মতামতমতামত

উগ্রবাদ প্রতিহতে সংগীত যেন বারুদ—অতীত থেকে '২৬

উগ্রবাদ প্রতিহতে সংগীত যেন বারুদ—অতীত থেকে '২৬
মতামতদানকারীর ছবি

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মানুষের হাতে বন্দুক যেমন যুদ্ধ জিততে পারে, তেমনি একটি গানও জয় করতে পারে কোটি মানুষের হৃদয়। কখনও কখনও সংগীত বারুদের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কারণ বারুদ ধ্বংস করে, আর সংগীত জাগিয়ে তোলে চেতনা, সাহস, আত্মপরিচয় ও প্রতিরোধের শক্তি।

বাংলাদেশের ইতিহাস তার উজ্জ্বল উদাহরণ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি", ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে "জয় বাংলা, বাংলার জয়", ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গণসংগীত এবং নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে জর্জ হ্যারিসনের গাওয়া "Bangla Desh"—প্রতিটি গানই মানুষের হৃদয়ে স্বাধীনতার আগুন জ্বালিয়েছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র যেমন লড়েছে, তেমনি সংগীতও লড়েছে মানুষের মন, বিবেক এবং বিশ্বজনমতকে জাগিয়ে তোলার সংগ্রামে।

১৯৭১ সালের ১ আগস্ট অনুষ্ঠিত কনসার্ট ফর বাংলাদেশ ছিল সেই সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। পণ্ডিত রবিশঙ্করের উদ্যোগে জর্জ হ্যারিসন, বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, রিঙ্গো স্টারসহ বিশ্বের খ্যাতিমান শিল্পীরা যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। "Bangla Desh" গানটি তখন কেবল একটি সংগীত ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল মানবতার পক্ষে বিশ্বজনীন আবেদন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ভাষা।

ইতিহাস আমাদের আরেকটি শিক্ষা দেয়—যখন সমাজে বিভাজন, সংকীর্ণতা বা অসহিষ্ণুতা বাড়ে, তখন সংস্কৃতি ও সংগীত মানুষকে আবারও একত্রিত করার শক্তি হয়ে ওঠে। কারণ গান মানুষের আবেগ, স্মৃতি এবং পরিচয়কে এক সুতোয় গেঁথে দেয়।

সময়ের পরিক্রমায় ডিজিটাল যুগে এসে সেই সাংস্কৃতিক শক্তির নতুন রূপও দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে "শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে" গানকে ঘিরে তৈরি হওয়া আলোচনায় সিলেটের প্রধান শিক্ষিকা (সপ্রবি) বিউটি রানী পাল নতুনভাবে পরিচিতি পান। অল্প সময়ে অসংখ্য মানুষ একই গান ব্যবহার করে নিজেদের ভিডিও প্রকাশ করেন। অনেকের কাছে এটি একটি সাধারণ ভাইরাল ট্রেন্ড হলেও, অন্যদের কাছে এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়, শাড়ি, সংগীত এবং আত্মপরিচয় নিয়ে নতুন করে ভাবার উপলক্ষ হয়ে ওঠে।

এই ঘটনাকে ঘিরে সমাজে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। কেউ এটিকে ডিজিটাল সংস্কৃতির স্বাভাবিক প্রবণতা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন—সংস্কৃতির মাধ্যমে ভয়, সংকীর্ণতা ও সামাজিক বিভাজনের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিরোধ গড়ে তোলার একটি উদাহরণ এটি। মতভেদ থাকতেই পারে; কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—সংগীত আজও মানুষের আবেগকে একত্রিত করার অসাধারণ ক্ষমতা রাখে।

বাংলাদেশের সংস্কৃতির ভিত্তি বহুত্ববাদ, সহাবস্থান ও মানবিক মূল্যবোধ। শাড়ি, লোকগান, পুঁথিপাঠ, জারি, সারি, ভাটিয়ালি, বাউল, রবীন্দ্রসংগীত ও নজরুলগীতি—সব মিলিয়েই আমাদের জাতিসত্তার রঙিন বুনন। সেই ঐতিহ্য ধারণ ও চর্চা করা একটি জাতির সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার অংশ।

আজকের প্রশ্ন তাই কেবল একটি গান বা একটি ভাইরাল ভিডিওর নয়। প্রশ্ন হলো—আমরা কেমন সমাজ গড়তে চাই? এমন একটি সমাজ, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সহনশীলতাও থাকবে; যেখানে সংস্কৃতির চর্চা হবে ভয়ের নয়, স্বাধীনতার প্রতীক; যেখানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষ নিজের পরিচয় ও সৃজনশীলতা নিয়ে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারবে।

ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—উগ্রতা ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ কেবল শক্তি নয়, সংস্কৃতিও। আর সেই সংস্কৃতির সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষাগুলোর একটি হলো সংগীত। অতীতের ইতিহাস থেকে বর্তমানের অভিজ্ঞতা—দুটিই আমাদের সেই শিক্ষাই দিয়ে যায়।

Public Voice

শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


উগ্রবাদ প্রতিহতে সংগীত যেন বারুদ—অতীত থেকে '২৬

প্রকাশের তারিখ : ২৭ জুলাই ২০২৬

featured Image

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মানুষের হাতে বন্দুক যেমন যুদ্ধ জিততে পারে, তেমনি একটি গানও জয় করতে পারে কোটি মানুষের হৃদয়। কখনও কখনও সংগীত বারুদের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কারণ বারুদ ধ্বংস করে, আর সংগীত জাগিয়ে তোলে চেতনা, সাহস, আত্মপরিচয় ও প্রতিরোধের শক্তি।

বাংলাদেশের ইতিহাস তার উজ্জ্বল উদাহরণ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি", ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে "জয় বাংলা, বাংলার জয়", ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গণসংগীত এবং নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে জর্জ হ্যারিসনের গাওয়া "Bangla Desh"—প্রতিটি গানই মানুষের হৃদয়ে স্বাধীনতার আগুন জ্বালিয়েছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র যেমন লড়েছে, তেমনি সংগীতও লড়েছে মানুষের মন, বিবেক এবং বিশ্বজনমতকে জাগিয়ে তোলার সংগ্রামে।

১৯৭১ সালের ১ আগস্ট অনুষ্ঠিত কনসার্ট ফর বাংলাদেশ ছিল সেই সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। পণ্ডিত রবিশঙ্করের উদ্যোগে জর্জ হ্যারিসন, বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, রিঙ্গো স্টারসহ বিশ্বের খ্যাতিমান শিল্পীরা যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। "Bangla Desh" গানটি তখন কেবল একটি সংগীত ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল মানবতার পক্ষে বিশ্বজনীন আবেদন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ভাষা।

ইতিহাস আমাদের আরেকটি শিক্ষা দেয়—যখন সমাজে বিভাজন, সংকীর্ণতা বা অসহিষ্ণুতা বাড়ে, তখন সংস্কৃতি ও সংগীত মানুষকে আবারও একত্রিত করার শক্তি হয়ে ওঠে। কারণ গান মানুষের আবেগ, স্মৃতি এবং পরিচয়কে এক সুতোয় গেঁথে দেয়।

সময়ের পরিক্রমায় ডিজিটাল যুগে এসে সেই সাংস্কৃতিক শক্তির নতুন রূপও দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে "শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে" গানকে ঘিরে তৈরি হওয়া আলোচনায় সিলেটের প্রধান শিক্ষিকা (সপ্রবি) বিউটি রানী পাল নতুনভাবে পরিচিতি পান। অল্প সময়ে অসংখ্য মানুষ একই গান ব্যবহার করে নিজেদের ভিডিও প্রকাশ করেন। অনেকের কাছে এটি একটি সাধারণ ভাইরাল ট্রেন্ড হলেও, অন্যদের কাছে এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়, শাড়ি, সংগীত এবং আত্মপরিচয় নিয়ে নতুন করে ভাবার উপলক্ষ হয়ে ওঠে।

এই ঘটনাকে ঘিরে সমাজে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। কেউ এটিকে ডিজিটাল সংস্কৃতির স্বাভাবিক প্রবণতা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন—সংস্কৃতির মাধ্যমে ভয়, সংকীর্ণতা ও সামাজিক বিভাজনের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিরোধ গড়ে তোলার একটি উদাহরণ এটি। মতভেদ থাকতেই পারে; কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—সংগীত আজও মানুষের আবেগকে একত্রিত করার অসাধারণ ক্ষমতা রাখে।

বাংলাদেশের সংস্কৃতির ভিত্তি বহুত্ববাদ, সহাবস্থান ও মানবিক মূল্যবোধ। শাড়ি, লোকগান, পুঁথিপাঠ, জারি, সারি, ভাটিয়ালি, বাউল, রবীন্দ্রসংগীত ও নজরুলগীতি—সব মিলিয়েই আমাদের জাতিসত্তার রঙিন বুনন। সেই ঐতিহ্য ধারণ ও চর্চা করা একটি জাতির সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার অংশ।

আজকের প্রশ্ন তাই কেবল একটি গান বা একটি ভাইরাল ভিডিওর নয়। প্রশ্ন হলো—আমরা কেমন সমাজ গড়তে চাই? এমন একটি সমাজ, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সহনশীলতাও থাকবে; যেখানে সংস্কৃতির চর্চা হবে ভয়ের নয়, স্বাধীনতার প্রতীক; যেখানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষ নিজের পরিচয় ও সৃজনশীলতা নিয়ে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারবে।

ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—উগ্রতা ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ কেবল শক্তি নয়, সংস্কৃতিও। আর সেই সংস্কৃতির সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষাগুলোর একটি হলো সংগীত। অতীতের ইতিহাস থেকে বর্তমানের অভিজ্ঞতা—দুটিই আমাদের সেই শিক্ষাই দিয়ে যায়।


Public Voice

সম্পাদক: মোঃ বাদশাহ আলমগীর
প্রকাশক: অনন্যা অনসূয়া দিবা

কপিরাইট © ২০২৬ Public Voice । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত