নরসিংদীর মাধবদীতে ধর্ষণের বিচার দাবি করায় বাবার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে নির্মমভাবে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
নিহত কিশোরীর নাম আমেনা আক্তার (১৫)। তার পিতা মো. আশরাফ হোসেন। তারা পৈত্রিকভাবে বরিশালের বাসিন্দা হলেও দীর্ঘদিন ধরে মাধবদীর বিলপাড় এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন।
নিহতের স্বজন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৫ দিন আগে স্থানীয় বখাটে নূর মোহাম্মদের নেতৃত্বে ৫–৬ জনের একটি দল আমেনাকে তুলে নিয়ে যায় এবং তাকে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ। ওই সময় বিষয়টি আইনের আওতায় না এনে স্থানীয়ভাবে ‘মীমাংসা’ করা হয়।
বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে কাজ শেষে আমেনার বাবা মেয়েকে খালার বাড়িতে রেখে আসার পথে বড়ইতলা এলাকায় পৌঁছালে নূর মোহাম্মদ দলবলসহ প্রকাশ্যে আবারও আমেনাকে জোরপূর্বক তুলে নেয়। এরপর রাতভর খোঁজাখুঁজি করেও পরিবারের সদস্যরা তার কোনো সন্ধান পাননি।
পরদিন বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) সকালে মাধবদী থানা এলাকার মহিষাশুরা ইউনিয়নের কোতালিরচর দড়িকান্দীর একটি সরিষা ক্ষেত থেকে গলায় ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় আমেনার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
নিহতের বাবা মো. আশরাফ হোসেন বলেন, “আমার সামনে থেকেই নূর মোহাম্মদের নেতৃত্বে কয়েকজন আমার মেয়েকে জোর করে নিয়ে যায়। রাতে আর খুঁজে পাইনি। সকালে জানতে পারি, আমার মেয়ের লাশ সরিষা ক্ষেতে পড়ে আছে। যারা আমার সন্তানকে হত্যা করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
মাধবদী থানার ওসি কামাল হোসেন জানান, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, আমেনার সঙ্গে নূর মোহাম্মদের প্রেমের সম্পর্ক ছিল, যা পরিবার মেনে নেয়নি। বুধবার রাতে বাবার কাছ থেকে তাকে তুলে নেওয়ার পর সকালে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে সন্দেহভাজন হিসেবে একজনকে আটক করা হয়েছে এবং ধর্ষণের অভিযোগসহ পুরো বিষয়টি তদন্তাধীন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধকে সালিশের নামে ধামাচাপা দেওয়ার সংস্কৃতিই এই হত্যাকাণ্ডকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে। তাদের মতে, এটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়—সমাজ, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার সম্মিলিত ব্যর্থতার প্রতিফলন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধর্ষণ একটি ফৌজদারি অপরাধ—এটি কোনো সামাজিক মীমাংসার বিষয় হতে পারে না। লিখিত অভিযোগ না থাকলেও পুলিশকে স্বপ্রণোদিত হয়ে হত্যা ও ধর্ষণ মামলা গ্রহণ করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা উচিত। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারকে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা দেওয়া এবং অপরাধ ধামাচাপায় জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
সবশেষে স্থানীয়দের আহ্বান—নীরবতা নয়, প্রতিবাদই হোক সমাজের ভাষা। স্কুল, মসজিদ, বাজার ও পরিবারভিত্তিক উদ্যোগে ধর্ষণবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার মাধ্যমে এমন অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে।
সব মিলিয়ে, আমেনা আক্তারের হত্যাকাণ্ড আমাদের সামনে একটি কঠিন সত্য তুলে ধরে—ধর্ষণ আড়াল করার সংস্কৃতি, প্রভাবশালীদের প্রশ্রয় এবং ন্যায়বিচারে দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের আরও হিংস্র করে তোলে। এই ঘটনা যেন আর কোনো পরিবারে না ঘটে, সে জন্য অবিলম্বে দোষীদের গ্রেপ্তার, দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার, ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা এবং ধর্ষণ–হত্যা আড়ালে রাখার যেকোনো সালিশি প্রক্রিয়া বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হলে সমাজে ভয়ই রাজত্ব করবে—আর ন্যায়বিচার নিশ্চিত হলেই কেবল এমন বিভীষিকার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব।






এই পোস্টে মন্তব্য বন্ধ আছে।