মাদক
মামলা হচ্ছে, জেল-জরিমানাও হচ্ছে—তবু থামছে না বগুড়ার ধুনটের মাদক কারবার। উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও পৌর এলাকা মিলিয়ে প্রায় ১৮০টি পয়েন্টে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে ইয়াবা, হিরোইন, ট্যাপেন্টাডল, আইস, ফেনসিডিল ও গাঁজাসহ নানা মাদকদ্রব্য। শুধু স্থানীয় বাজারই নয়, টেকনাফ ও উত্তরাঞ্চলের সীমান্ত থেকে আসা এসব চালানের একটি বড় অংশ নদীপথে পৌঁছে যাচ্ছে ঢাকা, জামালপুর, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলেও—কারবারিদের কাছে ধুনট যেন পরিণত হয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক মাদক করিডোরে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এই করিডোরের ভয়াবহ চালচিত্র। জয়পুরহাটের পাঁচবিবি সীমান্ত দিয়ে ঢোকে হিরোইন, ফেনসিডিল, ট্যাপেন্টাডল ও গাঁজা, আর টেকনাফ থেকে আসে ইয়াবা। এসব চালানের প্রধান প্রবেশপথ মথুরাপুর ও গোপালনগর ইউনিয়ন, কারবারিদের ভাষায় যা এখন পরিচিত 'ট্রানজিট পয়েন্ট' নামে। এখান থেকে যমুনা নদীর শহরাবাড়ি ঘাট দিয়ে মাদক পৌঁছে যায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, আবার একই নৌপথে জামালপুর ও কাজিপুরের চরাঞ্চল থেকে আসে গাঁজার বড় বড় চালান। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, নারী পাচারকারীরা ভিক্ষুক বা ভদ্রবেশে সপ্তাহে পাঁচ থেকে ছয় লাখ পিস ইয়াবা পৌঁছে দিচ্ছেন স্থানীয় কারবারিদের হাতে—প্রতি চালানে তাদের পারিশ্রমিক ৫০ হাজার টাকা, আর ধরা পড়লে আইনি খরচ বহন করেন নেপথ্যের 'বড় ভাই'রা, এমন অভিযোগও রয়েছে।
মাদক সহজলভ্য হওয়ায় এর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে পরিবারে পরিবারে। মথুরাপুরের হেদায়েতুল ইসলাম ও পাঁচথুপীর মোহাম্মদ আলীসহ একাধিক অভিভাবকের ভাষ্য, নেশার টাকার জোগাড়ে সন্তানরা এখন বাবা-মাকে খুন করতেও দ্বিধা করছে না। লাবনী নামে এক নারী জানান, কয়েকদিন আগেই মাদকের টাকার জন্য তার সন্তান তাকে মারধর করেছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে চিকাশী ও পশ্চিম ভরনশাহী গ্রামের দুই অভিভাবক নিজেদের সন্তানকে নিজ হাতে পুলিশে সোপর্দ করেছেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত যাদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছে। মথুরাপুরের হিজুলী গ্রামের প্রটেকশন ফর লিগ্যাল অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক রেজাউল করিম বলেন, তার নিজের পরিবারও এই আতঙ্কের বাইরে নয়। বাংলাদেশ মানবাধিকার সংস্থার সদস্য মোহাম্মদ আলীর দাবি, শুধু মথুরাপুর ইউনিয়নেই মাদক বেচাকেনায় সক্রিয় দেড় হাজারের বেশি মানুষ।
সংকটের গভীরতা স্বীকার করছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও। মথুরাপুর ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের, চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাসানুল করিম পুটু এবং গোপালনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম জানান, মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্যে উঠতি বয়সী যুবসমাজ ধ্বংসের পথে, অথচ স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা সভায় বারবার অভিযোগ জানিয়েও কোনো প্রতিকার মেলেনি।
আর এখানেই উঠে আসছে সবচেয়ে স্পর্শকাতর অভিযোগ—রাজনৈতিক ছত্রছায়া। মথুরাপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে মাদক কারবারিদের সহযোগিতার অভিযোগ থাকলেও তিনি তা অস্বীকার করেছেন। দলীয়ভাবে অবশ্য কিছু ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে—মাদকে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ইতিমধ্যে বহিষ্কার করা হয়েছে আরাফাত রহমান কোকো স্মৃতি সংসদের ধুনট উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম এবং এলাঙ্গী ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক উজ্জ্বল মিয়াকে। গত ২৮ জুন ভান্ডারবাড়ি ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জহুরুল ইসলামের ইয়াবা সেবনের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ভেঙে দেওয়া হয় উপজেলার সব ইউনিয়ন যুবদল কমিটি। তবে অভিযুক্ত জাহিদুল ইসলাম ও উজ্জ্বল মিয়া দুজনই দাবি করেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তাদের ঘায়েল করতেই এসব অভিযোগ সাজিয়েছে; উজ্জ্বল মিয়ার ভাষ্যে, তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে মাদক মামলার আসামি হয়েছেন।
এ ছাড়া বেল্লাল হোসেন, আলী আকবর, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা রাসেল, রাসেলা, রফিকুল, সেতু, দুলাল, আমিনুল, রূপালী, রফিক, বাদশা মিয়া, সেলিম ও উজ্জ্বল মিয়াসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে উপজেলাজুড়ে মাদক সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। জেলা গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা স্বীকার করেন, রাজনৈতিক আশ্রয়ের কারণে অনেক সময় আসামি ধরতে হিমশিম খেতে হয় থানা পুলিশকে। তবে ধুনট উপজেলা বিএনপির সভাপতি তৌহিদুল আলমের দাবি, মাদকের বিষয়ে কোনো ছাড় নেই। দলীয় কেউ জড়িত থাকলে পুলিশকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
প্রশাসনিক পরিসংখ্যান বলছে, গত ছয় মাসে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ২৮ জনকে জেল-জরিমানা এবং পুলিশি অভিযানে ৬১ জনকে আটক করা হয়েছে; উদ্ধার হয়েছে ৫৪৪ পিস ইয়াবা, ৩১৭ পিস ট্যাপেন্টাডল, ১৮.৫ কেজি গাঁজা ও ১২ গ্রাম হিরোইন, দায়ের হয়েছে ৩২টি মামলা। তারপরও কারবার কমেনি। এ বিষয়ে ধুনট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুল ইসলাম বলেন, জনবল সংকটের কারণে বিস্তৃত চরাঞ্চল ও প্রান্তিক এলাকায় অভিযান চালানো কঠিন হয়। পুলিশ দেখলেই মাদক কারবারিরা গা ঢাকা দেয়।
ধুনট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ উল্লাহ নিজামী অবশ্য আশ্বস্ত করে বলেন, দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি সহকারী কমিশনার (ভূমি)-সহ নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে মাদক কারবারিদের জেল-জরিমানা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।

রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ আগস্ট ২০২৬
মামলা হচ্ছে, জেল-জরিমানাও হচ্ছে—তবু থামছে না বগুড়ার ধুনটের মাদক কারবার। উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও পৌর এলাকা মিলিয়ে প্রায় ১৮০টি পয়েন্টে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে ইয়াবা, হিরোইন, ট্যাপেন্টাডল, আইস, ফেনসিডিল ও গাঁজাসহ নানা মাদকদ্রব্য। শুধু স্থানীয় বাজারই নয়, টেকনাফ ও উত্তরাঞ্চলের সীমান্ত থেকে আসা এসব চালানের একটি বড় অংশ নদীপথে পৌঁছে যাচ্ছে ঢাকা, জামালপুর, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলেও—কারবারিদের কাছে ধুনট যেন পরিণত হয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক মাদক করিডোরে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এই করিডোরের ভয়াবহ চালচিত্র। জয়পুরহাটের পাঁচবিবি সীমান্ত দিয়ে ঢোকে হিরোইন, ফেনসিডিল, ট্যাপেন্টাডল ও গাঁজা, আর টেকনাফ থেকে আসে ইয়াবা। এসব চালানের প্রধান প্রবেশপথ মথুরাপুর ও গোপালনগর ইউনিয়ন, কারবারিদের ভাষায় যা এখন পরিচিত 'ট্রানজিট পয়েন্ট' নামে। এখান থেকে যমুনা নদীর শহরাবাড়ি ঘাট দিয়ে মাদক পৌঁছে যায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, আবার একই নৌপথে জামালপুর ও কাজিপুরের চরাঞ্চল থেকে আসে গাঁজার বড় বড় চালান। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, নারী পাচারকারীরা ভিক্ষুক বা ভদ্রবেশে সপ্তাহে পাঁচ থেকে ছয় লাখ পিস ইয়াবা পৌঁছে দিচ্ছেন স্থানীয় কারবারিদের হাতে—প্রতি চালানে তাদের পারিশ্রমিক ৫০ হাজার টাকা, আর ধরা পড়লে আইনি খরচ বহন করেন নেপথ্যের 'বড় ভাই'রা, এমন অভিযোগও রয়েছে।
মাদক সহজলভ্য হওয়ায় এর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে পরিবারে পরিবারে। মথুরাপুরের হেদায়েতুল ইসলাম ও পাঁচথুপীর মোহাম্মদ আলীসহ একাধিক অভিভাবকের ভাষ্য, নেশার টাকার জোগাড়ে সন্তানরা এখন বাবা-মাকে খুন করতেও দ্বিধা করছে না। লাবনী নামে এক নারী জানান, কয়েকদিন আগেই মাদকের টাকার জন্য তার সন্তান তাকে মারধর করেছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে চিকাশী ও পশ্চিম ভরনশাহী গ্রামের দুই অভিভাবক নিজেদের সন্তানকে নিজ হাতে পুলিশে সোপর্দ করেছেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত যাদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছে। মথুরাপুরের হিজুলী গ্রামের প্রটেকশন ফর লিগ্যাল অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক রেজাউল করিম বলেন, তার নিজের পরিবারও এই আতঙ্কের বাইরে নয়। বাংলাদেশ মানবাধিকার সংস্থার সদস্য মোহাম্মদ আলীর দাবি, শুধু মথুরাপুর ইউনিয়নেই মাদক বেচাকেনায় সক্রিয় দেড় হাজারের বেশি মানুষ।
সংকটের গভীরতা স্বীকার করছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও। মথুরাপুর ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের, চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাসানুল করিম পুটু এবং গোপালনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম জানান, মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্যে উঠতি বয়সী যুবসমাজ ধ্বংসের পথে, অথচ স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা সভায় বারবার অভিযোগ জানিয়েও কোনো প্রতিকার মেলেনি।
আর এখানেই উঠে আসছে সবচেয়ে স্পর্শকাতর অভিযোগ—রাজনৈতিক ছত্রছায়া। মথুরাপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে মাদক কারবারিদের সহযোগিতার অভিযোগ থাকলেও তিনি তা অস্বীকার করেছেন। দলীয়ভাবে অবশ্য কিছু ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে—মাদকে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ইতিমধ্যে বহিষ্কার করা হয়েছে আরাফাত রহমান কোকো স্মৃতি সংসদের ধুনট উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম এবং এলাঙ্গী ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক উজ্জ্বল মিয়াকে। গত ২৮ জুন ভান্ডারবাড়ি ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জহুরুল ইসলামের ইয়াবা সেবনের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ভেঙে দেওয়া হয় উপজেলার সব ইউনিয়ন যুবদল কমিটি। তবে অভিযুক্ত জাহিদুল ইসলাম ও উজ্জ্বল মিয়া দুজনই দাবি করেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তাদের ঘায়েল করতেই এসব অভিযোগ সাজিয়েছে; উজ্জ্বল মিয়ার ভাষ্যে, তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে মাদক মামলার আসামি হয়েছেন।
এ ছাড়া বেল্লাল হোসেন, আলী আকবর, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা রাসেল, রাসেলা, রফিকুল, সেতু, দুলাল, আমিনুল, রূপালী, রফিক, বাদশা মিয়া, সেলিম ও উজ্জ্বল মিয়াসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে উপজেলাজুড়ে মাদক সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। জেলা গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা স্বীকার করেন, রাজনৈতিক আশ্রয়ের কারণে অনেক সময় আসামি ধরতে হিমশিম খেতে হয় থানা পুলিশকে। তবে ধুনট উপজেলা বিএনপির সভাপতি তৌহিদুল আলমের দাবি, মাদকের বিষয়ে কোনো ছাড় নেই। দলীয় কেউ জড়িত থাকলে পুলিশকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
প্রশাসনিক পরিসংখ্যান বলছে, গত ছয় মাসে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ২৮ জনকে জেল-জরিমানা এবং পুলিশি অভিযানে ৬১ জনকে আটক করা হয়েছে; উদ্ধার হয়েছে ৫৪৪ পিস ইয়াবা, ৩১৭ পিস ট্যাপেন্টাডল, ১৮.৫ কেজি গাঁজা ও ১২ গ্রাম হিরোইন, দায়ের হয়েছে ৩২টি মামলা। তারপরও কারবার কমেনি। এ বিষয়ে ধুনট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুল ইসলাম বলেন, জনবল সংকটের কারণে বিস্তৃত চরাঞ্চল ও প্রান্তিক এলাকায় অভিযান চালানো কঠিন হয়। পুলিশ দেখলেই মাদক কারবারিরা গা ঢাকা দেয়।
ধুনট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ উল্লাহ নিজামী অবশ্য আশ্বস্ত করে বলেন, দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি সহকারী কমিশনার (ভূমি)-সহ নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে মাদক কারবারিদের জেল-জরিমানা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।
