টিকটকে প্রেম, দুই বছর একসঙ্গে বসবাসের পর বিচ্ছেদ
নেত্রকোণার দূর্গাপুর উপজেলা-এ প্রেম ও সহবাসের জটিল সম্পর্ককে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্যকর এক ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে। বিয়ের দাবিতে এক হিন্দু যুবকের বাড়িতে অবস্থান নিয়েছেন মিতু আক্তার (৩২) নামে এক মুসলিম নারী। ঘটনাটি উপজেলার কাকৈরগড়া ইউনিয়ন-এর পূর্ব কাকৈরগড়া গ্রামে ঘটেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় চার বছর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকের মাধ্যমে মিতু আক্তার ও অন্তু চক্রবর্তীর পরিচয় হয়। পরিচয় থেকে শুরু হয় প্রেমের সম্পর্ক। পরে তারা দীর্ঘ প্রায় দুই বছর একসঙ্গে বসবাস করেন। তবে পরবর্তীতে ধর্মীয় পরিচয়, পারিবারিক তথ্য গোপন এবং ব্যক্তিগত নানা বিষয় নিয়ে তাদের সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়। এক পর্যায়ে সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটে।
শুক্রবার (৮ মে) বিকেল থেকে অন্তু চক্রবর্তীর বাড়িতে অবস্থান নেন মিতু আক্তার। এতে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে উৎসুক মানুষ ঘটনাস্থলে ভিড় করছেন।
মিতু আক্তারের বাড়ি রাজবাড়ী জেলা-এর দুলদী লক্ষীপুর গ্রামে। তিনি জানান, ২০২২ সালে টিকটকে পরিচয়ের পর তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সে সময় অন্তু সাভারের একটি গার্মেন্টসে চাকরি করতেন। ২০২৪ সালে তিনি সাভারে গিয়ে অন্তুর সঙ্গে একসঙ্গে বসবাস শুরু করেন।
মিতু আক্তারের দাবি, তিনি শুরু থেকেই নিজের পরিচয় ও আগের সংসারের কথা অন্তু চক্রবর্তীকে জানিয়েছিলেন। তার ভাষ্য, আগের সংসারে তার এক ছেলে ও এক মেয়ে সন্তান রয়েছে। কিন্তু অন্তু এসব জেনেও তাকে গ্রহণ করেছিলেন এবং বিয়ের আশ্বাস দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, “আমি তাকে আগেই বলেছিলাম আমার স্বামী-সন্তান আছে। তখন সে বলেছিল, এসব তার সমস্যা না। আমার ১০টা সন্তান থাকলেও সে আমাকে নিয়েই থাকবে। সে কখনও আমার ধর্ম নিয়েও আপত্তি করেনি। আমি নামাজ পড়তাম, কোরআন পড়তাম, সেও শুনতো। এখন সে আমাকে অস্বীকার করছে। সে আমাকে বিয়ে না করলে আমি এখানেই মরবো।”
অন্যদিকে অন্তু চক্রবর্তী দাবি করেন, তিনি জানতেন না মিতু মুসলিম এবং বিবাহিত। তার ভাষায়, “হিন্দু পরিচয়ে তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক হয়েছিল। পরে জানতে পারি সে বিবাহিত এবং তার সন্তানও আছে। এরপর আমি সম্পর্ক থেকে সরে আসি। এখন সে বাড়িতে এসে বিয়ের দাবি করছে। কিন্তু আমি তাকে বিয়ে করবো না।”
অন্তুর বাবা অসিত চক্রবর্তী জানান, ছেলের সঙ্গে ওই নারীর সম্পর্কের বিষয়টি তিনি আগে জানতেন না।
স্থানীয় বাসিন্দা এরশাদ মিয়া বলেন, “এ ধরনের ঘটনা সমাজের জন্য ভালো নয়। তবে যেহেতু তারা দীর্ঘদিন একসঙ্গে ছিল, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।”
সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্য জামাল উদ্দিন জানিয়েছেন, এলাকাবাসী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টির সমাধানের চেষ্টা চলছে।
এ বিষয়ে দূর্গাপুর থানা-র অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ বলেন, ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। অভিযোগের আইনগত দিক যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিষয়টি শুধু একটি প্রেম বা পারিবারিক বিরোধ নয়; এটি বর্তমান সমাজের কয়েকটি গভীর সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরিচয়, বিশ্বাস ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের ফাঁক তৈরি হচ্ছে। টিকটক বা ভার্চুয়াল যোগাযোগে আবেগ দ্রুত তৈরি হলেও, পারিবারিক, ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত বাস্তবতা অনেক সময় পরে সামনে আসে। তখন সম্পর্ক ভাঙন, প্রতারণার অভিযোগ ও সামাজিক সংঘাত তৈরি হয়।
দীর্ঘদিন একসঙ্গে বসবাসের পর সম্পর্ক অস্বীকার করার ঘটনা সমাজে নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্ন তোলে। আবার নিজের পূর্ববর্তী বৈবাহিক পরিচয় বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করাও বিশ্বাসভঙ্গের বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে এখানে একপক্ষকে সম্পূর্ণ নির্দোষ বা অন্যপক্ষকে পুরোপুরি দায়ী বলা কঠিন।
ধর্মীয় ভিন্নতা এখনো আমাদের সমাজে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ক অনেক পরিবার সহজভাবে নিতে পারে না। ফলে ব্যক্তিগত সম্পর্ক দ্রুত সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক আলোচনায় রূপ নেয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এ ধরনের ঘটনায় জনসমাগম, কৌতূহল বা সামাজিক অপমান নয়; প্রয়োজন মানবিক ও আইনসম্মত সমাধান। দুই পক্ষের বক্তব্য, প্রতিশ্রুতি, সহবাসের বাস্তবতা এবং আইনি অবস্থান বিবেচনা করেই সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। কারণ আবেগ দিয়ে শুরু হওয়া সম্পর্ক ভেঙে গেলে তার প্রভাব শুধু দুইজন মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং পরিবার ও সমাজেও অস্থিরতা তৈরি করে।






এই পোস্টে মন্তব্য বন্ধ আছে।