কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ীভাবে সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদে কর্মকর্তা না থাকায় ভূমি সেবা কার্যক্রমে চরম স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করায় প্রশাসনিক ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত জমির নামজারি (খারিজ) সম্পন্ন হচ্ছে না। এর ফলে জমি ক্রয়-বিক্রয়, খাজনা পরিশোধ, রাজস্ব আদায়সহ সামগ্রিক ভূমি ব্যবস্থাপনায় নানা জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে তৈরি হচ্ছে জাল নামজারির কাগজপত্র ব্যবহার করে দলিল সম্পাদনের আশঙ্কাও।
জানা গেছে, এর আগে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার প্রয়োজনীয় ভূমি আইডি না থাকায় প্রায় চার থেকে পাঁচ মাস পর্যন্ত জমির নামজারির কার্যক্রম কার্যত বন্ধ ছিল। এতে উপজেলার সাধারণ মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে ভূমি সেবা থেকে বঞ্চিত হন। অনেকেই জমির খাজনা ও খারিজ সম্পন্ন করতে না পারায় সরকারেরও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আদায় ব্যাহত হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নামজারি কার্যক্রম বন্ধ বা ধীরগতির হওয়ায় জমি ক্রয়-বিক্রয়ের পুরো প্রক্রিয়াই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষই আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যে পড়ছেন।
স্থানীয় দলিল লেখক মজিবর রহমান, স্বপন মিয়াসহ একাধিক ভুক্তভোগী জানান, প্রায় চার মাস ধরে জমির নামজারি হচ্ছে না। ফলে জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে তারা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অনেক লেনদেন আটকে রয়েছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পন্ন করতে না পারায় মানুষ অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত চিলমারী উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার সবুজ মিয়া বলেন, বর্তমানে খারিজকৃত জমির বিক্রেতা না পাওয়ায় শুধু রেকর্ডভুক্ত (রেকর্ডিও) জমির দলিল সম্পাদন করা হচ্ছে। অর্থাৎ নিয়মিত নামজারি সম্পন্ন না হওয়ায় স্বাভাবিক দলিল নিবন্ধন কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
অন্যদিকে, প্রয়োজনের সময় জমির নামজারি না হওয়ায় কিছু অসাধু ব্যক্তি ও স্বার্থান্বেষী চক্রের মাধ্যমে জাল নামজারির কাগজপত্র তৈরির প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে জাল কাগজ ব্যবহার করে দলিল সম্পাদনের ঝুঁকি আরও বাড়বে এবং ভূমি জালিয়াতির ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এরই মধ্যে এ ধরনের একটি ঘটনার সত্যতা মিলেছে। সম্প্রতি চিলমারী ভূমি অফিসের সামনেই এক কম্পিউটার দোকানদারকে ভূমি সংক্রান্ত জাল কাগজপত্র তৈরির সরঞ্জামাদিসহ আটক করা হয়। পরে গত ০১/০৭/২০২৬ ইং তারিখে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে এবং জালিয়াতি চক্রের সক্রিয়তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দেয়।
গত ০৬/০৭/২০২৬ ইং (সোমবার) সরেজমিনে উপজেলা ভূমি অফিসে গিয়ে এ বিষয়ে কানুনগো সুলতান মাহমুদের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, জমির নামজারি সম্পন্ন করতে আইন অনুযায়ী ৪৫ দিন সময় নির্ধারিত রয়েছে। আবেদনকারীর কাগজপত্র বৈধ হলে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে নামজারি সম্পন্ন করে থাকেন।
এদিকে ০৮/০৭/২০২৬ ইং (বুধবার) মোবাইল ফোনে চিলমারী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, গত এক-দুই সপ্তাহ ধরে জমির খারিজের কাজ পুনরায় শুরু হয়েছে। বর্তমানে ৩১০টি আবেদন পেন্ডিং রয়েছে এবং সেগুলো পর্যায়ক্রমে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং স্থায়ী সাব-রেজিস্ট্রার না থাকায় ভূমি প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে একদিকে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছেন, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আদায় ব্যাহত হচ্ছে এবং ভূমি জালিয়াতির ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এ অবস্থায় বিরাজমান অসঙ্গতি ও সমস্যা দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে এলাকাবাসী, ভুক্তভোগী এবং সংশ্লিষ্টরা চিলমারী উপজেলায় অবিলম্বে একজন স্থায়ী সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং একজন স্থায়ী সাব-রেজিস্ট্রার পদায়নের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা বিষয়টিতে ভূমিমন্ত্রীর দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন, যাতে সাধারণ মানুষ দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরবচ্ছিন্ন ভূমি সেবা নিশ্চিতভাবে পেতে পারেন।






এই পোস্টে মন্তব্য বন্ধ আছে।