পরিবেশ ও জলবায়ু
ঐ দেখা যায় তালগাছ, ঐ আমাদের গাঁ—ছোটবেলার পাঠ্যবইয়ের এই পরিচিত পঙক্তি আজ যেন বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়িয়েছে বগুড়ার ধুনট উপজেলায়। বজ্রপাত প্রতিরোধে যেখানে সারাদেশে তালগাছ রোপণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, সেখানে ধুনটে ঘটছে ঠিক তার উল্টো চিত্র—একশ্রেণির মানুষ মেতে উঠেছে উঠতি তালগাছ নিধনের মহোৎসবে।
তালগাছ শুধু একটি ফলজ বৃক্ষ নয়। পরিবেশবিদদের মতে, বজ্রপাত প্রতিরোধে এই গাছের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গভীরমূলী ও মজবুত এই বৃক্ষ ঝড়-তুফান ও মাটি ক্ষয় রোধেও কার্যকর ভূমিকা রাখে। জনশ্রুতি আছে, অতীতে বজ্রপাত হলে তা তালগাছ বা অন্য বড় গাছের ওপর পড়ে মাটিতে চলে যেত, ফলে মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি কম ছিল। কিন্তু বড় গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, আর বিশ্বে এই মৃত্যুহারে শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। এই বাস্তবতাতেই একসময়ের 'গুরুত্বহীন' তালগাছ এখন হয়ে উঠেছে জীবনরক্ষাকারী এক প্রাকৃতিক ঢাল।
বছরের পর বছর প্রচেষ্টা, তবু নিধনের শিকার।
দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো ধুনটেও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় নানা প্রজাতির বৃক্ষের পাশাপাশি তালবীজ রোপণ করে আসছে। এসব উদ্যোগে অনেক সময় সমাজের বিশিষ্টজন ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও অংশ নিয়েছেন। উপজেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে রোপণ করা হয়েছে তালবীজ, যার অনেকগুলো ইতিমধ্যে অঙ্কুরিত হয়ে ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের চান্দিয়ার গ্রাম এবং চিকাশী ইউনিয়নের ছোনপঁচা গ্রাম।
কিন্তু সম্প্রতি দেখা গেছে, এই দুই গ্রামের প্রধান সড়কের দুই পাশে স্বেচ্ছাসেবীদের রোপণ করা বীজ থেকে গড়ে ওঠা তালগাছগুলো অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা কেটে ও বিশেষ কৌশলে মেরে ফেলে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, রাস্তা নির্মাণের প্রয়োজনে অথবা জমির পাশে থাকা তালগাছের ছায়ায় ফসলের ক্ষতি হবে—এই আশঙ্কা থেকেও অনেক কৃষক নীরবে তালগাছ নিধন করছেন।
হৃদয়ে রক্তক্ষরণের মতো"—স্বেচ্ছাসেবীদের ক্ষোভ।
মানবিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আমরা ধুনটবাসী ফাউন্ডেশনের সভাপতি আঁখিনূর জামান বকুল বলেন, তারা উপজেলার বিভিন্ন স্থানে তালবীজ রোপণ করেছেন এবং সময়ের ব্যবধানে সেসব বীজ থেকে গড়ে ওঠা তালগাছ ইতিমধ্যে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা বিভিন্ন কৌশলে এসব গাছ মেরে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী করে তুলছে, যা স্বেচ্ছাসেবীদের জন্য হৃদয়ে রক্তক্ষরণের মতো বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বৃক্ষপ্রেমী ও রাজফুল ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের প্রধান নির্বাহী, সহকারী অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম নাবিল দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সমাজ ও মানুষের কল্যাণে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষ ও বীজ রোপণ করে আসছেন তারা। কিন্তু যে সমাজের জন্য এই বৃক্ষরোপণ, সেই সমাজেরই কিছু মানুষ যখন গাছ পুড়িয়ে বা বিভিন্ন কৌশলে মেরে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে, তার চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু হতে পারে না। তিনি বলেন, মানুষ সচেতন হতে পারে না—এটা ভুল ধারণা; বরং আমরা তাদের সচেতন করতে পারি না, এটাই আমাদের ব্যর্থতা।
আল-খিদমাহ কওমী ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের সভাপতি আশেকে এলাহী শিবলী বলেন, গ্রামীণ সমাজে তালগাছের পরিবেশগত গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতার অভাবই এই নিধনের অন্যতম প্রধান কারণ।
তাল বীচ রোপনের পাশাপাশি সরকারি ও সামাজিক সংগঠনের এবং ব্যক্তিগতভাবে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। তাহলে পরিবেশ রক্ষাকারী এই গাছকে রক্ষা করা হমতো সম্ভব হবে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, তালগাছ শুধু বজ্রপাত থেকে রক্ষাই করে না, বরং মাটির ক্ষয় রোধ করে, জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে এবং খাদ্য হিসেবেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা ধুনটবাসী ফাউন্ডেশন ও রাজফুল ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের যৌথ উদ্যোগে বছরের পর বছর ধরে তালবীজ রোপণ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যাতে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে আরও কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।
কিন্তু এই মানবিক উদ্যোগের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা নিধনযজ্ঞ থামানোর দায়িত্ব কি শুধু স্বেচ্ছাসেবীদেরই?
সমাজ ও সমাজের মানুষের কি এতে কোনো দায় নেই—এই প্রশ্নই আজ ধুনট উপজেলার সকল স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও পরিবেশ সচেতন মানুষের মুখে মুখে।
পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর জনসচেতনতামূলক উদ্যোগ ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া না গেলে বজ্রপাত প্রতিরোধে গড়ে তোলা এই প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যূহ ধ্বংস হয়ে যেতে বেশি সময় লাগবে না।
বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফ উল্লাহ নিজামী বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। মানুষ সচেতন হলে এমন ঘটনা ঘটার কথা নয় বলে মন্তব্য করে তিনি জানান, প্রশাসনিক ও স্থানীয়ভাবে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে পারলে এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ করা সম্ভব।

রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ জুলাই ২০২৬
ঐ দেখা যায় তালগাছ, ঐ আমাদের গাঁ—ছোটবেলার পাঠ্যবইয়ের এই পরিচিত পঙক্তি আজ যেন বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়িয়েছে বগুড়ার ধুনট উপজেলায়। বজ্রপাত প্রতিরোধে যেখানে সারাদেশে তালগাছ রোপণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, সেখানে ধুনটে ঘটছে ঠিক তার উল্টো চিত্র—একশ্রেণির মানুষ মেতে উঠেছে উঠতি তালগাছ নিধনের মহোৎসবে।
তালগাছ শুধু একটি ফলজ বৃক্ষ নয়। পরিবেশবিদদের মতে, বজ্রপাত প্রতিরোধে এই গাছের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গভীরমূলী ও মজবুত এই বৃক্ষ ঝড়-তুফান ও মাটি ক্ষয় রোধেও কার্যকর ভূমিকা রাখে। জনশ্রুতি আছে, অতীতে বজ্রপাত হলে তা তালগাছ বা অন্য বড় গাছের ওপর পড়ে মাটিতে চলে যেত, ফলে মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি কম ছিল। কিন্তু বড় গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, আর বিশ্বে এই মৃত্যুহারে শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। এই বাস্তবতাতেই একসময়ের 'গুরুত্বহীন' তালগাছ এখন হয়ে উঠেছে জীবনরক্ষাকারী এক প্রাকৃতিক ঢাল।
বছরের পর বছর প্রচেষ্টা, তবু নিধনের শিকার।
দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো ধুনটেও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় নানা প্রজাতির বৃক্ষের পাশাপাশি তালবীজ রোপণ করে আসছে। এসব উদ্যোগে অনেক সময় সমাজের বিশিষ্টজন ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও অংশ নিয়েছেন। উপজেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে রোপণ করা হয়েছে তালবীজ, যার অনেকগুলো ইতিমধ্যে অঙ্কুরিত হয়ে ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের চান্দিয়ার গ্রাম এবং চিকাশী ইউনিয়নের ছোনপঁচা গ্রাম।
কিন্তু সম্প্রতি দেখা গেছে, এই দুই গ্রামের প্রধান সড়কের দুই পাশে স্বেচ্ছাসেবীদের রোপণ করা বীজ থেকে গড়ে ওঠা তালগাছগুলো অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা কেটে ও বিশেষ কৌশলে মেরে ফেলে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, রাস্তা নির্মাণের প্রয়োজনে অথবা জমির পাশে থাকা তালগাছের ছায়ায় ফসলের ক্ষতি হবে—এই আশঙ্কা থেকেও অনেক কৃষক নীরবে তালগাছ নিধন করছেন।
হৃদয়ে রক্তক্ষরণের মতো"—স্বেচ্ছাসেবীদের ক্ষোভ।
মানবিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আমরা ধুনটবাসী ফাউন্ডেশনের সভাপতি আঁখিনূর জামান বকুল বলেন, তারা উপজেলার বিভিন্ন স্থানে তালবীজ রোপণ করেছেন এবং সময়ের ব্যবধানে সেসব বীজ থেকে গড়ে ওঠা তালগাছ ইতিমধ্যে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা বিভিন্ন কৌশলে এসব গাছ মেরে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী করে তুলছে, যা স্বেচ্ছাসেবীদের জন্য হৃদয়ে রক্তক্ষরণের মতো বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বৃক্ষপ্রেমী ও রাজফুল ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের প্রধান নির্বাহী, সহকারী অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম নাবিল দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সমাজ ও মানুষের কল্যাণে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষ ও বীজ রোপণ করে আসছেন তারা। কিন্তু যে সমাজের জন্য এই বৃক্ষরোপণ, সেই সমাজেরই কিছু মানুষ যখন গাছ পুড়িয়ে বা বিভিন্ন কৌশলে মেরে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে, তার চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু হতে পারে না। তিনি বলেন, মানুষ সচেতন হতে পারে না—এটা ভুল ধারণা; বরং আমরা তাদের সচেতন করতে পারি না, এটাই আমাদের ব্যর্থতা।
আল-খিদমাহ কওমী ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের সভাপতি আশেকে এলাহী শিবলী বলেন, গ্রামীণ সমাজে তালগাছের পরিবেশগত গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতার অভাবই এই নিধনের অন্যতম প্রধান কারণ।
তাল বীচ রোপনের পাশাপাশি সরকারি ও সামাজিক সংগঠনের এবং ব্যক্তিগতভাবে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। তাহলে পরিবেশ রক্ষাকারী এই গাছকে রক্ষা করা হমতো সম্ভব হবে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, তালগাছ শুধু বজ্রপাত থেকে রক্ষাই করে না, বরং মাটির ক্ষয় রোধ করে, জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে এবং খাদ্য হিসেবেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা ধুনটবাসী ফাউন্ডেশন ও রাজফুল ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের যৌথ উদ্যোগে বছরের পর বছর ধরে তালবীজ রোপণ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যাতে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে আরও কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।
কিন্তু এই মানবিক উদ্যোগের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা নিধনযজ্ঞ থামানোর দায়িত্ব কি শুধু স্বেচ্ছাসেবীদেরই?
সমাজ ও সমাজের মানুষের কি এতে কোনো দায় নেই—এই প্রশ্নই আজ ধুনট উপজেলার সকল স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও পরিবেশ সচেতন মানুষের মুখে মুখে।
পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর জনসচেতনতামূলক উদ্যোগ ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া না গেলে বজ্রপাত প্রতিরোধে গড়ে তোলা এই প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যূহ ধ্বংস হয়ে যেতে বেশি সময় লাগবে না।
বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফ উল্লাহ নিজামী বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। মানুষ সচেতন হলে এমন ঘটনা ঘটার কথা নয় বলে মন্তব্য করে তিনি জানান, প্রশাসনিক ও স্থানীয়ভাবে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে পারলে এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ করা সম্ভব।
