একটি এবং ধুনট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইতিহাসে প্রথম।
ডেলিভারির সংখ্যার দিক থেকে পুরো বগুড়া জেলায় এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রায় সময়ই থাকে প্রথম সারিতে। কর্তৃপক্ষের দাবি, এখানে ডেলিভারি-পরবর্তী মা ও শিশুর সুস্থতার হার শতভাগ।
সেবার আওতা ও সুযোগ-সুবিধা।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, সপ্তাহের সাত দিন, ২৪ ঘণ্টা অভিজ্ঞ মিডওয়াইফ ও নার্সের মাধ্যমে স্বাভাবিক প্রসবের ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। এছাড়া প্রতি সপ্তাহে রবি ও বুধবার ডাঃ মোকছেদা খাতুনের নেতৃত্বে নারী চিকিৎসক দল দ্বারা বিনামূল্যে সিজারিয়ান অপারেশনের ব্যবস্থাও রয়েছে। সিজার হোক বা নরমাল ডেলিভারি—উভয় ক্ষেত্রেই গর্ভবতী মায়েদের কোনো অর্থ ব্যয় করতে হয় না; প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি ও সেবা হাসপাতালের পক্ষ থেকেই প্রদান করা হয়।
গর্ভধারণের শুরু থেকে প্রসব পর্যন্ত ধাপে ধাপে পরামর্শ, ওষুধ ও সার্বিক চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হয় এখানে। মাত্র ১২০ টাকায় গর্ভবতী মায়েরা আল্ট্রাসনোগ্রাম করাতে পারেন, যার ফলে প্রতিদিন গড়ে ৮০টিরও বেশি আল্ট্রাসনোগ্রাম সম্পন্ন হয় এই কমপ্লেক্সে। কোনো মা বা শিশুর জরুরি উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে হাসপাতালের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে অ্যাম্বুলেন্স সেবাও প্রদান করা হয়। দিন দিন এসব সেবা গরিব ও সাধারণ মানুষের কাছে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) দুপুরে হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেওয়া মায়েরা তাদের নবজাতক নিয়ে একে একে বাড়ি ফিরছেন। এ সময় তারা চিকিৎসক ও নার্সদের আন্তরিকতা, দক্ষতা এবং নিরাপদ মাতৃত্বসেবা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন এবং সার্বিক সেবার মান নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
সেবা নিতে আসা প্রসূতি মায়েদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুরুতে স্বাভাবিক প্রসব নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকলেও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাঠকর্মী ও চিকিৎসকদের পরামর্শ ও আশ্বাসে তারা হাসপাতালে এসে নিরাপদে প্রসব সম্পন্ন করেছেন। এতে একদিকে যেমন তাদের অর্থ সাশ্রয় হয়েছে, অন্যদিকে মা ও নবজাতক উভয়েই সুস্থ রয়েছেন বলে জানান তারা।
নাটাবাড়ি গ্রামের শিউলি বেগম, বিশ্বহরিগাছ গ্রামের শেফালী খাতুন ও পাঁচথুপী গ্রামের রাজিয়া খাতুনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুরুতে স্বাভাবিক প্রসব নিয়ে তাদের মনে ভয় থাকলেও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাঠকর্মী ও চিকিৎসকদের আশ্বাসে সাহস পেয়ে হাসপাতালে এসে নিরাপদে সন্তান প্রসব করেছেন তারা। এতে একদিকে যেমন তাদের চিকিৎসা খরচ বেঁচেছে, অন্যদিকে মা ও নবজাতক উভয়েই সুস্থ রয়েছেন।
নাটাবাড়ি গ্রামের মোঃ হেলাল জানান, তার স্ত্রী গর্ভধারণের পর থেকেই নিয়মিত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে পরামর্শ নিয়েছেন এবং এখানেই সন্তান প্রসবের জন্য ভর্তি হয়েছিলেন। তার সন্তান ও স্ত্রী দুজনেই সুস্থ আছেন জানিয়ে তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই সেবা পাওয়ার জন্য।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কনসালট্যান্ট ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোকছেদা খাতুন বলেন, নরমাল ডেলিভারিকে হ্যাঁ, সিজারকে না বলুন—এই স্লোগান নিয়ে ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সচেতনতা সৃষ্টি করে আসছে। ২০২২ সালে এখানে যোগদানের পর অভিজ্ঞ টিমের সঙ্গে নরমাল ডেলিভারিকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ শুরু করি। শুরুতে বিভিন্ন কৌশলে প্রসূতি মায়েদের বিনামূল্যে 'প্রসূতি দাওয়াত কার্ড' প্রদান করা হয়েছিল।
তিনি জানান, প্রসবের আগ পর্যন্ত চলে নিয়মিত কাউন্সেলিং ও চেকআপ। স্থানীয় শিক্ষক, চেয়ারম্যান, মেম্বার, স্বাস্থ্যকর্মী এবং বিভিন্ন এনজিওর স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমেও এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে এই প্রচেষ্টা মানুষকে আকৃষ্ট করেছে এবং বর্তমানে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গর্ভবতী মায়েদের আস্থার জায়গা হয়ে উঠেছে।
মাতৃমৃত্যুর হার কমাতে এবং স্বাভাবিক প্রসব নিরাপদ করতে দক্ষ মিডওয়াইফদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে ডা. মোকছেদা বেগম বলেন, প্রতিটি গর্ভবতী মায়ের তথ্য ডাটাবেজের মাধ্যমে সংরক্ষণ করে নিয়মিত মোবাইল ফোনে ও সরাসরি খোঁজখবর রাখা হয়, প্রসব পূর্ববর্তী ও পরবর্তী পরামর্শ দেওয়া হয়—যার ফলে ক্রমাগত বাড়ছে স্বাভাবিক প্রসবের সংখ্যা।
তবে জনবল সংকটের কথাও তুলে ধরেন তিনি। জানান, সাতজন মিডওয়াইফের স্থলে বর্তমানে মাত্র চারজনকে নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে, এবং শিগগিরই তাদের মধ্য থেকে একজন অবসরে যাবেন। এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও গর্ভবতী মায়েদের স্বাভাবিক প্রসবের প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন তিনি।
অপারেশন থিয়েটার (ওটি) ইনচার্জ রুমা খাতুন মলি বলেন, ওটিবয় ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংকট থাকলেও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। তিনি জানান, চিকিৎসা নিতে আসা প্রসূতিদের যথাসম্ভব পরামর্শ দিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয় স্বাভাবিক প্রসব নিশ্চিত করতে, এবং বর্তমানে এখানে সিজারের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন হচ্ছে। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই এই সুবিধা চালু রয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, "বেসরকারি হাসপাতালে প্রসূতি মায়েদের স্বাভাবিক প্রসবের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম থাকে। আবার বাড়িতে অদক্ষ ধাত্রীর মাধ্যমে স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টাও মা ও শিশুর জন্য যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। তাই বেসরকারি হাসপাতাল বা বাড়িতে না গিয়ে সরকারি হাসপাতালে এসে নিরাপদ ও মানসম্মত প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারি নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছি, যাতে মা ও নবজাতকের ঝুঁকি হ্রাস পায় এবং স্বাস্থ্যসেবার মান আরও উন্নত হয়।"
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাজ্জাদ কাদির শামিম জানান, প্রসূতি মায়েদের সুবিধার্থে হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে 'প্রসূতি কার্ড' প্রদান করা হয়ে থাকে এবং বর্তমানে একটি হটলাইন চালু রয়েছে, যার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পরামর্শ, চিকিৎসা ও আল্ট্রাসনোগ্রামের সুযোগ পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, "্স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেলিভারির সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে, আর আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করি নরমাল ডেলিভারি নিশ্চিত করতে। কারণ নিরাপদে এই ডেলিভারি সম্পন্ন হলে মা ও শিশুর মৃত্যুঝুঁকি থাকে না এবং সাধারণ মানুষ অনেক আর্থিক ব্যয় থেকেও রক্ষা পায়। তিনি জানান, নিরাপদ ডেলিভারির জন্য অভিজ্ঞ চিকিৎসক, অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ এবং চারজন দক্ষ মিডওয়াইফ ও নার্স কর্মরত রয়েছেন এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
সেবাগ্রহীতারা কোনো বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেবাপ্রার্থীদের বিড়ম্বনার শিকার হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। প্রতিটি পয়েন্টে আমরা দায়িত্বশীল লোক নিয়োজিত রেখেছি। কারো কোনো অভিযোগ থাকলে সরাসরি আমাকে জানালে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সবার সহযোগিতায় ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স একটি মাতৃবান্ধব হাসপাতাল হিসেবে গড়ে উঠবে।
ধুনট উপজেলার সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে দরিদ্র, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত প্রসূতিরা সরকারি ব্যবস্থাপনায় স্বল্প খরচে এই গুরুত্বপূর্ণ সেবা পাচ্ছেন। এতে তাদের আর্থিক সাশ্রয় হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ির বিড়ম্বনাও কমেছে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এই কার্যক্রমকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন সেবাগ্রহীতারা।

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুলাই ২০২৬
বগুড়ার ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দিন দিন বাড়ছে স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের (নরমাল ডেলিভারি) সংখ্যা। প্রতিদিনই এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রসূতিরা নিরাপদে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সন্তান প্রসব করছেন, যা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী সম্ভব হচ্ছে চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফদের আন্তরিকতা ও দক্ষতার কারণে।
দেশজুড়ে যখন সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান জন্মদানের জন্য গড়ে উঠছে অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল, এবং দালালচক্রের মাধ্যমে ভালো চিকিৎসার নাম করে কিংবা বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে গর্ভবতী মা ও তার স্বজনদের সিজার করাতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠছে—যার ফলে অনেক নারী চিরতরে শারীরিক জটিলতার শিকার হচ্ছেন এবং অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে—ঠিক তখনই ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। অহেতুক সিজার বাণিজ্য, দালালচক্র ও অদক্ষ ধাত্রীর হাত থেকে প্রসূতিদের রক্ষা করে নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসব নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানটি।
যেভাবে শুরু হয়েছিল এই উদ্যোগ।
২০২২ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. দিবাকর বসাকের নেতৃত্বে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একটি চিকিৎসক দল টিমওয়ার্কের মাধ্যমে স্বাভাবিক প্রসব কার্যক্রম শুরু করে। প্রসূতিদের স্বাভাবিক প্রসবে উদ্বুদ্ধ করতে বিভিন্ন কৌশল ও প্রচারণা চালানো হয়, যার সুফল মেলে হাতেনাতে। ধারাবাহিক এই প্রচেষ্টার সফলতায় ধুনট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বগুড়া জেলায় একটি মডেল হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালে এখানে ৪১০টি, ২০২৩ সালে ৪৮১টি এবং ২০২৪ সালে ৫২১টি স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন হয়। সিজারিয়ান ডেলিভারি কার্যক্রম শুরুর প্রথম বছরে (২০২৪) মাত্র ৩৯টি সিজার সম্পন্ন হয়েছিল, যেখানে নরমাল ডেলিভারি হয়েছিল ৫২১টি। ২০২৫ সালেও রেকর্ড ৫২১টি স্বাভাবিক প্রসবের বিপরীতে সিজার হয়েছে মাত্র ১১৪টি।
চলতি বছরের (২০২৬) জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৩২৮ জন শিশুর ডেলিভারি সম্পন্ন হয়েছে, তবে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে ৬০ টি শিশুর সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে জন্ম দিতে হয়েছে বাকি ২৬৮ জন শিশু নরমাল ডেলিভারি হয়।
সবমিলিয়ে ২০২২ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ২ হাজার ৪১৪টি ডেলিভারি সম্পন্ন হয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ২১৩টি সিজারিয়ান এবং বাকি ২ হাজার ২০১টি স্বাভাবিক প্রসব।
এই সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ হাসপাতালটি ১০১ শয্যায় উন্নীত হওয়ার সুসংবাদ পেয়েছে, যা বগুড়া জেলায় এ যাবৎকালের সেরা অর্জনগুলোর একটি এবং ধুনট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইতিহাসে প্রথম।
ডেলিভারির সংখ্যার দিক থেকে পুরো বগুড়া জেলায় এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রায় সময়ই থাকে প্রথম সারিতে। কর্তৃপক্ষের দাবি, এখানে ডেলিভারি-পরবর্তী মা ও শিশুর সুস্থতার হার শতভাগ।
সেবার আওতা ও সুযোগ-সুবিধা।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, সপ্তাহের সাত দিন, ২৪ ঘণ্টা অভিজ্ঞ মিডওয়াইফ ও নার্সের মাধ্যমে স্বাভাবিক প্রসবের ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। এছাড়া প্রতি সপ্তাহে রবি ও বুধবার ডাঃ মোকছেদা খাতুনের নেতৃত্বে নারী চিকিৎসক দল দ্বারা বিনামূল্যে সিজারিয়ান অপারেশনের ব্যবস্থাও রয়েছে। সিজার হোক বা নরমাল ডেলিভারি—উভয় ক্ষেত্রেই গর্ভবতী মায়েদের কোনো অর্থ ব্যয় করতে হয় না; প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি ও সেবা হাসপাতালের পক্ষ থেকেই প্রদান করা হয়।
গর্ভধারণের শুরু থেকে প্রসব পর্যন্ত ধাপে ধাপে পরামর্শ, ওষুধ ও সার্বিক চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হয় এখানে। মাত্র ১২০ টাকায় গর্ভবতী মায়েরা আল্ট্রাসনোগ্রাম করাতে পারেন, যার ফলে প্রতিদিন গড়ে ৮০টিরও বেশি আল্ট্রাসনোগ্রাম সম্পন্ন হয় এই কমপ্লেক্সে। কোনো মা বা শিশুর জরুরি উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে হাসপাতালের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে অ্যাম্বুলেন্স সেবাও প্রদান করা হয়। দিন দিন এসব সেবা গরিব ও সাধারণ মানুষের কাছে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) দুপুরে হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেওয়া মায়েরা তাদের নবজাতক নিয়ে একে একে বাড়ি ফিরছেন। এ সময় তারা চিকিৎসক ও নার্সদের আন্তরিকতা, দক্ষতা এবং নিরাপদ মাতৃত্বসেবা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন এবং সার্বিক সেবার মান নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
সেবা নিতে আসা প্রসূতি মায়েদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুরুতে স্বাভাবিক প্রসব নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকলেও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাঠকর্মী ও চিকিৎসকদের পরামর্শ ও আশ্বাসে তারা হাসপাতালে এসে নিরাপদে প্রসব সম্পন্ন করেছেন। এতে একদিকে যেমন তাদের অর্থ সাশ্রয় হয়েছে, অন্যদিকে মা ও নবজাতক উভয়েই সুস্থ রয়েছেন বলে জানান তারা।
নাটাবাড়ি গ্রামের শিউলি বেগম, বিশ্বহরিগাছ গ্রামের শেফালী খাতুন ও পাঁচথুপী গ্রামের রাজিয়া খাতুনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুরুতে স্বাভাবিক প্রসব নিয়ে তাদের মনে ভয় থাকলেও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাঠকর্মী ও চিকিৎসকদের আশ্বাসে সাহস পেয়ে হাসপাতালে এসে নিরাপদে সন্তান প্রসব করেছেন তারা। এতে একদিকে যেমন তাদের চিকিৎসা খরচ বেঁচেছে, অন্যদিকে মা ও নবজাতক উভয়েই সুস্থ রয়েছেন।
নাটাবাড়ি গ্রামের মোঃ হেলাল জানান, তার স্ত্রী গর্ভধারণের পর থেকেই নিয়মিত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে পরামর্শ নিয়েছেন এবং এখানেই সন্তান প্রসবের জন্য ভর্তি হয়েছিলেন। তার সন্তান ও স্ত্রী দুজনেই সুস্থ আছেন জানিয়ে তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই সেবা পাওয়ার জন্য।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কনসালট্যান্ট ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোকছেদা খাতুন বলেন, নরমাল ডেলিভারিকে হ্যাঁ, সিজারকে না বলুন—এই স্লোগান নিয়ে ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সচেতনতা সৃষ্টি করে আসছে। ২০২২ সালে এখানে যোগদানের পর অভিজ্ঞ টিমের সঙ্গে নরমাল ডেলিভারিকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ শুরু করি। শুরুতে বিভিন্ন কৌশলে প্রসূতি মায়েদের বিনামূল্যে 'প্রসূতি দাওয়াত কার্ড' প্রদান করা হয়েছিল।
তিনি জানান, প্রসবের আগ পর্যন্ত চলে নিয়মিত কাউন্সেলিং ও চেকআপ। স্থানীয় শিক্ষক, চেয়ারম্যান, মেম্বার, স্বাস্থ্যকর্মী এবং বিভিন্ন এনজিওর স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমেও এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে এই প্রচেষ্টা মানুষকে আকৃষ্ট করেছে এবং বর্তমানে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গর্ভবতী মায়েদের আস্থার জায়গা হয়ে উঠেছে।
মাতৃমৃত্যুর হার কমাতে এবং স্বাভাবিক প্রসব নিরাপদ করতে দক্ষ মিডওয়াইফদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে ডা. মোকছেদা বেগম বলেন, প্রতিটি গর্ভবতী মায়ের তথ্য ডাটাবেজের মাধ্যমে সংরক্ষণ করে নিয়মিত মোবাইল ফোনে ও সরাসরি খোঁজখবর রাখা হয়, প্রসব পূর্ববর্তী ও পরবর্তী পরামর্শ দেওয়া হয়—যার ফলে ক্রমাগত বাড়ছে স্বাভাবিক প্রসবের সংখ্যা।
তবে জনবল সংকটের কথাও তুলে ধরেন তিনি। জানান, সাতজন মিডওয়াইফের স্থলে বর্তমানে মাত্র চারজনকে নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে, এবং শিগগিরই তাদের মধ্য থেকে একজন অবসরে যাবেন। এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও গর্ভবতী মায়েদের স্বাভাবিক প্রসবের প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন তিনি।
অপারেশন থিয়েটার (ওটি) ইনচার্জ রুমা খাতুন মলি বলেন, ওটিবয় ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংকট থাকলেও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। তিনি জানান, চিকিৎসা নিতে আসা প্রসূতিদের যথাসম্ভব পরামর্শ দিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয় স্বাভাবিক প্রসব নিশ্চিত করতে, এবং বর্তমানে এখানে সিজারের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন হচ্ছে। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই এই সুবিধা চালু রয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, "বেসরকারি হাসপাতালে প্রসূতি মায়েদের স্বাভাবিক প্রসবের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম থাকে। আবার বাড়িতে অদক্ষ ধাত্রীর মাধ্যমে স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টাও মা ও শিশুর জন্য যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। তাই বেসরকারি হাসপাতাল বা বাড়িতে না গিয়ে সরকারি হাসপাতালে এসে নিরাপদ ও মানসম্মত প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারি নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছি, যাতে মা ও নবজাতকের ঝুঁকি হ্রাস পায় এবং স্বাস্থ্যসেবার মান আরও উন্নত হয়।"
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাজ্জাদ কাদির শামিম জানান, প্রসূতি মায়েদের সুবিধার্থে হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে 'প্রসূতি কার্ড' প্রদান করা হয়ে থাকে এবং বর্তমানে একটি হটলাইন চালু রয়েছে, যার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পরামর্শ, চিকিৎসা ও আল্ট্রাসনোগ্রামের সুযোগ পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, "্স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেলিভারির সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে, আর আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করি নরমাল ডেলিভারি নিশ্চিত করতে। কারণ নিরাপদে এই ডেলিভারি সম্পন্ন হলে মা ও শিশুর মৃত্যুঝুঁকি থাকে না এবং সাধারণ মানুষ অনেক আর্থিক ব্যয় থেকেও রক্ষা পায়। তিনি জানান, নিরাপদ ডেলিভারির জন্য অভিজ্ঞ চিকিৎসক, অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ এবং চারজন দক্ষ মিডওয়াইফ ও নার্স কর্মরত রয়েছেন এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
সেবাগ্রহীতারা কোনো বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেবাপ্রার্থীদের বিড়ম্বনার শিকার হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। প্রতিটি পয়েন্টে আমরা দায়িত্বশীল লোক নিয়োজিত রেখেছি। কারো কোনো অভিযোগ থাকলে সরাসরি আমাকে জানালে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সবার সহযোগিতায় ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স একটি মাতৃবান্ধব হাসপাতাল হিসেবে গড়ে উঠবে।
ধুনট উপজেলার সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে দরিদ্র, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত প্রসূতিরা সরকারি ব্যবস্থাপনায় স্বল্প খরচে এই গুরুত্বপূর্ণ সেবা পাচ্ছেন। এতে তাদের আর্থিক সাশ্রয় হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ির বিড়ম্বনাও কমেছে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এই কার্যক্রমকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন সেবাগ্রহীতারা।
