টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার প্রভাবে বগুড়ার ধুনট উপজেলার কাঁচাবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় শাকসবজির বাজারে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে অধিকাংশ সবজির দাম কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য প্রতিদিনের বাজার করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ মানুষের ভাষায়, ‘শাকসবজির বাজার এখন গরিবের সাধ্যের বাইরে’।
সোমবার (২০ জুলাই) সকালে ধুনট পৌর বাজারসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, অল্প কয়েকটি সবজি ছাড়া প্রায় সব ধরনের শাকসবজির দাম স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। যদিও ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে সবজি পাওয়া যাচ্ছে, তবে সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে। এতে বাজারে কোনো সংকট না থাকলেও উচ্চমূল্যের কারণে ক্রেতাদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, টানা বৃষ্টি ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার কারণে সবজির উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। অনেক এলাকার খেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় উৎপাদন কমেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন মোকাম থেকে সময়মতো পণ্য না পৌঁছানোয় সরবরাহ কমে গেছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে খুচরা বাজারে।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতি কেজি বেগুন ৯০ থেকে ১০০ টাকা, করলা ৮০ থেকে ১০০ টাকা, ঢেঁড়স ৭০ থেকে ৮০ টাকা, চিচিঙ্গা ৭০ থেকে ৮০ টাকা, শসা ৯০ থেকে ১০০ টাকা এবং ঝিঙা ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পটল, যা গত সপ্তাহে ২০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছিল, বর্তমানে ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে ২০-২৫ টাকার লাউ এখন ৪০-৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কাঁচামরিচের বাজারে সবচেয়ে বেশি ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। কয়েক দিন আগেও ১২০ টাকা কেজিতে বিক্রি হওয়া কাঁচামরিচ এখন সাধারণ মানে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা এবং ভালো মানের কাঁচামরিচ ২০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া কচুর লতি, যা এক সপ্তাহ আগে ২০-৩০ টাকা কেজি ছিল, এখন ৪০-৫০ টাকা। কচুরমুখী ৩০-৪০ টাকা থেকে বেড়ে ৬০ টাকায় পৌঁছেছে। আলু ও পেঁয়াজের দাম মোটামুটি অপরিবর্তিত থাকলেও কিছু বাজারে পেঁয়াজ ৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। তুলনামূলকভাবে কম দামে বিক্রি হচ্ছে পেঁপে, যার কেজি ৩০-৪০ টাকা।
বাজারে আসা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের অভিযোগ, সংসারের আয় না বাড়লেও প্রতিদিনই বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম সবজি কিনে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে।
বাজার করতে আসা সাবেক সরকারি কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান বলেন, “সরবরাহ সংকট থাকলেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফার জন্য অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়াচ্ছেন। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।”
খুচরা সবজি ব্যবসায়ী মো. রঞ্জু হোসেন বলেন, “আমাদের কোনো হাত নেই। পাইকারি বাজার থেকেই বেশি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে বিক্রি করছি। দাম বাড়ার কারণে বিক্রিও কমে গেছে। মানুষ এখন প্রয়োজনের তুলনায় কম সবজি কিনছেন।”
সবজি বিক্রেতা জহুরুল ইসলাম বলেন, “টানা বৃষ্টি ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার কারণে সবজির সরবরাহ কমে গেছে। এ কারণেই প্রায় সব ধরনের সবজির দাম বেড়েছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে দাম কিছুটা কমতে পারে।”
মথুরাপুর বাজারের কাঁচামাল ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম বলেন, “বৃষ্টির কারণে পরিবহন সময়মতো পৌঁছাতে পারছে না। মোকামে সবজির সংকট থাকায় বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এর প্রভাব খুচরা বাজারেও পড়ছে।”
সবজির বাজারে ঊর্ধ্বগতির বিপরীতে ডিমের বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। প্রতি ডজন লাল ডিম ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত সপ্তাহের তুলনায় ১০-১৫ টাকা কম। সাদা ডিমও প্রতি ডজন ১২০ টাকা। ব্রয়লার মুরগি ১৭০-১৮০ টাকা, সোনালি ৩১০-৩৩০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৫৫০-৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে মাছের বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন নেই। রুই, কাতল, তেলাপিয়া, পাঙাশসহ অধিকাংশ মাছ গত সপ্তাহের দামে বিক্রি হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, বাজারে সবজি পাওয়া গেলেও বর্তমান দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষ করে দিনমজুর, নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী ও স্বল্প আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে। তাদের দাবি, বাজারে নিয়মিত নজরদারি বাড়িয়ে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।






এই পোস্টে মন্তব্য বন্ধ আছে।